হাজার দুয়ারীতে একদিন
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০১৮
লেখকঃ

 213 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

মাহমুদা মুকিত সেবা

 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে কেউ গিয়েছেন, আর হাজার দুয়ারী না দেখে ফিরেছেন এমনটি কেউ শুনেনি। তাই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব এর স্মৃতি বিজড়িত মুর্শিদাবাদ ভ্রমনের উদ্দেশ্যে গত বছর ডিসেম্বরের শুরুর দিকে রওনা দিয়েছিলাম আমরা।
.
পরিবারের চার সদস্য মিলে পারি জমিয়েছিলাম আমরা। মামা, মামী, আমি আর বাবা। ফারাক্কা থেকে রওনা দিয়েছিলাম ভোর সাড়ে পাচটাই। বহরমপুর পৌছাতে পৌছাতে বেজে গেছিল সকাল ১১ টা। আমরা সেখানে সকালের নাস্তা করে আবার রওনা দিলাম। বহরমপুর থেকে মুর্শিদাবাদের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। আজব এ শহর, গাড়িতে বসেই আমরা বেশ অবাক হয়ে দেখছিলাম এই শহরের আজব মানুষদের কাণ্ডকারখানা। ভাগীরথী নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল ধর্মীয় উপসনালয়। সেখানে লাইন ধরে পুজো করছে নানা বয়সের নানা শ্রেনীর লোক। একেকজনের একেক বুলি, একেকজনের একেক পোষাক। সাধু দরবেশদের জটাধরা চুল হাটু ছুঁইছুঁই।মাঝখানে বসে নানারকম ধর্মীয় কাহিনী ও ভাগ্যগণনারর ফলাফল উপস্থাপন করছেন তারা। তাদেরকে ঘিরে বসে আছে নানা পেশার নানা শ্রেনীর লোক। কি তাদের ধর্মবিশ্বাস কি তাদের সরলতা। একজায়গায় দেখলাম বেশ কিছু নগ্ন সাধুকে পুজো করছেন স্থানীয় লোকেরা। আর একজায়গায় তো বটগাছের সাথে হনুমানকে প্রায় বেধে তাকে পুজো করতে দেখলাম। আমি প্রায় হেসেই দিচ্ছিলাম। মামী ধমকের সুরে বললেন, যার যার ধর্ম বিশ্বাস মজা করতে নেই। আমি মুখ গম্ভীর মত করে আবার বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে মুর্শিদাবাদ শহরে প্রবেশ করলাম।
মুর্শিদাবাদ শহর থেকে গেলাম লালবাগ নামক স্থানে। এই পথটুকুতে আসার সময় চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্থানীয় দর্শনীয় স্থান গুলোও একবার করে দেখে নিয়েছি। যখন আমরা হাজারদুয়ারীর মুল গেটের সামনাসামনি এসে পৌঁছেছি তখন ঘড়িতে ৩ টা ছুঁইছুঁই। বাহির থেকে দুপুরের লাঞ্চ সেরে তবেই ভেতরে ঢুকলাম। লাঞ্চ খুব সাধারন ছিল, ভাত,ডাল আলুভাজা, ডিমের তরকারী আর সবজি। সেই সাধারন খাবারই খালি পেটে অসাধারন বলে মনে হলো। ইন্ডিয়ানরা সম্ভবত তাদের সবজি রান্নাতে বিশেষ কোন মশলা ব্যাবহার করে থাকেন বলে স্বাদ আলাদা হয়। ওদের মাছ মাংস আমাদের মত এত স্বাদের না হলেও, আলুভাজা সবজি এসবে ওদের জুড়ি নেই।
.
যাইহোক মুল ফটক এর সামনে এসে দাঁড়িয়েছি সূর্য তখন মাথার উপরে। ঠান্ডা কেটে গিয়েছিল প্রায়। সামনে তাকিয়ে হাজার দুয়ারীর বিলাশ প্রাসাদ দেখতে পেলাম। দেখে যেনো মনে হল যদি ভেতরে না ও যেতে পারি, এইযে ৮০ ফুটের প্রাসাদ বাইরে থেকে পুরোটা দেখতে পাচ্ছি এতেই ভ্রমন স্বার্থক। আমরা মুল ফটকের পাশে একটি ছোট্ট গেট দিয়ে প্রবেশ করলাম। তারপর টিকিট কেটে সুদৃশ্য বাগানের মধ্যে দিয়ে হেটে প্রাসাদের কাছে পৌছালাম।
.
হাজার দুয়ারীর ঠিক উল্টোপাশে রয়েছে ইমামবাড়া। মহরমের ১০ দিনের জন্যই শুধু এই ভবনটির দরজা সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এখন বন্ধ। যেতে পারব না বলে একটু মনটা ঝিমিয়ে আসলেও পরক্ষনে তা আবার আগের মতই উচ্ছাসিত হয়ে উঠল, যখন আমরা হাজার দুয়ারীর ভেতরে প্রবেশ করলাম। লাল গালিচা পেতে রাখা হয়েছে সর্বত্র। ৩৭ ধাপ সিড়ি অতিক্রম করে তবেই নিচতালা। ৮০ ফুটের বিল্ডিং কিন্ত মাত্র তিনতালা। প্রধানফটকের ভেতর এ প্রবেশ করেই দেখতে পেলাম অসাধারন একটি কক্ষ, যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে মুর্শিদাবাদ এর ইতিহাস। মুর্শিদাবাদের নবাবদের ইতিহাস। আর হাজার দুয়ারীর ইতিহাস।
.
অনেকে মনে করেন মুর্শিদাবাদ যেহেতু বাংলার রাজধানী ছিল। তাহলে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মহল ছিল এই হাজার দুয়ারী। কিন্ত আসলে তা নয়। নবাব সিরাজের পতনের অনেককাল পরে এই হাজার দুয়ারী নির্মিত হয়। হাজারদুয়ারী পুরো ইউরোপীয় কায়দায়,ইউরোপীয় কারিগর দ্বারা, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ১৮ লক্ষ টাকা ব্যায়ে নির্মান করেন মীর জাফরের বংশধর নবাব হুমায়ন জা। তারপর থেকে সকল ইংরেজ শাসনাধীন নবাবেরা এতে তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করতো। যদিও এটি নবাব সিরাজের আমলের নয়, তবুও পরে সরকার যখন এটিকে যাদুঘর হিসেবে পুনরায় নির্মান করেন, তখন থেকেই এখানে নবাব সিরাজ সহ বাংলার সকল নবাবের স্মৃতিবজরিত সকল সামগ্রী ও তথ্য এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি নবাবকে রানী ভিক্টোরিয়া যে ঝাড়বাতি উপহার দিয়েছিলেন তাও পুরো একটি ঘর জুরে সংরক্ষিত আছে।
.
মুলত এই হাজার দুয়ারীর নাম হাজার দুয়ারী কারন এই প্রাসাদে রয়েছে এক হাজারটি দরজা। অবশ্য তার মধ্যে আসল দরজার সংখ্যা একশো টি। বাকি নয়শোটিই নকল দরজা। আসল দরজা আর নকল দরজার মধ্যে পার্থক্য করা দুষ্কর। আকৃতিগতভাবে বা দর্শনগত ভাবে একই রকম শুধু পার্থক্য এই যে নকল দরজাগুলো খোলা যায়না। বিশাল বিশাল থাম ও ছাদের সিলিং দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়।ছোট ছোট বেলকোনীগুলোর দৈর্ঘ্যই যেনো আমাদের দেশের উন্নতমানের প্রাইমারী স্কুলগুলোর বারান্দার সমান।
নিচ তালায় রাজনৈতিক জিনিসের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এখানে কাঠের বা পাথরের ভাস্কর্য দ্বারা পুরো বিচারসভা বা পুরো আইনসভা তুলে ধরা আছে। প্রতিটা ভাস্কর্য এত জীবন্ত যেনো মনে হয় এখনই নড়ে উঠবে। নবাবদের তলোয়ার। তাদের যুদ্ধের ঢাল হাতিয়ার ইত্যাদি সব সংরক্ষিত আছে। ১৬১ ঝাড় যুক্ত ঝাড়বাতিটি দেখে অবাক হয়ে আমি দুই মিনিট তাকিয়ে ছিলাম। সত্যিই বড় অদ্ভুত।
.
কি মনে হয়েছিল একতালার পরে আমরা চলে দিয়েছিলাম তিনতালা তে। সেখানে দেখলাম নবাবদের শয়নকক্ষতে, পালঙ্ক,আলমারি, বালিশ,চাদর পর্যন্ত সংরক্ষিত। যদিও সেদিকে প্রবেশ নিষেধ। নবাব বেগমদের বৈঠকখানা, বিভিন্ন শৈখিন সোফা, বসার স্থান, ডায়নিং টেবিল ইত্যাদি। একপাশে নিচের দিকে দেখলাম লাইব্রেরী। লাইব্রেরীতে প্রায় ১০,৭৯২ টি বই। সোনা দিয়ে মোড়ানো কোরআন শরীফ। ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়।
.
দোতালা টা তুলনামূলক ভাবে আকর্ষনীয় ও মনোমুগ্ধকর। দেওয়ালচিত্র, সকল নবাবদের ও বেগমদের পোট্রেইট আমাকে মুগ্ধ করেছল সেদিন। আমি প্রতিটি পোট্রেইট এর অসাধারন অঙ্কনশৈলী মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। বাবা ও মামাকে দেখলাম এদিকে অতো মনোযোগ নেই। তারা নবাবদের ব্যাবহৃত জিনিসপত্র গুলিতে মনোযোগ দিয়েছেন। আমিও সেদিকে গেলাম। চাইনিজ পোর্সেলিন প্লেটগুলো অভিনবত্বে ভরা। নবাবরা খেতেন এসব প্লেটে। পান করতেন পোর্সেলিনের গ্লাসে। খাবারে বিষ থাকলে এসব প্লেট বা গ্লাস ভেঙে যেতো। কি তাদের আবিষ্কার। বাবা আর মামা তখন ও মন দিয়ে ওগুলোই দেখে যাচ্ছেন।
মামীকে আবার দেখলাম এসবে নজর নেই। তিনি দেখছেন মন্ত্রনা কক্ষের লুকোচুরি আয়না। আমি আয়না দেখে অবাক হয়ে গেছিলাম। এক আমি প্রায় একশোটি। আবার যেদিকে আমি দেখছি সেদিকে যেয়ে দেখি আয়না নেই। অন্যঘরে যাবার রাস্তা। সে রাস্তা দিয়ে চলে গেলে আবার ঘুরে যেখানে ছিলাম সেখানেই চলে আসছি। প্রায় দশ মিনিট চেষ্টা করেও আয়নার রহস্য বুঝতে পারিনি। পরে আর চেষ্টাও করিনি। পর্যাপ্ত সময় হাতে ছিল না। বেলা পড়ে যাবার আগে আগেই বের হতে হতো আমাদের। পরে আকর্ষনীয় নাচমহল দেখে বেরোবার পথ খুজতে লাগলাম। তখন আবিষ্কার করলাম যে লাইব্রেরীটা তিনতালা থেকে নিচের দিকে দেখেছিলাম সেটি আসলে দোতালায় ও তিনতালা মিলে তৈরী।
সব শেষে আমরা আবার সেই লাল গালিচার উপর হেটে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলাম। বেশ কিছু পারিবারিক ফটো তুলে আমরা হাজার দুয়ারী প্রাঙ্গন ত্যাগ করলাম। হাজার দুয়ারীর বিশাল বাগান পার করে আমরা মুল ফটক থেকে বের হয়ে বাহিরের রাস্তায় এসে পৌছালাম।
.
বাহিরে এসে বাবা বেশ কিছু বই কিনলেন মুর্শিদাবাদ ও নবাবদের জীবনীর উপরে।মামা কয়েকটা চটি আকারের হাজারদুয়ারী গাইড বই কিনলেন বাড়ির অন্যান্য বাচ্চাদের জন্য। আমি হাজারদুয়ারী ও নবাব সিরাজ লেখা কাঠের কিছু কলম কিনলাম প্রতি পিচ দশ টাকা করে। দেখতে বেশ হলেও দেশে এসে সেগুলি দিয়ে একদিন ও লিখিনি অর্থাৎ লেখার যোগ্য ছিল না। মামী কিছু খেলনা ও ওখানকার বিশেষ শুকনা খাবার কিনলেন। তারপর আমরা ভাগীরথী নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখলাম। আমি অনুভব করলাম পৃথিবীতে রাজা বাদশা নবাবদের যতই সৃষ্টি থাকুক না কেনো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির কাছে সবই নগন্য। আমরা আবার গাড়িতে উঠে ফারাক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
.
গাড়ি যখন বহরমপুর ছেরে চলে এসেছে তখন শীতে আমার শরীর হিম হয়ে এলো। তবুও আমি জানালা লাগালাম না। বাহিরের শান্ত পরিবেশ আর আকাশে মস্ত থালার মত চাঁদ এর আলো উপভোগ করতে থাকলাম। গাড়ি ছুটছিল। নাম না জানা এক নদীর উপর দিয়ে। নদীর পানিতে চাঁদ এর আলো পড়ে রুপালি উজ্জ্বলতার সৃষ্টি করেছিল।।মামী আমার সাথে নদীর পানি দেখছিলেন আর গুনগুন করে মিস্টি সুরে গাচ্ছিলেন ,’এই জোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে…’ আমি আরেকবার অনুভব করলাম সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির চেয়ে সুন্দর কিছু নেই। অদ্ভুত এই অনুভূতি অদ্ভুত এই অভিজ্ঞতা।
– মাহমুদা মুকিত সেবা

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

২ Comments

  1. shahrulislamsayem@gmail.com

    বাহ, বেশ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে বর্ণনা, সেই সাথে বেশ কিছু ঐতিহাসিক জিনিসও জানা গেলো, তবে বেশ কিছু বানান ভুল লক্ষ করেছি, যেমনঃ পারি – পাড়ি, পাচটাই – পাঁচটায়, পোষাক – পোশাক, মুল – মূল

    Reply
  2. Rifat

    খুবই সুন্দর একটা ভ্রমণ কাহিনী পড়লাম।
    বর্ণনাভঙ্গী, লেখার ধরন, বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন সবই খুব চমৎকার হয়েছে।
    একরাশ মুগ্ধতা রেখে যাচ্ছি।
    কিছু বানানভুল ও টাইপিং মিস্টেক আছে।
    শুভ কামন।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *