ভাইয়ের কাছে চিঠি
প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৭, ২০১৯
লেখকঃ

 289 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখা :রাহিম মিয়া।

প্রিয় ভাই,
কেমন আছিস রে ছোট ? আশা করি ভালোই আছিস। কি চিঠি দেখে অবাক হয়ে গেলি? অবশ্যই অবাক হওয়ারই কথা আর ভাবছিস কেন চিঠি দিয়েছি তাই না? তাহলে পড়তে থাক চিঠিটা। তুই তো ভাই ফোনে কল দিলে কথাই বলিস না, এটা ওটা ব্যস্ততা বলে রেখে দিস। কিন্তু আজ আমার সব অব্যক্ত কথাগুলো চিঠিতে বলতে বাধ্য হচ্ছি। তুই কি জানিস আব্বু মরার আগে আমার হাত ধরে কি বলেছিল? আব্বু বলেছিল তোকে যাতে পড়ালেখা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করি। তখন আমি আব্বুকে বড় ছেলে হিসাবে ওয়াদা দিয়েছিলাম, আমার যত কষ্ট হোক তোকে পড়ালেখা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবো। তোর তো জানবার কথাও না এটা। কারণ তখন তুই অনেক ছোট ছিলি আর পাশেও ছিলি না যখন আব্বু বলেছিল আমাকে। তারপর আব্বু চলে গেল আর পরিবারের ভার পড়লো আমার কাঁধে। তখন দশম শ্রেণীতে পড়ালেখা করতাম। তোকে মানুষ করার জন্য পড়ালেখা ছেড়ে কর্মজীবন ধরেছিলাম তখন। শুধু তোকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম তুই একদিন অনেক বড় হবি পড়ালেখা করে। যার জন্য কঠিন পরিশ্রম করতে লাগলাম। আব্বুর রেখে যাওয়া এক বিঘা জমিতে নিজে গরু আর লাঙল দিয়ে রোদে পুড়ে চাষের উপযোগী করেছি এবং বীজ লাগিয়েছি। তুই যখন রাতে ঘুমিয়ে থাকতি ভাই, আমি তখন মুখে কাপড় বেঁধে রাতে রিকশা চালিয়েছি টাকার জন্য। এই কথাটা শুধু আম্মুই জানতো। কারণ মার কাছে তো আর কোনো কিছু লুকানো যায় না। তিনি যেভাবে হোক বুঝে ফেলেন। তুই যখন দশম শ্রেণীতে জিপিএ 5
পেয়েছিলি, সেইদিন না আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার পরিশ্রম তাহলে বৃথা যাচ্ছে না। যখন যা চেয়েছিস, যত চেয়েছিস দিয়েছি টাকা প্রশ্ন না করে। কারণ আমার বিশ্বাস তুই বাবার স্বপ্ন আর আমার ওয়াদা পূরণ করবি একদিন। তুই একাদশ শ্রেণীতে থাকাকালে আম্মু কি বলেছিল জানিস? আম্মু বলেছিল বিয়ে করে সংসার করতে। তখন আমি বলেছিলাম আগে আব্বুর ওয়াদা রক্ষা করি তারপর বিয়ে করবো। কারণ বউ আসলে ভাই থেকে ভাইকে আর মার থেকে ছেলেকে আলাদা করে দিতে পারে এই যুগের মেয়েরা। কারণ নারীর ভিতরে কী চলে সেটা তো বুঝা মুশকিল রে ভাই। তাই খুব ভয় হয়েছিল বিয়ে করে যদি বউ ভালো না হয়। আমাদের যদি আলাদা করে দেই তখন তো আমি ওয়াদা রক্ষা করতে পারবো না। সুতরাং বিয়ের চিন্তা তখন বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর তুই একাদশ শ্রেণীতেও জিপিএ 5 পেয়ে পাস করলি। সেদিন যে কী খুশি হয়েছিলাম ভাই বলে বুঝাতে পারবো না। মনে হচ্ছিল বাবার স্বপ্ন যেন একটু একটু করে পূরণ হয়ে যাচ্ছে। তারপর তুই স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে লন্ডনে পড়ালেখা করতে আমাকে জানালি। আমিও হ্যাঁ জানিয়ে দিলাম। কারণ আমার বিশ্বাস তুই একদিন বড় কিছু হয়ে আসবি। যার জন্য বাবার এক বিঘা জমি বিক্রি করে দিয়েছিলাম তোকে না বলে। কারণ তুই পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করলে এইরকম অনেক জমি কিনা যেতে পারে।লন্ডনে যাবার আগে এয়ারপোর্টে যখন তোকে বিদায় দিচ্ছিলাম বারবার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছিল আর আমি তা খুব যত্ন করে মুছে নিচ্ছিলাম যাতে তুই না দেখিস এই ভেবে। সেখানে পৌঁছে যখন বলেছিলি ঠিকভাবে পৌঁছেছিস আর ভালো আছিস,তখন চিন্তা সব চলে গিয়েছিল যে ভিসা তাহলে ঠিক আছে। পড়ালেখা চালানোর জন্য অনেক টাকা চেয়েছিস। কিন্তু আমি প্রশ্ন না করে যত চেয়েছিস দিয়ে দিয়েছি। একবারও তো জানতে চাইলি না আমি এত টাকা কীভাবে পেয়েছি। সর্বশেষ যখন তুই দশ লক্ষ টাকা চেয়েছিলি। আমি শোনে যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছি। কারণ এত টাকা আমি কোথায় থেকে দিবো। তারপর তুই যখন বললি বড় একটা ফোনের কোম্পানিতে চাকরির জন্য দশ লক্ষ টাকা ঘুষ লাগবে, তখন যেন একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম। যাক তাহলে চাকরির জন্য টাকা লাগবে। কিন্তু আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না এত পড়ালেখার পরও ঘুষ লাগছে কেন? তোকে আর প্রশ্ন তখন করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি তুই আমাকে ঠকাতে পারিস না। তাই তো না ভেবে বাড়ির কাগজপত্র মহাজনের কাছে রেখে টাকা ধার নিলাম। আর বলেছিলাম সুদ যত আসবে এক বছর পর সব দিয়ে দিবো টাকা সহকারে।ভেবেছিলাম তোর চাকরি হলে টাকা দিয়ে দিতে পারবো। চাকরি যখন পেয়েছিস বলেছিলি আর মাসে এক লক্ষ টাকা বেতন পাবি। আমি শোনে যে কী পুলকিত হয়েছিলাম বলে বুঝাতে পারবো না। সেইদিন গ্রামে যাকে পাচ্ছিলাম তাকেই ধরে মিষ্টি খাওয়াচ্ছিলাম
আর বলেছিলাম আমার ভাই চাকরি পেয়েছে লন্ডনে আর মাসে এক লক্ষ টাকা বেতন। সেই হাসি আর খুশির দিনগুলো আজ শুধু স্মৃতি হয়ে রইল। আস্তে আস্তে তুই যোগাযোগ কমিয়ে দিলি। যখনই কল দিয়েছি তুই বলতি কাজে ব্যস্ত আছিস। তখন বিরক্ত হচ্ছিস ভেবে নিজের থেকেই বলতাম, তাহলে রেখে দে ভাই পরে কথা হবে। কিন্তু তোর এই দূরত্ব আরো বেশি বাড়তে লাগলো।কল দিলে রিসিভ করতি না। তাই ভাবলাম একটু খবর নিই অন্য কাউকে দিয়ে। তখনি মনে পড়ে গেল আমার ছোট বেলার বন্ধুটার কথা যে সেও লন্ডনে থাকে। ওকে কল দিয়ে বললাম তোর খবর নিতে আর ঠিকানা দিয়ে দিলাম যেটা আমাকে দিয়েছিলি। কিন্তু আমার বন্ধুটা যা বললো তা শুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। তুই নাকি সেইখানে বিদেশি কোনো এক মেয়েকে বিয়ে করেছিস আর মেয়ের পরিবার তাদের সাথেই থাকিস। কিন্তু আমাকে বলিসনি কেন ভাই? আমি তো আর না করতাম না ভাই বিয়ে করার জন্য। আম্মু কীভাবে জানে সেইদিন আমার মুখ দেখে বুঝে ফেললো আর বারবার প্রশ্ন করতে লাগলো কী হয়েছে? আমি আর আম্মুর অস্থিরতা দেখতে পারলাম না সব বলে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার বলাতে যে এত বড় ভুল হবে তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। আম্মু এখন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছে রে ভাই। হার্ট অ্যাটাক করেছে আম্মু আর যখনি জ্ঞান ফিরেছে ফাহিম ফাহিম করছে। শুধু বলছে আমি আমার ছোট ছেলে ফাহিমকে দেখবো। তোমরা আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাও। আমি তোর বড় ভাই রাহিম অনুরোধ করছি প্লিজ ভাই তুই দেশে ফিরে আয়। আমার জন্য না হয় আম্মুর জন্য আয় একবার। না হলে আম্মুকে বাঁচাতে পারবো না। আম্মু যে শুধু ফাহিম ফাহিম করে চিৎকার করছে। কল তো রিসিভ করিস না তাই চিঠি দিয়ে বলতে হলো। আমি জীবনে তোর কাছে কিছু চাইনি শুধু দিয়েই গিয়েছি। কিন্তু আজ চাচ্ছি দয়া করে ভাই তুই দেশে ফিরে আয় আর আম্মুকে দেখে যা। হয়তো আম্মু তোকে পেলে সুস্থ হয়ে যেতে পারে।
ইতি
তোর বড় ভাই রাহিম

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

২ Comments

  1. আফরোজা আক্তার ইতি

    দারুণ! মনটা ভরে গেল চিঠিটা পড়ে। একটা ভাই তার অন্যভাইকে কত কষ্ট করে ঘাম ঝরিয়ে বড় করেছে, কন্তু সেই ছোটভাইই জীবন গুছিয়ে নেওয়ার পর ভুলে গেছে বড়ভাইকে, তার নিজের পরিবারকে। অনেক গভীর উপলব্ধি দিয়ে লিখেছেন ভালো লাগলো। কিন্তু একাদশ শ্রেণীতে জিপিএ ৫ না পেয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে হবে।
    শুভ কামনা আপনাকে।

    Reply
  2. হালিমা তুস সাদিয়া

    খুব সুন্দর একটি চিঠি।
    পড়ে খারাপ লাগলো।

    কারণ অনেক পরিবারে আছে বড় ভাই ছোট ভাইদের টাকা পয়সা খরচ করে পড়াশোনা করায়।
    আর সেই ছোট ভাই বিয়ে করে সংসার গুছানো শুরু করে দেয়।
    ভাইয়ের অবদান মনে থাকে না।
    ভুলে যায়।নিজের স্বার্থের পিছনে ছুটে বেড়ায়।

    শুভ কামনা রইলো।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *