লাশের প্রলাপ
প্রকাশিত: এপ্রিল ১০, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 244 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05
গল্প লেখক
মোঃ রোবেল পারভেজ
(এপ্রিল – ২০১৮)
…………………………
লাশটা আমাকে সঙ্গ দেয় মাঝে মাঝেই। সঙ্গ দেয় মানে কথা বলে। নানা ধরণের কথা হয় আমাদের মধ্যে।আসলে লাশটাই বল। আমি শুনি। মাঝে মাঝে হ্যাঁ, না উত্তর দেই। দিনের বেলাতে সে কোনো কথা বলে না। তবে দেখতে পাই তাকে। কথা হয় রাতের বেলা। সে যেমন রাতই হোক না কেন। চাঁদনি রাতে তার মুখটা আবছা দেখা গেলেও অমাবস্যায় ঘোর অন্ধকার ঘিরে রাখে তাকে। এ অন্ধকার আইয়ামে জাহিলিয়াতের মতোই। লাশটা ঝুলে থাকে বড় আমগাছটাতে। গলায় ফাঁস লাগানো। পা দুটো প্রায় মাটি স্পর্শ করেই আছে কিন্তু মাটির ছোঁয়া পায়না। গাছে বসে থাকা পাখিটার ভালোবাসাও পায় না। কিছুটা করুণা হয়তো পায় কিন্তু নির্মম করুণা লাশটা চায়না। জীবন্ত লাশের ভিড় থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্যই মেয়েটা গলায় দড়ি দিয়ে নিজেকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো আমগাছটার সাথে। সেই থেকেই ঝুলে আছে। ঝুলন্ত বিবেকের মতো।
হাস্নাহেনা ফুল খুব ভালোবাসতো মেয়েটা। প্রায় রাতেই জানালা খোলে তার পাশে দাঁড়াতো ফুলের সুবাস নিতে। ফুলের সুঘ্রাণ মিশ্রিত বাতাস বিমোহিত করতো তাকে। বিষধর সাপ যেমন ফুলের ঘ্রাণে আকুল হয়ে ছুটে আসতো গাছটার কাছে। মেয়েটাও মাঝে মাঝে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতো মাতাল হাওয়ার টানে। গাছটার কাছে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো মুগ্ধ দৃষ্টিতে। রাজ্যের কৌতুহল ভর করতো তার চোখে। অজানা এক ভালোলাগা ঘিরে রাখতো তাকে। ভরা পূর্ণিমায় চন্দ্রাহত হয়ে জ্যোৎস্নাস্নান করতো সে। পান করতো চাঁদের আলো।
কলঙ্কিত চাঁদ সবাইকে আকর্ষণ করলেও কলঙ্কের দাগ লাগা কোনো মেয়ে সমাজে অচ্যুত। সমাজে ত নয়ই ঘরের মধ্যেও তার জায়গা হয় না। সতীত্বের পরিক্ষায় নারীকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হলেও কোনো পুরুষকে সতীত্বের পরিক্ষা দিতে হয় না। তাই তারা কলঙ্কিতও হয় না। কলঙ্কের বিষ যে আশীবিষের চেয়েও ভয়ংকর। সাপের কামড়ে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও কলঙ্ক তীলকে মৃত্যু নিশ্চিত। বেশ্যা নারীর তবুও নিরাপদ আশ্রয় স্বরুপ রঙ্গিলা বাড়ি আছে। ধর্ষিতা মেয়ের সে আশ্রয়টুকুও থাকেনা। নিশিকন্যার গানের, সুরের প্রশংসায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল পঞ্চমুখ হতে পারেন। উকিল মুন্সী রঙিলা বাড়িতে বসে বারকন্যার গান শোনতে পারেন। গানের তালিম দিতে পারেন। নজরুল গানের সুর করতে পারেন। কিন্তু ধর্ষিতা মেয়ে বাবা মায়ের কাছেই মূর্তিমান অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে পরিবারকে মুক্তি দিতেই মেয়েটি নিজেকে বিসর্জন দিয়েছে।
সেদিন ছিলো পূর্ণিমা। আকাশে পূর্ণচাঁদ দুধের মতো জ্যোৎস্না ঢেলে দিয়েছিলো মাটিতে। রজনীগন্ধা, হাস্নাহেনার সৌরভে বিমোহিত হয়ে মেয়েটি বাইরে বের হয়ে এসেছিলো। সেই আসাই তার কাল হলো। পাঁচটা নপুংসক সারারাত ভরে পৈশাচিক ক্ষুধা মিটায়। রক্তাক্ত অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে যায় হাস্নাহেনা গাছটার নীচে যেখানে কুন্ডলি পাকিয়ে ছিলো একটা সাপ। যমের অরুচি হয়ে বেঁচে যায় মেয়েটা। তবে মৃত্যুর যন্ত্রণাময় জীবন। সমাজের করুণার জীবন। আর বিচারব্যবস্থার হাতে বার বার ধর্ষিতা হওয়ার জীবন। সীতা জ্বলন্ত অগ্নিকান্ডের মধ্য দিয়ে হেঁটে নিজের সতীত্বের প্রমাণ দিতে পারলেও মেয়েটা ধর্ষিতা হওয়ার প্রমাণ দিতে পারেনি। আদালত প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে মেয়েটা দেহব্যবসায়ী। আর নপুংসক গুলো সব দেবশিশু। দেবতাদের হেরেমের রক্ষিতা হয়ে থাকতে চায় নি মেয়েটি। নিজের দুর্ভাগ্যকে সঙ্গী করে অনন্তের পথে যাত্রা করেছে।
এমন দুর্ভাগ্য সে চায়নি। মারা যাওয়ার পূর্বক্ষণেও তার মনে হয়েছে পৃথিবীটা কত সুন্দর! কত মায়ায় ভরা প্রকৃতি। কী বিমোহিত করা চাঁদের আলো!অথচ এই মায়ায় ভরা কাননে কিছু অসুরের দৌরাত্ম্য। যাদের কাছ থেকে নিস্তার পাচ্ছেনা কোনো ফুলই (মেয়েই)। মেয়ে হয়ে জন্মানোর পাপ মোচন করতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। লাশটা মাটিতে একবার পা রাখতে চায় পরম নির্ভরতায়। কিন্তু নির্ভরতা পায় না। তাই ঝুলে থাকে মাটি থেকে একটু উপরে। তবে আর কোনো ঝুলন্ত লাশ সে দেখতে চায়না। সে জানায় ভয়ংকর এ পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রত্যেকটি নারীকেই ধারণ করতে হবে রৌদ্র মূর্তি। দেবী দুর্গার মতো বিনাশী রূপ ধরে বিনাশ করতে হবে সব অসুরকে।নিজেকে রক্ষার মন্ত্র না জানলে সমাজ পাশে দাঁড়াবেনা কখনোই। বরং কুলটার কলঙ্কতীলক এঁকে দিবে ললাটে। তাই নারীকে শুধু মায়াবতী, রুপবতী, দয়ার্দ্র হৃদয়ের হলেই হবে না। হতে হবে কঠোরও। নিজেকে রক্ষার মতো সাবলম্বী। নপুংসকদের উচ্ছন্নে পাঠানোর মতো সাহসী। আমি লাশের কথাকে সমর্থন করি। নিজের মধ্য থেকেই একটা বোধ কাজ করে নারীবান্ধব সমাজ গঠনে। লজ্জা হয় নারীদের জন্য অনিরাপদ একটা সমাজ দেখে। জাহিলিয়াতের যুগেও হয়তো মেয়েরা এতটা অনিরাপদ ছিলোনা, যতটা নিরাপত্তাহীন এখনকার সময়ে। চেতনা জাগ্রত হলে নিশ্চয় নিরাপদ সমাজ গঠন করা যাবে। চেতনা কি জাগ্রত হবে?

সম্পর্কিত পোস্ট

চশমা

চশমা

লেখকঃ সাকি সোহাগ (মে -২০১৮) .................. দিনকাল খুব ভালোই যাচ্ছিল আমার। কিন্তু আমাকে ভেবে অন্য কারো দিন হইত খুব বেশি একটা ভালো যায় না। আমার সাত জন ছেলে চার জন মেয়ে। ছেলেগুলোকে বিয়ে করিয়েছি এবং মেয়েগুলোকে বিয়ে দিয়েছি। ছেলে মেয়ের সবারই আবার ছেলে মেয়ে আছে। মানে এক...

মালিশ

মালিশ

গল্প লেখকঃ Shammi Rahman (এপ্রিল - ২০১৮) .............................. বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন ক্যাম্পাসে নায়ক মাগুর আর নায়িকা ইলিশের সামনা সামনি ধাক্কা। ইলিশের হাত থেকে পড়ে গেল বই- ইলিশ (নায়িকা):   এই যে মিস্টার, দেখে চলতে পারেন না? মাগুর (নায়ক):    (ইলিশের...

ভেরি ইন্টারেস্টিং

ভেরি ইন্টারেস্টিং

গল্প লেখকঃ তাহসিন আহমেদ ধ্রুব .................. মিঁউ মিঁউ মিঁউ..... আমি ঘুম থেকে উঠে চারপাশে তাকালাম। কোথাও কোন বিড়াল নেই। তাহলে ডাকটা আসলো কোথেকে? আবার ডেকে উঠল মিঁউ মিঁউ মিঁউ...এবার শব্দটা কোনদিক থেকে আসছে সেটা খেয়াল করলাম। শব্দটা আমার বালিশের নিচ থেকে আসছে! তার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *