ভেরি ইন্টারেস্টিং
প্রকাশিত: মার্চ ১৮, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 174 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

গল্প লেখকঃ
তাহসিন আহমেদ ধ্রুব
………………

মিঁউ মিঁউ মিঁউ…..
আমি ঘুম থেকে উঠে চারপাশে তাকালাম। কোথাও কোন বিড়াল নেই। তাহলে ডাকটা আসলো কোথেকে? আবার ডেকে উঠল মিঁউ মিঁউ মিঁউ…এবার শব্দটা কোনদিক থেকে আসছে সেটা খেয়াল করলাম। শব্দটা আমার বালিশের নিচ থেকে আসছে! তার মানে আমার বালিশের নিচে একটি বিড়াল লুকিয়ে আছে? হোয়াট! এটা কেমনে সম্ভব? বালিশের নিচে বিড়াল কিভাবে লুকাবে! আমি আস্তে আস্তে বালিশের দিকে এগিয়ে গেলাম। অতি সন্তর্পণে বালিশটা উঁচু করতে লাগলাম। নিজের মধ্যে একটা থ্রিলিং ভাব চলে এসেছে। কি না কি বের হয়!

শব্দটা ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে। একটানে পুরো বালিশটা সরিয়ে ফেললাম। বালিশের নিচে আমার মোবাইলটা পরে আছে। গতকাল রাতে যে, বিড়ালের ডাক রিংটোন দিয়ে ঘুমিয়ে পরেছিলাম সেটা আদৌ মনে নেই। বয়স হয়ে গেছে তো তাই অনেক কিছুই মনে রাখতে পারিনা। আস্তে আস্তে আমার দাদার মতো হয়ে যাচ্ছি। বুড়ো বয়সে এসে তিনিও নাকি বদনা না নিয়েই বাথরুমে চলে যেতেন। আমার যদিও বদনা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়না। এখন বাথরুমের সাথেই বদনা পার্মানেন্টলি রেখে দেয়া হয়। বাথরুমের ভেতরে বড় ড্রামে পানি ভরা থাকে। যেকোন সময় বাথরুমে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সেরে চলে আসা যায়। বদনা নিয়ে কোনোরকম ঝামেলা পোহাতে হয়না।

আমি মোবাইলটা হাতে তুলে নিলাম। মোবাইলের স্ক্রীনে কলদাতার নাম লেখা উঠেছে। এডলফ হিটলার কল দিয়েছে। আমি হিটলারের কল রিসিভ করলাম। হিটলারের উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেল,
— দোস্ত কই তুই?
— বাথরুমে
— কি করস?
— বাথরুমে বসে মানুষ কি করে?
— ও আচ্ছা, দোস্ত একটা ঝামেলায় পরে গেছিতো!
— কি ঝামেলা?
— ঝামেলা শুধু আমার একার না। তোরও আমারও, দুইজনেরই।
— কস কি? কি ঝামেলা?
— না মানে এলাকার লোকজন আমাকে আর তোরে খুজঁতেছে। গণধোলাই দিবে এজন্য বাঁশও রেডি করে রাখছে। লোকমানরে দেখলাম মেহেগনির ডাল দিয়ে সুন্দর করে লাঠি বানাইতেছে।
— ও আচ্ছা, অবস্থা তো তাইলে খুব খারাপ। তুই এখন কোথায়?
— আমি আমাদের পানির ট্যাংকির ভিতর গলা ডুবিয়ে বসে আছি।
— কস কী! পানির ট্যাংকির ভিতরে? তুই ওখানেই থাক। পরিস্থিতি শান্ত হোক এরপর বের হইস।
— দোস্ত, আর পারতেছিনা তো। রোদ ওঠা শুরু করছে এজন্য ট্যাংকির পানিও গরম হয়ে যাইতেছে। এভাবে আর বেশীক্ষন বসে থাকলে তো সিদ্ধ হয়ে যাব। এলাকার কয়েকজন লোক ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। বেরও হইতে পারতেছিনা।
— ভাই, তুই একটু কষ্ট কর। আমি তোরে অতি তাড়াতাড়ি বের করার ব্যবস্থা করতেছি।
— ভাই, তাড়াতাড়ি আয়।

আমি ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। ভাবছি, আমাদেরকে হঠাৎ করে গণধোলাই কেন দেওয়া হবে? হিটলার মানে আমার বন্ধু মফিজকেও তো জিজ্ঞেস করা হলোনা।

কয়েকদিন পরপরই যদিও এভাবে গণধোলাই দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এবারের কারণ তো বুঝতে পারলাম না। মনে করার চেষ্টা করলাম গত তিন চারদিনের মধ্যে কোন চুরিকার্য অথবা ভাওতা বাজিতে অংশগ্রহন করেছিলাম কি না? নাহ্ যতটুকু মনে পরছে এমন কিছুই তো করিনি। তাহলে কেন এই গণধোলাই?

মিঁউ…মিঁউ…মিঁউ… আবার ফোনটা বেজে উঠল। আননোন নাম্বার, অবশ্যই গুছিয়ে কথা বলতে হবে আর বুঝে শুনেও। কোনমতেই ফাঁদে পা দেওয়া যাবেনা। একটা কঠিন প্রকৃতির গলা খাঁকারি শোনা গেল এরপর বললো,
— এইডা কি মতিনের নাম্বার?
— জি না, এইটা তার দাদার নাম্বার। সরাসরি কবর থেকে কথা বলছি।
— চুপ কর শালা। কই তুই?
— জনাব, আমি তো আপনাগো ধারে কাছেই আছি। আপনাদের জন্য অপেক্ষা করতেছি।

ওপাশ থেকে কন্ঠটা বললো, “শালায় বাড়িতে আছে, চল সবাই।” এই কথা বলার পরপরই ফোনটা কেটে গেল। ওরা তাহলে আমার বাড়ির দিকেই আসছে। আসলে বাড়িটা আমার না, পরিত্যক্ত বাড়ি। সেখানে ছোট একটা রুমে আমি থাকি আর কি!

আমি আর এক মুহুর্তও দেরী করলাম না। আলনা থেকে শার্টটা বের করে দ্রুত পরে নিলাম। মোবাইলটা শার্টের পকেটে রেখে খাটের নিচ থেকে দড়ির গোছাটা হাতে নিলাম। ২ লিটারের বোতলটা কোমড়ের সাথে বাঁধলাম। হালকা কিছু শুকনা খাবারও টিনের কৌটায় করে নিয়ে নিলাম। তারপর দরজায় তালা মেরে সোজা বাড়ির পিছনে গিয়ে বড় আমড়া গাছটা বেয়ে উঠতে লাগলাম।

আমি এখন আমড়া গাছের ওপরে বসে আছি। এখান থেকে আমার বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। বাড়ির চারপাশে ১০-২০ জন লোক। উঁকিবুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে, ভেতরে আমি আছি কি না। আমি আমার টিনের কৌটা থেকে মুড়ি বের করে চিবাচ্ছি আর নিচের দিকে তাকিয়ে লোকেদের কর্মকান্ড দেখছি। তারা পুরো বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখলো।

হঠাৎ করে আমার ফোনটা মিঁউ মিঁউ করে উঠলো। আমি ফোনটা রিসিভ করলাম। সেই কর্কশ কন্ঠের লোকটাই আমাকে ফোন করেছে। এবার আমি তাকে দেখতেও পাচ্ছি। বাজারের চালের আড়তদার আক্কাস মিয়াই এই কর্কশ কন্ঠের অধিকারী। তিনি প্রায় হুংকারের মতো করে বললেন,
— ঐ খা*র পোলা। কই তুই?
— আমাকে বিশেষ ব্যবস্থায় আমেরিকা সরকার তাদের দেশে নিয়ে এসেছে। আপনি চাইলে জর্জ বুশের সাথে কথা বলতে পারেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব আমার পাশেই বসে আছেন।(বিঃদ্রঃ তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ)
— ওই বেটা ফাজলামি করস? চেয়ারম্যান সাহেব তোরে ডাকে। কই তুই?
— আমি চেয়ারম্যান চাচার সাথে সকালের নাস্তা খাচ্ছি। তোমরাও চলে এসো।
— ঐ তুই জানোস আমি কে? তুমি কইরা কইতে লইজ্জা করেনা?
— নাহ্ করেনা
— বেয়াদব। দাঁড়া! তোরে এইবার পাইয়া লই। তোর একদিন কি আমার একদিন। তোরে একমাস চাল ধোয়া পানি খাওয়ামু শালা আবাল।
টুট টুট টুট…

ফোনটা কেটে দিলো মজনু মিয়া। আমি আমড়া গাছে বসে মুড়ি খাইতেছি। এতক্ষন পরে আমাদের অপরাধটা বুঝতে পারলাম। গতকাল শহরে গিয়েছিলাম আমি আর মফিজ ওরফে হিটলার। চেয়ারম্যান সাহেবও শহরে গিয়েছিলেন। আমাদের এলাকার সর্বস্তরের মানুষের ভালবাসার চেয়ারম্যান তিনি। আমরা বিকেলের দিকে চলে আসছিলাম। চেয়ারম্যান চাচা আমাদের দেখে বললেন যে, “তার কিছু কাজ থাকায় রাতটা সেখানেই কাটাবেন, এটা যেন আমি তার বাড়িতে বলে দেই।”

কিন্তু চেয়ারম্যান চাচা আমাদেরকে অনেক সাঁজা দিয়েছেন। তাই চেয়ারম্যানের প্রতি ক্ষোভ থেকে আমরা সেটা না করে গ্রামে এসে প্রচার করলাম যে চেয়ারম্যান চাচা শহরে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন। হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, কাল সকালে এম্বুলেন্স এসে লাশ দিয়ে যাবে। পুরো এলাকা কান্নায় আর বিষাদে ভারী হয়ে উঠেছিল। চেয়ারম্যান বাড়ীকে লোকে লোকারণ্য করে আমি আর হিটলার মফিজ আরামের ঘুম ঘুমিয়েছি। এজন্যই আজ সকালে এই অবস্থা। যদিও এখন সকাল নয়, ১২ টা পার হয়ে গেছে।

মিঁউ মিঁউ মিঁউ…ফোনটা বেজে উঠল। হিটলার মফিজ ফোন করেছে। আমি রিসিভ করতেই ও উত্তেজিত গলায় বললো,
— তুই কই? আমি তো সেদ্ধ হয়ে গেলাম
— সেদ্ধ হয়ে যা। তোর শরীরের নরম গোস্ত বাজারে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে।
— ফাজলামি করিসনা। প্লিজ তোর পায়ে পড়ি। কোথায় তুই?
— আমি আমড়া গাছে বসে মুড়ি খাইতেছি।
— ভাই, আমড়া গাছের একটা ডালে আগের বার লুঙ্গি রাইখা আসছিলাম। নামার সময় সেটা মনে করে নিয়ে আসিস।
— আইচ্ছা।
ফোন কেটে দিল। এই মহা সমস্যার সময়ও মফিজ লুঙ্গীর কথা ভুলে নাই। হায়রে চোর! চোররা মনে হয় এরকমই হয়। কাকে কি বলবো! আমি নিজেও তো চোর। এই যে মুড়ি খাইতেছি এগুলোও তো চুরি করা।

আমার বাড়ির চারপাশ ঘুরে কিছুক্ষন পর সবাই চলে গেল। আমি ভাবলাম নামবো কি না! মুড়ি খাওয়া শেষ করে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। মুড়ি খাচ্ছি আর গ্রামের দৃশ্য দেখছি। আমড়া গাছের আগায় বসে গ্রামটাকে অনেক সুন্দর লাগছে। সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে মুড়ি শেষ হয়ে গেল। দোটানায় আছি! নামব কি নামব না! হঠাৎ করে দেখলাম একটা মোটামুটি রকমের জটলা আমার বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। জটলার নেতৃত্বে চেয়ারম্যান চাচা। জটলার মাঝখানে হাত আর শরীর বাঁধা অবস্থায় হিটলার মফিজ আসছে। তাকে প্রতি পদে পদে কিল-ঘুষি দেয়া হচ্ছে।

চেয়ারম্যান সাহেব আমড়া গাছের নিচে এসে উপরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ওই মতিন নিচে নেমে আয়
আমি নিচের দিকে তাকিয়ে আছি। ধরা খাওয়ার জন্য ভয় করছেনা। কারণ, মফিজকে ধোলাই দিয়ে সব বের করে নেয়া সম্ভব। আমি চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— চেয়ারম্যান সাব। আমি নিচে নামতে পারুম না। আপনে উপরে চলে আসেন।
দুয়েকটা ফিসফিসানি কথা শোনা গেল। চেয়ারম্যান সাহেবকে হয়তো কেউ বলছে যে, দেখেন স্যার কত বড় বেয়াদব। আপনাকে গাছে উঠতে বলে। চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে আশ্বাস দিলেন যে, আমাকে মারপিট করা হবেনা। আমি আশ্বাস পেয়ে মুড়ির টিন, বোতল আর মফিজের লুঙ্গী নিয়ে সরসর করে নিচে নেমে এলাম। আমি জানি যে তিনি মিথ্যা বলেন না। এজন্যই মূলত নিচে নেমে আসলাম। নাহলে আরো কয়েকদিন গাছে বসবাস করতে হতো।

বিশাল বড় গোল আকৃতির জটলার মাঝে আমি এবং মফিজ বসে আছি। মফিজকে আচ্ছামতো ধোলাই দেয়া হয়েছে। ও বড় বড় করে নিশ্বাস নিচ্ছে। ওর সারা শরীর ভেজা। মনে হয়, পানির ট্যাংকি থেকে বের করে এনেই ধোলাই দেয়া হয়েছে। ও আমাকে বলছে,
“আব্বা এক গ্লাস পানি দেনতো।”
আমি হাসলাম। এমন মার দিছে যে, মার খেয়ে বাপের চেহারাও ভুলে গেছে। আমি বললাম,
“ওই হিটলারের বাচ্চা হিটলার, আমি তোর বাপ না। আমি মতিন”
ও কিছুই বললো না শুধু মাথা নাড়ল।

আমাকে কোন ধোলাই দেয়া হয়নি শুধু বেঁধে রাখা হয়েছে। পা-হাত-শরীর তিনটা একসাথে বাঁধা অবস্থায় বসে আছি। গাছের ছায়ায় এভাবে বসে থাকতে ভালোই লাগছে। চারপাশে ভীড় জমানো গ্রামবাসী আমাদের দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে আছে। আগুনচোখে তাকালে যদি পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতো তাহলে এতক্ষনে আমি আর মফিজ পুড়ে যেতাম। যুবকদের কোলাহল একটু বেশীই। উৎসাহী অনেকে আবার ভিডিও করছে। এই ভিডিও নাকি ফেসবুকে ছেড়ে দেয়া হবে। বাংলাদেশের সবাই নাকি এগুলো দেখবে। আমি যদিও এসব গাঁজাখুড়ি গল্প বিশ্বাস করিনা। মোবাইলে সর্বোচ্চ ছবি তোলা যায়। ভিডিও করা যায়। এছাড়া আমার জানামতে সাপও খেলা যায়। আর কিছুই না। যদিও অনেককে দেখেছি হাত দিয়ে মোবাইল চালাতে। আমিও হাত দিয়েই মোবাইল চালাই কিন্তু তাদের মোবাইলে কোন টিপ নাই। আমারটায় আছে, সে হিসেবে আমারটা ভাল হবে এটাই স্বাভাবিক।

মেম্বার সাহেব এখনো না আসায় বিচার কার্যে দেরী হচ্ছে। ঘটনা যা জানতে পারলাম তা হলো- “সারারাত কান্নাকাটি, খতম, দোয়া-দরূদ সব পাঠ করা হয়েছিল। বরই পাতা ধোয়ানো পানি সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। চেয়ারম্যানের আত্মীয় স্বজন, জামাই, মেয়ে-ছেলে সবাই ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছে। গতকাল রাতেই কোরআন পাঠ করা হয়েছে একাধিকবার। শোকে পর্যুদস্ত পুরো গ্রামবাসী। এদিকে সকাল আটটা-নয়টার দিকে মসজিদের ইমাম সাহেব আর গোরখোদক আবদুস সামাদ(যাকে সবাই সাহসী লোক হিসেবে চিনে) আর কয়েকজন মিলে কবর খুঁড়ছিল। এমন সময় চেয়ারম্যান চাচা শহর থেকে ফিরে এসে দেখে যে তার বাড়ির সামনে কবর খোঁড়া হচ্ছে। অজানা আতংক ভীড় করে তার মনে। সে তাদের পাশে গিয়ে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন যে, “কে মারা গিয়েছে হুজুর?”

সবাই প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে একযোগে চিল্লানি দিয়েছিল। সামাদ সাহেব “ও মাগো” বলে কবরের ভেতরে পরে গেছেন। তার মাথায় তিন বালতি পানি ঢালার পর তার জ্ঞান ফিরে। চেয়ারম্যান সাহেব তার দিকে ঝুকে এসে বলছিলেন, সামাদ সাহেব এখন কি সুস্থ আছেন? সামাদ চোখ মেলে তাকিয়ে আবারো “ও মাগো” বলে চিল্লানি দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। তার মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। তার সহকারী তিন চার জন “ভুত” বলে দৌড় দিয়েছিল। একজন নাকি লুঙ্গী ফেলে রেখেই দৌড়ে পগার পার। এদেরকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছেনা। আর ইমাম সাহেব! তার এখনো জ্ঞান ফেরেনি। বালতির পর বালতি শেষ হয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান ফিরবে বলে আশা করা যাচ্ছেনা।

এই ঘটনার পরে বাড়ি থেকে লোকজন বেরিয়ে আসে। তখনও উপস্থিত কয়েকজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ জায়গায় ফিট হয়ে গেছে। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান সাহেব সব শুনে সবাইকে বুঝিয়ে বললেন যে শয়তানের গোড়ায় আমরা দুইজন আছি। বিক্ষুদ্ধ গ্রামবাসী এরপর থেকেই আমাদেরকে খুঁজছে।”

মেম্বার সাহেব আসার পর উপস্থিত নেতাগণ বিক্ষুদ্ধ ভঙ্গিতে আমাদের কাজের সমালোচনা করলেন। অনেক বক্তৃতাও হলো…সামনে নির্বাচন তো এজন্য আমাদের বিচারের সময়ও অনেকে ভোট চাইলেন। মেম্বার সাহেব ভোট চাইলেন অন্যভাবে, “ভায়েরা আমার, আজ গ্রামে এসব দুস্কৃতিকারী ধরা পরতো না যদি আমি মেম্বার না হতাম। তাই আরেকবার আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে চোর-বাটপারদের ধরার সুযোগ করে দিন।”

বিভিন্ন আলোচনার পর সবার উপস্থিতিতে আমাদের দুজনের শাস্তি ঘোষণা করা হলো। শাস্তির পরিমাণও নেহাত কম নয়।
১. ২০ হাত নাকে খত দিতে হবে।
২. জুতার মালা গলায় দিয়ে গ্রাম ঘুরানো হবে।
৩. একজন আরেকজনের কান ধরে ১০০ বার উঠবস করতে হবে।
৪. ময়লা পুকুরে ২০ টা চুবানি দেওয়া হবে।
৫. মসজিদের বারান্দার ওপরে খেঁজুর পাতার চাটাই বিছিয়ে দিতে হবে।
৬. গ্রাম থেকে বিদায় নিতে হবে।

শাস্তির কথামালা ঘোষনা করলেন চালের আড়তদার আক্কাস মিয়া। ঘোষনা করার সময় তিনি আমার দিকে তাকিয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসলেন। উপস্থিত সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আনন্দ করতে লাগলো। আমিও সবার দিকে তাকিয়ে সৌজন্যমূলক হাসি দেয়ার চেষ্টা করলাম। মুরুব্বীরা আমার সৌজন্যমূলক হাসিকে বেয়াদবী ধরে নিয়ে আরো শাস্তি বাড়ানোর আবেদন করলেন। সবার সহমতে আরো একটা শাস্তি বাড়ানো হলো- ১০ টা জুতার বাড়ি খেতে হবে।

সবাই মহাউৎসাহে অপেক্ষা করতে লাগলো কখন শাস্তি দেয়া শুরু হবে। শাস্তির প্রাথমিক পর্যায়ে নাকে খত দেয়া শুরু হলো। আমি সঠিকভাবেই নাকে খত দিলাম। কিন্তু বেচারা মফিজ নাক কেটে একাকার করে দিল। এরপর আমরা দুইজন দুজনের কান ধরে ১০০ বার উঠবস করলাম। ময়লা পানির পুকুরে ২০ টা চুবানি দেওয়া হলো। মার খেয়ে অভ্যাস আছে বলে সবই সাধারণ মনে হচ্ছিল। এরপর গায়ের জোরে গাল বরাবর ১০ টা জুতার বাড়ি দেওয়া হলো। ৮০ বছরের ঠুনঠুনে এক বুড়াও গায়ের জোর দিয়ে একটা বাড়ি দিয়ে গেল। সর্বশেষ, জুতার মালা গলায় দিয়ে পুরো গ্রাম ঘোরানো শুরু হলো।

মহিলা, যুবতী, শিশুরাও উৎসুক দৃষ্টিতে আমাদের দেখছেন। আমার দুসম্পর্কের এক চাচীর বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ চাচী এসে মেম্বারের পা ধরে কান্নাকাটি শুরু করলেন। তিনি কাদঁতে কাঁদতে যা বললেন তার সারমর্ম হলো- “একটা এতিম ছেলে ভুল করে চুরি করতেই পারে। এজন্য তো এতো বড় শাস্তি তাকে দেয়া যায়না।” তিনি আবেদন করলেন, আমাকে মাফ করে দেওয়ার জন্য। মেম্বার সাহেব ব্যপারটা নাকচ করে দিলেন। আমি চাচীকে বললাম,
“চাচী, বাড়িতে যান। অনেকদিন গ্রাম ঘুরে দেখিনা। আজকে ঘুরতে ভালোই লাগছে। চাইলে আপনিও আমার সাথে আসতে পারেন।হ্যাপী জার্নি বাই দ্যা ভিলেজ রোড”

চাচী কান্না বন্ধ করে আমার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বেশরম, ইবলিস এজাতীয় কয়েকটা গালিও দিলেন। সবশেষ তার মরণ কামনা করলেন। যাই হোক, জীবনানন্দ হেটে চলেছিলেন পৃথিবীর পথে আর আমি হাঁটছি আমাদের গ্রামের পথে। জীবনানন্দের চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন আর আমার গলায় জুতার মালা।

পুরো গ্রাম ঘুরে আসার পর আমাদেরকে মসজিদের কাজে লাগিয়ে দেয়া হলো। এবং পরদিন সকালে যেন আর গ্রামে না দেখা যায় এটাও বলা হলো। আমি আর মফিজ বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে মসজিদের বারান্দায় রেখে দিলাম। সারারাত মসজিদের বারান্দার ছাদ মেরামত করে দানবাক্স, ঘড়ি, হাতপাখা, ২ টি কাসাঁর বদনা, আইপিএস এবং ৫ টা জায়নামাজ চুরি করে শহরে পালিয়ে গেলাম।

এই ঘটনার পর থেকে আর কখনো গ্রামমুখী হইনি। শহরে এসে চুরি চামারি করে এখন আমি শহরের অন্যতম ধনী লোক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এসব পুরনো কথা আর কে ই বা ভাবে এই বয়সে? জীবনের সায়াহ্নে এসে আমাকে এসব কথা আবারো মনে করতে হলো। ভাবছি আগামী শুক্রবার আমার জন্য মসজিদে মিলাদ দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করবো নাকি?

৫৫ তম জন্মদিনের দিন আমি বারান্দায় বসে আছি। আমার ১০ বছরের নাতি আমার পাশে এসে বসলো। আমাকে নাকি মজার একটা জিনিস দেখানো হবে ইউটিউবে। ওর দাদীও এর আগে ভিডিওটা দেখেছে। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম কি দেখানো হবে? বুড়ো বয়সে অপেক্ষাই করতে হয়। সবাই অপেক্ষাই করতে থাকে, এই সময়ের বড় অপেক্ষা হলো মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। আমি এই মুহুর্তে একটা মজার ভিডিও দেখার জন্য অপেক্ষা করছি।

একসময় ভিডিও ওপেন করা হলো। আমি বিষ্ময় নিয়ে দেখলাম ৩০ বছর আগের ভিডিও। আমার আর মফিজের নাকে খত দেয়া, পুকুরে চুবানির দৃশ্য, গালের ওপর ঠাস ঠাস করে জুতার বাড়ি মারা, গলায় মালা পরিয়ে এলাকা ঘোরানোর দৃশ্য। আসলেই ভিডিও গুলো দেখতে মজার ছিল। সবচেয়ে উপভোগ্য ছিল চুবানোর পর্যায়টা। মফিজের জান যায় যায় অবস্থা, সে চিৎকার করছে।

আমার নাতি আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
“দাদু দেখো এত শাস্তি দেবার পরও এই লোকটা হাসছে। কত বড় সেন্সলেস পাগল। দাদীর কাছে শুনলাম, কম বয়সে নাকি তোমার চেহারা এই লোকটার মতোই ছিল। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার না?

আমি বিরস বদনে বললাম, “ভেরি ইন্টারেস্টিং ভেরি ইন্টারেস্টিং”

সম্পর্কিত পোস্ট

চশমা

চশমা

লেখকঃ সাকি সোহাগ (মে -২০১৮) .................. দিনকাল খুব ভালোই যাচ্ছিল আমার। কিন্তু আমাকে ভেবে অন্য কারো দিন হইত খুব বেশি একটা ভালো যায় না। আমার সাত জন ছেলে চার জন মেয়ে। ছেলেগুলোকে বিয়ে করিয়েছি এবং মেয়েগুলোকে বিয়ে দিয়েছি। ছেলে মেয়ের সবারই আবার ছেলে মেয়ে আছে। মানে এক...

মালিশ

মালিশ

গল্প লেখকঃ Shammi Rahman (এপ্রিল - ২০১৮) .............................. বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন ক্যাম্পাসে নায়ক মাগুর আর নায়িকা ইলিশের সামনা সামনি ধাক্কা। ইলিশের হাত থেকে পড়ে গেল বই- ইলিশ (নায়িকা):   এই যে মিস্টার, দেখে চলতে পারেন না? মাগুর (নায়ক):    (ইলিশের...

লাশের প্রলাপ

লাশের প্রলাপ

গল্প লেখক মোঃ রোবেল পারভেজ (এপ্রিল - ২০১৮) .............................. লাশটা আমাকে সঙ্গ দেয় মাঝে মাঝেই। সঙ্গ দেয় মানে কথা বলে। নানা ধরণের কথা হয় আমাদের মধ্যে।আসলে লাশটাই বল। আমি শুনি। মাঝে মাঝে হ্যাঁ, না উত্তর দেই। দিনের বেলাতে সে কোনো কথা বলে না। তবে দেখতে পাই...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *