স্বপ্ন
প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 39 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

গল্প লেখকঃ
আরাফাত শাহীন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।
(মার্চ – ২০১৮)
…………

পারুলের দিনগুলো আজ বেশ সুখেই কাটছে। নিজের নামে বেশ খানিকটা জায়গা-জমি হয়েছে, একটি বাড়ী তৈরি করেছে। আর আছে তার জীবনের সবটুকু মেধা ও শ্রম দিয়ে গড়া নারীদের সেঁলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তারপরও মাঝে মাঝে সে বড়ই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। অতীতের দিনগুলির কথা স্মরণ করে হয়ত তার চোখের কোণা বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কখনো সখনো। তবে সে অশ্রুবেগ সামলে নিতেও তার সময় লাগেনা। নতুন উদ্যম ও দৃঢ়তায় সে আবার উঠে দাঁড়ায়। তার পরিকল্পনাগুলো পূণরায় গুছিয়ে নেয়। নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠার অদম্য ইচ্ছা তাকে পেয়ে বসে।

স্বামীর বাড়ী থেকে পরিত্যক্ত হয়ে পারুল যখন বাপের বাড়ীতে ফিরে আসে তখন তার বয়স আর কতই বা হবে! পঁচিশ কি ছাব্বিশ বছরের এক যুবতী তখন সে। পাঁচ বছর বয়সী ছেলেটার হাত ধরে ভগ্ন হৃদয়ে পারুল যেদিন ফিরে এলো সেদিনের কথা তার আজও স্পষ্ট মনে আছে। পারুলের এই করুণ দশা সহ্য করা তার দরিদ্র পিতার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব ছিলোনা। পারুলের বাবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। তিনি বজ্রাহতের মত পশ্চিম ঘরের বারান্দায় বসে থাকেন। কোনো কথা তিনি বলতে পারেন না। তার যবান যেন কেউ হঠাৎ-ই কেড়ে নিয়েছে! পারুলের মা ছিলেন দুর্বল চিত্তের অধিকারিণী মহিলা। মেয়ের এ অবস্থা তিনি সহ্য করতে পারলেন না। হাঁউমাঁউ করে কেঁদে সারা পাড়া এক করে ফেললেন। তার কান্না শুনে সেদিন পাড়ার সমস্ত মানুষ পারুলদের বাড়ীতে এসে ভীড় জমিয়েছিলো। তারা হয়ত কোনো মৃত্যুসংবাদেরই প্রত্যাশা করেছিলো! পারুলের মা চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন, “আমার পারুলের কী হবে এখন!” মাকে জড়িয়ে ধরে পারুল সেদিন ভয়ানক রকমের কেঁদেছিলো। ওই তার জীবনের শেষ কাঁদা। এরপর শত কষ্ট ও দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত হলেও পারুলকে কোনোদিন কেউ কাঁদতে দেখেনি। চোয়াল শক্ত করে সমস্ত প্রতিকূলতাকে দু-পায়ে ঠেলে এগিয়ে এসেছে আজকের এ অবস্থানে।

পারুলের বাবা সবচেয়ে বেশি দুঃশ্চিন্তায় ছিলেন পরিবারের অন্ন সংস্থানের ব্যাপারে। নিজে বয়সের ভারে প্রায় অক্ষম হয়ে পড়েছেন। ছোট্ট একটা মুদী দোকান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে চারজনের সংসারটা কোনো রকমে চলে যায়। বড় ছেলেটা কলেজে পড়ে। তারও বেশ খরচাপাতি আছে। ছেলেটা অবশ্য টিউশনি করে নিজের খরচটা চালিয়ে নেয়। পারলে মাঝেমধ্যে বাবাকে সাহায্য করে। কিন্তু হঠাৎ করে সংসারে নতুন দু’টি মুখ এসে পড়াতে তিনি শঙ্কিত না হয়ে পারলেন না। পারুল সব বুঝতে পারে। কিন্তু বুঝেও সে চুপ করে থাকে। কারো সাথে কথা বিশেষ একটা বলেনা। মাকে রান্না-বান্নার কাজে সাহায্য করে। পারুলের একটা ছোট বোন আছে। নাম মরিয়ম। মরিয়ম ক্লাস ফাইভে পড়ে। মরিয়মের জামা-কাপড়ে নকশা আঁকানোর শখ আছে। সময় পেলে দু-বোন নকশা আঁকানোয় মনোনিবেশ করে। পারুলেরও সময়টা এতে এতে বেশ কেটে যায়।

বাবার মলিন মুখটা দেখে পারুলের কিছুতেই সহ্য হয়না। তার বুক ফেটে অব্যক্ত বেদনার অশ্রু বের হয়ে আসতে চায়। নিজেকে বহুকষ্টে সামলে নেয়। পারুল নিজে যদি শক্ত না হয় তাহলে ওর বাবা-মা কী করে সহ্য করতে পারবেন!

২.

পারুল একদিন সিদ্ধান্ত নেয় বাবার সাথে খোলাখুলি কথা বলবে। বিষয়টা বুকের ভিতর চেপে রাখতে ওর বেশ কষ্ট হচ্ছে। রুস্তম আলী দাওয়ায় বসে মাছ ধরার জন্য ফাঁদ তৈরি করছিলেন। পারুল ধীরে ধীরে গিয়ে বাবার সামনে দাঁড়ালো।

“আমি চলে আসাতে তোমাদের বেশ কষ্ট হচ্ছে, আমি সেটা বুঝতে পারছি। আমি চাচ্ছি তোমাদের এ কষ্ট লাঘবের জন্য সামান্য কিছু একটা হলেও করতে। ও বাড়ীতে আমার কোনোদিন ফিরে যাওয়া হবেনা। ছেলেটার ভবিষ্যত নিয়েও তো ভাবা দরকার!”
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে বাবার মুখের তাকালো পারুল; তার প্রতিক্রিয়া কী হয় দেখার জন্য।
পারুলের কথা শুনে রুস্তম আলী মাথা তুলে তাকালেন। তার চোখেমুখে বেদনার ছাপ স্পষ্ট।
“নাজির কি তোকে একেবারেই যেতে না করে দিয়েছে? ওর পরিবার এ ব্যাপারে কী বলে?”
“সে আর আমার সাথে সংসার করতে রাজী নয়। তার পরিবার অনেক বুঝিয়েছে। কিন্তু সে কারুর কথা শুনতে নারাজ।”
“তোর অপরাধটা কী শুনি?”
“তার অন্য একটা মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। আমি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি। আমার অপরাধ এটাই।”
পারুলের বুক বেয়ে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে।
রুস্তম আলীর গায়ের রক্ত হঠাৎ করেই মাথায় চড়ে বসে। অশ্রাব্য একটা গালি বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে।
“আমি থানায় গিয়ে ওর নামে নালিশ করব। ওকে জেলের ভাত না খাইয়ে আমি কিছুতেই ছাড়ব না।”
“থানা-পুলিশ করে কোনো লাভ নেই বাবা। টাকার জোরে কিছুদিন পর ঠিকই বেরিয়ে আসবে।”
“তাই বলে এমনিতেই ছেড়ে দিবো? গ্রাম্য সালিশের ব্যবস্থা তো করতে হবে।”
“তার দরকার নেই বাবা। আমি আর কোনো ঝামেলা হোক চাইনা। একটু শান্তিতে বসবাস করতে চাই।”
পারুলের নিষ্পৃহতায় রুস্তম আলী হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। বুঝতে পারেন জোর খাটিয়ে বিন্দুমাত্র লাভ নেই।
“তবে তুই এখন কী করতে চাস?’ রুস্তম আলী প্রশ্ন করলেন।

“আমি সেঁলাইয়ের কাজ জানি। একটা সেঁলাই মেশিন কিনে বাড়ীতে বসেই কাজ করতে চাই। আমার কাছে বেশকিছু টাকা জমানো আছে। তুমি শহরে গিয়ে আমার জন্য একটা মেশিন কিনে এনে দিলেই হবে।”
রুস্তম আলী পারুলের এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন। তিনি নিজেও চাচ্ছিলেন পারুল এভাবে বেকার বসে না থেকে কিছু একটা করুক। তাতে সময়টা বেশ ভালভাবে কেটে যাবার পাশাপাশি নিজের খরচটাও নিজে বহন করতে পারবে। তিনি কথা দিলেন শহরে গিয়ে মেশিন কিনে এনে দেবার। পারুল নতুন করে আবার স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করে। চোখেমুখে তার নতুন আশার ঝিলিক।

৩.

পরদিন খুব ভোরবেলা পারুলের কাছ থেকে টাকা নিয়ে শহরের দিকে রওনা হললেন রুস্তম আলী। ফিরে এলেন ঠিক সন্ধ্যার আগ-মুহূর্তে; সাথে একটি ‘বাটারফ্লাই’ মডেলের সেঁলাই মেশিন। কোন মডেলের মেশিন কিনতে হবে তা আগে থেকেই বলে দিয়েছিল পারুল। ফলে শহরে গিয়ে রুস্তম আলীর কিনতে একদম অসুবিধা হয়নি। পারুল দেখলো, কিছু টাকা তখনও বেঁচে রয়েছে। এই টাকার কিছু অংশ সে বাবার হাতে তুলে দিল আর বাকী অংশ নিজের কাছে রেখে দিল। একমাত্র ছেলে সোহাগকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলে এ টাকা তখন তার লাগবে।

সেদিন থেকে পারুলের জীবনে শুরু হয়ে গেল এক অন্য রকম সাধনা; বেঁচে থাকার তীব্র লড়াই। পারুল কারো দয়ার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে চায়না। একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নারীর মতই বেঁচে থাকার ইচ্ছা সে বুকে লালন করে। প্রথম প্রথম কাজ খুব একটা সে পেত না। তারপরও ধৈর্যধারণ করে সে নিজের কাজ চালিয়ে যায়। একটা সময় তার কাছে বেশ লোকজন আসতে শুরু করে। তাদের মুখেমুখে পারুলের সুনাম গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এরমাঝে একদিন গিয়ে সে সোহাগকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসে। স্কুলের ভর্তি ফরমে বাবার নামের জায়গা ফাঁকা দেখে প্রধান শিক্ষিকা পারুলকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবার নামের জায়গা ফাঁকা রেখেছেন কেন?”
পারুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর জবাব দিলো,
“ওর কোনো বাবা নেই। আমিই ওর বাবা এবং সেইসাথে মা।”
“আপনার সাহসের প্রশংসা না করে পারছি না। তবে বাবার নাম ছাড়া ভর্তি করার নিয়ম নেই।”
“আমি আইনের কথা শুনতে চাইনা। আপনি ভর্তি করতে পারবেন কি না সেটা বলুন।” পারুল দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলো।
প্রধান শিক্ষিকা পারুলের ব্যাপারটা আগে থেকেই জানতেন। তাছাড়া তিনি নিজেও একজন আধুনিক শিক্ষিতা মেয়ে ছিলেন। পারুলের ব্যাপারটা তার না বোঝার কথা নয়। ফলে তিনি ভর্তি করিয়ে নিতে রাজী হলেন। পারুল প্রধান শিক্ষিকাকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ীতে ফিরে এলো।

পারুল যে শুধুমাত্র মেশিন চালিয়ে অর্থই উপার্জন করে এমন নয়। বরং সে সুযোগ পেলে বাড়ীর আশেপাশের দরিদ্র মেয়েদের সেঁলাই শেখার কাজে সাহায্য করে। ছোট ভাইটার পড়ার খরচ সেই চালিয়ে নেয়। পাড়ার হতদরিদ্র মানুষকে মাঝেমধ্যেই বিনামূল্যে কাপড় বানিয়ে দেয়। একদিন উত্তর পাড়ার ময়নার মা একটি কাপড় হাতে করে এসে বলল,”মা পারুল, আমার তো এই কাপড়টি বানানোর প্রয়োজন। কিন্তু আমার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই। ”
পারুল বুড়ীকে খাতির করে বসতে দিলো।

“আপনার কোনো টাকা দেওয়া লাগবে না। যখন যা বানানোর প্রয়োজন হয় আমার কাছে নিয়ে আসবেন।”

বুড়ী শুনে খুশি হলেন। পারুলের জন্য তিনি দোয়া করতে করতে বাড়ীতে ফিরে গেলেন। ময়নাও এখন পারুলের কাছে মাঝেমধ্যে কাজ শিখতে আসে। পারুল মনে মনে পাড়ার মেয়েদের নিয়ে একটি সেঁলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা আঁটতে থাকে।

৪.

দিনে দিনে পারুলের সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে তার কাছে লোকজনের ভীড় ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকলো। পারুল একা কুলিয়ে উঠতে পারেনা। ময়না এবং অন্য একটা মেয়েকে সে সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিলো। তাছাড়া মরিয়মও মাঝেমধ্যে ওকে বেশ সাহায্য করে। নতুন দু’টি মেশিন এনে ও পাশাপাশি বসিয়ে দেয়। অচিরেই পারুলদের সারা বাড়ীতে সেঁলাই মেশিনের খট্ খট্ শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায়না।

পারুলের হাতে এখন বেশকিছু টাকা জমে গিয়েছে। অন্তত দশটি মেশিন সে ইচ্ছা করলে অনায়াসেই কিনতে পারে। পুরনো ইচ্ছাটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো পারুলের। তার বহুদিনের লালিত স্বপ্ন একটি সেঁলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করবে। পারুল মনে মনে খুশি হয়ে ওঠে। ওর স্বপ্নটা পূরণ হতে আর বুঝি খুব বেশি দেরি নেই! প্রথমেই একটি নতুন ঘর তোলার ব্যাপার ওর বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সারাজীবন যে মানুষটা শুধু বাঁধা-ই ঠেলে এসেছে তার কাছে এটা সামান্য ব্যাপারই বটে! বাড়ীর পশ্চিম পাশে বেশ খানিকটা জায়গা এমনিতেই পড়ে রয়েছে। পারুল ইচ্ছা করলেই একটা ঘর সেখানে তুলতে পারে। কিন্তু বাবা কি ওকে ঘর তোলার অনুমতি দিবেন? বাবার অনুমতি ছাড়া পারুল কিছুই করতে পারবে না। তবে পারুলের মনে এ দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে বাবা ওকে না করতে পারেন না। একদিন সকালবেলা পারুল মনস্থির করে আজ ব্যাপারটা নিয়ে বাবার সাথে একবার কথা বলবে। রুস্তম আলী দোকানে যাবার জন্য বের হচ্ছিলেন। পারুল গিয়ে বলল,”একটা কথা বলার ছিলো….”
রুস্তম আলী পাঞ্জাবীটা গায়ে দিতে দিতে বললেন, “বল– কী বলবে।’

“আমি মেয়েদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি ট্রেনিং সেন্টার খুলতে চাচ্ছি।”
“এটা তো একটি অতি উত্তম কাজ।” রুস্তম আলী উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন।

“কিন্তু তার জন্য ঘর তুলতে হবে একটা…”

“এজন্য পশ্চিম পাশের ওই ফাঁকা জায়গাটুকু লাগবে,তাই তো? এতে আমার অনুমতি নেবার কী আছে! এই বাড়ীতে মরিয়ম আর রাতুলের যেমন অধিকার আছে তোরও তেমনি অধিকার রয়েছে।” হাসতে হাসতে বললেন রুস্তম আলী।
পারুলও হাসতে হাসতেই বললো, “আমি জানতাম তুমি না করতে পারবে না। কিন্তু তোমার অনুমতি ব্যতীত কী করে কাজ শুরু করি!”

“তাহলে ঘর তোলার কাজ শুরু করে দে। জায়গাটা এমনিতেই পড়ে রয়েছে। তোর কাজে লাগলে বরং ভালোই হবে।”
পারুলের মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। দু’চোখ দিয়ে আবেগে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে চায়। স্বপ্ন পূরণের পথে আরো একধাপ এগিয়ে গেল।

৫.

রুস্তম আলীর সাথে কথা বলার ঠিক এক সপ্তাহ পর পারুল ঘর তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করলো। একাজে তাকে রাতুল সর্বপ্রকার সাহায্য করলো। পারুলের নির্দেশনায় এক মাসের মধ্যেই ঘর তৈরির যাবতীয় কাজ সমাপ্ত হয়ে গেলো। খুব বেশি যে জাঁকজমকপূর্ণ ঘর তৈরি হলো এমনটা নয়;সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব ততটুকুই। ঘর তৈরির কাজ শেষ হলে রাতুলকে নিয়ে একদিন শহরে গিয়ে দশটি সেঁলাই মেশিন কিনে নিয়ে এলো। একাজে ওর জমানো টাকাগুলো বেশ কাজে দিলো। মেশিনগুলো ঘরের মাঝে ঠিকঠাকমত বসাতে আরো দু’দিন সময় লেগে গেলো। গ্রামের মানুষজন খুব খুশি। যে মেয়েগুলো এতদিন বেকার বসে বসে দিন কাটাচ্ছিলো এখন থেকে তারা পারুলের কাছে ভালোভাবে সেঁলাই শিখে স্বাবলম্বী হতে পারবে।

খুব অল্প টাকার বিনিময়ে পারুল মেয়েদের সেঁলাই শিখাতে শুরু করলো। ততদিনে মরিয়ম ও ময়না সেঁলাইয়ের কাজে বেশ দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছে। ফলে পারুলের সহকারী হিসেবে ওরা দু’জন নিষ্ঠার সাথে শ্রম দিতে পারলো। পারুল এখন আর সেই অসহায় নারী নেই ; যে একদিন স্বামীর কাছ থেকে পরিত্যক্ত হয়ে বাপের বাড়ীতে ফিরে এসেছিলো। তার স্বামী তাকে পরিত্যাগ করলেও বাপের বাড়ীর লোকজন তাকে পরিত্যাগ করতে পারেনি। এই সমাজের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত নারীদের নিয়ে পারুল যে স্বপ্ন দেখে সেটা দেখার সাহস সবার হয়না। সমাজের কঠিন স্রোত এবং বাস্তবতার ঝড়ো হাওয়া উপেক্ষা করে সবাই পারুলের মত তাই টিকে থাকতেও পারেনা। সেটা যদি পারত তাহলে আমাদের এই সমাজের গন্তব্য হত আরো বহুদূর ; সূদূরে বিস্তৃত। তবে আশার কথা হল আজ পারুলকে দেখে যারা অনুপ্রাণিত হচ্ছে তাদের মধ্য হতেই অসংখ্য পারুলের যে জন্ম হবেনা তা কে বলতে পারে!

পারুলের সেঁলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এখন একশো জন নারী রোজ সেঁলাই শিখতে আসে। পারুল নিজে দেখাশোনার ভার ছেড়ে দিয়েছে বহু আগেই। মরিয়ম ও ময়নার বিয়ে হয়ে যাবার পর এখন অন্য দু’জন মেয়ে দেখাশোনা করে। পারুলের এখন আর কোনকিছুর অভাব নেই। ছেলেটা এ বছরই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হয়েছে। এবার ছেলেটাকে একটা বিয়ে দিয়ে সব দায়িত্ব তার উপর ছেড়ে দিয়ে অবসর জীবন যাপন করতে চায় পারুল। জীবনে পরিশ্রম তো আর কম করা হলনা! এবার একটু নিরিবিলি থাকার প্রয়োজন। তবে হ্যাঁ,যে স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে পেরেছে এই অঁজপাড়াগাঁয়ে তা ওকে প্রতিনিয়ত সীমাহীন তৃপ্তি দিয়ে চলে।

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *