শীতকালের একটি জ্যোৎস্না রাত
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০১৮
লেখকঃ

 234 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখিকা : সানজিদা বেগম (প্রীতি)

অপূর্ব মন মাতানো জ্যোৎস্নার রূপ দেখার আগে রাতের আকাশকে অন্ধকার বলেই ভেবেছি আমি। আর শীতের রাতের জ্যোৎস্না? তা তো ভাবতাম অমাবস্যায় চাঁদ দেখার মত। এই কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশে আবার চাঁদ দেখা যায় নাকি যে জ্যোৎস্না দেখা যাবে? রাত মানেই তো চারদিকে নেমে আসে শুধু স্তব্ধতা। কিন্তু রাতের পৃথিবীতে যে সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যময় সমারোহ ঘটতে পারে তা কখনও আমার অভিজ্ঞতায় ছিল না। অভিজ্ঞতা হলো সেদিন যেদিন হঠাৎ করে আকাশে চন্দ্রোলোকিত রাতের শোভা দেখেছিলাম মুগ্ধ নয়নে। আমার ক্ষুদ্র জীবনে সৌন্দর্যের এমন মাদকতা কখনও অনুভব করিনি।
যদিও আকাশ আমার খুব প্রিয় কিন্তু রাতের কালো আকাশ কখনও আমার দেখা হয়নি। দেখা হয়নি রাতের আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘদের। রাতের আকাশের ঝলমল করা হাজার হাজার তারা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়। সাধারণত আলোর মধ্যে থাকার কারণে কখনও জ্যোৎস্নার মোহনীয় রূপ বা আকাশের হাজার তারা দেখা হয় না। ঘটনাচক্রে এক রাতে জ্যোৎস্নার রূপ-মাধুরী নিজ চোখে অবলোকন করার সৌভাগ্য আমার হয়। সে এক অপরূপ রাত, রূপময় জ্যোৎস্না রাত।
সময়টা শীতকাল ছিল। শীতের ছুটিতে খালাতো-মামাতো ভাই বোনরা এসেছিল আমাদের বাসায় ছুটি কাটাতে। এক সন্ধ্যায় সবাই মিলে আমরা খুব মজা করছিলাম। গল্প আর কথায় মেতে উঠেছিল আমাদের আড্ডা। এতোদিন পরে সবাই এক হওয়াতে আনন্দ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ টা চলে গিয়ে আমাদের আড্ডাটা নষ্ট করে দিল। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার মধ্যে অন্ধকার নেমে আসে। এমন সময় সবাই জেদ ধরে ছাদে যাওয়ার জন্য। ছাদে গিয়ে আড্ডা দিবে সবাই মিলে। প্রথমে আমি রাজি হতে চাচ্ছিলাম না। অনেক বুঝানোর পর অবশেষে তাদের সাথে একমত হলাম। শরীরে চাদুর জড়িয়ে আমিও তাদের সাথে ছাদে গেলাম। সেখানে গিয়েই আমি চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় অভিভূত । চারপাশে আলো না থাকায় চাঁদের এমন আলো দেখে মনে হলো, স্বচ্ছ রূপালি ঝরনার মতো চাঁদের আলো যেন চারপাশ ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে।
আকাশে মেঘ গুলো ছুটে বেড়াচ্ছিল। আর কুয়াশার চাদুর ভেদ করে আলোর বন্যা ছড়াচ্ছিল রূপময় চাঁদটি। চাঁদ যতই উপরে উঠছে ততই বাড়ছে তার উজ্জ্বলতা। বাড়ছে সেই মায়াবী রাতের সৌন্দর্য। এমন মায়াবী একখানা চাঁদ দেখে মনটাই ভালো হয়ে গেল। নিজের মনের অজান্তেই গুনগুন করে গান ধরলাম :
আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে,
বসন্তেরই মাতাল সমীরণে….
বাড়ির ছাদে এই খোলা আকাশের নিচে জ্যোৎস্নার সৌন্দর্যের যে এমন সমারোহ ঘটতে পারে তা কখনও আমার কল্পনায় ছিল না। আগে কখনও রাতের বেলায় বাড়ির ছাদে বা রাস্তায় হাঁটিনি। তাই এমন অপূর্ব অনুভূতি কখনও মনে আগে জাগেনি।
বাইরে চারদিক নিস্তব্ধ আর নিঝুম। সব পাখপাখালি তাদের নীড়ে ঘুমাচ্ছে শীতে। মাঝে মাঝে কনকনে শীতল হাওয় বয়ে যাচ্ছে। এছাড়া কোথাও পাতা নড়ার শব্দটাও নেই। যেন সম্পূর্ণ প্রকৃতি শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এই জগত থেকে। মনে হচ্ছিল আমাদের সাথে শুধু জেগে আছে আকাশের বিশাল উজ্জ্বল চাঁদটি আর তার সাথি তারারা। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় সবাইকে কেমন যেন মায়াবী দেখাচ্ছিল। এতো অপরূপ জ্যোৎস্না দেখে ইচ্ছে করছিল এই ছাদেই সারাজীবনের জন্য থেকে যায়। বিদ্যুৎ বিহীন জীবন যাপন করি যেন এই অপরূপ সৌন্দর্য সব সময় অবলোকন করতে পারি। আজ বুঝতে পারলাম হুমায়ূন আহমেদ স্যার কেন জ্যোৎস্নার প্রতি এতো আবেগপূর্ণ ছিলেন। স্যারের একটা উপন্যাসে পড়েছিলাম :
আমি ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া,
জ্যোৎস্না ধরতে যাই ।
হাত ভর্তি চাঁদের আলো,
ধরতে গেলেই নাই।
আজকে আমিও মুঠো ভর্তি করে চাঁদের আলো ধরতে চাচ্ছি কিন্তু ধরতে পারছি না। সম্পূর্ণ পরিবেশটা আমাকে অনেক আবেগপ্রবণ করে তুলছে। জোনাকি পোকার আলো আর বকুল ফুলের সুরভি প্রকৃতির সৌন্দর্য যেন আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়েছে। আকাশে উজ্জ্বল আলোময় কুয়াশার চাদুরে আবৃত ঝলমলে চাঁদ, চারপাশে তারই প্রভাবে অপূর্ব সৌন্দর্যময় পৃথিবী। এবং মনমাতানো ফুলের সুরভির সাথে জোনাকি পোকার খেলা আমাকে আপ্লুত করে তুলল। মনে হলো, এই অপূর্ব দৃশ্যের কারণে কবি শিল্পীরা এই জন্যেই জ্যোৎস্না রাতকে ঘিরে কবিতা লিখেছেন, গান গেয়েছেন।
সবে মাত্র স্বপ্ন দেখতে যাব এমন সময়ই বিদ্যুৎ চলে এলো। ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে সবাইকে নিয়ে রুমে চলে এলাম। মন চাইছিল না ছাদ থেকে নেমে আসতে কিন্তু বিদ্যুতের কারণে চারদিকে আলোকিত হওয়ায় চাঁদের আলোটা যেন কেমন মলিন হয়ে গেল। অপেক্ষায় রইলাম আরেকটি জ্যোৎস্না রাত দেখার জন্য।
সেদিন রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলাম, আমি জ্যোৎস্নার মত উজ্জ্বল একটা সাদা জামা গায়ে দিয়ে আছি।আমার মাথায় বকুল ফুলের মালা আর আমার চারপাশে হাজারও জোনাকি পোকা। আমি সে জোনাকি পোকাদের সাথে আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৩ Comments

  1. MD Ismail

    বাস্তব অনুভূতির প্রকাশ । দরুন লিখেছেন বোন

    Reply
  2. Rifat

    জ্যোৎস্না রাতের সৌন্দর্মের বর্ণনা অনেক চমৎকারভাবে লিখেছেন। শব্দের ব্যবহারেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
    আর উপমা ব্যবহারেও কোনো কমতি রাখেননি।
    শুভ কামনা।

    Reply
  3. shahrulislamsayem@gmail.com

    খুব সুন্দরভাবেই রাত এবং জ্যোৎস্নার মধ্যকার সম্পর্কটি ফুটে উঠেছে সেই সাথে লেখার ধরনও খুব ভালো

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *