খেলুক শিশু, হাসুক শিশু
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০১৮
লেখকঃ

 101 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

আরাফাত শাহীন

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ বড্ড বেশি একমুখী। ভোরসকালে সূর্যের মুখ দেখা যেতে না যেতেই ছেলেমেয়েরা একগাদা বই কাঁধে করে হয়ত স্কুলের দিকে নয়ত কোচিংপানে ছোটে। সারাদিন স্কুলে ক্লাসের পড়া শেষে তারপর ঘরে ফেরা। অনেকের কপালে আবার এই সৌভাগ্যটুকুও জোটে না। কারণ স্কুল ছুটি শেষে অনেক ছেলেমেয়ে ফের প্রাইভেট বা কোচিংপানে ছোটে। কেমন যেন মনে হয় এই দুনিয়াটাই শুধুমাত্র ছোটাছুটির জন্য! বিন্দুমাত্র অবসর কিংবা সামান্য একটু বিনোদন এখানে অপরাধ বলে গণ্য হয়। এখানে খেলাধুলার জন্য একটুখানি সুযোগ পাওয়া তো বহু দূরের ব্যাপার।
অনেকেই হয়ত পড়াশোনার চাপে পিষ্ট হয়ে খেলার মাঠে গিয়ে একটু ছোটাছুটি করার সুযোগও পায় না। আবার অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাধুলাকে পাশ কাটিয়ে চলে। তাদের ধারণা, খেলাধুলা করে হবেটা কী! তারচেয়ে বরং মোবাইলে একটু গেম খেলা কিংবা একটু টেলিভিশন দেখাও ভালো। এভাবে স্মার্টফোন এবং আকাশ সংস্কৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে একপ্রকার প্রতিবন্ধী মানুষে পরিণত করছে। এটা অবশ্য আমাদের মাথায় প্রবেশও করছে না।
আমাদের এই প্রজন্মের শিশুরা বলতে গেলে পুরোপুরি খেলাবিমুখ। মাঠের খেলার চেয়ে তাদের কাছে স্মার্টফোনের খেলা (গেমস) বেশি জনপ্রিয় হবার পেছনে আমাদের অভিবাবকদের দায়ও কিন্তু কম নয়। পিতা-মাতা তাদের সন্তানদেরকে নিজেদের কাছ থেকে দূরে রাখার জন্যই মূলত তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন। এভাবে ধীরে ধীরে যে শিশু স্মার্টফোনের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠে তাদের পক্ষে এটা থেকে দূরে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটা যখন তাদের কাছে নেশায় পরিণত হয় তখন তাদের ফেরাবে এমন সাধ্য কার? এভাবে আমাদের শিশুরা দিনদিন মাঠের খেলাধুলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অথচ শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ সাধনের জন্য খেলাধুলার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আমরা কীভাবে অস্বীকার করবো?
এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে,একটি জাতির সার্বিক উন্নতি, অগ্রগতি এবং প্রগতির জন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলারও কোনো বিকল্প নেই। যারা মনে করেন খেলাধুলা শুধুমাত্র সময়ের অপচয় তারা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে বসে আছেন। আমাদের একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন, খেলাধুলা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষভাবে সাহায্য করে। মানুষের শরীর কাঠামোকে মজবুত করে গড়ে তোলে। আমরা নিশ্চয় আমাদের সন্তানদের অতিশয় দুর্বল হিসেবে দেখতে চাই না! তাহলে শিশুদের খেলার মাঠে পাঠাতে বাঁধা কোথায়? প্রতিদিন বিকেলে একঘন্টা কিংবা তারচে’ সামান্য বেশি সময় খেলাধুলার পেছনে ব্যয় করলে কোনো ক্ষতি হয় না বরং সতেজ শরীর এবং মন নিয়ে পড়ার টেবিলে বসতে পারে। আফসোস! আমাদের দেশের অধিকাংশ পিতামাতা বিষয়টি সম্পর্কে একেবারে বেখবর।
আমরা যখন ছোট ছিলাম, স্কুল থেকে ফিরে এসে বাড়িতে বই রেখে সামান্য কিছু মুখে দিয়েই খেলার মাঠে ছুটে যেতাম। ক্রিকেট, ফুটবল,কাবাডি -প্রায় সমস্ত খেলাই চলতো সমানতালে। কই পরীক্ষার সময় তো কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখিনি! বরং যে সমস্ত ছেলেমেয়ে খেলাবিমুখ ছিল, দিনদিন তাদেরই পিছিয়ে পড়তে দেখেছি। প্রবলভাবে খেলার মাঠের অভাব আমাদের দিনদিন খেলাধুলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। আবার সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে খেলাধুলাকে অন্তর্ভূক্ত না করার ফলেও খেলাধুলা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান একেবারে শূন্যই থেকে যাচ্ছে।
সত্যি কথা বলতে কী, আমরা শিশুকালে যেসব খেলাধুলা করেছি তার বেশিরভাগের নামই এই প্রজন্মের শিশুরা জানে না। সেসব খেলাধুলার একটা বড় অংশই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। হা ডু ডু যে আমাদের দেশের জাতীয় খেলা এটা কে না জানে! ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া শিশুটিও জানে আমাদের জাতীয় খেলা কী। অথচ এই প্রজন্মের শিশুদের যদি খেলাটি সম্পর্কে আরেকটু বেশি প্রশ্ন করা হয় তাহলে তারা জবাব দিতে পারবে না। যে খেলাটিকে তারা কখনও নিজ চোখে দেখেনি তার বর্ণনা তারা কীভাবে দিতে সক্ষম হবে? এটা আমাদের জন্য অবশ্যই লজ্জার বিষয় যে, আমাদের জাতীয় খেলা হা ডু ডু আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ আমাদের দায়িত্ব ছিল এটাকে ভালোমত সংরক্ষণ করা।
ছোটবেলায় দেখেছি, প্রতিটা স্কুল এবং কলেজে প্রতিবছর মহা ধুমধামের সাথে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে। যে স্কুল বা কলেজে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত তার আশপাশের এলাকায় একটা সাজ সাজ রব পড়ে যেত। মানুষ দলে দলে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা দেখতে ছুটে আসতো। স্কুলে ভর্তি হবার সময় অন্যান্য বহু খাতের সাথে ক্রীড়ানুষ্ঠানের ফি বাবদ মোটা অঙ্কের একটা চাঁদা নির্দিষ্ট করা থাকে। প্রতিটি ছেলেমেয়ের কাছ থেকে এই ফি বাধ্যতামূলক আদায় করা হয়। অথচ এখন আমাদের স্কুল-কলেজগুলোতে ঠিকমত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় না। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা
নগুলোতে আয়োজন করা হলেও শহরের বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় না। হবে কীভাবে! স্কুলগুলোতে যে খেলার মাঠই নেই!
অত্যন্ত নির্মম হলেও এটা সত্য যে, ধীরে ধীরে আমাদের দেশে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ উচিত ছিল জনসংখ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ার সাথে সাথে সেই অনুপাতে খেলার মাঠও বৃদ্ধি পাওয়া। কিন্তু তা হয়নি। গ্রামাঞ্চলে কম হলেও এখনও কিছু কিছু খেলার মাঠ রয়েছে যেখানে ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করতে পারে। কিন্তু শহরের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। অপরিকল্পিত নগরায়ন শহরের বুকের এক চিলতে খেলার মাঠকেও গিলে খেয়েছে। ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা করার মত সামান্য একটু জায়গাও অবশিষ্ট নেই। তাহলে কীভাবে আমাদের দেশ থেকে তৈরি হবে একজন পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি কিংবা ব্রায়ান লারার মত গ্রেটদের! শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়েই কি একটি দেশ কখনও এগিয়ে যেতে পারে?
খেলাধুলার উপকারিতা নানাবিধ। খেলাধুলা শিশুদের নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা প্রদান করে। আপনার শিশু আগামী দিনে নেতৃত্ব দিতে পারবে কি-না সেটা আপনি কীভাবে বুঝতে পারবেন? এটা বোঝার একমাত্র উপায় হলো শিশুকে অন্য শিশুদের সাথে মিশতে দেওয়া। আর এটা করতে হলে অবশ্যই আপনার শিশুকে খেলার মাঠে পাঠাতে হবে। খেলাধুলার মধ্যে আত্মনিবেদিত ছেলে অথবা মেয়ে অন্যকোনো বাজে দিয়ে মনোযোগ দেবার সুযোগ কম পায়। ফলে বাবা-মায়ের জন্য এটাও স্বস্তির একটা কারণ বলে বিবেচিত হতে পারে।
আমাদের আগামী প্রজন্ম ব্যাপকভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের ভয়াবহতা দেখে মাঝেমধ্যেই ভয়ে শিঁউরে উঠতে হয়। কোনদিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম? অথচ তরুণদের যদি খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত করা যায় তাহলে মাদকের ভয়াবহতা কিছুটা হলেও কমবে। শুধু মাদক কেন- অশুভ যেকোনো কিছুর মোকাবিলার জন্য খেলাধুলা হয়ে উঠতে পারে আমাদের জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার। আমরা যদি একটু সচেতন হতে পারি তাহলে সহজেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আজকাল খেলাধুলা শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যমই নয়, খেলাধুলার মাধ্যমে বিশ্ব পরিমণ্ডলে নিজেদের দেশকে পরিচিত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তাহলে আমরা কেন খেলাধুলায় ভালো করার মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরবো না?
ভাবতে অবাক লাগে, সারা পৃথিবী যখন সকল প্রকার উন্নতি ও অগ্রগতির সাথে সাথে খেলাধুলায় বিশেষ পারদর্শিতা অর্জনের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে নিজেদের মুখ ক্রমেই উজ্জ্বল করে চলেছে, তখন আমরা ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছি। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে সাথে খেলাধুলায়ও বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। তাহলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই স্কুলে স্কুলে খেলাধুলার জন্য বিশেষভাবে ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু তাই নয়, এই খেলাগুলো যাতে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হয় সেদিকেও বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সুস্থ -সবল জাতি গঠনের জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের নিরস পাঠের চেয়ে আনন্দের মাধ্যমে যদি পাঠদান করা যায় তাতে অসুবিধা কী? পড়াশোনাকে প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য করার জন্য মাঝেমধ্যে একটু সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার আয়োজন করা একান্ত জরুরী।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *