দারুচিনি দ্বীপের গল্প
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০১৮
লেখকঃ

 234 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

তাসনিম রিমি

বেশ কিছুদিন পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ ছিল। মনে  আশা থাকলেও তাই সমুদ্র বিলাসের এবারের যাত্রায় আমাদের স্বপ্নের দারুচিনি দ্বীপে যাওয়া হবে না ভাবতেই মন খারাপ ভাবটা বেড়ে যায়। কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়েই যাত্রা শেষ করতে হবে এমনটাই ছিল সবার ধারনা। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাবার পথেই সুখবর আসে সেন্টমার্টিনে আবার ট্রিপ চালু হয়েছে। তাই দু’দিন কক্সবাজারে কাটিয়ে এবার সেন্টমার্টিন যাবার পালা। খুব ভোরে হোটেল থেকে চেক আউট করে যে যার ব্যাগ, ট্রলি বগলদাবা করে বের হয়ে পড়লাম। বাস রিজার্ভ করা হয়েছে আমাদের জন্য। সবার মধ্যেই তুমুল উত্তেজনা। এতদিনকার আশা পূর্ণ হবে। যদিও গ্রুপের অনেকেই কক্সবাজারে দু’চার বার এসেছে আগে কিন্তু সেন্টমার্টিন যাত্রা এবারই প্রথম সবার, তাই সবার মাঝেই কম বেশি আনন্দের মাত্রাটা প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রখ্যাত কথা সাহিতিক্য হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্র শুভ্র অবলম্বনে তারই পরিচালনায় দারুচিনি দ্বীপ সিনেমা দেখে নাই এমন একটা প্রাণিও ছিল না আমাদের ভ্রমণ প্যাকেজে। পিচঢালা রাস্তার উপর দিয়ে বাস যখন টেকনাফের উদ্দেশ্যে ছুটে চলছে সুর কিংবা বেসুরা গলায় সবাই গান গাইছে, “যাব যাব যাব.. সাগরের নীল জলে ডিগবাজি খাব..” মনের প্রফুল্লতা আর গানের উথাল পাথাল সুর থেকেই বুঝতে পারলাম আমার মতো অন্যরাও সেন্টমার্টিন নিয়ে কতটা স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। টেকনাফ পৌঁছাতে প্রায় সকাল সাড়ে আটটা বেজে গেল। জেটি থেকে শিপ ছাড়বে আরো ঘন্টা খানেক পরে। এ সময়ের মধ্যে সবাই সকালের নাস্তা করে ফ্রেস হয়ে নিল। আমাদের মতো আরও অনেক দর্শনার্থী একে একে এসে ভিড় জমাচ্ছে। অবশেষে জাহাজে ওঠার সময় এলো জাহাজ না বলে এটাকে ছোটখাট লঞ্চ বলাই শ্রেয়। খরচ বাঁচাতে প্রথম শ্রেণির বদলে সবার জন্য দ্বিতীয় শ্রেণির টিকেটের ব্যবস্থাই করা হলো। হুটোপুটি করে সবাই সিটে এসে বসলাম। শিপ ছাড়ার পর আর কেউ সিটে বসে নাই। চা কিংবা কফির অনটাইম গ্লাস হাতে রেলিং এর পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল অনেকেই। বিশাল জলরাশির বুক চিড়ে ছুটে চলছে শিপ। শত শত গাংচিল ছুটছে তার পিছু পিছু যেন হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার পিছনে ছুটে চলা সেই ইঁদুরের ঝাঁক। ছুটবেই বা না কেন গাংচিলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ওদের দিকে একের পর রুটি আর চিপসের টুকরা ছুড়ে দিচ্ছে যাত্রীরা। খাবারের লোভে গাংচিলের দলও ছুটছে পাশে পাশে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার এসে সিটে বসে পড়লাম। হকারের দলও সুযোগ বুঝে মুড়ি মুড়কি নিয়ে চলে আসছে সবার কাছে। তবে সব থেকে আকর্ষণীয় ছিল পেপার বিক্রেতার কণ্ঠ। সুর করে করে তিনি প্রথম আলো পত্রিকা বিক্রি করেন, ” আলো আলো…ওওও…বেশি আলো প্রথম আলো..” চানাচুরররর…. বলেই তার পিছনে কণ্ঠে কাঁপন জাগিয়ে এক অল্প বয়সি ছেলে চলে এলো। পেপার না কিনলেও চানাচুর কিনতে ভুল করলাম না। খালি মুখে বসে থাকার চেয়ে একটু মুখের ব্যায়াম করে নেয়া যেতেই পারে নেতানো চানাচুর চিবিয়ে। শিপের মাইক্রোফোনে ততোক্ষণে বর্ণনা করে যাচ্ছে চারপাশের বর্ণনা। জানালা দিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলাম অপরূপ সৌন্দর্যের সারি সারি পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে মায়ানমার অন্যপাশে বাংলাদেশের নাফ নদী দিয়ে অামরা গন্তব্যে চলছি। দ্বীপের কাছাকাছি যত যাচ্ছি জলরাশির রং ততো পরিবর্তন হয়ে নীলচে রঙ ধারণ করছে। শিপ এসে ঘাটে পৌঁছালে একসাথে সবাই আবার হাঁটা শুরু করি কিছুদূর হাঁটার পর বুকিং দিয়ে রাখা কটেজে উঠি। কিন্তু এখানে দেখা গেল বিপত্তি কটেজে পর্যাপ্ত সুবিধা নাই একসাথে সবাই থাকতেও পারবো না রুম সল্পতার কারনে। অবশেষে তাদেরই অন্য এক পার্টনারের কটেজে উঠি অামরা। আগেরটার তুলনায় এবারের কটেজটা সুন্দর। চারপাশে ঘুরানো গ্রাম্য বাড়ির মতো ছোট ছোট রুম করা মাঝখানে উঠোন পাশেই কলতলা। ছবির মতোন সুন্দর এক গোছানো বাড়ি। রুমে বাক্স পেটরা রেখে এবার সাগরের নীলজলে সত্যি সত্যি ডিগবাজি খাবার পালা। তবে অনেকেই বেড়িয়ে পড়েছে ক্যামেরা হাতে ফ্রেমবন্দি করতে তাদের সুন্দর মুহূর্তগুলো। অামারা ক’জন গেলাম সাগর অার আকাশের নীলে একাকার হওয়া জলে স্নান সেরে নিতে। অনেকটা দূর পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে দ্বীপ দেখলাম, সাঁতার প্রতিযোগিতায়ও কেউ কারো থেকে কম ছিলাম না। এসবের মাঝেই হঠাৎ একজন আমাদের মাঝ থেকে উধাও হয়ে গেল। জল ছলছল চোখে প্রিয় বন্ধুর খোঁজে নেমে পড়ে গেল যারা সাগর পাড়ে ছিল। একজন ছুটে কটেজের রুমে খুঁজতে চলে এল। এভাবে কাটল প্রায় মিনিট তিরিশে। হঠাৎ অন্যদিক থেকে হেলতে দুলতে দেখি মহারাজা আসতেছেন। একদিকে রাগ আর অন্যদিকে আনন্দ দু’টোর মিশ্র প্রতিক্রিয়াই ওর উপর পরল। পরে অবশ্য ওর কাছে বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার কাহিনী শুনি। বেচারা সাঁতার জানে না তাই আমাদের সাথে সাগর পাড়ি দিয়ে মায়ানমার পৌঁছানোর অলিক স্বপ্নে বিভোর না হয়ে কোরালের সৌন্দর্যরূপ অবলোকন করতে করতে সামনে হাঁটছিল। আর এদিকে আমরা ওরে খুঁজে হয়রান হই। যা হোক বন্ধুত্বের এক অকৃত্রিম ভালোবাসার নজির পাওয়া গেল একটুখানি নিখোঁজ হওয়াতে। দুপুরের খাওয়ার পরে একটু বিশ্রাম করে গোধূলি বেলায় আবার সবাই মিলে বিচে আসি। সাইকেল চালাতে পারদর্শীরা সাইকেল ভাড়া করে চক্কর দিয়ে ঘুরে বেড়ায় দ্বীপের এমাথা থেকে অন্যমাথায়। আমরা যারা সাইকেল চালাতে পারি না তারা সাগরের পাড় ঘেঁষে হেঁটেই দ্বীপের রূপ লাবন্য দেখতে থাকি। জোয়ারের সময় হওয়াতে আস্তে আস্তে পানি বাড়তে থাকে। এদিকে সূর্য অস্ত গিয়েছে অনেক অাগেই। রাতের অন্ধকার চারদিক থেকে একটু একটু করে গ্রাস করে নিচ্ছে পুরো দ্বীপ। যাবার সময় যেসব স্থান শুকনো খটখটে ছিল এখন সেখানে জোয়ারের পানি চলে এসেছে। দ্রুত পা চালিয়ে আমরা ফিরে আসতে থাকি। দ্বীপের এত সৌন্দর্যের মধ্যে কষ্টের ব্যাপার হলো বিদ্যুৎ নাই এখানে। সন্ধ্যার পর জেনারেটর দেয় ঠিকই কিন্ত রাত দশটার মধ্যেই পুরো দ্বীপ অন্ধকারে হারিয়ে যায়। রুমে এসে তাই ফোনের ব্যাটারি ফুল করে নিচ্ছি সবাই কেননা কাল সারাদিন ছবি তুলতে হবে তো। রাতের খাবার সময় বলা হলো বার-বি-কিউ পার্টি করা হবে যদিও সব ব্যবস্থা হোটেলের লোকজনই করে দিয়েছে তাই আমাদের বেশি কষ্ট করতে হয় নাই। পার্টি হবে আর সবাই চুপ করে বসে থাকবো তা তো হবে না। ফান বক্সের আয়োজন করে ফেলল এরমধ্যে একজন। ছোটখাট কৌতুক, গান, মজার মজার ছোট গল্প বলা এসব ছিল ফান বক্সের আওতাধীন। একজন প্রশ্ন করে বসল দ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন কেন কেউ জানে কিনা? আমার উত্তরটা জানা ছিল না যদিও তবে সব গ্রুপেই যে একজন পন্ডিত থাকে আমাদেরও তেমনি এক উইকিপিডিয়া আছে। হরবর করে সে উত্তর দিয়ে দিল। “খ্রিষ্টান সাধু মার্টিন” এর নামানুসারে সেন্ট মার্টিন নামকরন করা হয় সাথে সেন্টমার্টিনের আরো বেশ কিছু তথ্য জানাতে ভুল করে না। সব শেষ হতে প্রায় রাত দুইটা পঁয়তাল্লিশ। একজন বায়না করলো রাতের সমুদ্রটা দেখে আসি, সবার মনের একান্ত বাসনা থাকলেও সারাদিনের জার্ণির ক্লান্তিতে চোখের পাতা লেগে আসছিল প্রায়। তবুও গেলাম সাগর পাড়ে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে ছিল আমাদের ভ্রমণটা, দিনের বেলায় সূর্যের তীর্যক কিরণ সানবার্ণ করলেও মাঝরাতে সাগরের বায়ু হালকা হালকা শীতের ছোঁয়া দিয়ে যায়। শিরশির করে ওঠে শরীরের প্রতিটা লোমকূপ। রাতের সেন্টমার্টিন যে এতটা মাদকতায় পূর্ণ, না আসলে বুঝতেই পারতাম না। মাথার উপরে দ্বাদশীর চাঁদ দেখে মনে হলো সুকান্ত বুঝি এ চাঁদ দেখেই ঝলসানো রুটির কথা বলছিলেন একটু আগেই যা আমরা পোড়া মাংসের সাথে গলধকরণ করলাম। মন চাইলেও রাতের সমুদ্রের বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর কোন আয়োজন আমাদের নাই। রুমে এসে মোমের আলোয় বিছানা ঠিক করে তাই শান্তির ঘুম দিলাম কেননা খুব সকালে উঠে আবার ছেঁড়াদ্বীপে যাবার জন্য তৈরি হতে হবে।
পরদিন সকালে ট্রলারে করে স্থানীয় লোকের ভাষায় ছেঁড়াদিয়া বা সিরাদিয়া যাই। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির উপর দিয়ে ট্রলার চলে। জোয়ারের সময় পরিবেশ-প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে স্বীকৃত এ দ্বীপের অনেকটাই পানির নিচে চলে যায় তাই ইঞ্জিন চালিত নৌকাই হয় পর্যটকদের বাহন। অন্যথায় ভাঁটার সময় অতি উৎসাহীরা পায়ে হেঁটে চলে আসে দ্বীপের সাথে মিতালি করতে। নিঃসঙ্গ এ ছেঁড়াদ্বীপে কোন জনবসতি নাই তবে ছোট্ট একটা দোকান আছে। পানির পিপাসা মেটাতে কেউ কেউ কচি ডাব / নারিকেল খেয়ে নিল। মানবহীন এ দ্বীপে বিশাল জায়গা জুড়ে আছে কেয়াবন, সবুজ বনায়ন বলতে এতটুকুই। দ্বীপের সব জায়গাতেই কম বেশি মাছের গন্ধ বিজারমান। জনমানবশূন্য এ দ্বীপেও বালুচরের অনেকটা জায়গা জুড়ে রোদে শুকিয়ে শুটকি করার জন্য ছড়ানো রয়েছে মাছ। দ্বীপের মানুষদের জীবিকার উৎস এসব শুঁটকি করা মাছ। কিছু সময় কাটানোর পর আমরা আবার ট্রলারে ফিরে আসি। পিছনে পরে থাকে একলা একা এক সবুজ নিঃসঙ্গ দ্বীপ। ছেঁড়াদ্বীপ থেকে ফিরে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে নীড়ে ফেরার পালা আমাদের। যত আনন্দ উদ্দীপনা নিয়ে সিনবাদ নামক শিপে আমাদের দ্বীপে আগমন হয়েছিল তার থেকে অধিক ভারাক্রান্ত মনে প্রস্থান নিতে হয়। যেতে মন চাইলেও চলে আসতে হয় চোখ জুড়ানো নীল জলের দ্বীপকে একটু একটু করে চোখের আড়ালে ফেলে। বিদায় জানাতে এবারও গাংচিলের দল ছুটে আসে শিপের পিছু পিছু। অবাধ স্বাধীনতায় উড়তে উড়তে বিদায় জানায় আমাদের আর আমরা একরাশ সুখস্মৃতি নিয়ে ফিরে আসি নীলজলে সমস্ত ক্লান্তি দিয়ে বিসর্জন।

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৩ Comments

  1. আরিফ আকবর

    বর্ণনা খুব সুন্দর ছিল। সেন্টমার্টিনের আরো কিছু তথ্য যোগ করলে আরও সুন্দর ভাবে ফুটে উঠত। সর্বোপরি, সুন্দর হয়েছে।
    বানান ও দাড়ি, কমা ইত্যাদির দিকে একটু লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন বোধ করছি। যেমন,
    নামকরন-নামকরণ
    জার্ণি-জার্নি
    হরবর না হয়ে সম্ভবত গড়গড় হবে।

    Reply
    • Tasnim Rime

      ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য। সামনে এসব ব্যাপারে খেয়াল রাখব।

      Reply
  2. Tasnim Rime

    ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য। সামনে এসব ব্যাপারে খেয়াল রাখব।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *