অবারিত বৃষ্টি
প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০১৮
লেখকঃ

 56 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল
.
.
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির সাথে শীতল বাতাস মনটাকে উতলা করে দিচ্ছে। শিরশিরে বাতাসের ছোঁয়ায় মনটা যেন ভরে উঠছে। যে জায়গায় অবস্থান করছি তার আশেপাশে অনেক মানুষের সমাগম। হোটেলটা মানুষে মানুষে গিজগিজ করছে। মনে হচ্ছে কিঞ্চিৎ জায়গা ফাঁকা নেই। নামীদামী হোটেলের বেশিরভাগ চেয়ারগুলো দখল করে আছে কপোত-কপোতীরা। চারপাশে তাকাতেও খানিকটা লজ্জা লাগছে। কিন্তু উপায় নেই, বৃষ্টি থামা পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতেই হবে। বর্ষাকাল! খুব তাড়াতাড়ি বৃষ্টি থামার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। অগত্যা বসে না থেকে চায়ের অর্ডার দিলাম।
.
বাবা-মা ইদানিং বিয়ের জন্য খুব চাপ দিচ্ছেন। যতই চাপাচাপি করুক না কেন, আমি এখন বিয়ে করছি না। মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করলাম আরও চার-পাঁচটা বছর কুমার হিসেবেই কাটাব। সিগারেট, বিভিন্ন ক্লাব, তিন-চারটা বান্ধুবীর সাথে ফুর্তি করা আমার নিত্যদিনের কাজ। পানীয় কিংবা নারী ছাড়া আমার জীবনটা যেন অচল প্রায়। তাই তো এতো সুখের জীবন ছেড়ে অন্য আরেকজনকে গলায় ঝুলাতে চাচ্ছি না। বাবা-মা জানেন আমার বদ অভ্যাস সম্পর্কে। বাবা হজ্ব ব্রত পালন করে আসলেও আমাকে শোধরাতে পারেননি। আমি চলছি আমার মতো।
মোবাইল ফোনে শুয়ে শুয়ে রিয়ার সাথে প্রেমালাপ করছিলাম। রিয়া জানে তাকে আমি বিয়ে করব না, তার সাথে শুধু সময় কাটানো উদ্দেশ্য। প্রেমালাপের এক পর্যায়ে যৌন চাহিদার কথাগুলো সামনে আসলো। ভালোই লাগছে আমার, রিয়াও বেশ আনন্দ পাচ্ছে। হঠাৎ দেখি দরজা ঠেলে কেউ যেন ঢুকছে। ফোনটা কেটে দিয়েই দেখি বাবা-মা। আমি ঠিক হয়ে বসে বললাম,
‘আব্বু-আম্মু তোমরা এই সময়ে?’
বাবা আমার বিছানার কোণায় বসে বললেন,
‘দেখ বাবা, তোমাকে বলছি এই ভবঘুরের মতো জীবন-যাপন না করে সবকিছু ছেড়ে বিয়ে করে ব্যবসায় মন দাও। আমি আর আগের মতো খাটতে পারি না। তোমাকে সবকিছুর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাই।’
আমি আমতা আমতা করে বলতে লাগলাম,
‘কিন্তু আব্বু, আসলে……’
মা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
‘চুপ, একটাও কথা বলবি না। আমরা যা বলছি সেটাই হবে। তোর জন্য মেয়ে ঠিক করে এসেছি। অনেক ভদ্র আর শান্ত আর পরহেজগারি। তোর মতো মাতাল নয়।’
মায়ের কথা শুনে আমি বললাম,
‘দেখ আম্মু, আমি এখন বিয়ে করতে চাচ্ছি না। এসবে আমার ভালো লাগে না। আর আমি আপাতত ব্যবসার দায়িত্বও নিতে চাচ্ছি না। আমার সময় হলে তোমাদের বলবো।’
বাবা বললেন,
‘কিন্তু আমরা মেয়ে দেখেছি বাবা। মেয়েটা খুব শান্ত আর….. ‘
বাবাকে থামিয়ে দিলাম। আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। বাবাকে থামিয়ে দেয়াতে বুঝতে পারলাম বাবার চোখে জল টলমল করছে। বেচারা কখনও আমাকে কষ্ট দেননি। ভুল করলেও সবসময় শালীনভাবে বুঝিয়েছেন। বাবা মাথা নিচু করে মায়ের ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেন, ‘শায়লা, আমি ব্যর্থ।’
বাবা দ্রুত চলে গেলেন। মনে হয় চুপিসারে কাঁদবেন। এটাই তো স্বাভাবিক। সন্তানেরা কষ্টে থাকলে বাবা-মায়ের কাছে সে কষ্টের কথা ব্যক্ত করে। কিন্তু বাবা-মায়েদের যে কোনো কেউ কষ্টে থাকলে তারা কার কাছে তা ব্যক্ত করবে?
মা আমার দিকে তার চোখ দু’টো বড় বড় করে রাগ দেখিয়ে চলে গেলেন। মনে মনে ভাবলাম বাবার সাথে যা করলাম তা মনে হয় ঠিক হলো না। বাবাকে বুঝিয়ে বললেই তো হতো।
মনে মনে প্রচণ্ড অনুশোচনা হতে লাগলো।
সকাল থেকে কোনো কাজেই মন বসছে না। বন্ধুরা বারবার ফোন করলেও কোনো সাড়া দেইনি। তাবার সাথে রুমডেটের কথা আছে আজ। মেয়েটাও সবকিছুর যোগান দিয়ে ফোন করছে। বেশ কয়েকটা মেসেজও দিয়েছে। নাহ! কিছুই ভালো লাগছে না।
কোনোদিন বাবার চোখে পানি দেখিনি। আজ দেখলাম। ছেলেকে বিয়ে করাতে না, ছেলেকে মানু্ষ করাতে ব্যর্থ হয়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভালো করে দেখলাম। প্রত্যেক বাবা-মা তাদের সন্তানকে যেভাবে চান সবাই ঠিক সেভাবে পান না। যেমন আমি নিজেও আয়না দেখে ভাবছি আমার বিদঘুটে চেহারা নিয়ে।
সময়মত সবকিছু ঠিকঠাক করলে হয়তো এমন হতাম না। সকালে টেবিলে যেভাবে খাবার দেখেছি সেগুলো ঠিক সেভাবেই রাখা আছে। কেউ একটুও স্পর্শ করেনি। সাড়া বাড়ি খুঁজে দেখলাম মা ছাদের এক কোণায় বসে ফুল গাছে পানি দিচ্ছেন। আমি বুঝতে দিলাম না যে মা ছাদে আছে। নিজের ঘরে এসে দরজার বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।
ঘুম যখন ভাঙ্গলো তখন ঘড়ির কাঁটা দুপুর আড়াইটা পার হয়েছে। ডাইনিং টেবিলেও সকালের মতো অবস্থা। বুঝতে বাকি রইলো না অভিমানের মাত্রা মাত্রাতিরিক্তভা
বে বেড়েছে। কখনও এমন করে ভাবিনি। হঠাৎ আজ ভাবছি কেন?
মায়ের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম মা শুয়ে আছেন।
‘আম্মু, দুপুরে রান্না হয়নি?’
গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘রান্নাঘরের পাতিলে সবকিছুই আছে, নিয়ে খা।’
‘আম্মু দুপুরে আব্বু আসেননি?’
‘নাহ।’
‘আব্বুর খাবার টিফিন ক্যারিয়ারে দাও। আমি অফিসে গিয়ে দিয়ে আসি।’
আমার শেষোক্ত কথাটা শুনে মা যেন চমকে উঠলেন। আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে হয়তো ভাবছে, এ কাকে দেখছি আমি!
টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে বাবার অফিসে এসেছি। বাবা জরুরী মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। আমি তার বিশ্রাম ঘরে বসে আছি। তাবা বারবার ফোন করছে, ফোনে না পেয়ে একেরপর এক মেসেজ করেই যাচ্ছে। মেয়েটা খুব এক্সাইডেট। আমি কলটা ব্যাক করে বললাম, ‘তাবা, আমি আজ খুব ব্যস্ত আছি। আজ হচ্ছে না, অন্যদিন।’
ফোনের ওপাশ থেকে তাবা বললো, ‘ওহ! আমি সেই কখন থেকে তোমাকে ট্রাই করে যাচ্ছি। একটা রেসপন্স দিলেও তো পারো। আমি খুব আশা নিয়ে আছি। ভেবেছিলাম, ডেটের পর তুমি আমাকে মার্কেটে নিয়ে কিছু ড্রেস কিনে দিবে।’
বেশি কথা না বলে ফোনটা রেখে দিলাম আর ভাবলাম, তাহলে শপিং করার জন্যই তার সতীত্ব আমার কাছে দিয়ে দিচ্ছে। পরক্ষণে ভাবলাম, যে মেয়ে সামান্যতম শপিংয়ের জন্য রুম ডেটে যায় নিশ্চয়ই তার এই ডেটের বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা।
সিমটা খুলে বাইরে ফেলে দিলাম যাতে ও আর ফোন দিতে না পারে। আমাকে দেখেই বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। হাসিমুখে বললেন, ‘কখন এসেছিস?’
‘অনেকক্ষণ। সকালে খেয়ে আসোনি কেন? দুপুরেও যাওনি।’
‘ব্যস্ত ছিলাম।’ খুব সংক্ষেপে উত্তর দিলেন।
আমি খাবারগুলো ঢালতে ঢালতে বললাম, ‘কখনও আর এমন করো না।’
‘আমার এমন করাতে কার কী আসে যায়!’ বাবার কণ্ঠে অভিমানের সুর।
‘আমি তোমার পছন্দ করা মেয়েকে দেখতে যাব। তবে শর্ত হচ্ছে আমার পছন্দ না হলে বিয়ে হবে না।’
আমি ভেবেছিলাম মেয়ে যেমনই হোক বাড়িতে এসে বলব মেয়েকে পছন্দ হয়নি। বাবা আমার কথা শুনে খুব খুশি হলেন। প্লেট থেকে খেতে খেতে বললেন, ‘তোর পছন্দ না হলে করবি না। আগে মেয়ে তো দেখ।’
বাবা নিজে খেতে খেতে আমার মুখেও তুলে দিলেন। অনেকদিন বাদে বাবার হাতে খেলাম। আজ খুব সুখী মনে হচ্ছে নিজেকে। বাবার মুখে প্রশান্তির ছোঁয়া দেখতে পেলাম। বাবা কিছুক্ষণের মধ্যে কাকে যেন ফোন করে বললেন মেয়েকে কোনো হোটেলে আসতে।
ফোন রেখে আমাকে বললেন, ‘স্বপ্নশীলা’ হোটেলে সন্ধ্যার পর তোদের দেখা করার ব্যবস্থা করে দিলাম। ঠিক সময় মতো পৌঁছে যাস।’
আমি আচ্ছা শব্দটি উচ্চারণ করে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আসলাম। বাড়ি ফিরেই বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। মা কিছুক্ষণ পর এসে বললেন, ‘কী রে ভাত খাবি না?’
‘আব্বুর সাথে ভাত খাইছি আমি। তুমি খেয়ে নাও।’
মায়ের মুখেও হাসির রেখা দেখা দিলো। এই হাসি মুখের জন্য মানুষ কতকিছু করে! কেউ লক্ষ টাকার বিনিময়েও এই হাসিমুখ কিনতে পারে না। আবার কারও ঘরে লক্ষ টাকার প্রয়োজন পরে না। দু’বেলা দু’মুঠো ভাত হলেই হলো। সন্ধ্যার পর রেডি হয়ে বের হচ্ছি। মেয়েকে দেখতে যাওয়া আমার কাছে আহামরি কিছুই নয়। মেয়ে যেমনই হোক না কেন, বাড়িতে এসে বলবো মেয়ে পছন্দ হয়নি। মা পিছন থেকে ডাকলেন,
‘সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছিস?’
‘মেয়ে দেখতে যাচ্ছি। না গেলে তো একেকজনের মুখের মধ্যে আকাশ মেঘ করবে।’
আমার কথায় মা খানিকটা মুচকি হেসে বললেন, ‘চা খেয়ে যা।’
আমি বললাম, ‘দরকার নেই। হোটেলে চায়ের চাইতে অনেক ভালো আর দামী খাবার অপেক্ষা করছে হয়তো।’
মা হাহা করে হাসছেন। আমিও কিঞ্চিৎ মুখ বাঁকা করে সামনের দিকে হাঁটা দিলাম। বাইরের আকাশটা মেঘ করেছে। যেকোন সময় বৃষ্টি আসতে পারে, বর্ষাকাল বলে কথা।
মায়ের শেষ কথাটি ছিলো, ‘তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করিস বাপ।’
মা জানে আমি রাজ্যের কাজ করে রাত বারোটার আগে ফিরবো না। সেজন্য চেষ্টা করিস শব্দটা ব্যবহার করেছেন।
.
হোটেলে অনেক মানুষের সমাগম। বিশেষ করে কপোত-কপোতীদের ভিড় বেশি। আমি কোণার একটা টেবিলে বসে আছি। পাত্রী সাহেবা এখনও আসেনি। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। রিকশায় করে তাড়াহুড়ো করে একটা বোরকা পরিহিতা মেয়ে নামছে। আমি বাঁকা হাসি দিলাম।
হোটেলের সিট নাম্বার হয়তো ওর কাছেও আছে। আমার মনে হয় না ও ভুল করবে। জানালা থেকে মুখ সরিয়ে মোবাইলের একেক করে নাম্বারগুলো দেখছি। সারিবদ্ধভাবে নাম্বারগুলো, রিয়ার পর মিষ্টি, মিষ্টির পর মিম, মিমের পর রোজিনা। হঠাৎ একজন মেয়ে এসে বললো, ‘আপনি রিফাত চৌধুরী?’
বোরকা পরিহিতা মেয়েটার কথা শুনে ভাবলাম এটাই তাহলে সেই মেয়ে, যাকে কিছুক্ষণ আগে বাইরে রিকশা থেকে নামতে দেখলাম। মেয়েটা খানিক ভিজে গেছে। মুখ ঢাকা বলে আপাতত কিছু দেখতে পেলাম না। ওকে না দেখেই ওর কণ্ঠ আমার কানে বারবার বাজতে লাগলো, ‘আপনি কি রিফাত চৌধুরী?’
দ্বিতীয় প্রশ্ন করাতে থতমত খেয়ে বললাম, ‘জ্বী।’
‘বসতে পারি? মানে যার জন্য এখানে এসে বসে আছেন সেই আমি।’
‘আসলে নামটাও শোনা হয়নি আব্বুর কাছে।’
‘আমার নাম সামিয়া বিনতে সা’দ। সবাই সামিয়া বলেই ডাকে।’
সামিয়ার কণ্ঠ যেমন মিষ্টি তার চাইতেও সে হয়তো বেশি সুন্দরী। কিন্তু যেভাবে বোরকা পরে আছে তাতে দেখার কোনো উপায় নেই। আমি চুপ করে বসে আছি। কিছুক্ষণের মধ্যে ওয়েটার আসাতে কিছু খাবারের মেনু অর্ডার করলাম। চারদিকে ভালো করে তাকিয়ে সামিয়া ওর মুখ থেকে কাপড়টা সরালো। আমি প্রথমে আড় চোখে তাকিয়ে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। পরেরবার আড় চোখে না তাকিয়ে সামনাসামনি তাকিয়ে রইলাম। ঠোঁটের পাশে ছোট্ট তিলটা মুখের সৌন্দর্যকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি চোখ ফেরাতে পারছি না দেখে সামিয়া কয়েকবার গলা খাঁকড় দিলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, মানুষ এত সুন্দর হয় কীভাবে?
‘আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছে?’ সামিয়া বললো।
‘ইয়ে মানে………!’
আমার কথা শেষ না হতেই ও বলতে শুরু করলো, ‘দেখেন পছন্দ হোক বা না হোক আমি আপনাকে বিয়ে করছি না। প্রত্যেক মেয়েই চায় দ্বীনদার স্বামী পেতে। যে নামায পড়বে, রোযা রাখবে, তার খারাপ কোনো নেশা থাকবে না ইত্যাদি। আমি যখন শুনলাম আপনি এসবে খুবই আসক্ত তখনই বাসায় জানিয়ে দিয়েছি আপনাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তারপরও পরিবারের জোরাজুরিতে আসতে হয়েছে। আপনি অন্য কাউকে খুঁজে নিন আর আমাকে মুক্তি দিন।’
কথাগুলো বলেই মুখের কাপড় লাগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমি ওর হাতটা টেনে ধরে বললাম, ‘যদি খারাপ অভ্যাসগুলো ছেড়ে দেই তাহলে?’
‘তাহলে ভেবে দেখা যায়।’
‘আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। যে কোনো প্রকারেই হোক, আমি আপনাকে পেতে চাই।’
কিছুক্ষণ কথা বলার পর সামিয়া চলে গেল। আমি টেবিলেই বসে আছি। ওকে পৌঁছে দিতে চাইলাম তবে ও হেল্প নিলো না। বারবার ওর মুখের সৌন্দর্য আমার সামনে ভেসে উঠছে। কণ্ঠের কথাগুলো বারবার কানে বাজছে।
.
সামিয়ার সাথে বিয়ের কাজটা খুব ভালোভাবেই সম্পূর্ণ হয়েছিলো। বিয়ের সাত বছরের মাথায় দু’টো কন্যা সন্তানের বাবা-মা হয়েছিলাম। আমার বাবা-মা দেড় বছরের কমবেশিতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন। বাবা-মায়ের অভাবটুকু বুঝে কষ্ট পেতে দেয়নি সামিয়া। সবসময় পাশে থেকে সাহস দিয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া, রমযান মাসে রোযা পালন করা, নেশাদার দ্রব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখা, দান খায়রাতের বিষয়গুলো নিজের সাথে সম্পৃক্ত করে অনেক ভালো আছি।
আগের থেকে খুব বেশি সুখী মনে হয় নিজেকে। সামিয়া সেদিন বিছানায় শুয়ে বলছিলো, ‘আমি আরেকটা বাচ্চা নিতে চাই।’
আমি বলেছিলাম, ‘দু’টো তো আছে সামিয়া।’
‘আমি বিশ্বাস করি এবারে আমাদের ছেলে সন্তান হবে। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের নিরাশ করবেন না, এ বিশ্বাস আমার আছে।’
সামিয়ার কথা ফেলতে পারিনি। তৃতীয় সন্তানের জন্য অপেক্ষা। মায়ের পেটে সে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। সঠিক সময়ে পরীক্ষা করার পর ডাক্তারবাবু ছেলে সন্তানের সংবাদ দিলেন। আমি এতটাই খুশি হয়েছি যে সামিয়াকে কোলোয় তুলে চারপাশে ঘোরাচ্ছিলাম। লজ্জাবতীর মতো লজ্জা পেয়ে ও বারবার মুখ লুকাচ্ছিলো।
সবথেকে বেশি আশ্চর্য হয়েছি এটা ভেবে যে, আল্লাহর প্রতি মানুষের বিশ্বাসটুকু সুফল বয়ে আনে।
অপারেশনের রুমে সামিয়া। আমার পাশেই দু’মেয়ে আয়েশা আর আছিয়া। দু’জনেই আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। রান্না করার সময় দুর্ভাগ্যবশত পা পিছলে পড়ে গিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। বারবার আল্লাহকে ডাকছি যেন সবকিছু আগের মতোই ঠিক হয়ে যায়।
কিন্তু আল্লাহ নাকি তার পছন্দের বান্দাদের নানা ভাবে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন। সেটাই আমার কপালে জুটলো। ফুটফুটে সন্তান জন্ম দিয়ে সামিয়া চলে গেছে অনন্তে। আমাকে করে গেছে একা। আমি একা, বড় একা।
.
‘স্যার, আরেক কাপ চা দিব?’
ওয়েটারের কথায় বর্তমানে ফিরে এসে সম্মতি দিলাম। এখন মোটা ফ্রেমের চশমা পরতে হয়। বয়সে ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে, এখন প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। সামিয়া চলে যাওয়ার পর এক বছর পরে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। ছেলে-মেয়েরা মায়ের অভাবে খুব ভোগে। মিষ্টিও ঠিক সামিয়ার মতো। আমার তিন পৃথিবীকে ছাতার মতো আগলে রেখে বেঁচে আছে। আয়েশার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। আছিয়ার লেখাপড়া এক বছর হলেই শেষ। ছিয়াম এবার অনার্স প্রথম বর্ষে ঢাবিতে ভর্তি হয়েছে।
আজ সামিয়ার বিশতম মৃত্যু্বার্ষিকী! বিয়ের আগে যে টেবিলে ওর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো সেই টেবিলেই বসে আছি। আশেপাশে কপোত-কপোতীদের মাঝে বুড়ো হিসেবে বড্ড বেমানান লাগছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুম বৃষ্টি। সামিয়ার কবরে যাব বলে গাড়ি নিয়ে আসিনি। ছাতাটা খুলে মাথায় দিলাম। বৃষ্টি হচ্ছে, হোক না, তাতে কী!
আমি ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটছি তো হাঁটছি……..!
আমাকে তো যেতে হবে সামিয়ার কবরে, ভালোবাসার টানে।
(সমাপ্ত)

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৩ Comments

  1. Anamika Rimjhim

    বেশ ভাল লাগলো।শুভ কামনা।

    Reply
  2. Sajjad alam

    বাহ! খুব সুন্দর

    Reply
  3. Jannatul Ferdousi

    ভাঙ্গলো→ ভাঙলো

    মাত্রাতিরিক্তভা→ মাত্রাতিরিক্ততা

    বিয়ের সাত বছরের মাথায় দুইটা কন্যা সন্তানে বাবা মা হয়েছিলাম→ হয়েছিলাম আমরা। আমরা না থাকাতে বাক্যটা অসম্পূর্ণ লাগছে।

    গোছালো লেখা। তবে এই গল্পটা আগেও পড়েছি। এডমিনদের নিকট আবেদন থাকলো, বিষয়টি দেখবেন।
    …. তবে যেই লেখুক না কেন, গল্পটা চমৎকার এবং গোছালো।
    ভালো লেগেছিল, আজও লাগলো।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *