গল্পের পেছনের যে গল্প আমাদের জানা নেই
প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০১৮
লেখকঃ

 69 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি না। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি বটে তবে আমাদের সেই গৌরবোজ্জল ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে পারিনি। যুদ্ধ পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলাদেশে কাজ করা ডাঃ ডেভিস বলেন, ‘আমরা একটা ঐতিহাসিক ভুলের মধ্যে আছি।’
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ধর্ষণের পরিমাণ আমাদের নথিপত্র কিংবা লোকমুখে শোনা থেকেও অনেক বেশি ছিল। দুই লাখ কিংবা পাঁচ লাখ নয়, ধর্ষিতার পরিমাণ ছিলো আরো বেশি। ডাঃ ডেভিসের মতে, ‘সঠিক সংখ্যাটি আমাদের অজানা।’
আমরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ লিখি। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধেরই বড় অবদান আমাদের মা-বোনের ইজ্জত হরণের কথা বেমালুম ভুলে যাই। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া যুদ্ধশিশুর কথা ভুলে যাই। তারা কিন্তু আমাদের থেকে অনেক বেশিকিছু ডিজার্ভ করে। ঠিক এ জায়গাতেই আমরা ব্যর্থ। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে কিন্তু ক্যামেরার পেছনে থাকা লাখ লাখ ধর্ষিতা স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও গুমড়ে কেঁদে ওঠে।
যুদ্ধের সময়ে সাধারণ সিভিলিয়ানদের হত্যা করার প্রথা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। তবে ধর্ষণের এই লজ্জাজনক বিষয়টা ধারণা করা হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকেই শুরু হয়েছে। আসলে আমরা এই পীড়াদায়ক ইতিহাসের ঠিক কতটুকু জানি? নাকি আদৌ জানি না?
মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, পাকিস্থানী সেনাদের যুদ্ধকৌশল, ধর্ষণের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তারা প্রথমে ভারি অস্ত্রধারী সেনাদের পাঠাতো। তাদের পেছন পেছন থাকতো পদাতিক বাহিনী। ভারি অস্ত্রধারীরা হাসপাতাল, স্কুল এসব জায়গায় আক্রমণ করে বিশৃংখলা তৈরী করতো। অন্যদিকে পদাতিক বাহিনী বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে নারীদেরকে অস্ত্রের মুখে ধর্ষণে বাধ্য করতো। যাদেরকে পছন্দ হতো, বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুণীদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হত অন্যান্য সেনাদের সম্ভোগের জন্য। এমনকি এই পৈশাচিক বর্বরতা থেকে ১২ বছরের শিশুরাও রেহাই পায়নি।
মুক্তিযোদ্ধাদের দখল করা বাঙ্কার থেকে শত শত মেয়েদেরকে উদ্ধার করা হতো। এদের মধ্যে কয়েকজন বারবার বারবার ধর্ষিত হয়েছে। মেয়েদের উলঙ্গ করে গাছের সাথে বেঁধে গণধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। নির্যাতনের ফলে ধোপে টিকতে না পেরে অনেক মেয়ে মারা যেত। কেউ কেউ আত্মহত্যা করার চেষ্টাও করতো। অনেক প্রতক্ষ্যদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মেয়েরা একে অন্যের গলা টিপে মেরে ফেলত যাতে তাদের আর এই অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না হয়। নিজের গলা নিজে টিপে আত্মহত্যা করার ঘটনাও শোনা গেছে। ঠিক কতটুকু দুঃখ আর নির্যাতনের স্বীকার হয়ে নিজের গলা টিপে নিজে আত্মহত্যা করতে পারে তা হয়তো আমরা কোনদিনই বুঝতে পারবো না।
যুদ্ধের সময়ে পাকিস্থানী ক্যাম্পে হাজার হাজার নারীরা গর্ভপাত করেছে। বিদেশী একটি প্রতিবেদনের ভিডিওতে দেখানো হয়, কিভাবে বাঙালী মেয়েরা ক্যাম্পের মধ্যেই সন্তান জন্ম দিচ্ছে। গর্ভবতী অবস্থায়ও পাক সেনাদের শরীরের ক্ষুধা মেটাতে হতো তাদের। নির্যাতনের শিকার কত হাজার হাজার নারীর কঙ্কাল ব্রীজের নিচে পরে আছে। কতগুলো নারী নির্যাতন শেষে গণকবরে সমাহিত হয়েছে, তার খবর কি আমরা রাখতে পেরেছি? পারিনি বলেই আমাদের ইতিহাস এখনো পরিপূর্ণ নয়।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নারীদের এই আত্মত্যাগকে বীরের মর্যাদা দিয়ে তাদের বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করেছেন। কিন্তু তারপরের খবর কি আমাদের জানা আছে? সমাজে তাদের অবস্থান কোথায় ছিলো? কমলাপুর রেলস্টেশনের বস্তিতে আজ রাতে কোন বীরাঙ্গনা ঘুমাতে পারেনি, সেটা কি এই প্রজন্ম জানতে পারবে কখনো?
ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী নারীরা মানসিক সমস্যায় ভুগে রাস্তায় রাস্তায় পরে থাকতো। তাদের দিকে ফিরে তাকানোর মতো কেউ ছিলো না। গভীর রাতে রাস্তার কুকুরের সাথে পাশাপাশি শুয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া বীরাঙ্গনার মাটিচাপা দেওয়া লাশের সম্মান আমরা দিতে পারিনি। যে যুদ্ধশিশু ড্রেনের ময়লা পানিতে অক্সিজেনের অভাবে মরে রাস্তার কুকুরের খাদ্যে পরিণত হয়েছে সেই যুদ্ধশিশুর আত্মা কি কখনো আমাদের ক্ষমা করবে?
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পে আটক থাকা মেয়েরা নিজ স্বামীর হাতে খুন হয়েছে এমন নজিরও কম নয়। কেউ কেউ নিজের আধা পাকিস্তানী সন্তানের গলা টিপে মেরে ফেলেছে। যুদ্ধের সময়ে ক্যাম্পে নির্যাতনের শিকার অনেক মেয়েরা বাড়ি ফিরে যেতে চাইতো না। মারাত্মক ডিপ্রেশন, ফ্রাস্টেসনে ভুগে পাকি সেনাবাহিনীর পা ধরে কান্নাকাটি করতো, যেন তাদেরকে সাথে করে পাকিস্থান নিয়ে যাওয়া হয়।
বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ বিনা ডি কস্তা বীরাঙ্গনাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় দেখেছেন, পুরনো সেই দিনগুলোর কথা মনে করে মায়েরা কেমন হাউমাউ করে কেঁদেছে।
আর যুদ্ধশিশুরা কার পরিচয় নিয়ে বড় হলো? নাগরিক নিবন্ধনের ফরমে যখন কাঁপা হাতে নিজের বাবার নাম মন মতো লিখতে হয়, তখন ছেলেটি/মেয়েটির মনের অবস্থা কেমন হয়? পিতৃপরিচয়হীন কিছু শিশুদের ধনীরা দত্তক নিয়েছিল বটে। তবে বাকিদের জীবনটা কিভাবে কেটেছে তা আমাদের জানা নেই।
বাদল শিকদার নামে একজন লোক মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্থানের নৃশংসতা সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন,
” একবার ওমরাহ করে মক্কা থেকে জেদ্দায় ফিরছিলাম। এক পাকি আমার কাছে মাফ চাইলো। বললাম, কেন? সে বলেছিল, একাত্তরে সে অনেক অন্যায় করেছে, ২০ বছরের বেশি সময় সে রাতে ঘুমায় না।
আমি বলেছি, আমাদের অনেক মাও গত ৪০ বছর ধরে রাতে ঘুমাতে পারেন না।”
রাজনৈতিক ডামাডোল কিংবা সময়ের কঠিন বাস্তবতায় বীরাঙ্গনা এবং যুদ্ধশিশুরা হয়তো হারিয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের এই আত্মত্যাগ তো আর চাইলেই হারিয়ে ফেলা যায় না। লক্ষ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত কোন পেন্সিলে আঁকা চিত্র নয় যে ইচ্ছে করলেই মুছে ফেলা যাবে।
বর্তমান সুশীল সমাজ হয়তো এই আত্মত্যাগকে অশ্লীল মনে করে পরবর্তী প্রজন্মকে জানাতে চাইছে না। কিন্তু আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই সত্যগুলো জানা আমাদের প্রয়োজন। শুধু ইতিহাসকে রক্ষা করার জন্যই নয় যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করার জন্যও।
লেখাঃ তাহসিন আহমেদ

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৪ Comments

  1. Tasnim Rime

    ‘৭১ এর যুদ্ধ কেবল ‘৭১ এ শেষ হয় নি। যুদ্ধের রেশ রয়ে গেছে অাজও। যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে ঝাপসা কাঁচের মতো। বিকৃত ইতিহাস জেনে বড় হওয়া শিশু তাই অাজ দেশের মানুষের কাছে অমানুষ ক্ষেতাব নিয়ে বড় হয়। স্বাধীনতা নামক প্রহসনে হারিয়ে গেছে অামাদের নির্মল বিশুদ্ধ ইতিহাসের অনেকাংশ।

    শুভ কামনা রইলো।
    খুব খুব সুন্দর একটা লেখা।

    Reply
  2. তাহসিন আহমেদ

    ধন্যবাদ তাসনিম রিমি ম্যাডাম।

    Reply
  3. আফরোজা আক্তার ইতি

    আল্লাহ। লেখাটি পড়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। চোখে পানি চলে এলো। কি ভয়াবহ। আসলেই আমাদের যা দেখানো হচ্ছে আমরা তাই দেখছি। কিন্তু অনেক কিছুই রয়ে গেছে আমাদের জ্ঞানের অন্তরালে। কতো সুন্দর করে আপনি লেখাটি তুলে ধরেছেন। এটি শুধু প্রশংসার দাবীদারই নয় বরং আশা করছি লেখাটি যেনো তার প্রাপ্য স্থান পায়।
    গৌরবজ্জল- গৌরবোজ্জ্বল।
    বারবার বারবার- শব্দটি দুইবার লিখেছেন।
    আন্তরিক শুভ কামনা রইল।

    Reply
  4. তাহসিন আহমেদ

    ধন্যবাদ আফরোজা আক্তার ইতি আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য। আসলে এই ইতিহাসগুলো অনেকেই জানেন না।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *