ভ্রান্তি বিচ্ছেদ
প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০১৮
লেখকঃ

 165 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখা: মাবরুর আহমাদ নাকীব। (জুলাই, ১৮)

১.
রাত ৩.০২; গহীন রজনী। বৃষ্টির জল পতনের শব্দে চারিদিক টুপ টুপ করছে। এই শব্দ আবার কয়েক ধরণের; কোথাও বাতাস কেটে জল আছড়ে পড়ার ক্ষীণতর শব্দ। কোথাও জল গড়িয়ে পড়ার ভোঁতা শব্দ। কোথাও বা জলের চুইয়ে পড়া টিপ টাপ শব্দ। নয়তো টিনের চালে পতিত হয়ে অঝোর ধারার শ্রুতিমধুর ক্রন্দন! আরো কত যে শব্দের সম্মেলন অনবরত ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে নিঃশব্দের মহাশব্দে গর্বে চৌচির হয়ে, তার বুঝি ইয়ত্তা নেই। হঠাৎ করে কল্পলোক বেয়ে ধারালো সূক্ষ্ম ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে বিনা অনুমতিপত্রে প্রবেশ করতে লাগলো; বৃষ্টির চিত্ত ভুলানো সফেদ রঙের ঘ্রাণ। অসজ্ঞায়িত সকল কিছুর রং চোখ ধাঁধানো সফেদ হয়।
শব্দে শব্দ ঢাকে, গন্ধ ঢাকে কিসে? সবমিলিয়ে এক অপার্থিব আবহে শব্দের মোহময় নূপুর নৃত্য। ছন্দের তালে তালে মনের সুধা উজাড় করে দেওয়া। সম্মোহনী শিহরণে আবেশে চোখ জড়িয়ে আসা।
পুরো শহরটা বেঘোর ঘুমে মগ্ন। ভারী নিঃশ্বাসের শব্দে মৃদু পায়ে ঘুরে বেড়ানো বিড়ালটা শঙ্কা নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছে। চারটে ইঁদুর হুল্লোর করে বেড়াচ্ছে। ওরা রাতজাগা, মানব জাতি যখন ঘুমিয়ে কাতর, তখন তাদের রাজত্বে উৎসব শুরু হয়। এই চারটে ইঁদুরও আজ উৎসবে অংশ নিয়েছে। দুর্বোধ্য ভাষায় গল্প করতে করতে তারা আচমকা আঁতকে উঠল বিড়ালের সবুজাভ চোখের দিকে তাকিয়ে। আতঙ্কে নেংটি ইঁদুরগুলো বেখেয়ালেই যেন পড়িমরি করে ছুট লাগানোর মতো বড্ড ভুল করে বসলো। কিন্তু ধড়িবাজ বেড়াল ভুল করেনি, একটি ইঁদুরকে সে ঠিকই ধরে বসলো। রীতিমতো তার ঘাড় চেপে ধরে এক কামড়ে ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিলো। নিরুপায় ইঁদুরের মাথাহীন দেহ লাফাতে লাফাতে স্থির হতে খুব সময় লাগেনি। মাত্র কয়েক পলক আগে, গর্ভভরে দাপিয়ে বেড়ানো, ধারালো দাঁত দিয়ে নানান জিনিষপাতি কুটিকুটি করা ইঁদুরের নিথর দেহ ঘরের এক কোণে ধূলোয় মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে। প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার অন্তিম মূহুর্তেও সে যে নিজেকে বাঁচানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছে, তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু আফসোস তাকে পরাজিত হয়ে হয়েছে, নিয়তির অমোঘ পরিণতি। অবশ্য এরূপ একদিন হওয়ারই ছিলো; আজ না হয় কাল।
নিঝুম রাতের এই শেষ যামে আর সকলে ঘুমিয়ে থাকলেও বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছায়ামূর্তি। ছেলেটার নাম রাহিন; রাহিন আহমাদ। কারমাইকেল কলেজের ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সে। তুখোর মেধাবী হিসেবে বন্ধু মহলে তার বেশ নামডাক আছে। অবশ্য এখন আছে বললে কিঞ্চিত ভুল হবে; ছিল বলা যেতে পারে।
রাহিনের নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে গতকাল বিকেল থেকে। যখন তার প্রিয় বন্ধু আমান আমতা আমতা করতে করতে অদ্রির বিয়ের খবর তাকে দেয়। অদ্রি রাহিনের খুব ভালো বন্ধু । যদিও রাহিন গোপনে গোপনে তাকে অতি আপন করে ভাবতে শুরু করেছে। নিত্য নতুন ভঙ্গিতে অদ্রিকে অভিভূত করার কোশেশ করে চলছে অনবরত । অদ্রিও এই ব্যাপারটা বেশ আঁচ করতে পেরেছে। কিন্তু সে তাতে কোন আপত্তি করেনি। বরং তার ভাবনা, ভালো লাগাগুলো ধীরে ধীরে রাহিনকে ঘিরেই যেন আবর্তিত হতে শুরু করেছে। স্রষ্টা মানুষকে স্বাধীন চিন্তা শক্তি দিয়েছেন। তাই তার ব্যক্তিগত পছন্দ থাকতেই পারে। সে কাউকে আপন করে নীড় বাঁধার স্বপ্ন বুনবে এটাই স্বাভাবিক। মা বাবারা তো ছেলে মেয়ের সুখই দেখতে চান। আর সুখ যদি অর্থবিত্ত, প্রভাব প্রতিপত্তি, উঁচু উঁচু দালানের উপর নির্ভর করতো- তবে বিশ্বের যতো সামর্থবান, ধনী-ধনকুবের আছে- তারা বিনা বাক্যব্যয়ে সুখী হিসেবে বিবেচিত হতেন। কিন্তু আদৌ কি তা ঠিক? তারা কি আদৌ সুখী?
সহজ বাক্যে উত্তর হবে- না; মোটেও না। তবে কেন আমাদের দেশের অভিভাবকরা নিজের মেয়েকে উচ্চবিত্তের ঘরে বিয়ে দেওয়ার মতো চরম নির্বুদ্ধিতার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেন? যার দরুন সংসারগুলোতে আজ বিপত্তির ঘনঘটা!
অদ্রির বিয়ের খবর শুনে তাই রাহিন যেন বোবা হয়ে গেছে। সে মূর্তির মতো ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো। পুরো পৃথিবীই যেন থমকে গেছে। মূল্যহীন হয়ে গেছে সবকিছু। তার মাথায় কেবল কিছু অপ্রিয় কথা বাজতে লাগলো – “এখন আর বেঁচে থেকে কি হবে? যার জন্য বেঁচে থাকার কথা ছিল সেই যদি আমাকে ফেলে চলে যায়, তাহলে আমি বেঁচে থেকে কি করবো?
যার জন্য স্বপ্নগুলোকে এতো যত্ন করে সাজিয়েছি, সে স্বপ্নগুলোকে ধূলোয় মিশিয়ে দিয়ে অন্য কারো হাতে হাত রাখবে, তার জন্য স্বপ্ন বুনবে- এ যেন ভাবাই যায়না।”
২.
টলতে টলতে কোনরকমে রুমে ফিরে এসে বিছানায় আছড়ে পড়লো রাহিন। অঝোর অশ্রু আর বাঁধ মানলো না। ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লো সে। ঘুমে ভয়ঙ্কর একটা স্বপ্ন দেখলে সে, যেখানে অদ্রি অপরিচিত এক লোকের সাথে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে। লোকটা বোধহয় তার স্বামী। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হেসে হেসে কথা বলছে। সম্ভবত লোকটা কোন মজার কথা বলছে। যা শুনে অদ্রির হেসে কুটিকুটি অবস্থা।
হাসির প্রতিটি কম্পন রাহিনের বুকে সূচের ডগার মতো ফুটছে। সে আর দেখতে পারলো, প্রচন্ড বেদনা নিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো।
স্বপ্নের ঘোর কিছুটা কাটতেই রাহিন বারান্দায় গিয়ে দড়াম করে বসলো। অনেকটা আছাড় খেয়ে পড়ার মতো।
একের পর এক সিগারেট ফুকতে ফুঁকতে সে অবশেষে সেই চরম সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিলো।
আকাশের পর্দা উঠার মতো করে মেঘগুলো চুপিচুপি সরে গেছে। শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ মাথার উপরে কৌনিক অবস্থান তৈরী করে মুচকি হাসি হাসছে। চাঁদের আলোর তোড়ে প্রকৃতিতে এক অতি রহস্যঘন আবহের সৃষ্টি হয়েছে। যেন কোন নিগূর গোপনীয়তা প্রকৃতি এখনই ফাঁস করে দিবে! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো প্রকৃতি তা কখনো দেয়না। মায়ার রাজ্যে ডুবিয়ে মানুষকে ভুলিয়ে রাখে কেবল। সূর্যের আলোতে রহস্যের সৃষ্টি হয়না কেন? সূর্যের তেজ আছে বলেই বোধহয়। অবশ্য তেজ থাকলে কি রহস্যের ছোঁয়া থাকতে নেই? হয়তো প্রকৃতির অসজ্ঞায়িত হেয়ালীপনাই তার জন্য দায়ী। চন্দ্রিমার আলোক প্লাবনে সকল শ্রান্তি যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে; সুদূরে।
চাঁদের আলোকছটাকে খানিক ফিকে করে দিয়ে পূবাকাশে কমলারঙের আলো উল্লাস করছে; ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার রাত জাগা আলো। এই মাঝ রাতেও সেখানে ব্যস্ততার যেন কমতি নেই। ট্রাক ইঞ্জিনের বিরক্ত উদ্বেলকারী শব্দ ক্রমাগত ভেসে আসছে। কখনো বা ইঞ্জিনের তীক্ষ্ণ প্রতিবাদে ক্যাঁচ করে ব্রেক কশার শব্দ। যত লক্কড় ঝক্কর ধরণের গাড়ি আছে তার বেশিরভাগই বোধহয় এদেশের পরিবহণ কাজে ব্যাবহৃত হয়! গাড়ির কাঠামো কোনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেই যেন হলো! নূন্যতম রুচিবোধ ও শৌখিনতার কোন বালাই নেই আমাদের। সচেতনতা তো অনেক পরের কথা! যার ফলে যা হওয়ার তাই হয়! খবরে চোখ বুলালেই কেবল বিপত্তি আর আপত্তির চিত্র ভরপুর রূপে ফুটে উঠে। কত প্রাণ, কত স্বপ্ন যে লাশ হয়ে পথের ধারে ঝরে- তার হিসেব দেয়াই বুঝি দুষ্কর! তবুও আমাদের বোধোদয় হয় না!
প্রকৃতির হৃদয় জুড়ানিয়া ঐশ্বর্য, জীবনের এতো আয়োজন – কোন কিছুই আজ রাহিনকে মনে স্পন্দন তুলতে পারছে না। অথচ যদি সে জানতো, মানুষের মনের সকল গ্লানি মিইয়ে দেয়ার জন্য স্রষ্ঠা হাজারো উপাদানের প্রাচুর্যতা প্রকৃতিতে দিয়ে রেখেছেন। মনের খোরাক মিটিয়ে দিয়ে প্রসন্নতা বইয়ে দেয়ার সকল ক্ষমতা ওই প্রকৃতির মাঝেই লুকিয়ে আছে; তাহলে সে বারবার ফিরে তাকাতো অনিন্দ্য ও প্রেরণায় উচ্ছল সুসজ্জিত প্রকৃতির দিকে, যতক্ষণে না তার দৃষ্টি ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসতো।
সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধুম্রজাল ছাড়তে ছাড়তে রাহিন ফিল্টার ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। কাঁপতে কাঁপতে সজোরে মেঝেতে পড়ে গিয়ে সে হাপাতে শুরু করলো। অব্যক্ত ব্যথায় তার মুখ বিকৃত হয়ে গেছে। লাল টকটকে চোখ, চোখের নিচের গভীর কালো দাগ আর ঝুলে পড়া চোয়াল দেখলে যে কেউ ভীমরতিগ্রস্ত হয়ে পড়তো।
বহু কষ্টে অবশেষে গ্রিল ধরে সে উঠে দাঁড়ালো। টলতে টলতে দেয়াল ধরে ধরে রুমে ঢুকে টেবিলের ড্রয়ার খুলে তার চোখ চকচক করে উঠেছে। ক্ষীণ হাসির রেখা ঝুলে পড়া চোয়ালে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। সেই হাসিতে উন্মাদতা আর পৈশাচিকতা মিশে আছে।
পানির জগ হাতে নিয়ে রাহিনের মুখে চরম বিরক্তি ফুটে উঠেছে। জগ উপুড় করেও এক ফোটা পানিও পড়লো না। বিরক্তি রাগে পরিণত হতে সময় লাগেনি। যার পরিণতিতে কাচের জগের বিকট শব্দে পতনে দেয়ালে সেটে থাকা টিকটিকিটা চমকে উঠে অদ্ভুত ভাষায় চিৎকার করতে করতে তরতর ছুটে পালালো। সে ভাষার অর্থ অজানায় রয়ে গেলো!
রাহিনের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে দৃষ্টিহীন চোখে জ্বলজ্বল করা ভাঙা কাচ টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। তার জীবনটাও যেন আজ ভাঙা কাচের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়।
মোহগ্রস্থের মতো সে রান্না ঘরের দিকে মন্থন গতিতে হাটা শুরু করলো। তাকে পানি পেতেই হবে। নইলে তার মুঠোতে ধরা সাদা রঙের ঘুমের ঔষধগুলো গিলতে পারবে না। শুকনো গলা বেয়ে কষ্টেসৃষ্টে গিলতে পারলেও তা কাজ শুরু করতে দেরী হতে পারে। রাহিন সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। তার খুব ঘুম দরকার ; চিরতরের ঘুম।
আত্মহত্যা করতে যেয়ে, পানি না পেয়ে- পানি খুঁজতে থাকাটা সত্যিই বাজে ব্যাপার। রাহিন বিরক্তিতে ভ্রু কুচকে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মেঝেতে থাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে। সে থ’ মেরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো রান্নাঘরের দরজার কৌণিকে দৃষ্টি মেলে।
৩.
রাহিনের দৃষ্টিতে হকচকিয়ে যাওয়া ভাব ক্রমেই প্রগাঢ় হয়ে উঠেছে। সে পানি খোজার জন্য রান্নাঘরে আসলেও, তার মাথায় এখন আর তা নেই। ইঁদুরের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ধূলোয় ধুসর দেহ দেখে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেছে। শির দাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে চলছে অনবরত । মনের ভিতরে অবস্থাও বেশ জটিল রূপ ধারণ করেছে। একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে মস্তিষ্ক জুড়ে। চোখের সামনে থেকে যেন একটা পর্দা সরে গেছে। যা তাকে ভ্রান্তির পথে পরিচালিত করেছিলো। তাকে প্ররোচনা দিচ্ছিল নিজেকে শেষ করে দেওয়ার। তার প্রবল অস্বস্তি লাগা শুরু করেছে। বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোটা জমাট বাধতে শুরু করেছে চুলে ঢাকা কপালে। ঘাম দিয়ে জ্বর সারলে যেমন হয়, ঠিক সেই রকম।
ইঁদুরের মাথা বিহীন ধড় চুইয়ে রক্ত বেরোনো এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। রক্তগুলো জমাট বাধতে শুরু করেছে; ঘন কালো রক্ত।
রাহিন শিউরে উঠলো সেই বিভৎস দৃশ্য দেখে। আপাদ দৃষ্টিতে হয়তো শিউরে উঠার মতো কিছু নেই। একটা অবলা প্রাণিই তো মরেছে কেবল। কিন্তু রাহিন এই ছোট্ট প্রাণীটার মধ্যেই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পারছে। যেই প্রাণীই হোক, মানুষ কিংবা হাতি; মারা গেলো তো সকলেই মৃত! যাকে আর স্বাভাবিক সমাজে রাখা যায় না। যত তাড়াতাড়ি পচন ঠেকিয়ে মাটি চাপা দেওয়া যায়, ততই যেন জীবিতরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারেন। মৃতরা সব সময় সম্মানজনক আবর্জনা হিসেবে পরিগণিত হয়। আর বাকি যে অশ্রু বিসর্জন চলে, তা তো কেবল মায়া পরিত্যাগের মহড়া। একসময় মায়ার অবশিষ্টাংশ তলানীতে গিয়ে ঠেকে। অতঃপর মিলিয়ে যায়, কালের অতল গহ্বরে। কচিৎ বিশেষ বিশেষ ক্ষণে তা স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস হয়ে ফিরে দেখা দিলেও; তা ওই পর্যন্তই!
হঠাৎ করে কে যেন তার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলা শুরু করেছে- ‘রাহিন! তুমি কি ইঁদুরটির পরিণতি দেখতে পাচ্ছো? সে নিশ্চয় একসময় বেঁচে ছিলো। সেও নিশ্চয় একসময় তার সমাজে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। অথচ আজ সে কতই না করুণভাবে ধূলোতে পড়ে আছে। সে মরে গেছে; তার সব কিছু এখানেই শেষ। কিন্তু তুমি তো মানুষ; তুমি তো মুসলিম। যাদেরকে স্রষ্টা তাঁর ইবাদাত এবং মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তোমার মৃত্যু হলে কি সবকিছু এখানেই শেষ হয়ে যাবে? তোমাকে কি তোমার প্রতিপালকের দিকে ফিরে যেতে হবে না? তুমি তো নিশ্চয় জান যে- মৃত্যুই শেষ নয়, বরং নব জীবনের সূচনা; অনন্ত জীবনের সূচনা। তবে কি করছো তুমি? কার জন্য তুমি নিজেকে হত্যা করতে যাচ্ছ? অথচ আরশের মালিক তোমাকে তোমার জীবনের জিম্মাদার করেছেন। তোমার প্রার্থনা, ত্যাগ, জীবন-মৃত্যু তো কেবল মাত্র তো তারই জন্য হতে পারে। তুমি কি চাও তাঁকে অমান্য করে নিজেকে চির অভিশপ্তদের কাতারে অন্তর্ভূক্ত করতে? যাদের পরিণতি কিনা অত্যন্ত ভয়াবহ। তুমি কি তা চাও? তুমি কি চাও?
প্রচণ্ড কেপে উঠে রাহিন স্বম্ভিত ফিরে পেয়ে কাপা কাপা গলায় বলে উঠলো, ‘ কে? কে?’ রাহিনের নিজের কণ্ঠই প্রতিধ্বনিত হয়ে ঘরময় ফিরতে লাগলো। কোন উত্তর ভেসে আসলো না! আশেপাশে তো কেউ নেই। তাহলে কি সে এতক্ষণ নিজের সাথে কথা বলছিলো; অবচেতন মনে!
রাহিনের শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম বেরুতে লাগলো।
কখন যেন রাহিনের মুঠি খুলে গেছে। মেঝেতে পড়ে থাকা উচ্চ মাত্রার ঘুমের ট্যাবলেটগুলো বিস্ময় নিয়ে রাহিনের দিকে তাকিয়ে আছে।
রাহিন ভেঙে পড়তে লাগলো অনুতপ্ততার ভারে। আপনাতেই যেন অস্ফুট স্বরে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলোএলো- ‘ ইন্না’স স্বলাতি অ’নুসুকি অ’মাহিয়ায়া অ’মামাতি লিল্লাহি রব্বীল আলামিন’।
রাহিনের মোহগ্রস্ততা কেটে গিয়ে সে এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আবার তার মধ্যে উদ্দাম আর প্রাণ শক্তির সঞ্চালন ফিরে এসেছে।। অদ্রির ব্যাপারটা নিতান্তই তুচ্ছ মনে করে, ক্রমেই সে অনুতপ্ত হয়ে উঠছে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো নিতান্তই বোকামো করার জন্য।
আসলে মানুষের মন বড্ড প্যাঁচালো জিনিষ। সাধারণ কিছুকে তা মাঝেমাঝে জটিল করে ফেলে। আবার তুচ্ছ কিছু থেকেই সে প্রেরণা আর বিরাট শিক্ষা খুঁজে পায়। রাহিনের বেলাতেও ঠিক তাই হয়েছে।
৪.
রাতের প্রায় শেষ পর্যায়; ঘড়ির টিকটিক শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে সময় বয়ে চলছে। সুনসান নীরবতায় ছেয়ে আছে পুরো শহর। মনে হচ্ছে- সায়েন্স ফিকশনের কাহিনীর মতো কোন অজানা ভাইরাসের আক্রমণে সবাই যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। তাই আলো-ছায়াময় মায়া ধাঁধায় নির্বাক স্ট্রিটের পাষাণ কোলে নিঃসঙ্গতার বিষাদ সঙ্গীত ঝংকার তুলছে।
ল্যাম্পপোস্টের ঘুম জড়ানো আলোকে ঘিরে অশরীরীরা বুনো নৃত্যে মেতে উঠেছে। এই নিস্তব্ধতা ওদের। ছায়ার মতো নিঃসাড় দাঁড়িয়ে থাকা দালানগুলো যেন ওদেরই প্রতিচ্ছবি। তারা অন্ধকারে গা মুড়ি দিয়ে আসে, আবার অন্ধকারেই মিলিয়ে যায়।
পুব আকাশের এক কোণে, সুখতারার দীপ্তি চোখের জলকণার মতো জ্বলজ্বল করছে। সেই কেবল ভাবান্তরবিহীন পাক খেতে খেতে রাহিনকে এই নিশুতিতে সঙ্গ দিচ্ছে। জানালার ফাঁক গলে, মাথা নিচু করে দেয়ালে হেলান দেয়া রাহিনের দিকে তাকিয়ে নীরবে সহানুভূতির পরশ বুলাচ্ছে।
রাতের নিবিড় নীরবতা ফুঁড়ে হঠাৎ চারিদিক বিমুগ্ধে মুখোর হয়ে উঠলো। ফজরের আজান ধ্বনিত হচ্ছে। এই ধ্বনি বড়ই মধুর; উচ্ছলিত আনন্দের উচ্ছ্বাসে- অজান্তে চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ার মতো মধুর।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো আজানের শব্দে পুরো পরিবেশ যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে। কুকুরগুলো অলসতা ভেঙে তার স্বরে চিৎকার জুড়ে দিলো আজানের সাথে পাল্লা দিয়ে। হীন পশুর মধ্যেও কি নিদারুণ প্রভাব পড়েছে আজানের শব্দে! যদিও এতে বেশিরভাগ মানুষের কানেও প্রভাব পড়েনি। আসলে পশু- আপনাতেই পশু। কিন্তু প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কাউকে মানুষ হয়ে উঠতে হয়।
আজানের শব্দ কানে পৌঁছাতেই রাহিন চকতিত হয়ে উঠলো। আজ হতে তাকে নতুন দিনের সূচনা করতে হবে। কাপড় ছেড়ে; ভালো করে ফ্রেস হয়ে, সে মসজিদের দিকে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। চনমনে হয়ে উঠা প্রকৃতি তার নিস্তব্ধ হৃদয় উপকূলে স্পন্দন তুলতে লাগলো অনবরত। মনে হচ্ছে সবাই যেন রাহিনকে সম্ভাষণ জানাচ্ছে মহাসমারোহে। আর চুপিসারে বলে চলছে- হে আলোকের পথযাত্রী! তোমাকে স্বাগত। তোমার পরশে মুখোর হয়ে উঠুক ব্যাথিতের হৃদয়। অবমানিতের আশার প্রদীপ হয়ে উঠো তুমি। তোমার পদতলে মিথ্যে দম্ভ মাথা ঠুকে মরুক। তোমার সাথে সেই অবিনশ্বর আছেন, যিনি জলে স্থলে অন্তরীক্ষে সমানভাবে থাকেন। তোমার কোন ভয় নেই। তুমি দুর্দম্য হয়ে এগিয়ে যাও সোনালি সকালের সন্ধানে।’
রাহিন বিড়বিড় করে বলতে লাগলো – ‘ হাসবুনাল্লাহ ওয়া নেয়’মাল ওয়াকিল, নে’য়মাল মাওলা ওয়া নেয়’মান নাসির্’।
আকাশ প্রায় পরিষ্কার হয়ে এসেছে। অচিরেই আরেকটি নতুন দিনের সূচনা হবে। পুরোনো গ্লানি ঝেড়ে ফেলে নব উদ্দ্যমে রাহিনের পথচলা শুরু হলো। সে অতীতেও বাস করেনা, ভবিষ্যতের বাস করে না। তাই তাকে বর্তমানকে সুশোভন ভাবে সাজানোর নিরন্তর চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যৎ নান্দনিক রূপে হাজির হবে।
ভ্রান্তির বিচ্ছেদ করে শুদ্ধতার সঞ্চারণে বোধোদয় ঘটিয়ে রাহিন মসজিদে প্রবেশ করছে স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে। তিনিই তো সর্বোত্তম অভিভাবক।

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৭ Comments

  1. robiul hossain

    সুন্দর হয়েছে তবে লেখায় আরো উন্নতি করতে হবে।

    Reply
  2. Anamika Rimjhim

    জিনিষ- জিনিস *
    একটা লাইনে দেখলাম ‘না’ লিখতে ভুলে গেছেন যার ফলে লাইনটার অর্থই উল্টে গেছে। শিক্ষণীয় বিষয়টা ভাল ছিল তবে গল্প আর একটু ঘটনাবহুল হলে ভাললাগতো । একটাই টপিক নিয়ে অনেকক্ষণ সাহিত্যিক লাইন পড়তে পড়তে একঘেয়ে লাগছিল।শুভ কামনা।

    Reply
  3. Md Alamgir

    ভালো গল্প। পড়ে ভালো লাগলো। কিন্তু লেখাটায় সাহিত্য আনতে গিয়ে এমন কিছু উদ্ভট শব্দ ব্যবহার করেছে যার কোনো অর্থ হয় না। কেবল নতুন নতুন শব্দ দিয়ে কোনো উপমা বা কোনো ঘটনার বর্ণনা দিলেই সেটা সুন্দর ও সাহিত্যপূর্ণ হয় না, বরং অর্থগত দিকটাও কেমন হচ্ছে সেদিকেও নজর দিতে হয়।

    গল্পটায় একটা শিক্ষণীয় দিক ফুটে উঠেছে। যা সত্যি ভালো একটা দিক। ঠিকই তো, ভালোবাসার জন্য নিজেকে কেন বলি দিতে হবে? বরং সেসব ভুলে আল্লাহর পথে এসে, পরকালের চিন্তা করে সবকিছু ভুলে নিজেকে আবারও আগের মতো গুছিয়ে নেওয়াটাই শ্রেয়।

    অনেক বানানে ভুল ছিল, তার মধ্যে অল্পকিছু ভুল দেখালাম। যা চোখে পড়ার মতো,
    জিনিষপাতি * জিনিসপাতি/জিনিসপত্র
    কিঞ্চিত * কিঞ্চিৎ
    দরুন * দরুণ
    যায়না * যায় না
    প্রচন্ড * প্রচণ্ড
    হয়না * হয় না
    দেরী * দেরি
    প্রাণিই * প্রাণীই
    জিনিষ * জিনিস

    সে তাতে কোন আপত্তি করেনি
    যেন কোন নিগূর গোপনীয়তা
    ↑উপরের লাইন দুটোতে ‘কোনো আর কোন’ শব্দের সঠিক ব্যবহার হয়নি। শব্দটি “কোনো” হবে।

    এখন আর বেঁচে থেকে কি হবে?
    তবে কি করছো তুমি?
    ↑উপরের লাইন দুটোতে “কী” শব্দ হবে।

    Reply
  4. Jannatul Ferdousi

    রাত ৩.০২; → এখানে ৩:০২ এভাবে লিখতে হবে।
    টুপ টুপ → টুপটুপ
    কিন্তু আফসোস তাকে পরাজিত হয়ে হয়েছে→ হতে হয়েছে।
    ঠাই→ ঠাঁই
    বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে→ আধিক্য হয়ে গেছে।
    ফুকতে→ ফুঁকতে
    কুচকে→ কুঁচকে
    খোজা→ খোঁজা
    জিনিশ → জিনিস
    তবে কি করছ তুমি?→ তবে কী করছ তুমি?
    (যেখানে মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেওয়া যায় সেখানে কি হবে)

    ওয়েল, লেখকের লেখার হাত চমৎকার। অনেক সাহিত্যিক শব্দবুননে লেখা গল্পটি বর্ততমান জেনারেশনের জন্য শিক্ষণীয়। আমার ব্যক্তিগত মতামত- গল্পটির সাহিত্যিক রস ভালো ছিল। মাঝেমধ্যে মনে হলো একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছিল। তবে শেষদিকে তা লাগেনি। রাহিন হলো একজন বুদ্ধিমান ছেলে। প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হয়ে দুনিয়া ছাড়তে হবে এমন অদ্ভুত বোকা সত্যিই বিরক্তির।
    শুভ কামনা…

    Reply
  5. Learner

    লেখাটা সত্যিই ভালোছলো, তবে সাহিত্যের রসালো আমেজ আনতে গিয়ে কয়টা উদ্ভট শব্দ চোখে পড়লো।
    উদ্ভট শব্দ :
    অসজ্ঞায়িত
    ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষ ( ইন্টারমিডিয়েট অথবা উচ্ছমাধ্যমিক বলতে পারেন)

    বানানে বেশকিছু ভুল ছিলো যা পূর্ববর্তী কমেন্টএ উল্লেখ আছে, আরো কয়েকটি ভুল :
    হয়ে হয়েছে→ হতে হয়েছে
    ফুকতে ফুঁকতে → ফুঁকতে ফুঁকতে
    নিগূর→ নিগূঢ়

    সব মিলিয়ে লেখাটা শিক্ষণীয়, সাজানো গুছানো ছিলো তবে সাহিত্যিক লাইন বেশী লিখতে গিয়ে গল্পের ধারাবাহিতা হারিয়েছে বারবার। গল্পে ধারাবাহিকতা থাকা জরুরী কারনা ধারাবাহিকতা থাকলেই গল্প পাঠককে টেনে গল্পের মধ্যে নিয়েযাবে আর এটাই গল্পের সার্থকতা। শুভকামনা ♥

    Reply
  6. Halima tus sadia

    ভালো লাগলো।

    Reply
  7. Halima Tus Sadia

    ভালোই লিখছেন।
    চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
    লেখার হাত খুব ভালো।

    রাহিনের মতো কতো ছেলে এভাবে প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে অকালেই জীবন ঝরে যাচ্ছে।
    সবকিছু বুঝার পরে ও কেনো যে এ কাজ গুলো করে বুঝি না।

    এভাবে মরে কি লাভ।

    কারও জন্য নিজের জীবন দেওয়া পুরাই বৃথা কাজ।

    বানানে ভুল আছে।
    সবাই উপরে বলে দিছে।
    তারপরে ও বললাম।

    জিনিষ–জিনিস

    হয়না–হয় না

    দেরী–দেরি

    যায়না–যায় না

    প্রাণিই–প্রাণীই

    ঠাই–ঠাঁই

    নিগূর–নিগূঢ়

    খোজা–খোঁজা

    টুপ টুপ –টুপটুপ

    কিঞ্চিত –কিঞ্চিৎ

    ফুকতে–ফুঁকতে

    লেখকের জন্য শুভ কামনা রইলো।
    বানানের প্রতি যত্নশীল হবেন।তাহলে গল্পের সৌন্দর্য বাড়বে।

    আরও ভালো গল্প লিখবেন।
    সেই প্রত্যাশায় থাকবো।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *