দ্বীনের দিশা
প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০১৮
লেখকঃ

 74 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখিকাঃ আফরোজা আক্তার ইতি

ভার্সিটিতে প্রথমদিন ক্লাসে আসার পর থেকেই লক্ষ্য করছি কেউ আমার সাথে গায়ে পড়ে কথা বলছে না, অনেকে তো এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি চিড়িয়াখানার কোন জন্তু, ভুল করে এখানে এসে পড়েছি। কাউকে দশ কথা জিজ্ঞেস করলে দু’কথার জবাব দিয়েই কেটে পড়ে। আজ আমি নতুন এসেছি বলে তাদের সাথে মানিয়ে চলতে পারছি না, নাকি সমস্যাটা অন্যখানে সেটা বুঝতে পারছি না। ক্লাস শেষে বুকলিস্ট নিয়ে বাসায় ফিরছি, এমনসময় পিছন থেকে কে যেন শিষ দিল। নিশ্চয়ই কোন ফালতু ছেলে হবে। আজ প্রথমদিন বলে আর কোন ঝামেলায় জড়াতে ইচ্ছা করল না। ব্যাপারটা এড়িয়ে দ্রুত পা চালাতে লাগলাম। ঠিক তখনই আমাকে উদ্দেশ্য করে একটা মেয়ের কন্ঠ শুনে থমকে গেলাম। “এই বোরকাওয়ালী, তোমাকে ডাক দিলাম শুনতে পাও না?” চমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, যে আমাকে শিষ দিয়ে ডেকেছিল, সে কোন ফালতু ছেলে নয়, বরং একটা মেয়ে! তবে প্রথম দেখায় যে কেউ তাকে ছেলে ভেবেই ভুল করে বসতে পারে। পড়নে শার্ট-প্যান্ট, চুল ছেলেদের মত ছোট করে কাঁটা, চোখের সানগ্লাস খুলে শার্টের কলারে গুঁজে রেখেছে, আর পায়ের উপর আরেক পা তুলে একটা উঁচু ঢিবিতে বসে আছে। তার এই ব্যবহার আর বৈশিষ্ট্য যেন তার চেহারার সামান্য কোমলতাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। সে একা নয়, তাকে ঘিরে আরো ৫ ৬ জনের একটা লেডি গ্যাং বসে আছে, তার মধ্যে আবার ২ ৩ জন ছেলেও আছে, তারাও তাদের লিডারের থেকে কোন অংশে কম নয়। আমাকে ওভাবে ক্যাবলার মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের গ্যাং লিডার আবার আমাকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি হল? ডাক দিসিলাম কানে শুনো নাই?” ওর শিষ দেওয়াটাকে যে কিভাবে ডাক বোঝায় ব্যাপারটা আমার মাথায় এল না। মেয়েটার কথা-বার্তায়, চালচলনে, এমনকি কন্ঠেও বিন্দুমাত্র মেয়েলী ভাব নেই। গলার স্বর নিচু করে বললাম, “আমি আপনাকে দেখি নি।” মেয়েটা হি হি করে হাসতে হাসতে পাশের একটা মেয়েকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, “শুনছিস, আমাকে নাকি দেখেই নাই। ভদ্র মেয়ে তো মাথা নিচু করে হাঁটে।” কথাটা শুনে তার আশেপাশে মেয়ে গুলোও খিকখিক করে হেসে উঠে। ব্যাপারটায় তারা ভীষণ মজা পেয়েছে। তাদের গ্যাং লিডার আবার হাত পা নেড়ে বলতে লাগলো, “শোন এই যে তুমি আমাকে দেখো নাই, এটা তুমি একটা অনেক বড় অপরাধ করছো। আজকে তুমি নতুন আসছো বলে ছেড়ে দিলাম আর র্যাগ ট্যাগ দিলাম না। আমাকে চিনা রাখো ভালোমত। আমি প্রিয়া, পুরা ভার্সিটি আমাকে একনামে চিনে। বুজঝো না? যাও বোরকাওয়ালী ভদ্র মেয়ে এবার বাসায় যাও।” আমি মাথা নিচু করে চলে আসতে নিলেই সে আবার ডাক দিল। “এই শুনো, কই যাও? বড় আপুকে সালাম দিলা না?” তার এসব অযথা কথা শোনার পর মেজাজ ১০৪ডিগ্রিতে খিঁচড়ে আছে। আজ ভার্সিটিতে প্রথমদিন, কোন তামাশা না করাই ভালো। “আসসালামু আলাইকুম” বলেই আমি কেটে পড়লাম।
বাসায় ফিরে গোসল সেরে মায়ের সাথে খেতে বসলাম। এমনিতেই মেজাজ আগে থেকেই বিগড়ে আছে, তার উপর ক্ষুদায় যেন পেটের ভিতর নাড়িভুঁড়িতে জিলাপির আড়াই প্যাঁচ লেগে আছে। মা আমার প্লেটে রুই মাছের মাথা তুলে দিয়ে বললেন, “কিরে ফাতিমা? এমন মুখ ভার করে খাচ্ছিস কেন? আজ প্রথমদিন গেলি ভার্সিটিতে কেমন লাগলো কিছু তো বললিও না? কিছু হয়েছে নাকি?” “না, মা। কিছুই হয় নি। কিন্তু সবাই কেন যেন আমাকে এড়িয়ে চলে। বুঝলাম না কিছু।” মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “আরেহ, এসব কিছুই না। চিন্তা করিস না মা। প্রথম দিন তো, এমন হবেই। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ভার্সিটিতে পড়ছি একমাস হয়ে গেল কিছুই ঠিক হয় নি। এই একমাসে মাত্র তিনজন কাছের বান্ধবী হয়েছে। আমার ডিপার্টমেন্টের এক সিনিয়র আপু লাবণীর সাথে বেশ গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। অফ আওয়ারে তারই মুখে বসে শুনছিলাম, এই ভার্সিটির গ্যাং লিডার প্রিয়ার অতীত। লাবণী আপু বলছিল, “আমি যেদিন ভার্সিটিতে প্রথম এসেছিলাম, সেদিনও প্রিয়া ঠিক এভাবেই র্যাগিংয়ের নামে আমাকে হেনস্থা করেছিল। তখনও তার দাপট এ ভার্সিটিতে এতোটা ছিল না, কারণ তখন তারও সিনিয়র ব্যাচ ছিল। এরপর আস্তে আস্তে সে তার প্রভাব ফেলতে থাকে। কোন মেয়ে তার জন্য পর্দা করতে পারে না। সুশীলভাবে চলতে পারে না, ও যেমন আধুনিক আর পাশ্চাত্য পোশাক পড়ে, তেমনি অন্য মেয়েদেরও নানাভাবে উত্যক্ত করে এসব পোশাক পড়তে। যারা খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিল তারাও তার চাপে পড়ে বখে গেছে। এখন তো বলতে গেলে সবাই ওর নাম শুনলেই আতঙ্কে থাকে। ওর সাথে যারা চলেছে সবাই উচ্ছন্নে গেছে। যারা চলে নি বা তার কথামত চলে নি তাদেরকে সে এই ভার্সিটি থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছে। অনেকে নিজের আত্মসম্মানের ভয়ে চলে গেছে। আর যাদেরকে এখানে দেখছো, বলতে পারো এদের মধ্যে শতভাগের পঁচানব্বই ভাগ তার কথামত চলছে বা চলতে বাধ্য হচ্ছে। আর বাকি পাঁচভাগ তার সব যন্ত্রনা সয়েও নিজের মত করে পড়াশোনা করছে। প্রিয়া তো ছেলেদের পর্যন্তও ছাড় দেয় নি। তুমি তো মাত্র ক’দিন হল এখানে এসেছ। আস্তে আস্তে আরো অনেক কিছুই দেখবে।” আমি একটু ভেবে বললাম, “আচ্ছা আপু, প্রিয়া কি প্রথম থেকেই এরকম উচ্ছন্ন ছিল?” “না না, ফাতিমা। আমার সিনিয়রদের কাছে শুনেছি প্রিয়া যখন প্রথম এখানে ভর্তি হয়, তখন সে খুবই ভালো আর ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে ছিল। কিন্তু ধনী বাবা মায়ের আদরের দুলালী। বাবা মা দুইজনেই কাজে ব্যস্ত থাকতো বলে তাকে সময় দিতে পারতো না। ও কি করতো না করতো তার দিকে কোন খেয়ালও রাখতো না। ওর যেই পরিচারিকা ওর খেয়াল রাখতো, সে তখন এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। আর তাই ভার্সিটিতে ওঠার পরপরই ও পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে যায়। একাকীত্ব কাটানোর জন্য ও অনেক বন্ধু-বান্ধবদের সাথে চলাফেরা করে আর এর মধ্যেই কিছু দুষ্ট বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ওর পড়ালেখা গোল্লায় যায়। ড্রাগস নেয়া শুরু করে, মাদকাসক্ত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে পালটে যেতে থাকে ও। আর যার পরিণাম ভুগতে হচ্ছে আমাদেরও।” মুখ গোমড়া করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লাবণী আপু। আশ্চর্য! বিশ্বাসই হচ্ছে না প্রিয়া এতো ভালো মেয়ে ছিল, আর এখন তার নাম শুনলেই সবার আতঙ্কে চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
সেদিন রাত ২টা কি আড়াইটা হবে। সেমিস্টার চলছে আমাদের। তাই রাত জেগে পড়ছিলাম। মা এক গ্লাস দুধ টেবিলে রেখে ঘুমুতে চলে গেছেন অনেকক্ষণ আগে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা ডিপ্রেশনে ভুগছেন, তাই স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমান। এদিকে আমিও পড়তে পড়তে ঘুমে ঢলে পড়ে যাচ্ছি টেবিলের উপর, হঠাৎ চমকে উঠলাম কলিংবেলের শব্দ শুনে। এই গভীর রাতে কে আসলো আমাদের বাসায়? ঘুমের ঘোরে আবার ভুল করে শুনলাম না তো? অপেক্ষা করতেই আরো তিন চারবার একনাগাড়ে কলিংবেলের শব্দ শোনা গেল। যেন দরজার ওপাশের ব্যক্তি খুব ব্যস্ত। মাকে ডাক দিব কিনা বুঝতে পারছি না। মা তো স্লিপিং পিল খেয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। এখন ডাক দিলেও তার ঘুম ভাঙবে না। এদিকে দরজার ওপাশে ঘন ঘন অনবরত কলিংবেল বেজেই চলেছে। কাঁপা কাঁপা পায়ে দরজার লুকিং গ্লাসে চোখ রাখলাম। যা দেখলাম তা একেবারেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। দরজার ওপাশে প্রিয়া দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দাঁড়িয়ে আছে বললে ভুল হবে, রীতিমত পুরোদস্তুর হাঁপাচ্ছে। পুরো শরীর দিয়ে দরদর করে ঘামছে। আমি তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিতেই ও আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ভিতরে ঢুকে দরজা আটকে দিল।
আমি মূর্তির মত থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এ মূহূর্তে কি হচ্ছে বা আমার কি করা উচিৎ কিছুই মাথায় আসছে না। প্রিয়া এতোটাই হাঁপাচ্ছে যে কথা বলা তো দূরের কথা, ঠিকমত শ্বাসও নিতে পারছে না। ওকে আমার রুমে নিয়ে চেয়ারে বসালাম। প্রিয়া অস্ফুট স্বরে বলল, “পানি খাবো।” আমি ওকে এক গ্লাস পানি দিতেই ঢকঢক করে সবটুকু খেয়ে একটু চোখ বন্ধ করে বুক ভরে নিশ্বাস নিল। কিছুক্ষণ জিরিয়ে একটু স্বাভাবিক হওয়ার পর ও চোখ মেলে তাকাল। আমি আর কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে ওকে একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বসলাম, “তুমি এতো রাতে বাইরে কেন? আমার কাছে আসলে যে? তুমি একা কেন? এমন হাঁপাচ্ছ কেন? কি হয়েছে?” আমার ব্যস্ততা দেখে প্রিয়া আমাকে থামিয়ে বলল, “দাঁড়াও, দাঁড়াও। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি দিচ্ছি।” একটু ধাতস্থ হয়ে প্রিয়া এবার বলতে লাগল, “আমাকে তো তুমি চেনোই? আমি যে কতটা বখে যাওয়া মেয়ে সেটা শুধু আমার বাবা মা ছাড়া আর কারো জানতে বাকি নেই। আজ আমার কিছু বন্ধুর সাথে এই প্রথম একটা নাইট পার্টি ক্লাবে যাচ্ছিলাম। অনেকটা জোড় করেই ওরা আমাকে নিয়ে যায়। ওরা বলেছে ওখানে অনেক মজা হবে। কিন্তু ওরা যে আমার সাথে এত নোংরা মজা করতে চাইবে তা আমি কখনো বুঝতে পারি নি। আমি কখনো ভাবি নি, ওরা আমাকে হায়েনার মত খেতে চাইবে, যার জন্য ওরা আগে থেকেই অনেক বড় প্ল্যান করে রেখেছে। আমি খুব কষ্টে নিজের সম্মান নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছি। আমি কাছে ধারে তোমাদের বাসায়ই পেয়েছি, তাই এখানেই এসেছি নিজের সম্মান বাঁচাতে। ওরা আমাকে এখনো বাইরে হন্যে হয়ে লোভী কুকুরের মত খুঁজে বেড়াচ্ছে। তুমি আমাকে বাঁচাও বোন, তুমি আমাকে বাঁচাও।”
প্রিয়া এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে চোখ বন্ধ করে। হয়ত শুয়ে শুয়ে ওর জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার কথাই ভাবছে। আরেকটু হলেই যে নিজের সাথে কতবড় একটা অঘটন ঘটে যেতে পারতো, একটু পরপ্র সেটা ভেবেই শিউরে উঠছে। আর আমিও এতোদিন এটারই অপেক্ষায় ছিলাম। কবে ও নিজেই ওর ভুল বুঝতে পারে, কবে ও নিজেই ওর অপরাধের জন্য গ্লানিবোধ করবে। এখন সেই মূহূর্ত এসেছে। তার চোখেমুখে অনুতাপের ছায়া, একই সাথে সেই চেহারায় একটা সুন্দর নতুন জীবন পাবার আকাঙ্ক্ষা। এখনই ওকে বোঝানোর জন্য উপযুক্ত সময়। আমি চেয়ার টেনে ওর আরেকটু কাছে গিয়ে বসলাম। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “কেমন লাগছে প্রিয়া?” ও চমকে উঠল, ওর কাছে স্নেহের স্পর্শ গুলোও ভীতিকর হয়ে উঠেছে। “আগের থেকে এখন অনেকটা ভালো লাগছে।”
-“প্রিয়া, তুমি কি বুঝতে পারছো আর কিছুক্ষণ দেরি হলে তোমার সাথে কতবড় দূর্ঘটনা ঘটতে পারতো?
-“হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি। আল্লাহ আমাকে অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। আচ্ছা আমি এখন এসব থেকে কিভাবে মুক্তি পাবো বলতো ফাতিমা?” কাতর কন্ঠে বলল প্রিয়া। -“এসব থেকে মুক্তি পাবার একটাই পথ আছে।” প্রিয়া খুব আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো। “দেখো প্রিয়া, আল্লাহ নারীজাতিকে সবচেয়ে সম্মান এবং যত্ন দিয়ে এতো সুন্দর করে গড়েছেন, যার কারণে আমরা সবচেয়ে সুন্দর আর আকর্ষণীয়। আর তাই তুমি যেসব আঁটসাট পোশাক পড়, সেগুলোর জন্য তোমার দেহের প্রতিটি অংগ আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠে, যার জন্য তারা আকৃষ্ট হয় বেশি। আর তাই তোমার অজান্তেই তাদের হায়েনার মত কুদৃষ্টি তোমাকে কুড়ে কুড়ে খায়। এজন্য তারা ওঁত পেতে থাকে তোমাকে কাছে পাবার জন্য। তাই সবার আগে দরকার আমাদের এই দেহকে এমনভাবে আবরণে ঢেকে রাখা, যেন কোন ছেলের কুদৃষ্টি না পড়তে পারে। আমরা নারী জাতি, মায়ের জাতি। আমাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এতো যত্ন আর সম্মান দিয়ে নিঁখুতভাবে তৈরি করেছেন,সেখানে আমরাই যদি সেটার যত্ন না নেই, নিরাপদে হেফাজতে না রাখি, তবে অন্যেরা কি সেটার মূল্য দিবে বলো? সবাই লোভী কুকুরের মত লোলুপ দৃষ্টি দিবে। আর আমাদের এই শরীরটাকে নিরাপদে হেফাজতে রাখার জন্য আল্লাহ তায়ালা অনেক সুন্দর একটা উপায় দিয়েছেন। তুমি যদি বোরকা পড়, তোমার সর্বাঙ্গ ঢাকা থাকবে, তোমার দিকে কেউ কুনজরও দিতে পারবে না।” প্রিয়া মাথা নিচু করে আমার সবগুলো কথা শুনছে আর ক্ষণে ক্ষণে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাচ্ছে। সে আমার প্রতিটি কথার মর্ম উপলব্ধি করতে পারছে। “তেমনি প্রিয়া, তুমি যেমন ড্রাগস নিচ্ছো, বিপথে চলছো, তার জন্য আজকে হয়ে যেতে পারতো অনেক বড় এক দুর্ঘটনা। তোমার এগুলো থেকে সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে আল্লাহর পথে চলা। তুমি যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে, তওবা করবে, রোজা রাখবে ঠিক তখন তোমার মনে একটা সংযম তৈরি হবে, তাকওয়া আসবে। তুমি কোন ড্রাগস বা মাদক নেয়ার আগেই ভাববে তুমি রোজা রেখেছো, কোন অপরাধ করার আগেই ভাববে তুমি নামাজ পড়ছো, কোন গুনাহ করার আগেই ভাববে আর কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন, তুমি তওবা করেছ। তখন কোন অপরাধ করার আগেই তোমার মধ্যে অপরাধ বোধ কাজ করবে। ঠিক যেমনটা তুমি এখন বোধ করছো। তখন আস্তে আস্তে তোমার সব আসক্তি চলে যাবে। তুমি নতুন জীবন পাবে। তুমি আবার ভালোমত পড়াশোনা শুরু কর প্রিয়া। আমি জানি তুমি অনেক ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলে।” প্রিয়া আশার আলো দেখতে পেয়ে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। ওর দু’ চোখ পানিতে ছলছল করছে। আমার হাতদু’টো চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,”বিশ্বাস কর বোন, তোমার মতো এত যত্ন আর স্নেহ দিয়ে কেউ আমাকও বোঝায় নি, আমার বাবা মাও না।” রাতটা প্রিয়া আমাদের বাসায়ই কাটালো। সকালে আমার একটা বোরকা পড়ে ওর বাসার জন্য বের হল। যাওয়ার আগে আমার কাছ থেকে নামাজ শিক্ষা বই আর কতগুলো হাদীসের বই নিয়ে গেছে। আর আমাকে অনুরোধ করে গেছে, কাল রাতের ঘটনা যেন আমি গোপন রাখি, কাউকে না জানাই, এটা ওর সম্মানের ব্যাপার। আমি ওকে কথা দিয়েছি, ও আমার বোন, ওর সম্মান মানেই আমার সম্মান।
আজ ফাইনাল সেমিস্টারের রেজাল্ট দিচ্ছে। প্রধান অতিথি স্টেজে বসে আমাদের লাস্ট সিনিয়ির ব্যাচের টপ ব্রিলিয়ান্টদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দিচ্ছেন। ওনার পাশেই আমাদের শাহানা ম্যাম বসে আছেন উপস্থাপিকা হিসেবে আর মাইকে একে একে তাদের স্টেজে আসার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন। ঠিক এমন সময় টপ ব্রিলিয়ান্টদের তালিকার মধ্যে মাইকে উচ্চারিত হল এমন একটি নাম, যা মূহূর্তেই ক্যাম্পাসভর্তি সব স্টুডেন্টদের মধ্যে চাঞ্চল্য ফেলে দিল। মাইকে শোনা যাচ্ছে, “আমাদের টপ ব্রিলিয়ান্টদের মধ্যে প্রথম হয়েছে সাদিয়া জান্নাত প্রিয়া। তাকে সসম্মানে স্টেজে আসার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। সবাই তাকে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছি। তার হাতে সম্মাননা হিসেবে ক্রেস্ট তুলে দিবেন আমাদের মাননীয় প্রধান অতিথি মতিউর রহমান।” ঠিক এমন সময় স্টেজে উঠে আসতে দেখা গেল, কালো বোরকা পড়া এক মেয়েকে। সে প্রধান অতিথির হাত থেকে ক্রেস্ট নিলে সবাই তাকে অনুরোধ জানাল মাইকে সবার উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য। শাহানা ম্যাম তার হাতে মাইক তুলে দিলেন। সবাই তার কথা শোনার জন্য উৎসুক। মেয়েটি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,”আজ হয়তো আমি এই মঞ্চে থাকতাম না, এই সম্মাননার ক্রেস্ট আমার হাতে থাকতো না। আমার জীবন দ্বীনের আলোয় উজ্জ্বল হত না। হয়তো আমি এখনো সেই গ্যাং লিডার প্রিয়াই থাকতাম, যদি না ফাতিমা আমাকে আশার আলো না দেখাতো। আজ আল্লাহর পথে চলেছি বলে, তার আকীদা দিলে ধারণ করেছি বলে, তার তাকওয়া মনে রেখেছি বলে আমি এতো সুন্দর জীবন যাপন করতে পারছি। দ্বীনের দিশা আমাকে দিয়েছে নিরাপদ জীবন, সন্তুষ্টি আর সফলতা। আজ আমার মতো উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়ে আল্লাহর ইবাদাতে পরিবর্তিত হয়েছি, তেমনি আনাকে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করবে হাজারো প্রিয়া। একমাত্র দ্বীনের দিশায় আছে ইহকাল আর পরকালের অনাবিল শান্তির নিশ্চয়তা।”
নেকাবের মাঝেও যে প্রিয়ার গাল বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু ঝড়ে পড়ছে তা আর আমি ছাড়া কেউ বুঝতে পারলো না। কারণ এ অশ্রু কষ্টের নয়, তার আনন্দের!

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৭ Comments

  1. Maimuna Akter

    সুন্দর❤

    Reply
    • আফরোজা আক্তার ইতি

      ধন্যবাদ আপনাকে আমার গল্পের প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য।????????

      Reply
  2. Anamika Rimjhim

    ৫ ৬ জন – ৫/৬ জন*
    ২ ৩ জন-২/৩ জন*
    কুড়ে কুড়ে -কুঁড়ে কুঁড়ে*
    হাতদু’টো-হাত দু’টো*
    আঁটসাট-আঁটসাঁট*
    কিছু মনে করবেন না আপু আপনার গল্পটি পড়ে মনে হয়েছে যেন যারা বোকরা পড়ে না শুধু তারাই এই বিপদের স্বীকার হয়।অথচ এখন ৪/৫ বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধা কাওকেই ছাড় দেওয়া হয়না। বোরকা পড়ে,শৃঙ্খল মেনে চলে তারাও রেপ হয়। তাই আপনার গল্পের মেইন ফোকাস ওই কয়েকটা লাইন মানতে পারলাম না। হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই নিজের সন্মান বজায় রেখে পোশাক পড়ব কিন্তু তাতে হায়েনাদের চোখের কোন পরিবর্তন হবে না আপু। কারণ তারা মানুষ না।
    বাকিটা ভাল ছিল।অবশ্যই ধর্ম ভালভাবে পালন করা উচিত। শুভ কামনা আপনার জন্য। 🙂

    Reply
    • আফরোজা আক্তার ইতি

      ধন্যবাদ আপু। আমি যাস্ট বলেছি,যে যারা বোরকা পড়ে তারা তুলনামুলক ভাবে নিরাপদ থাকে। আল্লাহ আমাদের পর্দা করার নিয়ম দিয়েছেন এজন্যই যেন আমরা নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারি। সেইসাথে পুরুষরাও তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে। যখন তারা মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হয় তখন তা পূরণ করার জন্য উপযুক্ত কাউকে না পেলে তারা বৃদ্ধা, শিশু, যুবতী এমনকি ছেলেদের পর্যন্তও ছাড় দেয় না। আমি শুধু বোরকার প্রতিই গল্পে ফোকাস করি নি, ইসলামের সমগ্র ব্যাপারে, আল্লাহর ইবাদাতেও ফোকাস করেছি। এখন যদি আপনি গল্পটা একপাক্ষিক হিসেবে দেখেন তাহলে আমার কিছু বলার নেই আপু। আপনাকেও ধন্যবাদ আপনার মতামতের জন্য।

      Reply
  3. Jannatul Ferdousi

    কোন→ কোনো
    (কোনো একদিন) (কোন দিকে যাবে?)

    শার্ট পড়ে→ পরে( পরিধানে র হয়)

    নি শব্দের সাথে বসে( বসোনি)

    ৫ ৬→ ছাপান্ন মনে হচ্ছে। সেজন্য বাংলায় লিখবেন। পাঁচ, ছয়জন। তদ্রুপ ২ ৩ ক্ষেত্রেও।

    ড্রাগস নেয়া শুরু করে….→ এই বাক্যে থেকে শব্দটা মিসিং।

    টা টি এসব শব্দের সাথে বসে

    ….
    থিম কমন হলেও গল্প সাজিয়ে তুলেছেন অনেক ভালো করে। আপনার লেখার হাত ভালো। ভবিষ্যতের জন্য শুভ কামনা।

    Reply
  4. Asma

    অনেক সুন্দর আপি।???????????? আসলে শিক্ষামূলক গল্প ????♥আজকালের উশৃংখল জীবন যাপন দেখতে,শুনতে আর ভালো লাগেনা।????

    Reply
  5. Halima Tus Sadia

    ভালো লিখেছেন।

    অনেক ক্ষেত্রে বাবা মার কারণে সন্তান নষ্ট হয়।প্রিয়া ও তেমনি।বাবা মা খেয়াল করে না সন্তান কখন কি করছে।তাইতো খারাপ পথে চলতে কুন্ঠাবোধ করে না।

    আর প্রিয়ার নষ্ট হওয়ার পিছনে বাবা মা আর কিছু বন্ধু দ্বায়ী।
    তবে ইসলামের আইনকানুন মেনে চললে অবশ্যই খারাপ নজর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।খোলা মেলা,টাইট পোশাক পরলে খারাপ ছেলেদের নজরে পরবেই।
    পর্দা করে চললে এসব নজরে পরে না।

    বানান ভুল আছে

    কন্ঠে-কণ্ঠে
    মূহূর্তে-মুহূর্তে
    হয়ত-হয়তো
    পরপ্র-পর
    আকাঙ্ক্ষা-আকাঙ্খা
    অংগ-অঙ্গ
    আনাকে-আমাকে

    ৫ ৬, ২ ৩ বাংলায় লিখবেন।

    শুভ কামনা রইলো।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *