অচেনা বালক
প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০১৮
লেখকঃ

 89 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

এইমাত্র ঘুম ভাঙ্গল। টেবিল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল ৯ টা বাজে। রাত তিনটায় ঘুমিয়ে সকাল নয়টায় ঘুম ভাঙ্গল। মোট ছয় ঘন্টা ঘুমালাম, একজন মানুষের দিনে ছয় ঘন্টা ঘুমই পারফেক্ট। বাহ্! আজকে নিয়ম মাফিক ঘুম হলো, কিন্তু বাস্তবে মোটেও নিয়মের সাথে আমার জীবন চলে না, সবই অনিয়মে ভরা। মানুষের জীবন বড়ই অদ্ভুত! গতকালই সব হিসেব পাল্টে দিয়ে দুটো অঘটন ঘটে গেল, অথচ রাত্রে কোন টেনশন ছাড়া আমার চমৎকার ঘুম হল। এর কি কোন ব্যাখ্যা আছে? নেই। জগতের অনেক কিছুরই কোন ব্যাখ্যা নেই।
গতকাল দুটো অঘটনের প্রথমটা ঘটে বিকাল পাঁচটায় আর পরের টা ঘটে রাত নয়টায়, রাতেরটাই আগে বলি।
হাটাহাটি করে বাসায় আসতে আসতে আমার প্রতিদিন রাত নয়টা বাজে। গতকালকেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। আমি রাতের নয়টায় বাসায় আসি, এবং এসেই দেখি পরিচিত এক খালা তার দুই মেয়েকে নিয়ে বসে বসে মায়ের সাথে গল্প করছে। খালাকে আমি চিনি, ওনার নাম মর্জিনা। আমি ছোটবেলা থেকেই তাকে মর্জিনা খালা বলেই ডাকি। তার মেয়ে দুইটার নাম হচ্ছে রিতু আর মিতু। এই দুইজনেই দেখতে সুন্দর, তবে রিতু বেশি সুন্দর। ইদানিং রিতুর বিয়ে নিয়ে মর্জিনা খালা বেশ চিন্তায় আছে। আমি রিতুর বিয়ে নিয়ে মোটেই চিন্তায় নেই, কারন এত সুন্ধর মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করাটা আমার কাছে মূর্খামি। প্রথম স্তরের নয় তৃতীয় স্তরের মূর্খামি, মর্জিনা খালা রিতুর বিয়ের বিষয়ে তৃতীয় স্তরের মূর্খামিতে আছেন।
এই মুহুর্তেি মর্জিনা খালা হাসিখুশি, তার চোখ ঠিকরে খুশি খুশি ভাব সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে। আমি কোন কথা না বলে আমার রুমে চলে যাচ্ছিলাম, মা ডাক দিলো,
-অভি এদিকে আয়।
আমি মােয়র পাশের সোফায় কাচুমাচু হয়ে বসলাম। মা বললো,
-তুই এভাবে কুকড়ে আছিস কেন?
-কেন জানি আমার মন বলছে, আমার কুকড়ে যাওয়ার বিশেষ কারন ঘটেছে।
-আমার সাথে হেয়ালি করে কথা বলবি না, শোন তোর সাথে দরকারি কথা আছে।
-বলো।
মা আমাকে নয় রিতু মিতু কে বলল, তোমরা একটু ভিতরের ঘরে গিয়ে বসো।
রিতু মিতু চলে যেতেই মা এবার আমাকে বললেন,
-তোর বিষয়ে আমি একটা গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেটা শোনার আগে আমাকে বল- তোর পছন্দের কোন মেয়ে আছে?
-আমার পছন্দের কোন মেয়ে নেই এবং আমি এখন বিয়ে করতে চাচ্ছি না।
কিন্তু আমি চাচ্ছি। আমি মনে করি তোর চাওয়ার থেকে আমার চাওয়ার গুরুত্ব বেশি। আমি রিতুর সাথে তোর বিয়ে ঠিক করেছি, এবং এটাই ফাইনাল। এখন তোর কোন উল্টাপাল্টা কথা শুনতে চাচ্ছি না। তিন মাস পরে তোর বিয়ে, এখন নিজের রুমে যা।
ইচ্ছে করছে মায়ের সাথে সামান্য রসিকতা করে মাকে রাগিয়ে দেই। সবসময় ইচ্ছেকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত না, তাই আমি কোন কথা না বলে নিজের রুমে চলে আসি। আজকের দিনটাই হচ্ছে অনিয়মের দিন, যা আমি ভাবিও নাই আজকে শুধু তাই ই হচ্ছে। বিয়ে ঠিক হওয়াটা আমার কাছে ভয়ঙ্কর কিছু না,তবে বিকেলে যেটা ঘটল সেটা আমার কাছে ভয়ঙ্কর,ভীষন রকমের ভয়ঙ্কর।
প্রতিদিনের মত আজকেও আমি কবির মিয়ার দোকানে চা খেতে যাই। মানুষের সব কাজের একটা উদ্দেশ্য থাকে। আসলে চা খাওয়া নয়, আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে- শ্রাবনি কে একটু দেখা। শ্রাবনি প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় টিউশনি করাতে যায়।
আজ থেকে দুই বছর আগের কথা। তখন আমরা আরেকটা ফ্লাটে থাকতাম। এখন যে ফ্লাটে আছি সেখানে না, একই এলাকার উত্তর পারায় আরেকটা ফ্লাটে। আমাদের বিল্ডিং এর পাশের বিল্ডিং এর তিন তলার একটা ফ্লাটে একটা মেয়ে থাকত, তার নাম শ্রাবনি। আমার তাকে ভাল লাগতো, অসম্ভব রকমের বেশি ভাল লাগতো। কেন লগতো আমি ঠিক জানতাম না, মানুষ তার অনেক কাজের বা ইচ্ছার ই কারন জানে না। কে জানে? হয়ত বা জানার চেষ্টাই করে না।
আমরা বাসা বদলিয়ে ফেলার পরে শ্রাবনিকে কম দেখতাম, আস্তে আস্তে একেবারেই ভুলে গেলাম। মাসখানেক আগে হঠাৎ একদিন শ্রাবনিকে দেখলাম। ও আরো বেশি সুন্দর হয়েছে। কবি সাহিত্যিক হলে এই সুন্দরের বর্ননা করতে পারতাম, কিন্তু আমি কবি সাহিত্যিক না তাই বর্ননাটা দিতে পারছি না।
এখন আমি প্রতিদিন বিকলে কবির মিয়ার টং দোকানে যাই। শ্রাবনি বিকেলে টিউশনি করাতে যায়, আর আমি চা সিগারেট খেতে খেতে খুব আগ্রহ নিয়ে শ্রাবনিকে দেখি। ঐতো শ্রাবনি যাচ্ছে, আমি তার চলে যাওয়া দেখছি। একি! শ্রাবনি আবার এইদিকে আসছে কেন?
শ্রাবনি টং দোকানটার সামনে এসে আমাকে বলল, এই যে শুনেন।
আমি অবাক হয়ে যাই, খুশি হয়ে বলি, জ্বি বলেন।
– আপনার সাথে আমার কথা আছে।
– চলুন, হাটতে হাটতে বলবেন।
– চলুন।
– আপনি প্রিতিদিন দাড়িয়ে দাড়িয়ে আমাকে দেখেন কেন? আর কখনো এখানে আসবেন না। আমি একজনকে ভালবাসি, তাকে নিয়ে সুখেই আছি। অহেতুক নিজের সময় নষ্ট করবেন না, আচ্ছা চলি।
শ্রাবনি চলে গেল। আমি ওর কথা শুনে বোকার মত দাড়িয়ে পড়লাম। কি করা যায় কিছুই বুঝতে পারছি না, আবার উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাটা শুরু করলাম।
এটাই ছিল আজকের প্রথম অঘটন, রাতে বাসায় গিয়ে পড়লাম বিয়ের অঘটনে।
এক সপ্তাহ পর।
আজকে শ্রাবনিকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। আমি কি কবির মিয়ার টং দোকানে যাব? ওকে দেখতে ইচ্ছে করছে ঠিক, তবে যাওয়াটা ঠিক হবে না।
বিকেল পাঁচটা। মনের অজান্তেই কবির মিয়ার টং দোকানে চলে এসেছি, চা- সিগারেট খাচ্ছি। ঐতো শ্রাবনি আসছে, আমার বুকটা কাপছে!
শ্রাবনি টং দোকানে আমাকে দেখে সরাসরি আমার কাছে এসে বলল, শুনে যান।
আমি এগিয়ে গিয়ে ওর সাথে হাটা শুরু করি। সে বলে,
আমি একজনকে ভালবাসি, তার নাম অচেনা বালক। সে প্রিতিদিন আমাকে খুব সুন্দর করে চিঠি লিখতো। সেই চিঠিগুলো পড়েই আমি বুঝতে শিখেছি, ভালবাসা কি? হঠাৎ করেই সে হারিয়ে যায়, তার চিঠি দেওয়া ও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমি তাকে ভুলতে পারিনি, এখনো তার চিঠিগুলো পড়ি। প্রতি রাতেই আমি বুঝতে পারি যে, আমি ঐ হারিয়ে যাওয়া ছেলেটাকেই ভালবাসি। আপনি যদি ভালবাসার সামান্যতমও কিছু বুঝে থাকেন, তাহলে দয়া করে আমার পেছনে ঘরুঘুর করবেন না।
শ্রাবনির কথা শুনে আমি চুপ হয়ে যাই। দুই বছর আগে আমিই শ্রাবনিকে চিঠি লেখতাম। ও প্রতিদিন ছাদে ওর ফুল গাছ দেখতে যেত আর আমি টবের মাঝে রেখে দিতাম আমার চিঠি। চিঠির শেষে লিখতাম,
ইতি
অচেনা বালক।
কখনো নিজের পরিচয় ওকে দেইনি, তারপরে তো ওর কোন খবরও নেই নি। কেমন যেন এক অপরাধ বোধ চেপে ধরে আমাকে। আজকেও আমি তাকে নিজের পরিচয় দিতে পারি না, মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে পেছন দিকে হাটা শুরু করি।
পেছন থেকে আবার শ্রাবনির ডাক শুনতে পাই,
-এই যে শুনেন।
আমি গুটি গুটি পায়ে তার দিকে এগিয়ে যাই।
শ্রাবনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন। আমার অস্বস্তি হতে থাকে, তবে সে তাকিয়েই থাকে। আপনি কি ভেবেছেন? আমি আপনাকে চিনতে পারবো না! আমি ঠিকই আপনাকে চিনেছি, আপনিই আমার সেই অচেনা বালক! সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, আজও কি লুকিয়েই থাকবেন?!
আমি বিষন্ন মাখা দৃষ্টিতে শ্রাবনির হাতের দিকে তাকিয়ে থাকি, চোখের কোনে দু ফোটা জল ছলছল করছে। না! তার হাতটা ধরা হয় না আমার! আমি পেছন দিকে ঘুরে হাটতে থাকি। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, দুজনের স্বপ্নের চেয়ে দুটো পরিবারেই স্বপ্নেরই দাম বেশি!

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৩ Comments

  1. Anamika Rimjhim

    মুহুর্ত-মুহূর্ত*
    কুকড়ে-কুঁকড়ে*
    প্রিতিদিন-প্রতিদিন*
    হাটাহাটি-হাঁটাহাঁটি
    সুন্ধর-সুন্দর*
    বানানের দিকে নজর দিবেন। গল্প মোটামুটি লেগেছে। শুভ কামনা।

    Reply
  2. Jannatul Ferdousi

    ভাঙ্গল→ ভাঙল

    হল→ হলো

    কোন→ কোনো

    হাটাহাটি→ হাঁটাহাঁটি

    ব্যাতিক্রম→ ব্যতিক্রম

    টা শব্দের সাথে বসে।

    সুন্ধর→ সুন্দর

    প্রিতিদিন→ প্রতিদিন

    দাঁড়িয়ে বানানে চন্দ্রবিন্দু হবে।

    কাপছে→ কাঁপছে

    নি শব্দের সাথে বসে।

    কিছুক্ষন→ কিছুক্ষণ

    ফোটা→ ফোঁটা


    গল্পটার ভেতর আরেকটু সাবলীল উপস্থাপনের দরকার ছিল। একটু সাদামাটা গল্প হয়ে গেছে।
    আপনার লেখায় আরেকটু উন্নতি দরকার। সেজন্য বেশি বেশি গল্প পড়ুন এবং চর্চা করুন। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
    শুভ কামনা

    Reply
  3. Halima Tus Sadia

    ভালো লিখেছেন।
    কিছু ভালোবাসা এমনি।
    তবে শ্রাবনি ও অভিকে খুব ভালোবাসতো।তাই তো সেই চিঠিগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
    অচেনা বালক ভালোবেসে ও কোনদিন বুঝাতে পারনি।

    বানানে ভুল আছে

    ব্যাতিক্রম-ব্যতিক্রম
    প্রতিদিন–প্রতিদিন
    দাড়িয়ে-দাঁড়িয়ে
    বর্ননা-বর্ণনা
    কিছুক্ষন-কিছুক্ষণ
    কাপছে-কাঁপছে
    সুন্ধর-সুন্দর
    দু ফোটা-দু’ফোঁটা
    মোয়র-মায়ের

    শুভ কামনা রইলো।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *