ঐতিহাসিক সোনারগাঁও ভ্রমণ
প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০১৮
লেখকঃ

 119 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

ঐতিহাসিক সোনারগাঁও ভ্রমন

ছোটবেলা থেকেই আমি তেমন কোথাও ঘুরতে যাই না। যদিও কোথাও যাই তবে সেটা হলো আমার নানুবাড়ি। ছোট থেকেই আমার নানুবাড়ির প্রতি এতটাই টান ছিলো যে, আমি অন্য কোথাও যাওয়ার কথা কল্পনাও করতাম না।
বছর দু’য়েক আগের কথা। তখন আমি দশম শ্রেণীতে পড়ি। বিদ্যালয়ে গিয়ে জানতে পারলাম বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা সফরে সোনারগাঁও যাবে। বরাবরের মতোই আমার সেখানে যাওয়ার প্রতি বিন্দু মাত্রও ইচ্ছা কাজ করলো না। বন্ধুরা যখন যাওয়ার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত আমি তখন আমার মতই স্বাভাবিক। শিক্ষা সফরে যাওয়ার সময় হয়ে এলো সবাই টাকা জমা দিলো শুধু আমি ছাড়া। আমার সব বন্ধুরা ধরে জানতে চাইলো যে,
কেন আমি যাবো না?
তবে আমার একটাই কথা, কোথাও যেতে ভালো লাগে না। ওরাও নাছোড়বান্দা কিছুতেই ছাড়ে না। অবশেষে ওরা আমাকে প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে এলো। স্যার বললেন,
“কেন তুমি যাবে না? এবারই তোমরা শেষ বর্ষ আর তুমি ক্লাসের প্রথম, তোমার যাওয়া দরকার। আমার কি সাথে গার্জিয়ান দিতে হবে না কি গাড়িতে চড়তে পারি না”? এটাও বললেন তিনি।
তবে আমি শুধু বললাম,
স্যার আমি যাবো না। কেন যাবো না তা জানি না তবে যাবো না। আমি যাবো না শুনে বন্ধুরা সবাই আমার বাড়িতে চলে গেলো তারপর বাড়ির সবাইকে বলে কয়ে আমাকে রাজি করালো। নির্ধারিত দিন রাত এগারোটায় বিদ্যালয় থেকে গাড়ি ছাড়ার কথা থাকায় আমি বাসা থেকে দশটায় বের হলাম। সাথে কিছুই নেই নি শুধু বাবার ভাইয়ার ফোন আর কিছু টাকা ছাড়া। আমি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি সবাই আগেই এসে বসে আছে। সবাই ব্যাগ নিয়ে এসেছে সাথে জামাকাপড় এটা দেখেই আমার রাগ হয়ে গেলো আর মনে মনে ভাবলাম,
এই জন্যই আমি নানুবাড়ি ছাড়া কোথাও যাই না। সবাই সব কিছু নিয়ে যাচ্ছে আর আমি খালি হাতে!
নির্দিষ্ট সময়ে বাস চলতে শুরু করলো। সবাই গাড়ির ভিতর আনন্দ-উল্লাস করছে, জোরে জোরে গান বাজাচ্ছে আর আমি বিরক্তি নিয়ে বসে আছি। কারণ আমার ছিটটা পড়েছে সাউন্ড বক্সের সাথে। বিরক্তি নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখছিলাম। কখন যে অনেক সময় চলে গেছে টেরই পাই নি। যখন টের পেলাম তখন দেখি সবাই হা করে ঘুমাচ্ছে আর বক্সে একাই গান বাজছে। সবার ঘুমানো দেখে আমি একাই মিটমিট করে হাসলাম। বাসে কোথাও গেলে আমার ঘুম আসে না তাই সারা রাস্তা বাইরের প্রকৃতি দেখেই পার করলাম।
দুপুর বারোটার একটু আগে আমরা সোনারগাঁও পৌঁছালাম। সেখানে নেমেই সবাই যে যার মত ঘুড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমার ভালো না লাগায় আমি চেয়ার নিয়ে স্যার, ম্যাডামদের মাঝে বসেছিলাম। কিছুক্ষণ পর স্যার সবাইকে ডাক দিয়ে বললেন ভাত খাওয়ার জন্য। আমি চেয়ে দেখলাম খিচুড়ি আর মাংস ভুনা। আমার প্রচণ্ড খিদে লাগলেও খাওয়ার ইচ্ছাটা মরে গেলো। কারণ, এই খিচুড়ি রান্না করার জন্য মায়ের সাথে আমার প্রায়ই ঝগড়া হয়৷ আমি খাবো না শুনে আমাদের ইংরেজি শিক্ষিকা ফরজানা ম্যাডাম আমার কাছে এসে বসলেন। তারপর নিজেই এক লোকমা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
খেয়েই দেখো কত মজা হয়েছে!
বিরক্ত লাগলেও ম্যাডাম হওয়ার এক লোকমা মুখে নিলাম। আমার মনে হলো এমন স্বাদের খাবার আমি জীবনে কখনও খাই নি। ম্যাডাম আমাকে প্লেটের সব ভাত নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে বললেন,
কেমন হয়েছে খেতে ?
কেমন হয়েছে তা বলার মত ভাষা আমার জানা নেই তাই উত্তর দিলাম না। খাওয়া শেষে সবাই ঈসা খাঁ, মুসা খাঁ-এর পুরোনো বাড়ি দেখতে লাগলাম। ভেতরে গিয়েও সব কিছু দেখতে লাগলাম। তাদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র, যুদ্ধের সামগ্রী সহ আরোও অনেক কিছু। পুরোনো হলেও খুব যত্ন করে সেগুলো রেখে দেয়া হয়েছে। সব কিছু এত সুন্দর লাগছিলো যা বলে প্রকাশ করতে পারবো না। আমি সব কিছুর একটা একটা করে ছবি নিচ্ছিলাম।
তারপর বাড়ি থেকে বের হয়ে আমি পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। একটু পর ঘাড় টা ঘুরিয়ে বাঁ’দিকে তাকাতেই চোখ দু’টো জুড়িয়ে গেলো। পুকুরের পাশ থেকে নতুন বাড়িটা এত্ত সুন্দর লাগছিলো যা বলার মত না।
কিছুদূর গিয়ে দেখলাম এক বৃদ্ধলোক ঝালমুড়ি বিক্রি করছে। সেখান থেকে দশ টাকার ঝালমুড়ি কিনলাম।
ঝালমুড়ি খাওয়ার পর মনে হলো এতো স্বাদের ঝালমুড়ি আমি আগে কখনও কোথাও খাই নি। সব কিছুই কেমন যেন স্বপ্নের মত সুন্দর লাগছিলো আমার কাছে।
দেখতে দেখতে ফেরার সময় হয়ে এলো। আমরা আবার গাড়িতে চড়ে বসলাম৷ আগের মতোই গাড়িতে গান বাজছে আর সবাই হৈ হুল্লোড় করছে। তবে এবার আর বিরক্ত লাগছে না আমার। এক সময় সবাই ঘুমিয়ে গেলো।
আমি গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি,
জীবনে কোথাও ঘুরতে যাই নি নানুবাড়ি ছাড়া। ভাবতাম হয়তো নানুবাড়িই শুধু যাওয়ার মত জায়গা তবে আমার ধারণাটি একদম ভুল প্রমানিত হলো আজ। বন্ধুদের জোরাজুরি আর স্যারের কথা না শুনলে হয়তো আমি বুঝতেই পারতাম না বাইরের জগৎ এত সুন্দর!
খিচুড়ির যে এত্ত স্বাদ আর এই খিচুড়িই কি না আমি না খাওয়ার জন্য ঝগড়া করেছি মায়ের সাথে ভাবতেই কেমন যেন লাগছে। এখানে এসেই বুঝতে পেরেছি এতদিন বাসায় কত্ত মজার মজার খিচুড়ি খাওয়া মিস করেছি।
শুধু ভাবছি আর আফসোস্ করছি। হায় রে, স্কুল জীবনের দশ টা বছরে কতবার সবাই এ জায়গা সে জায়গায় গেছিলো শুধু আমি ছাড়া। আমি যদি যেতাম তবে এতদিনে আরও কত সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখতে পেতাম। বন্ধুদের সাথে কোথাও ঘুরতে যাওয়া যে এত মজার তা কতবারই না মিস করেছি।
তবে এর পর থেকে আর কখনোই মায়ের হাতের খিচুড়ি খাওয়া বাদ দেই না। বাদ দেই না বন্ধুরা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করলে সেখানে যাওয়াও।
কারণ হিসেবে ভাবি,
এত বছরে অনেক কিছু দেখার মিস করেছি, অনেক মজা, আনন্দ মিস করেছি আর তা করতে চাই না।
আমার জীবনের পাতায় সর্বপ্রথম এবং সব’চে স্বরণীয় স্মৃতি হিসেবে সোনারগাঁও ভ্রমন আজীবন থাকবে।
আসিফ আহমেদ

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৪ Comments

  1. Tasnim Rime

    ভ্রমণকাহিনী না বলে স্মৃতিচারণ বলা যায় এটাকে। ভ্রমণের জায়গা বা সেখানকার ইতিহাস ঐতিহ্যের তেমন কোন বর্ণনা নাই কাহিনীতে।

    শুভ কামনা রইলো।

    Reply
  2. আফরোজা আক্তার ইতি

    খুব ভালো লাগলো পড়ে। প্রতিটি লাইন মনের গহীনে গিয়ে হানা দিচ্ছিলো আর বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল দু’বছর আগের সেই স্কুল জীবনের স্মৃতি! আমার তো এতোটাই ভাগ্য খারাপ যে আমাদের স্কুলের শিক্ষা সফরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আম্মু কখনোই যাওয়ার অনুমতি দেয় নি, তাই যেতেও পারি নি। আপনার ভ্রমণকাহিনীটি পড়ে বেশ ভালো লাগলো। তবে ভ্রমণকাহিনীটি আরো একটু ভালোভাবে ফুটিয়ে তুললে ভালো হত। ভ্রমণে গিয়ে সেখানে কি কি দেখলেন, তার ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক দৃশ্য এগুলো বিশদ বিবরণ দিলে আরো ভালো লাগতো।
    বানানে কিছু ভুল আছে।
    ছিটটা- সিটটা।
    ঘুড়তে- ঘুরতে।
    প্রমানিত- প্রমাণিত।
    শুভ কামনা।

    Reply
  3. Naeemul Islam Gulzar

    চমৎকার স্মৃতিচারণমূলক কাহিনী।তবে ভ্রমণকাহিনীর ক্ষেত্রে ভ্রমণের বর্ণনা দেওয়া উচিৎ।শুভকামনা

    Reply
  4. shahrulislamsayem@gmail.com

    সবই ঠিক আছে, তবে প্রথম অর্ধেক এর সাথে বিশয়বস্তুর কোনো মিল খুঁজে পেলাম না

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *