অদেখা সাগর
প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০১৮
লেখকঃ

 50 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখিকা: আয়েশা সিদ্দিকা
.
‘চিগন এক্কান মন,
সিয়ান তরে দিলুং মুই সাত্ত রাজার ধন।’ লাইনটা একটু সুর করে বলেই খিলখিল করে হাসে সাফানা।
ওর পাশেই দাঁড়ানো নূরাইদ। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সাফানার দিকে। সন্ধ্যার মৃদু শীতল বাতাসে ওদের চুল উড়ছে। বারান্দার সামনের আমগাছ আর গ্রীলের ছায়া মেখে ল্যাম্পপোস্টের হালকা আলো দখল করে আছে ওদের শরীর। সাফানা হাসছেই…
নূরাইদ অবাক চোখে চেয়ে বলে উঠলো,
‘কী বললে? কিছুই তো বুঝলাম না! এটা আবার কোন ভাষা?’
‘এটা প্রেমের স্বীকারোক্তি জনাব।’ বলেই আবার সেই হাসির পুনরাবৃত্তি করল সাফানা।
‘প্রেমের স্বীকারোক্তি! কার প্রেমের? তোমায় কি প্রোপোজ করেছে কেউ?’
এ কথা শোনার সাথে সাথে সাফানার হাসি থেমে চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো। নূরাইদ এখনও অবাক চোখে তাকিয়ে।
‘আচ্ছা আপনি কি আসলেই এমন বুদ্ধু না ভান করেন?’ রেগে বলল সাফানা।
‘না। আসলেই আমি কিছু বুঝতে পারিনি। সত্যিই।’
‘নারীরা হাঁ করলেই নাকি পুরুষ মানুষ সব কথা বুঝে যায়! তো আপনি কেমন বলুন তো?’
‘হাহাহা! হাঁ করলেই সব বুঝে যায়? কে বলেছে তোমায়?
‘নানি।’
‘মজার তো! এগুলো আসলে প্রবাদেই বেশি মানায়। বুঝলে?’
‘তাই তো দেখছি।’
‘তোমার কথার অর্থ তো বললে না। কোন ভাষা এটা?’
‘আমাদের থেকে বহু দূরের মানুষদের ভাষা। চাকমারা এ ভাষায় কথা বলে।’
‘বাব্বাহ্! তুমি চাকমা ভাষাও জানো?’
‘পুরোটা না। কলেজে এক বান্ধবী ছিলো। ওর থেকেই কিছু শেখা।’ হেসে বলে সাফানা।
‘অর্থ কী এটার?’
‘বলেছি তাই কত না! আবার অর্থ!’ বিড়বিড় করে সাফানা।
‘কিছু বললে?’
‘কিছু না। অর্থ আপনিই বের করবেন খুঁজে। কঠিন কিছু না।’
‘কী মুশকিল!’
সাফানা হাসে। তারপর বলে, ‘বিখ্যাত কবি কী বলে গেছেন জানেন?’
‘কী?’
‘হে ইনসান,
নয় সহজ প্রেমের দান!’
বেশ ভাব নিয়ে লাইনটা বলেই শাড়ির আঁচল মুখে চেপে হাসি আটকায় ও।
‘হুম। মন্দ বলেননি উনি! কত যে কঠিন এই জিনিস এ ক’দিনে হারে হারে টের পাচ্ছি আমি।’
সাফানার হঠাৎ মায়া লাগে। সামনে দাঁড়ানো বুদ্ধু মানুষটার কান ধরে বলতে ইচ্ছে করে, আরে গাধা এটা কোনো কবির কথা না। তোমার বউয়েরই কেবল বানানো দুষ্টুমি! তবে ও তা বলে না। কিছু বোকামী খুব মিষ্টি হয়। সেগুলো ভাঙতে হয় না। সাফানা রাগের অভিনয় করে বলে, ‘তার মানে আমি খুব জ্বালাই আপনাকে, না?’
‘হায় আল্লাহ্! এ কথা কখন বললাম? তুমি তো খুব কিউট একটা বউ।’
‘দেখুন, প্লে বা কেজিতে পড়া বাচ্চাদের কিউট বলে ইম্প্রেস করা যায়। বউকে নয়।’ আড়চোখে তাকিয়ে বলে ও।
‘উমম… বউকে তাহলে কী বলে ইম্প্রেস করে? চা করে আনবো বউ?’
সাফানা হাসে। ‘বলেছেন এতেই ইম্প্রেসড্। আপনি বসুন আমি চা করে আনছি। আর হ্যাঁ শুধু বসে থাকবেন না যেন। ভেবে চাকমা ভাষাটার অর্থ খুঁজে বের করুন।’ বলে রান্নাঘরে আসতে নেয় ও।
‘ওকে। কিন্তু এক মিনিট!’ বলে পেছন থেকে হাত টেনে ধরে নূরাইদ।
‘কী বলেছিলে যেন আর একবার বলে যাও প্লিজ!’
‘বলব না। যা মনে আছে তাই ভাবুন।’ বলে হেসে চলে আসে ও চা বানাতে।
চুলোয় গরম পানির ছোট্ট পাতিলটা বসিয়ে ভাবতে থাকে, মানুষটাকে জ্বালানোর মোক্ষম একটা হাতিয়ার পাওয়া গেছে। বেশ ক’দিন হয়রান করা যাবে এই চাকমা ভাষা নিয়ে।
কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ পেছন থেকে সুন্দর একটা ভারী কণ্ঠ ভেসে আসে।
‘দিলাম তোকে ছোট্ট একটি মন
মনটি আমার সাত রাজার ধন।
সারাজীবন তাকে তুই লুকিয়ে রাখিস বুকে,
দেখবি জ্যোৎস্না রাতে।’
সাফানা অবাক হয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে নূরাইদ রান্নাঘরের দরজার চৌকাঠে একপাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। মুখে বাঁকা হাসি!
নূরাইদ ভ্রু দুটি উপরে নাচিয়ে হাসিমুখে ওকে প্রশ্ন করে,
‘কী? কেমন চমকে দিলাম?’
‘তারমানে আপনি জানতেন?’ বিস্মিত সাফানার প্রশ্ন।
‘হুম।’
‘কোনো চাকমা বন্ধু আছে?’
‘নাহ্। চাকমাদের উপর একটা ডকুমেন্ট করতে হয়েছিলো একবার। ব্যাস তখনই শিখেছিলাম লাইনগুলো। ওদের দিকে তো এই লোকগানটা বেশ জনপ্রিয়! তাই দু’লাইন বেশিই গাইলাম।’
‘হুম! তো এমন ভান কেন করলেন?’ ভ্রু জোড়া একসাথে করে তাকিয়ে আছে সাফানা সন্দেহ ও বিরক্তির চোখে। নাহ্ লোকটাকে যতটা সোজা মনে হয়েছিলো ততোটা না।
‘আমি আরেকটা ডকুমেন্টারি করলাম! শুনেছিলাম সারপ্রাইজড হলে মেয়েদের আরও বেশি রুপবতী দেখায়। তাই…’
‘তো কত রুপ দেখলেন?’ হয়রানি করার প্ল্যানটা মাটি হওয়ায় রাগ হচ্ছে সাফানার।
‘আমি হয়ত একটু সৌভাগ্যবান! তাই রুপের সাথে রাগটাও দেখা হয়ে গেলো! মেয়েরা রাগলে আরও সুন্দর লাগে জানোতো?’ বলেই হো হো করে হেসে ওঠে নূরাইদ।
‘ওরে হাসি! যেন কত মজার কথা বলছে! যান বসুন। চা হয়ে গেছে। নিয়ে আসছি।’ ঈষৎ ঝারি দিয়ে কথার ফাঁকে কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলে ও।
.
মূহুর্ত পরেই দুপদাপ করে দৌড়ে রান্নাঘরে আসে নূর। এসে সাফানার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,
‘দাদুনী, তুমি আবার দু’কাপ চা করেছো? বাসায় তুমি ছাড়া আর কেউ তো চা খায় না! আর একা একা কার সাথে কথা বলো?’
সাফানা চোখের ভারী চশমাটা চোখে আরেকটু টেনে তার সাত বছরের একমাত্র নাতি নূরের দিকে তাকায়। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে কাকে যেন খোঁজে!
‘দাদুনী, আবার দাদুভাই কে দেখেছো তুমি? এসেছিলো এখানে?’ উৎফুল্ল হয়ে দাদীর হাত ধরে ঝাকি দেয় নূর।
‘থাকেই তো তোর দাদুভাই আমার সাথে। যাবে আর কই?’ বিড়বিড় করে বলে সাফানা জামান কাঁপা হাতে চায়ের ট্রেটা তুলতে যায়। নূর বাঁধা দিয়ে বলে,
‘চা আমি নিচ্ছি দাদুনী। আসো তোমাকে ডাইনিং এ নিয়ে যাই আমি। তোমার না একা নড়াচড়া নিষেধ। তুমি না অসুস্থ?’
‘তোর দাদুর জন্যই তো করছিলাম দাদুভাই।’ কাঁপা কণ্ঠে জবাব দেন তিনি।
‘কই দাদুভাই? আমি তো দেখি না কখনও।’ দাদীকে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে মন খারাপ করে বলে নূর।
‘আছে আছে। ভালো করে দেখলেই পাবি। খুঁজলেই দেখবি!’ কুঁচকানো ত্বকে শত ভাজ ফেলে মিষ্টি করে হাসেন সাফানা। তারপর আবার বলেন, ‘কই আর যাবে বল? মনটা যে সেই কবে আমার কাছে রেখে দিয়েছে! সে তো সাত্ত রাজার ধন! তা রেখে দূরে যাবে কই হ্যাঁ?’
‘বুঝিনা দাদুনী তোমার কথা। চা খাও। ঠাণ্ডা হয়ে গেলো তো! আমরা তো কোল্ড কফি খাই। ক্লোড টি মনেহয় হয় না। তবুও আজকের বাড়তি চা-টা আমি খাচ্ছি। কেমন!’
সাফানা জামান আর কিছু বলেন না। নাতির এগিয়ে দেয়া কাপটা হাতে নিয়ে তাতে আলতো চুমুক দেন। নূরও কাপ তুলে নেয় হাতে। সাফানা চমকে ওঠে! এইতো! ঠিক এমন করেই কাপ ধরতো মানুষটা! ঠিক এমন করেই চুমুক দিত কাপে। দাদার মতো হবে এ বিশ্বাসেই তো তিনি নাতিকে দাদার নামের অর্ধেক ‘নূর’ নামটা দিয়েছেন। অথচ এত স্মৃতি ফেলে কিভাবে না ফেরার দেশে চলে গেল উনি? কিভাবে? দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশটি বছর একইসাথে থাকা, একই ছাদের নিচে। একসাথে ইবাদত করা, খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো, ঝগড়া করা, সারাদিন কোথায় কী হলো বসে গল্প করা সে মানুষটা এতদূরে কী করে গেল! এতদিন কিভাবে আছে প্রিয়তমাকে ছাড়া! হিসেব মেলে না তার।
এখনও ফজরে ঘুম ভাঙলে ডানপাশে হাতরে ডাকতে থাকেন ঘুম ঘুম চোখে, ‘এই যে শুনছেন? উঠুন। আযান দিয়ে দিলো যে! জামাত মিস করলে তো সারাদিন গোমড়ামুখে থাকবেন। উঠে পড়ুন তাড়াতাড়ি।’
কিন্তু যখন হাতটা শুধু বিছানা আর বালিশই খুঁজে পায় তখন ফিরে আসে তার কাছে। বেড টেবিল থেকে চশমাটা টেনে নিয়ে চোখে দিয়ে চারপাশে দেখে বোঝেন সে দিনগুলো আর নেই। সে এখন বড় একা। চোখের পানি ধুয়ে মুছে ওযু করে নামাজ পড়ে দু’হাত তুলে আর্জি জানান মহামহীমের কাছে তাদের আবার একসাথে করে দেওয়ার জন্য। এ নিঃসঙ্গতা বড় পীড়াদায়ক। যে মানুষটার স্মৃতি ঘরের ভেন্টিলেটর থেকে ধূলিকণায়ও মিশে আছে তার বিহনে কী ভালো থাকা আদোও যায়!
চায়ের কাপ ধরে বসে থাকা সাফানা জামানের বয়সের ভারে ছোট হয়ে আসা বড় টানা টানা চোখ দুটি মূহুর্তেই সাগরের মত ভেসে যায়। যে সাগর বাঁধাহীন ও নির্জীব! যে সাগরের খোঁজ কেউ রাখে না। কেউ দেখে না…
.
~সমাপ্ত~

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৭ Comments

  1. Anamika Rimjhim

    বৃদ্ধবয়সের একাকিত্ব নিয়ে আমিও একটা গল্প লিখেছিলাম।ব্যাপারটা আসলেই খুব প্যাথেটিক!
    আপনার গল্পটা আসলেই খুব সুন্দর হয়েছে। এতগুলো গল্প পরে এটাকে বেস্ট বলা যায়। গল্পটা এত ভাল লেগেছে যে বানান টানান দেখিইনি। অনেক শুভ কামনা আপু। 🙂

    Reply
  2. Rahad

    অদেখা সাগর।।
    মারহাবা,,,

    Reply
  3. Learner

    গল্পের শুরুটা রোমান্টিক হলেও মাঝ পথে সম্পুর্ন মোড় ঘুরে গেছে মানে পাঠককে হঠাৎ চিৎপটাৎ করারজন্য যথেষ্ট টার্নিং ট্রাজেডি এবং রোমান্স মিলিয়ে সুন্দর ছিলো লেখাটি। শুভ কামনা

    Reply
  4. Jannatul Ferdousi

    অর্থ আপনিই বের করবেন খুঁজে→ খুঁজে শব্দ আগে দিলে বাক্যটা ভালো হত।

    রুপ→ রূপ

    মূহুর্ত→ মুহূর্ত

    ঝাকি→ ঝাঁকি

    ভাজ→ ভাঁজ

    আদোও→ আদৌ

    ….
    চমৎকার লেখনশৈলী। চমৎকার গল্প। আসলে কমেন্ট করার ভাষা নেই। লেখিকা গল্প লেখায় অনেক পারদর্শী। কিভাবে পাঠককে ধরে রাখতে হবে একটা গল্পে তা তিনি জানেন। আর এই গল্পেও তিনি সার্থক। ভীষণ ভালো লেগেছে গল্পটি। ভীষণ!
    লেখিকার জন্য শুভ কামনা।

    Reply
  5. Sajjad Hossain Munna

    ভালোবাসা এমনই হয়… ????

    Reply
  6. Halima tus sadia

    জীবনের শেষ প্রান্তের সময়গুলো খুবই খারাপ যায়।একাকিত্ব সময় কাটাতে হয়।বৃদ্ধ বয়সে তো কথাই নেই।
    নাতি – নাতনি থাকলে তবু ও ো কিছু টা ভালো কাটে।
    ভালো লিখেছেন া আপু।
    বানানে তেমন ভুল নেই।
    কন্ঠ-কণ্ঠ
    মূহূর্তে-মুহূর্তে
    ভাজ-ভাঁজ
    সাত্ত-সাত
    মনে হয় হয় না–মনে হয় না হবে।
    শুভ কামনা আপু…

    Reply
  7. tamanna

    গল্পটা ভালো ছিলো কিন্তু প্রথম প্যারার দিকে কেমন যেন অতি বর্ণনা হয়ে গিয়েছে। কিছুটা বোরিং লাগলো আমার কাছে কেন বুঝলাম না।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *