দুর্নীতি একটি ব্যাধির নাম
প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০১৮
লেখকঃ

 187 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ
লেখাঃ রাজিব
.
শিরোনামটা দেখে অনেকে ভ্রু কুঁচকাবেন, অনেকে বিরোধিতা করবেন, আবার অনেকেই আমাকে বিনামূল্যে উপদেশ ও পরামর্শ দিবেন। কিন্তু যে যা-ই বলুন না কেন, সত্য সব সময়ই সত্য। একে হাজারো মিথ্যা দিয়ে আড়াল করে রাখা যায় না; একদিন না একদিন ঠিকই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত রহস্য। আর তাই আমি সত্য প্রকাশ করতে নির্ভীক ও অকুতোভয়। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় দুর্নীতি। আমি এই দুর্নীতির একজন ভুক্তভোগীমাত্র। আমার মত এদেশের হাজারো কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, নারী-পুরুষ প্রতিনিয়তই নিদারুণ দুর্নীতির স্বীকার হচ্ছেন। প্রতিটা ডাক্তারের কর্তব্য হচ্ছে রোগীকে বাঁচানো, এটা তার নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব। কিন্তু লক্ষ করে দেখবেন প্রতিটা ডাক্তারই চায় মানুষ রোগাক্রান্ত হোক, যাতে করে তার উপার্জনটা বেড়ে যায়। বর্তমান ক্ষুণে ধরা সমাজে এমন ডাক্তারের মত দুর্নীতিবান মানুষের অভাব নেই।
আমি সাম্প্রতিক একটা বিষয় সম্পর্কে আপনাদের সামনে আলোকপাত করতে চাই। ২০১৮ইং সালের বাংলাদেশ পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ অনুযায়ী জেলাভিত্তিক নিয়োগ কার্যক্রম এবছরের ১৬ই জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। যদিও নিয়োগ সংক্রান্ত এ বিজ্ঞপ্তিটি বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে গত বছরের ২১শে ডিসেম্বরে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু দেখা গেল যে অনিবার্য কারণবশত নিয়োগটি স্থগিত করে দেওয়া হয়। স্থগিত হওয়ার বিষয়টা তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলেও পরে বিষয়টাকে আর ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায়নি। থলের বিড়াল প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে। নিয়োগ নিয়ে অবাধ বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টারস কনস্টেবল নিয়োগটি স্থগিত ঘোষণা করে। এবার আসুন অবাধ বাণিজ্যের ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনা করি। ব্যবসা অনেক প্রকার হয়। সব ব্যবসায় মূলধনের প্রয়োজন হয় আবার কিছু কিছু ব্যবসায় মূলধনের পাশাপাশি ক্ষমতার দাপটেরও দরকার হয়। তেমনই একটা ব্যবসা এটা। সরেজমিনে দেখা গেছে, নেতৃস্থানীয় ঊর্ধ্বত্মন কর্মকর্তারা ছাড়াও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও এই ব্যবসার সাথে জড়িত। তারা প্রার্থীর কাছ থেকে চাকরি দেবার বিনিময়ে ৮-১২ লক্ষ টাকা নিচ্ছেন। অনেক জায়গায় অর্ধেক টাকা চাকরির আগে, বাকি টাকা চাকরিতে জয়েন করার পরে দেবার চুক্তিতে তারা কাজ করে থাকে। বর্তমানে আবার আরেক ধরনের কোটাপদ্ধতি চালু হয়েছে। সবাই কোটা সম্পর্কে নিশ্চয় অবগত রয়েছেন। কিন্তু আমি যে কোটার কথা আপনাদের বলছি সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা হলো রাজকন্যা কোটা। একটু খোলাসা করে বলি বিষয়টা। মেয়ে বিয়ে করার শর্তে চাকরি নিশ্চিত করা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে প্রার্থীর কাজ হলো কর্মকর্তা বা চাকরিদাতার মেয়েকে বিয়ে করার শর্তে চাকরি নেওয়া। বর্তমানে এটার ছড়াছড়ি ব্যাপকারে। বিশেষ করে পদ্মার এপাড়ে ফরিদপুর অঞ্চলে এটা খুব বেশি, অনেকটা প্রথার মত হয়ে দাড়িয়েছে এটা। চাকরির এই অবাধ বাণিজ্য বা দুর্নীতি শুধুমাত্র পুলিশ প্রশাসনেই নয়, বাংলাদেশের প্রতিটা ডিপার্টমেন্টে এটা একই ধারায় বজায় রেখে চলছে।
জানুয়ারির স্থগিত নিয়োগের পুনরায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সে নিয়োগ অনুযায়ী জেলা ভিত্তিক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয় ২২শে ফেব্রুয়ারি থেকে। নিয়োগ স্থগিত হওয়ার পর পুনরায় নিয়োগটি দিলেও অবাধ বাণিজ্য কিন্তু মোটেও কমেনি, বরং বেড়েছে বৈকি। আমি নিজে একজন প্রার্থী ছিলাম। আমি আমার প্রত্যক্ষ ঘটনাটাই আপনাদের বলবো। শারীরিক মাপে প্রাথমিকভাবে ১২৫৮ জনকে (মুক্তিযোদ্ধা, পোষ্য, প্রতিবন্ধী, আনসার ও সাধারণ কোটাসহ) বাছাই করে লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। আমি যে জেলার প্রার্থী ছিলাম সেখানে এদের মধ্য থেকে মাত্র ৮১ জন নারী-পুরুষ (সকল কোটা থেকে) নেওয়া হবে। লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে ১২৫৮ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য মাত্র ১২৪ জনকে রাখা হলো। তার মাঝে সাধারণ কোটায় আমার অবস্থান ছিল ১১তম। আমাদের ১২৪ জনের ভাইবা নেওয়া হলো। ভাইবা নেওয়ার প্রক্রিয়াটা ছিল একসঙ্গে ৬ জনকে ডাকা এবং একসঙ্গে বের করে দেওয়া। আমার যখন ভাইবার ডাক পড়ে তখন আমার সঙ্গেও ৫ জন প্রার্থী প্রবেশ করে। ভাইবা বোর্ডের প্রধান ছিলেন জেলার এস.পি (পুলিশ সুপার) নিজে। তিনি আমাদের শুধু নাম আর রোল নাম্বার জিজ্ঞেস করে বের করে দিলেন। ভাইবার আগামাথা আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। পরদিন বিকাল চারটার সময় চুড়ান্ত ফলাফল দেবার কথা। রাত ১১টার সময় আমার এলাকার চেয়ারম্যান সাহেব ফোন করে আমার বাবাকে বললেন এস.পি অফিস থেকে ফোন এসেছিল তথ্য জানার জন্য, আমি যতদুর জানি এবং বুঝি ততটুকু বলে দিয়েছি। আশা করা যাচ্ছে আপনার ছেলের চাকরিটা হয়ে যাবে। পরদিন বেলা ১১:৩০ এ পুলিশের ডিএসবি (Detective Special Branch) থেকে দুজন কর্মকর্তা আমার ভেরিফিকেশনে এলেন। আমার বাবা ছিলেন অন্ধ। সবকিছু যাচাই করে যাবার আগে আমাকে আমার বাবার হাতে হাত ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “বাবা তোমার চাকরিটা হয়ে গেছে। চাকরি হয়ে গেছে বলে তুমি তোমার অন্ধ বাবাকে ফেলে দিও না। তাদের সেবাযত্ন করো, আর সবাইকে দেখে রেখো। চারটার সময় মাঠে গিয়ে খুশির সংবাদটা নিয়ে এসো।”
আমার পুলিশে চাকরি হয়েছে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে গেল সংবাদটা। এমনিতেই সবাই আমাকে ভালবাসতো, আদর করতো এবং অধিকাংশ লোকেই আমাকে মেধাবী মনে করতো। চাকরি হয়েছে শুনে সবাই খুশি হলো।
আমি চুড়ান্ত রেজাল্ট আনতে মাঠে গেলাম। চারটাই রেজাল্ট দেবার কথা, রেজাল্ট দিল সাড়ে পাঁচটাই। ফলাফল শুনেই আমার মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়লো। চুড়ান্ত নির্বাচিত তালিকায় তো আমি নেই-ই, এমনকি অপেক্ষমাণ তালিকায়ও আমার নাম নেই। তবে আমি কিন্তু কাঁদিনি, কেন জানেন? আমি কাঁদলে আমার অন্ধবাবাকে আমি বাঁচাতে পারতাম না, আমার মাকে আমি বোঝাতে পারতাম না। সবচেয়ে বেশি অবাক লেগেছে ফলাফল ঘোষণা শুনে। এস.পি প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ করলেন, তারপরে পোষ্য কোটা পূরণ করলেন, একে একে সব কোটা পূরণ করার পরে বাকি থাকলো সাধারণ কোটা। এস.পি তখন যাদের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বা পোষ্য কোটায় চাকরি হয়নি তাদেরকে সাধারণ কোটায় ডেকে নির্বাচিত করলেন। যদি প্রশ্ন করেন এটা কিভাবে বুঝলাম? কারণ, এস.পি সাধারণ কোটার কথা বলে যাদের নাম ডেকেছিলেন তাদের নামের পরে তিনি তাদের কোটাও উল্লেখ করেছিলেন। ধরুন রহিম একজন প্রার্থী এবং মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তার চাকরি হয়নি, তাকে তিনি সাধারণ কোটায় এরকমভাবে ডেকে নিলেন, মোঃ রহিম (মুক্তিযোদ্ধা কোটা)। আচ্ছা দুর্নীতি হয় সেটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু প্রকাশ্যে যেটা ঘটলো সেটাকে কি আমি অবিশ্বাস করতে পারি? এটা কি দুর্নীতি নয়! সবাই বলে, জেলার এই এস.পি সৎ, কোন ঘুষ খায় না, তিনবার হজ্ব করেছেন। আমি বুঝি না তিনি কেমন সৎ? কারণ, আমার চোখের সামনেই যখন এতগুলো সাধারণ কোটার মানুষের ভাগ্য নিয়ে যিনি প্রতারণা করলেন, তিনি আর যাই হোন না কেন কখনো সৎ হতে পারেন না। এমনিতেই তো ৫৬% কোটা এবং ৪৪% সাধারণ কোটা, যেখানে মেধাভিত্তিক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে, সেখানে তিনি প্রকাশ্যে অসততা করেছেন। শুধু তাই নয়, যে ছেলেটা রিটেনে পাশ করতে পারেনি সে ছেলেটাও ১২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে চাকরিতে ঢুকেছে এবং সেটা আমার প্রত্যক্ষ করা।
আমার চাকরি হয়নি তাতে আমার কোন দুঃখ ছিল না। কিন্তু আমার অন্ধ বাবার আহাজারিতে আকাশ-পাতাল ভারী হয়ে উঠেছিল। রেজাল্টের পরে আমি এস.পির সাথে অনেকটা রাগে, অনেকটা কষ্টে-ক্ষোভে কথা বলতে গেলে এস.পির বডিগার্ড আমাকে কথা বলতে দেয়নি। বলেছিল, আজকে কোনভাবেই স্যার কারো সঙ্গে কথা বলবেন না। এ নিয়ে তার আর আমার মাঝে কথা কাটাকাটি হয়। অসহায় মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন সে ক্রোধে বিষ্ফোরিত হয়ে ওঠে। সেদিন আমার অবস্থাটা সেরকম ছিল। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। রাগে-দুঃখে বাড়িতে চলে এসেছিলাম।
আমার অন্ধবাবা কোনভাবেই তার মনকে বোঝাতে পারছিল না যে, তার ছেলের চাকরি হয়নি। তাই পরদিন তিনি একা গেলেন এস.পির সঙ্গে কথা বলতে। যখন তিনি তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলেন তখন এস.পি জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে মুরুব্বি? আমার বাবা বিস্তারিত খুলে বললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন কেন আমার চাকরি হয়নি। এস.পি তখন পুরো ১২৫৮ জন প্রার্থীর রেজাল্ট শীট বের করলেন এবং খুজে আমার রেজাল্ট দেখলেন। এস.পি তখন নিজেই হতবাক। কেননা, মেধাতালিকায় আমার অবস্থান ছিল ৬২তম, লোক নেওয়ার কথা ছিল ৮১জন, সাধারণ কোটায় আমার অবস্থান ১১তম, কিন্তু তবুও আমার চাকরি হয়নি। এস.পি শুধু বললো, ভেরিফিকেশনে উল্টাপাল্টা তথ্য দেবার জন্য নাকি আমার চাকরি হয়নি। ইতিহাসে লর্ড এ্যাকটনের (Lord Acton) একটি বিখ্যাত প্রবচন আছে, “All power corrupts and absolute power corrupts absolute.” অর্থাৎ ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত বা দুর্নীতিপরায়ণ করে, সীমাহীন ক্ষমতা নিদারুণ দুর্নীতির দ্বার খুলে দেয়।
সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি তখনই, যখন পত্রিকার হেডলাইনে দেখতে পেলাম- মাত্র ১০০ টাকায় চাকরি দিলেন…জেলার এস.পি। হাসি পেল তখন, যেখানে কি না একজন প্রার্থীরও টাকা ছাড়া বিনামূল্যে চাকরি হয়নি।
শুধু প্রশাসনেই নয়, হাসপাতালে পর্যন্ত দুর্নীতির ছড়াছড়ি। আমার ছোট বোন ঢাকা শিশু হসপিটালের রোগী। তাকে যখন হসপিটালে ভর্তি করতে যাই, তখন অগ্রিম ৩৬৫০ টাকা কাউন্টারে জমা দিয়ে ভর্তি হতে হয়। জানতে চান টাকাটা কিজন্য জমা দিতে হয়েছে?
৩৬০০ টাকা হচ্ছে ৬ দিনের বেড ভাড়া এবং ৫০ টাকা হচ্ছে ভর্তি ফি। এই হসপিটালে সর্বনিম্ন বেড ভাড়া হচ্ছে ৬০০ টাকা, ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে প্রতি ২৪ ঘন্টায় ৩০০০ টাকা পর্যন্ত বেড ভাড়া রয়েছে এই হসপিটালে। শুধু তাই নয়, ৫০০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০০০ টাকা পর্যন্ত আপনি এই হসপিটালে স্পেশাল কেবিন ভাড়া করতে পারবেন। এসব কেবিনে আপনি টিভি, ফ্রিজ, সোফাসেট, এসি, পার্সোনাল বাথরুম-টয়লেট সবকিছুই পাবেন।
ডাক্তারকে যখন রিকোয়েস্ট করে বলি, স্যার আমরা গরীব মানুষ। আমাদের অন্তত একটা ফ্রি বেডের ব্যবস্থা করে দেন। জবাবে ডাক্তার বলে, রোগ-ব্যাধি ধনী-গরীব দেখে হয় না, টাকা দিলে বেড পাবেন, নাহলে চলে যাবেন। বারবার ফ্রি বেডের কথা বলে জ্বালাতন করবেন না। অথচ পেয়িং বেডের পাশেই তখন একটা ওয়ার্ড জুড়ে ফ্রি বেড রয়েছে।
খোজ নিলে জানা যায়, হসপিটালের এসব আয়ের খুব বড় একটা অংশ উচ্চস্থানের নেতাকর্মীদের পকেটে যায়। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যাচ্ছেতাই ভাবে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, কেউ কিছু বললেও তারা সেটা আমলে নেন না।
এই হসপিটালে যদি কোন রোগীর অভিভাবক নেতাদের বা অন্য কারো ক্ষমতা দেখিয়ে রোগীর চিকিৎসা করার চেষ্টা করেন, তাহলে ডাক্তাররা সে রোগীকে দেখেনই না বলতে গেলে। অর্থাৎ সেই রোগীর প্রতি আরো বেশি অবহেলা প্রকাশ করা হয়। নিরুপায় এখানে বিবেক।
আমি একজন সাধারণ থিয়েটারকর্মী। মঞ্চে অভিনয়ের পাশাপাশি মঞ্চব্যবস্থাপকের দায়িত্বও পালন করছি। “মুজিব মানে মুক্তি” নাটকের শো শেষে আমার টিমের দুজন মেয়ে গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়ে। খুবই জরুরীভিত্তিতে তাদেরকে গোপালগঞ্জ সদর হসপিটালে ভর্তি করা হয়। ইমার্জেন্সিতে দু’টা ট্রলি নেই বিধায় একজনকে আমি কোলে করে হসপিটালের দো’তলায় মহিলা ওয়ার্ডে নিয়ে যাই। নার্সকে জরুরীভাবে বেডের কথা বললে উত্তর দেয় ফ্লোরে শুইয়ে রাখেন। এমনিতেই রোগীর অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল, প্রচুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, দ্রুতই অক্সিজেন ধরানো প্রয়োজন, সেখানে সে নির্বিকার চিত্তে রোগীকে শুইয়ে রাখতে বলে। আমার কোলে রোগীর এমন অবস্থা দেখে এক বড় ভাই এগিয়ে এসে তার মাকে বেড থেকে নামিয়ে দিয়ে আমার কোলের মেয়েটিকে বেড দিলেন। তারপর আমি নার্সকে অক্সিজেন ধরাতে বললে তারা বলে অক্সিজেন মাস্ক খুজে আনেন, তাহলে ধরিয়ে দেবো। ভাবুন তো! যেটা নার্সদের কাজ সেটা আমাকে করতে বলে। পুরো ওয়ার্ড খুজে অক্সিজেন মাস্ক এনে রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হল। অক্সিজেন ধরানোর পরে কিছু ওষুধ দিলে রোগী কিছুটা শান্ত হয়। কিন্তু ঘন্টাখানেক পরে আবার যখন রোগীর অবস্থা আগের মত হয়, তখন ডাক্তারকে ডাকলে, ডাক্তার এসে রোগীর গায়ে হাত না দিয়েই সরাসরি খুলনায় রেফার করে দেয়। সামান্যতম রোগীকে সেবা করার চেষ্টাও করলো না। কিছু বলতে গেলে ডাক্তাররা উল্টাপাল্টা ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, ৫ টাকার টিকেট কেটে রোগীরা যখন বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখান, তখন ডাক্তাররা কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলে নির্দিষ্ট একটা ডায়াগনস্টিক থেকে পরীক্ষা করাতে বলেন। যারা সেখান থেকে পরীক্ষা করেন না, ডাক্তাররা তাদের রিপোর্ট দেখেন না। এখানেও তারা ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে।
নাট্যপ্রশিক্ষক হাবিব তাড়াশী বলেছিলেন, আমাদের যার যা আছে, আমরা তাই খারাপ কাজে ব্যবহার করছি। একজনের হাত নেই, সে তার সেই হাতটাকে ব্যবহার করে ভিক্ষা করছে, বলছে বাজান দুইটা টাকা দেন। যার ক্ষমতা আছে সেও অনুরুপ ক্ষমতার অপব্যবহার করছে।”
আমরা পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের দুর্নীতি বা অসদুপায় খুব বেশি লক্ষ করি এবং এর দায়ে অনেক ছাত্রছাত্রীকে বহিষ্কার করে তার জীবন থেকে মূল্যবান কিছু সময়কে নষ্ট করে দেওয়া হয়। অথচ অন্তরালে খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন, নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন সবার অলক্ষ্যে-অগোচরে পৌছে যাচ্ছে ছাত্রদের হাতে। তারা অতি উচ্চমূল্য দিয়ে প্রশ্নগুলো সংগ্রহ করছেন। এর পাশাপাশি সীট বিক্রিও কম চলছে না। অথচ তাদের কিছুই হয় না, সাধারণ ছাত্রজনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে-“ডিম পাড়ে হাসে, খায় বাঘডাশে।”
এরপরেও বর্তমান যুগে যারা বলে আমি সৎ, আমি দুর্নীতি করি না, তাদেরকে আমি বলবো তাহলে আপনারা মানুষ না, মহামানব। কেননা, বর্তমানে যারা ক্ষমতায় বা উচ্চপদে আছেন, তারা চাকরি করেন অথচ দুর্নীতি করেন না; স্বচক্ষে দেখলেও বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগে। যারা আমার মত ভুক্তভোগী তারা বুঝতে পারবেন। তবে হ্যা, হাতের পাঁচ আঙ্গুল কখনো সমান নয়, ভাল মানুষ যে একেবারেই নেই; সেটা আমি বলবো না। তবে সে সমস্ত ভাল মানুষগুলো পরিস্থিতির চাপে অসহায় হয়ে যান। যদি কখনো কোন কিছুর পিছনে ছুটাছুটি করেন তখন চোখ মেলে তাকালে সবকিছু প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। বুঝতে পারবেন, “দুর্নীতি শিরায় শিরায় বহমান।”

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

২ Comments

  1. Tasnim Rime

    প্রবন্ধের থেকে ব্যক্তিগত অাক্রশ মূলক স্মৃতিকথা বেশি মনে হলো। জানি না কেন এটা মনে হয়েছে। হয়তো এটাই প্রবন্ধ।
    ক্ষুণে- ঘুণে
    স্বীকার- শিকার
    ঊর্ধ্বত্মন- উর্ধ্বতন
    যতদুর – যতদূর
    খোজ- খোঁজ
    বানানগুলো এমন হবে।
    শুভ কামনা

    Reply
  2. Rajib Molla

    Tasnim_Rime
    জানি না আপনি এখানে আক্রোশের কি খুঁজে পেলেন! আমি শুধু বাস্তবতার আলোকে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছি। আক্রোশটা হয়তো এজন্যই ছিল যে, আমি ভুক্তভোগী হয়েও কোন প্রতিকার করতে পারছি না এসবের।
    প্রথম বানানটা টাইপিং মিসটেক। বাকিগুলো সংশোধণ করে নেবার চেষ্টা করবো। ভুল ধরিয়ে সংশোধন করার সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে…

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *