প্রণয় ও তার বোন
প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 93 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

গল্প লেখক
মুহাম্মাদ সোহাগ
(মার্চ – ২০১৮)
……………

তরুন ছেলেটির নাম প্রণয়। যথেষ্ঠ ভালো মনের মানুষ হওয়া সত্বেও পরিচিতদের অনেকেই মনে করে ছেলেটির ভেতর খারাপ, আসলে ঘটনাটা তা নয়। ঘটনা হলো, প্রণয়ের জ্ঞান-বুদ্ধির খানিকটা অভাব থাকার কারণে অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত দুই-একটা ভুলভাল কাজ করে বসে। আর এতেই বাধে যত গন্ডগোল। অথচ কখনোই এরকমটা করতে চায় না। সেরকম একটা ঘটনাই এবার আপনাদের বলি।

প্রণয় কাজে ফাঁকে ফাঁকে মাঝে-মধ্যে ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ এসব লিখে। যদিও ভালো হয় না তবুও তার বড় শখ এই লেখালেখি ছাড়তে সে একদমই নারাজ। বরং তার লেখাগুলো মানুষের কাছে পৌছানোতেই সে বেশি আনন্দ পায় আর সেটা করে বর্তমান যুগের সব থেকে সহজ মাধ্যম ফেসবুকে। যাতে নিজের লেখা অন্যের সামনে উপস্থাপন করতে পারে এবং অন্য লেখকদের লেখা নিজে পড়তে পারে মূলত এটাই তার ফেসবুক ব্যবহারের বড় কারণ।

ফেসবুকেই এক সময় প্রণয় পরিচিত হলো তার থেকে বয়সে বড় এক আপুর সাথে। সেই আপুটা প্রথম প্রথম প্রণয়ের সাথে যথেষ্ঠ কড়া ভাষায় মেসেজ করতো পরে কথা বলতে বলতে অবশ্য দু’জনের মধ্যে একদম সত্যিকারের ভাই-বোনের মতই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো।

প্রতিদিনই একে অপরের ভাল-মন্দ খোঁজ খবর নেয়। ভাইটা মানে প্রণয় মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে ভুলে গেলেও মমতাময়ী বোনটা কোনদিন তা ভুলেনি। তার ভাই কেমন আছে ঠিকই খোঁজ নিয়েছে। পাতানো ভাই হলেও প্রণয়কে আপন ছোট ভাইয়ের মতই ভালোবাসতে এক বিন্দুও… কৃপণতা করেনি।

কয়েকশো মাইল দূরে ছেলে-মেয়ে স্বামীর সাথে শহরে বসবাস করে প্রণয়ের সেই বোনটা। প্রণয় থাকে গ্রামে। এতো দূরে থেকেও তাদের দু’জনের মাঝে গড়ে উঠেছিলো খুবই আন্তরিক সুসম্পর্ক। এই তো গত একুশে বইমেলাতেই একে অপরকে দাওয়াত করেছিলো মেলায় আসতে। দুই ভাই-বোনের প্রথমবারেে মত দেখা হবার সেই সুবর্ণ সুযোগটা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি প্রণয়ের ব্যর্থতার কারণে। এছাড়াও সেই আপু প্রণয়কে যে কোন দিন তাদের বাসায় যাওয়ার জন্য মেয়াদহীন দাওয়াত দিয়ে রেখেছে। এছাড়াও আরো বহুকারণে তারা দুই ভাই-বোনের মধ্যে গড়ে উঠেছে অনেক মধুরতর সম্পর্ক। গল্পটার পেট মোটা যাতে না হয় সেজন্য সেসব বিষয়গুলো বলা বাদ দিয়ে চলুন আসল গল্পটাই বলা যাক্…।

আগেই বলেছি প্রণয় লেখালেখি করে এবং লেখা শেষ হবার আগেই সেগুলো ফেসবুকে পোস্টও করে দেয়। ফেসবুকে সেই পঁচা লেখাগুলো কেউ পড়ুক আর না পড়ুক প্রণয়ের আপু সেগুলো পড়ে তার মতামত ঠিকই জানায়। আপুটা প্রণয়ের লেখাগুলো বাজে হওয়া সত্ত্বেও ভাইকে উৎসাহ দেয়ার জন্য কমেন্ট ও মেসেজ করে খুব ভালো, সুন্দর, চমৎকার এসব বলে উৎসাহ দিয়ে যেত সব সময়। বরং মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতো নতুন কিছু লিখেছে কি না আর লিখে থাকলে সেটা ইনবক্সে দিতে বলতো। প্রণয় নিজের লেখার মানের প্রতি সন্তুষ্ঠ ছিলো না বলে ইনবক্সে কখনোই লেখা দিতে চাইতো না তবুও বোনটা যখন চাইতো তখন না দিয়ে পারতোও না। তাই মাঝে মাঝে একটা-দুইটা ছড়া মেসেজ করে বোনকে পড়তে দিতো।

সেদিন দুপুরে প্রণয় কিছু সময়ের মধ্যেই একে একে তিনটা ছোট ছোট ছড়া লিখে ফেললো। এই ছড়াগুলো তার নিজের কাছেই অন্য ছড়ার থেকেও খানিকটা ভালো লাগলো বলে সে নিজে থেকেই বোনকে মেসেজ করে বললো- আপু, নতুন ছড়া লিখেছি। পড়বেন…?
আপু রিপ্লে দিলো- তা কি আর জিজ্ঞেস করতে হয়! তাড়াতাড়ি পাঠাও।
প্রণয়ও খানিক বাদে একে একে তিনটা ছড়া পাঠালো। সেই আপু তিনটি ছড়াই পড়ে খুব খুশি হলেন এবং প্রশংসা করে বললেন- তোমার এই ছড়াগুলোর এক সময় খুব নাম হবে।
জবাবে প্রণয় বললো- বা বা বা বাহ্! নিজের ভাইয়ের প্রশংসা নিজে করেন! কি আজগুবি কথা! বেক্কল নাকি আপনে!

প্রণয় তার বোনের থেকে প্রশংসাবাণী পেয়ে বোনের ও তার কথার বিরোধিতা করে নয় বরং নিজের প্রশংসার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তার বোনের সুন্দর সুন্দর কথাগুলোকে আজগুবি কথা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং তার নিজের প্রশংসা করার জন্যই দুষ্টোমী করে বোনকে বলেছিলো- আপনি নিজের ভাইয়ের প্রশংসা করেন কেন? আপনি কি (বেক্কল) বোকা নাকি?

আজজগুবি কথা, বেক্কল এ ধরনের শব্দের ব্যবহার যুক্ত প্রণয়ের সেই দুষ্টোমীময় জবাবটা হয়তো বুঝে নয়তো না বুঝেই সহজভাবে নেননি আপুটা। সে কারণেই এর পর থেকে প্রণয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়।

দুপুরের এ ঘটনাটার পর থেকে আপু যে মনে কষ্ট পেয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন প্রণয় সেটা জানতোই না। অন্যদিন রাতের যে সময়ে আপু প্রণয়কে ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করতো আজ তিনি সেরকমটা করেননি। আজ তিনি দুপুরের মেসেজিংয়ের স্ক্রীনশট পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- এতগুলো কথা কি আমাকে বলেছো? মেসেজটা পেয়ে শতকষ্টযুক্ত অজানা আতংকে কেঁপে উঠলো প্রণয়ের ভেতরটা কারণ ততক্ষণে সে বুঝে গেছে এই মেসেজটা আপু একদম পছন্দ করেননি। বরং এটার কারণে আপু খুব রাগ করেছেন আর এজন্যই এত সময় তিনি কোনরকম কথা-বার্তা বলেননি।
প্রণয় ইচ্ছে করলে তখনই বলতে পারতো- না আপু, এগুলো আপনাকে বলিনি অন্য কাউকে বলতে চেয়েছিলাম। ভুলে আপনার কাছে চলে গেছে।
কিন্তু না, প্রণয় মিথ্যার আশ্রয় নেয়নি সে সত্য স্বীকার করে “হ্যা” বললো।
তারপর আর কোন জবাব দেননি আপু। প্রণয়ও সাহস পায়নি কোন মেসেজ করার। কিন্তু এমন স্নেহময়ী বোনটি হারিয়ে যাবে বোধ হয়- এই আশংকায় অস্থিরতা কাটছে না, ঘুমাতে পারছে না প্রণয়। এ কারণেই প্রণয় রাত ১টার পরে তার সকল জানা অজানা সকল দোষ-ত্রুটি ও অন্যায় মেনে নিয়ে স্বীকার করার পাশাপাশি করুণভাবে ক্ষমা চেয়ে একটা চিঠির মত লিখে বোনকে মেসেজ করলো কিন্তু কোন জবাব এলো না।
সহজে কাঁদেনা প্রণয় তবুও সেদিন কোন বেদনায় যেন দুই-এক ফোঁটা চোখের পানি ঝড়েছিলো প্রণয়ের চোখ থেকে। তার আরো পরে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়লো।

পরদিন প্রণয় তার আপুকে “কেমন আছেন?” লিখে মেসেজ করলো। কিন্তু আপু সেদিনও রাগ ছেড়ে আগের মত স্নেহময় উত্তর দেননি।
তিনি বললেন- হ্যা, ভালোই আছি। ছোট ভাইয়ের থেকে যা পেলাম তাতে ভালো না থেকে উপায় আছে!
প্রণয় আবারো ক্ষমা চেয়ে বার্তা পাঠালো। কিন্তু নাহ্! আপু হয়তো পণ করেই বসে আছেন যে, এত সহজে ক্ষমা করবেন না।
আপু রিপ্লে দিলো- তুমি জানো তোমার জন্য আমার বাচ্চাদের কাছে কতটা ছোট হয়েছি আমি! তারা এ মেসেজটা দেখে বলেছে “খুব তো ভাই ভাই করতে এখন দেখেছো কিভাবে কথা বললো?” ভালোই করেছো আমার জায়গাটা আমাকে চিনিয়ে দিয়েছো।

এর পরে আর কিছু বলতে পারেনি প্রণয়- আবারো ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিয়ে নেয়া ছাড়া…!
প্রণয় এখনো মাঝে মাঝে বোনের আইডিটি বের করে সেটার দিবে তাকিয় তাকিয়ে ভাবে, কেনই বা সেদিন দুষ্টোমী করতে গিয়েছিলাম। দুষ্টোমী করেইছিলাম যেহেতু যখন বুঝেছিলাম আপু রাগ করেছেন তখন একটা ছোট্ট মিথ্যাও যদি বলতাম তবুও তো এত বড় শাস্তি পেতে হতো না…।
প্রণয় আরও ভাবে আচ্ছা, আপু যে আগে আমার সব লেখা পড়ে লাইক দিতো সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করতো তিনি এখন তো অভিমানে এমনটা করেন না কিন্তু এখন লুকিয়ে লুকিয়েও কি আমার আইডিতে ঢুকে আমার লেখাগুলো পড়েন না? আচ্ছা, আমার লেখা না হয় না-ই পড়লো কিন্তু আগে তো প্রতিদিনই মেসেজ করে খোঁজ-খবর নিতো এখন তো আর খোঁজ খবর নেয় না কিন্তু আমার কথাও কি মনে করে না…? আমার তো প্রায় সময়ই উনার কথা মনে হয়ে চোখ থেকে পানি পড়ে যেতে চায় আপুর কি একবারও এমন হয় না? আপুর বুঝি একটুও মায়া নাই ছোট ভাইয়ের জন্য…!

এটাই ছিলো প্রণয়ের তার এক আপুকে পাওয়া ও হারিয়ে ফেলার কাহিনী…।

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *