অপয়া মা
প্রকাশিত: অগাস্ট ২২, ২০১৮
লেখকঃ

 109 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

বিয়ের ১৪টা বছর কেটে গেছে। ফুটফুটে ৪বছরের কন্যা সন্তান জয়ীকে নিয়ে বেশ সুখেই আছে বন্যা। সামনে মেয়ের পুরো ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে। পুরো পরিবার মিলে সেই ভবিষ্যৎ কে উজ্জ্বল করার প্রচেষ্টাই ব্যস্ত। পুতুল পুতুল মেয়েটা কে যেইই দেখে মায়াই পড়ে যায়।
.
মাঝরাতে যখন পুরো শহর গভীর ঘুমে মগ্ন, নির্ঘুম বন্যা ১৪বছর আগের স্মৃতিগুলো হাতড়াতে থাকে।
.
বিয়ের প্রথম বছরই জানতে পারলো বন্যা মা হতে চলেছে। সে যেন সম্পূর্ণ অন্য এক অনুভূতি। প্রথম সপ্তাহ থেকেই ধুন্ধুমার কান্ড বেঁধে গেল। পুরো পরিবার হাত ধুয়ে ওর পেছনেই পড়ে থাকে। মাটিতে পা’ই ফেলতে দিচ্ছে না। বন্যার স্বামী নয়ন তো সকাল থেকে ঘুমোনোর আগ পর্যন্ত ওর দেখভালেই ব্যস্ত। অফিসে গেলেও বোধহয় শান্তিতে ১টা মিনিটও বসতে পারে না।
.
দেখতে দেখতে পাঁচ মাসে পড়লো বন্যা। আজ প্রথমবার নিজের ভেতরে বাড়তে থাকা প্রাণটার হৃদয়ের শব্দ শুনতে পেলো। দিন দিন স্বপ্নের পাহাড় গড়ে তুলছে মনে মনে। স্বপ্নগুলোকে নিজের হাতে বুনছে। ছোট ছোট জামা, কাঁথা নিজের হাতে সেলাই করছে। নয়ন তো আগে ভাগেই দোলনা এনে ওদের খাটের পাশে বসিয়ে দিয়েছে। সকাল বিকেল ওটাকেই পরিষ্কার করতে থাকে। শাশুড়ি নিজের হাতে উল বুনছে অনাগত নাতি বা নাতনির জন্য। দেবর ননদ দুজন মারামারি লাগিয়েছে নাম নিয়ে। ঘরে একটা বাচ্চা আসার আনন্দ যেন ওদেরও বাচ্চা বানিয়ে দিয়েছে।
.
ছ’মাসে সবে পা দিলো এর মধ্যেই একদিন পেট চেপে বসে চিৎকার করে ওঠে বন্যা। দু’পা বেয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে। সাথে সাথেই খবর দেওয়া হলো নয়নকে। এ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হবে,তাই বাড়ির গাড়ি নিয়েই হাসপাতালে দিকে ছুটলো সকলে। অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলো বন্যাকে। ঘন্টাখানেক বাদেই জ্ঞান ফিরলো বন্যার।
.
পাশের মহিলাটার ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে। ছোট ছোট হাত পা গুলো নাড়ার চেষ্টা করছে পরীটা। ছোট ছোট চোখ গুলো পিট পিট করছে শুধু। ওর বাচ্চাটাও হয়তো এমনই হবে। মেয়ে হলেই ভালো হবে। এই ভাবতে ভাবতে পেটে হাত রাখলো। মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে গেলো। বুঝতে পারলো, ওর পুরো পৃথিবীটাই খালি হয়ে গেছে। একটু একটু করে বুনতে থাকা স্বপ্নগুলো একনিমিষেই শেষ হয়ে গেছে।
.
সন্তানহারানোর কষ্টটা সকলে বুঝতে পারে না তাই বন্যার কষ্টটা কমানোর কোনো উপায়ই যেন কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। ছ টা মাস যার বড় হওয়াটা নিজের মধ্যে অনুভব করেছে পেয়েও যেন তাকে আর পাওয়া গেলে না।
.
এরপর আরো তিনবার গর্ভপাত হয় বন্যার। নিজের প্রতি ভাগ্যের এতো অনিহার কারনটাই যেন খুঁজে পাচ্ছিলো না বন্যা। কেমন যেন হয়ে পড়েছিলো মেয়েটা। এট মধ্যেই এক নিকট আত্মীয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ পায়। বাইরে গেলে হয়তো একটু ভালো লাগবে এই ভেবে বন্যাকে নিয়ে গেলো বিয়েতে। ওকে দেখেই বিয়েতে আগত মহিলাগুলো মিষ্টি ভাষায় হুল ফোটাতে আরম্ভ করলো। একজন তো সোজা সুজিই বললো,”শোনো বন্যা, বিয়েতে এসেছো ভালো হয়েছে। তা মা বলছি বিয়ের কোনো জিনিসপত্রে হাত লাগিও না আবার। চারবার গর্ভপাত হয়েছে কি না। তোমার অপয়া হাত বিয়ের জিনিসগুলোকে না অপবিত্র করে দেয়।”
অাধমরা মানুষকে পুরোপুরিভাবে মারার কাজটা সমাজই করে দেয় তাও বিনামূল্যে।
.
অপয়া ভেবে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেই সবকিছু থেকে। চার দেয়ালের ভেতর বন্দি করে নিজেকে। প্রতিটা মুহূর্তে একটু একটু করে ভাঙতে আরম্ভ করে। সাতটা বছর কেটে গেছে এর মধ্যেই। কেউ না কেউ প্রতিদিন নয়নের জন্য নতুন নতুন সম্বন্ধের খোঁজ নিয়ে আসে। অথচ পরিবারের কারোরই এসবে মত নেই। প্রতিবেশি আর আত্মীয়গুলোই কান ভাঙাচ্ছে। শ্বশুরঘরের কেউই চায় না বন্যার জায়গাটা অন্য কাওকে দিতে।
.
দেখতে দেখতে কেটে গেলো আরো দুটো বছর। বন্যার অবস্থা যেন চোখে দেখা যাচ্ছে না। নয়নের মা মন্দির, দরগাহ, চার্জ কিছুই বাদ রাখেননি। পুজো মানত সমানে করেই যাচ্ছেন। মেয়েটা কে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতেই হবে। কান ভাঙানিদের মুখে ঝামা ঘষাটা আবশ্যক। নয়ন অনেক কষ্টে বন্যাকে রাজি করালো শেষ অার একবার চেষ্টার জন্য। এইবার যদি ভাগ্য সহায় হয়!
.
নয় বছরের শেষের দিকে আবারো বন্যা জানতে পারলো ও মা হতে চলেছে। আনন্দটা কাজ করছে না। বুকের ভেতরটা তোলপাড় করছে। অতীতের সেই আশংকায় বুক কাঁপছে। যতটা সম্ভব সাবধানে থাকা শুরু করেছে। সংস্কার কুসংস্কার সব মানবে এইবার। দেখতে দেখতে শেষ মাসে পা দিলো বন্যা। এখন ভয়টা যেন হঠাৎ করে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। প্রসব বেদনা যেদিন উঠলো ও ভেবেছিলো এটা হয়তো আগের সেই ব্যথাটা। এই বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারবে তো!
.
কেবিনে দেওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে নয়নকে দেখেই শুধু একটা বার জিজ্ঞেস করে,”ও আছে তো?” নয়নের হাসিটাই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে। ফুটফুটে একটা মেয়েই হয়েছে বন্যার। বুকে জড়িয়ে যেন পুরো পৃথিবীর সুখসব পেয়ে গেছে। ঐ মুহূর্তের অনুভূতিটা হয়তো কোনো ভাষাতেই বর্ণনা করা সম্ভব না।এটা শুধু অনুভব করেই বোঝা সম্ভব।
.
পুরোনো কথাগুলো মনে করে চোখদুটো ভরে উঠেছে বন্যার। পাশে মেয়েটা ঘুমোচ্ছে অঘোরে। একহাতে বন্যার আঁচল ধরা অন্যহাতে নয়নের চুল। মেয়ের ঘুমোনোর নমুনা দেখেই আনমনেই হেসে উঠলো বন্যা। নাড়ি ছেঁড়া ধন মেয়েটা। অালতো করে মেয়ের কপালে একটা চুমু একে দিলো বন্যা। ওর জন্যই তো বন্যার অপয়া নামটা ঘুচলো। আর পরিবারের সকলে এখন নিশ্চিতে ঘুমোতেও পারে। বন্যার জায়গাটা অন্য কাওকে দিতে হয়নি বলেই হয়তো এতোটা পরিতৃপ্ত নয়নও।।
.

® দুষ্টু™

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

২ Comments

  1. আফরোজা আক্তার ইতি

    ভীষণ সুন্দর একটি গল্প। পড়তে পড়তে মনটা ভালো হয়ে গেল। মাতৃত্বের স্বাদ প্রতিটি মেয়ের জন্য অহংকার। নারী জাতি মায়ের জাতি। তাই তারা বুঝে মাতৃত্ব কি। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা মানুষের কানভারী করতে ওস্তাদ। তারা মানুষের নামে আজেবাজে কথা বঅঅলে তাকে মানসিকভাবে শেষ করে দেয়, তার ভবিষ্যৎ নষ্ট করতেও দ্বিধাবোধ করে না। অপয়া, কলঙ্কীনি আরো অনেক বাজে কথা বলতেও তাদের বুক কাঁপে না। কিন্তু ঠিকই সৃষ্টিকর্তার কৃপায় বন্যা মা হয়েছে।
    সুন্দর লিখেছেন। বানানে খুব বেশি ভুল নেই।
    প্রচেষ্টাই- প্রচেষ্টায়।
    মায়াই- মায়ায়।
    নেই- নেয়।
    দুটো- দু’টো
    লেখকের নাম নেই গল্পে।

    Reply
  2. Mahbub Alom

    সৃষ্টিকর্তা নানাভাবে মানুষের পরীক্ষা নেন।সময় শেষ হলে সব ঠিক হয়ে যায়।একজন মা কখনো অপয়া হতে পারে না।
    তাই যদি হতো,তাহলে মহান আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব এই মায়ের মাঝে অর্পণ করতেন না।

    গল্পটা দারুণ ছিলো।শব্দের তাল,ভুল নেই সব ঠিক আছে।

    ধন্যবাদ

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *