জাফলং এর অপরূপ মায়া
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৬, ২০১৮
লেখকঃ

 188 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

সুমনা হক

সময় টা তখন ২০১৭ সাল,হঠাৎ করে বাসার সবাই সিদ্ধান্ত নিলো এবারের পহেলা বৈশাখে ছুটিতে কোথাও ঘুরতে যাবে।আমার পরিবার বেশ ঘুরাঘুরি পছন্দ করে, আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়েছি এক সাথে দল বেধে কিন্তু তখনো পাহাড় দেখা হয়নি। সবার সিদ্ধান্তে জায়গা ঠিক করা হলো আর সেটা হলো সিলেটের জাফলং।
যেই কথা সে কাজ পহেলা বৈশাখের ঠিক দুইদিন আগে আমরা সিলেটের উদ্দেশ্যে দুপুর ১ টায় রওনা দিলাম।যেহেতু আমি নরসিংদী থাকি তাই ঢাকা হতে আগত এনা বাসে করে সিলেট চলে গেলাম।
কদমতলী বাস স্ট্যান্ডে বাস থামে আর সেখান থেকে আম্বরখান সিএনজি দিয়ে এসে নামতেই আমাদের এক পরিচিত লোক আমাদের জন্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকে।সে আরেকটা সিএনজি করে রাজারগলী নামে একটা জায়গায় তাদের বাসায় নিয়ে যায় আর তখন প্রায় রাত হয়ে এসেছে।
পরেরদিন আম্বরখান থেকে সিএনজি রিজার্ভ করি জাফলং আসা যাওয়ার জন্য ।
সিএনজি তে উঠা মাত্রই সবার মাঝে খুশি খুশি আমেজ বিরাজ করছিল।সিলেটের রাস্তা বেশ সুন্দর, সেখানে কোনো জ্যাম নেই রাস্তায় তাই বেশ দ্রুতগতিতে যাচ্ছিলাম।
আমাদের সিএনজি চালক বেশ ভালো লোক ছিল পুরো রাস্তায় আমাদের গাইডের মতো জায়গা দেখিয়ে দেখিয়ে সে সম্পর্কে যা জানে বলে যাচ্ছে।
তাদের মধ্যে টিলাগরের সিলেট এমসি কলেজ আর জালালাবাদ সেনানিবাস খুব সুন্দর ছিল।
জাফলং যেতে যেতে বেশ কিছু চা বাগান ও দেখতে পাচ্ছিলাম।
তারপর জাফলং যাওয়ার পথে আরেকটা দেখার মতো জায়গা আছে আর সেটা হলো শাহপরান রহঃ এর মাজার শরীফ,আমরা ঠিক করেছিলাম জাফলং থেকে ফিরবার পথে এসব কাছ থেকে দেখে আসবো। সিএনজি তে উঠেছিলাম তখন ২ ঘন্টা হয়ে গিয়েছিল কিন্তু আশ্চর্যজনক কথা হলো কারো একটুখানি বিরক্ত লাগছিল না বরং মুগ্ধ হয়ে এই বাংলাদেশ যে এত সুন্দর তাই উপলব্ধি করছিলাম, এরিমধ্যে চোখে পড়লো সবুজ পাহাড়!
পাহাড় এত্ত কাছ থেকে আমি আগে কখনো দেখিনি। কি সুন্দর মায়াবী হতে পারে না দেখলে বুঝার উপায় নেই।দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখলাম পাহাড় দেখা যাচ্ছেনা! এইতো দেখছিলাম এখানে পাহাড় মুহূর্তের মধ্যে মেঘের আড়াল হয়ে গেল!
মন খারাপ হয়ে গেল আমার আর তখনি আমাদের ড্রাইভার আংকেল বলছিল, “এখনি এমন করছেন! সামনে থেকে যখন দেখবেন তখন না জানি কি করেন।” এই বলে হো হো হো করে হেসে উঠলো।
জাফলং এর যত কাছে যাচ্ছিলাম তত রাস্তা আঁকাবাঁকা হচ্ছিল।রাস্তায় যেতে যেতে বড়,বড় পাথর কিভাবে মেশিনের মাধ্যমে ছোট পাথর করে ফেলছে এটা এই প্রথম জাফলং এ দেখলাম।
জাফলং পৌঁছে যাবার পর একটু রাস্তা হেঁটে নিচে নামতে হয়েছে আর রাস্তাটা ছিল পাথরে পূর্ন এবং বেশ উঁচুনিচু যা একটু কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল অনেকের কাছে।কষ্ট হলেও নিচে নামতেই চোখের সামনে দেখলাম পিয়াইন নদী, যা দেখে অনেকটা বলা যায় কষ্ট চলে যায়।
পিয়াইন নদী অন্যসব নদীর মতো না এই নদীর পানি এত্ত পরিষ্কার যে আমি পায়ের নিচের পাথর আর পায়ের নিচে যে মাছ যাচ্ছে সব দেখছি।
সেখান থেকে একটা নৌকা ভাড়া করি জিরো পয়েন্ট আর ঝর্ণা দেখার জন্য।যদিও জিরো পয়েন্ট নদীর পাড় দিয়ে হেঁটেই যাওয়া যায় আর সেটা আমরা জানতাম না।
নৌকাতে উঠতেই আনন্দন বেড়ে গেলো দ্বিগুণ, পানি এতো স্বচ্ছ হয় আগে দেখিনি।
জিরো পয়েন্টে নৌকা থামতেই চোখে পড়ে ঝুলন্ত বেইলি ব্রিজ!
ব্রিজটা ছবিতে যেমন ঠিক কাছ থেকে তেমনি সুন্দর।
নদীর উপর ব্রিজটা আর তার পাশেই পাহাড়!
পাহাড়ের উপর ঘরবাড়ি গুলো কি সুন্দর দেখতে লাগে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।পাহাড়ের উপর একটা স্কুল আছে আর সেখানকার বাচ্চাগুলো আমাদের ইশারা তে টাটা দিচ্ছিল, এইতো বাচ্চাগুলো কে দেখছি কিন্তু তারা নাকি বাংলাদেশি না ভাবতেই কেমন লাগে।
জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে নদীতে পা ভিজাতে গিয়ে মনে হলো কি অদ্ভুত! একি নদী একি আকাশ তবে আমি দাঁড়িয়ে আছি বাংলাদেশে আর খাসিয়ানগুলো গোসল করছে ইন্ডিয়ার নদীতে।
একটু উপরের দিকে চেয়ে খেয়াল করতেই দেখলাম সীমান্তরক্ষী বাহিনী পাহাড়া দিচ্ছে কারণ বাংলাদেশের কেউ ভারত সীমানা তে পা রাখতে পারবেনা। অনেকেই গোসল করার সময় সাঁতার কাটতে কাটতে ইন্ডিয়ার সীমানাতে প্রবেশ করতে চায় আর তখনি সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের সতর্ক করে দেয়।
আমাদের পরিবারের ছোট সদস্যরা আগে থেকেই চিন্তা করেছিল এখানে এসে গোসল করবে তাই বাসা থেকে কাপড় নিয়ে এসেছিল। আর তারা জাফলং এর নদীতে গোসল করলো বেশ মজা করে কারণ পানি একি ঠাণ্ডা আবার এত্ত স্বচ্ছ!
মহিলাদের গোসল করার পর পোশাক পরিবর্তনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল।
তারপর নৌকাতে উঠে ঝর্ণা দেখার জন্য যাত্রা শুরু করলাম একটু পথ যেতেই চোখে পড়লো অনেক গুলো বাচ্চা একত্র হয়ে ডুব দিয়ে পানি থেকে লাকড়ি উঠাচ্ছে । দৃশ্য টা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল এইটুকু বাচ্চাদের ও কত সংগ্রামী জীবন এখানে।এরিমধ্যে আমাদের নৌকা থেকে নামতে বলা হয়েছে যদিও সেখানে কোনো ঝর্ণা দেখছিলাম না।
অনেকটা বালির পথ পাড়ি দিতে হবে তাই নৌকার চালক আমাদের ছাতা ভাড়া নিতে বলেন। উপায় না পেয়ে দুইটা ছাতা ভাড়া করে হেঁটে যেতে হয়েছে আর যেহেতু গরমের দিনে গিয়েছিলাম পুরো রাস্তায় বেশ কষ্ট হয়েছিল । সূর্যের আলোতে বালি গরম হয়ে গিয়েছিল সেই সাথে আমার নিজেও বেশ খারাপ লাগছিল, তখন মনে হচ্ছিল আসলেই জাফলং শীতের সময় আসা উচিত তাহলে একটু শান্তিতে ঘুরাঘুরি করা যেতো আর শীতের সময় পানিও নাকি বেশ গরম থাকে আর এই ব্যাপার টা বেশ আশ্চর্যজনক!
এই হাঁটার মধ্যেই চোখে পড়লো পাহাড় বেয়ে কিছু গারো মেয়ে তাদের নিজস্ব কাপড় পড়ে নেমে আসছে, পিছনের দিকে একটা বেতের ঝুড়ি ছিল আর সেখানে ছিল অনেক পান,তারা এত্ত উঁচু পাহাড় বেয়ে প্রতিদিন পান সংগ্রহ করতে যায় ভারতের সীমানায় লুকিয়ে লুকিয়ে।
আমাদের দেখে তারা কেমন তাড়াতাড়ি ছুটতে লাগলো।আমরা তাদের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু তারা আগ্রহী হয়নি।
মিনিট চারেকের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম ঝর্ণার কাছে।পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে ঝর্ণা। অনেক উঁচু থেকে পানি পড়ছে আর সে পানিতে দর্শনার্থীরা গোসল করছে আবার কেউবা ছবি তুলছে।ঝর্ণা থেকে প্রবাহিত পানি পড়া দেখে যে কারো ইচ্ছে করবে আরেকটু কাছ থেকে দেখার।আর তাই অনেকে ঝর্ণার অনেক উঁচুতে উঠছে যদিও এত উঁচুতে উঠা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।
ঝর্ণার পানিতে পা ভেজাতে ভেজাতে মনের অজান্তে যে অনুভূতি সৃষ্টি হয় সেটা একমাত্র ভ্রমণবিলাসি মানুষ গুলো আন্দাজ করতে পারবে।
ঝর্ণা দেখে বাড়ি ফিরবার পথে ইন্ডিয়ার পাহাড়ের নিচে থেকে কিছু সাবান, শ্যাম্পু আরো বিভিন্ন জিনিস কিনে নিয়েছিলাম কারণ যারা বিক্রি করছিল তারা বলছিল এসব ইন্ডিয়ান প্রোডাক্ট ।যদিও বাসায় এসে দেখলাম সবি বাংলাদেশের চকবাজারের প্রোডাক্ট!
জাফলং এ গেলে সব কিছু তে সতর্ক থাকতে হবে কারণ সেখান অনেক ধরনের মানুষ থাকে।
ঝর্ণা দেখে সেখান থেকে বাড়ির পথে রওনা দেই আর রাস্তায় শাহপরান রহঃ এর মাজার শরীফ দেখে আসি।তারপর একাবারে সিএনজি নিয়ে সেই পরিচিত লোকের বাসায় চলে যায়। জাফলং এ শুধু সিএনজি দিয়েই বেশি ঘুরাঘুরি করেছি কারণ বেশি মানুষ থাকতে সেখানে কম টাকার মধ্যে সিএনজিই ভালো সার্ভিস দেয়।
তারপরের দিন সকাল সকাল ট্রেনে করে আমরা সবাই বাড়ি ফিরে আসি। জাফলং সত্যিই অপরূপ সুন্দর একটা জায়গা আমার দেখা মতে।

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *