ভাবনা
প্রকাশিত: জুন ৫, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 93 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখকঃ
স্বাধীন পারভেজ
(জুন – ২০১৮)
……………

ছেলেটির বয়স কত হবে? আনুমানিক ছয় বা সাত বছর। আনুমানিক বলছি একারণেই যে, ছেলেটির জন্মগ্রহণ তার জন্মদাত্রী মা বা পরিবারের অন্যান্য ছিন্নমূল সদস্যদের জন্য এমন কোন বিশেষ খুশির বার্তা বয়ে আনেনি যে তার আগমনের দিনটিকে ঘটা করে লিখে রাখতে হবে। সুতরাং গায়ে গতরে সে যেটুকু বেড়ে উঠেছে তা দেখেই অনুমান করে নিতে হবে বাচ্চাটির বয়স ছয় বা সাত বছর। ছেলেটি কিন্তু দেখতে বেশ সুশ্রী ও নাদুস নুদুশ। ফলে প্রতিবেশী অবস্থাপন্ন অভিভাবকদের গোপন কৌতুহল – বেটা খায় কি?
আশ্রয়দাতা মামা মামীদের অতি উৎসাহী দাবী – মামাবাড়ীতে রাজপুত্রের মতো আদর যত্ন পাচ্ছে বলেই তো ……!
বলা বাহুল্য, এতিম ছেলেটির এই দৃশ্যমান বাড় বাড়ন্ত উপরে যে যাই বলুক না কেন; মনে মনে সকলেই হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে শুধুমাত্র শিশুটির বিধবা মা মেয়েলোকটি ছাড়া। চার মেয়ে আর দুই ছেলের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এই পুত্রটির মুখপানে তাকালেই কেব্ল দিনশেষে ক্লান্ত মায়ের মনে একটুখানি খুশির আবেশ ছলকে উঠে। প্রাইমারী স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠার পরীক্ষায় সাদতকান্দি গ্রামের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে এবার ক্লাশে প্রথম হয়েছে ছেলেটি। ঘটনাটিকে শিশুটির ধৃষ্ঠতা বললেও অত্যুক্তি হবে না। মায়ের পেটে থাকতেই বাবাকে হারিয়েছে। মামাবাড়িতে মানুষ হচ্ছে উচ্ছিষ্টের মতো। এই সুস্বাস্থ্য আর উজ্জল ফলাফল শিশুটিকে ঠিক মানায় না।
এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে ছিটকে পড়িছিলো ফরিদা। বড় মেয়েটি তখন সবে ষষ্ট শ্রেণিতে পড়ে। বাকী চার সন্তানও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থী। তার ওপর সে নিজেও ছিল চার মাসের গর্ভবতী। দুনিয়াতে কোন মেয়ের জন্য এর চেয়ে বড় সংকট আর কি হতে পারে? দিশে হারা ফরিদা কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলো যেন।

ফরিদার ছোট ভাই সায়েম, তখন দর্শনে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। মানে উঠতি দার্শনিক। ছেলেটিকে সমাজতন্ত্রের চেতনা ব্যবসায়িরা এক রকম দখল করে ফেলেছিল। ফলে তার তখন মস্তিস্ক তখন পুঁজিবাদ, ধর্মতত্ব আর নারী শৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে ভয়ানক ভাবে তেতে উত্তপ্ত হয়ে আছে। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বুকভরা ক্ষোভ আর জিঘাংসা নিইয়ে সাম্যবাদের আদর্শিক সমাজতন্ত্র কায়ীর যুদ্ধের জন্য সদা প্রস্তুত সে, কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই অভাব। নিজের সহোদর বোনের এই চরম দুর্দিনে তার মধ্যকার বিপ্লববোধ প্রবলবেগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। বেমক্কা সে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছিল ছানাপোনাসহ বোনকে বাবার বাড়িতে এনে আশ্রয় দিবে সে। বোনকে বিপন্ন হতে দিবে না।
অন্যদিকে বিধবা বোনের স্বামী বিয়োগের দুঃখে সদ্য শোকাতুর হয়ে ওঠা অন্যান্য ভাই ভাবীরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এই মাথামোটা বেয়াড়া ছেলেটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে যারপরনাই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। প্রকাশ্যে বাধা দেয়াটা দৃষ্টিকটু দেখায় বিধায় ভাইয়েরা কৌশলে নিজ নিজ স্ত্রীদের দিয়ে আদরে সোহাগে ছেলেটিকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। বুড়ো বাপটি বেঁচে থাকলে সেও হয়তো এতবড় উপকার করার সাহস পেতনা। ফরিদা যথার্থই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে।

পাঁচ পাঁচটি সন্তানসহ বিধবা, উপরন্ত পোয়াতি বোনকে বসত ভিটায় জায়গা দিয়েও নির্ঝঞ্ঝাট ভাবে জীবনযাপন করবে, এই জনপদের মানুষগুলো এখনো ততটা মহৎ হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে অচিরেই ভাইয়েরা শোকবিহ্বলতা কাটিয়ে উঠলো এবং নিত্যদিন নানা অযুহাতে অসহায় বোনটির ওপর চড়াও হতে লাগলো। নিরাপদে বেঁচে থাকার ঠিকানা খুঁজে পেয়ে সেই ভরসায় নিশ্চিন্ত হয়ে ওঠা ফরিদা এবার যেন ধীরে ধীরে আরো বেশি বিপন্ন হতে লাগলো। কিন্তু বিকল্প কোন উপায়ও হাতে ছিলো না তার। শ্বশুর বাড়ীতে মৃত সবামীর ভিটায় ফিরে যাওয়াটা ছিলো অসম্ভব। কারণ ফরিদাকে বাবার বাড়ীতে নিয়ে আসতে যাওয়ার দিন বাঙ্গালীয়ানা ভদ্রতা আর সমাজ রক্ষার দায়বোধ থেকে ফরিদার দেবর ভাসুরসহ গ্রাম্য সমাজপতিরা আপত্তি তুলেছিলেন, একটা দৃশ্যমান বাধার সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু সায়েম তা মানেনি, উল্টো বেশ কিছু আপত্তিকর দাম্ভিকতা দেখিয়ে এসেছিল সেদিন। ফলে সেই দরজাটাও বন্ধ হয়ে গেছে চীরদিনের জন্য। তাছাড়া উঠতি বয়সী কিশোরী মেয়েদের নিয়ে অল্পবয়স্ক বিধবা নারীটি সেখানে বড় অনিরাপদবোধ করতো। তাই শত কষ্টেও সে বাবার বাড়ীতেই থেকে যায়। সায়েম তখন সবে ছাত্র এবং বেকার। সেই অযুহাতে কেবল গলাবাজী করেই বোনকে উদ্ধারের দায়শোধ করেছিল সে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে হয়নি তাকে। পরে অবশ্য ছাত্রজীবনের ইতি টেনে উপার্যনের পর্ব শুরু করতে না করতেই ভোল পাল্টে সে বুর্জোয়াদের মুরীদ হয়ে পড়ে! মার্কসবাদ লেলিনবাদের চর্বিতচর্বনে ইস্তফা দিয়ে এখন সে পুরো দস্তর ঘুষখোর অফিসার!

তবে হ্যা, এ পর্যায়েও সে বড় বোনকে টুকটাক সহযোগিতা করে চলছে। যদিও সে জন্য বোনসহ বোনের সর্বকনিষ্ঠ পুত্রটিকেও রোজ রোজ উচু আওয়াজে শুনতে হয় – আমার মতো মানুষ পেয়েছিলে বলেই ……।

সৃষ্টিকর্তা বোধ হয় কিছু মানুষের আচরণ এতোটাই অপছন্দ করেন যে, তাদেরকে দিয়ে মানুষের উপকার করিয়ে নেন ঠিকই কিন্তু ব্যক্তিটির স্বভাবগত আচরণের কারণে উপকৃত ব্যক্তিটি তার উপকারী মানুষটিকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ফুসরত টুকুও পান না। উলটা লাগাতার খোটা পাওয়ার অপমানে একসময় উপকারীকে অভিশাপই দিয়ে বসেন।

বর্তমানে এভাবেই কাটছে ফরিদার দিনরাত্রি। ঘটনার আবর্তে বছর গড়িয়ে আবারো ঈদ চলে এসেছে। এই উৎসব মুখর দিনগুলোতে ফরিদার খুব মনে পড়ে অতীতের ঘটনাবলী। স্বামী বেঁচে থাকতে এসব সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানগুলোর কি দারুন রং ছিল! ছিল সুখ দুঃখ, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, আবেগ অভিমানের নানা ঘটনা, একেকটা অনুভূতির ছিলো ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ! মাত্র একজন মানুষ, একটি দায়িত্বশীল হাতের অভাবে একটা পুরো পরিবার যে এতোটা বঞ্চিত, নিগৃহীত হয়ে উঠতে পারে অতীতে তা ফরিদার ধারণার বাইরে ছিল। বেঁচে থাকা মানুষগুলোর আবদার আহলাদ মেটাতে, অভাব অভিযোগ শুনতে, অভিমান অনুরাগ ভাঙ্গাতে প্রতিটা পরিবারে অন্তত একজন দায়িত্বশীল মানুষ থাকা যে কতোটা জরুরী তা যেন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল ফরিদা। মনে মনে সে প্রায়ই আক্ষেপ করে ভাবে এতোসব মানুষের মাঝে যদি এরকম কিছু লোকও থাকতো যে খুব যত্নের সাথে পাশের মানুষগুলোর মনের খোঁজ নেবে, আস্থার সাথে কাছের মানুষগুলোর অভাব পূরনের দায়িত্ব নেবে, হাসি মুখে সকলের অভিমান অনুরাগের কথাগুলো মনদিয়ে শুনবে, আহ্লাদে ঢলে পড়ে আবদার করার সুযোগ টুকু দেবে। ইশ! যদি এই পুরো জনপদটির মাঝে মাত্র একজন মানুষও এমনটি পাওয়া যেত, তাহলে নিশ্চয়ই সেই আলোকিত মানুষটি আশেপাশের সবাইকে তার আলোয় আলোকিত করে রাখতো।

বছর ঘুরে প্রতিবার ঈদ আসলেও মির্জাবাড়ীর উঠানের কোনে অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা পুরানো ঘরটিতে অবাঞ্চিতভাবে বসবাস করা এই পরিবারটিকে কিছুমাত্র উচ্ছাসিত হতে দেখা যায় না। নিয়মিত অভাবে পিষ্ট হতে ধীরে ধীরে ওরা মেনে নিয়েছে এই কঠিন বাস্তবতাকে। বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, যে কোন উৎসবই ব্যয়বহুল। কেবলমাত্র সামর্থবানদের জন্যই এসব। বরং তারা অনাহুত এসব আচার অনুষ্ঠানের আগমনে বিরক্ত, বিব্রত হয়ে ওঠে।

কিন্তু আলোচ্য এই অবুঝ শিশুটি আজ ভারী চঞ্চল। ঈদের দিনের সুরোভিত সকালে চারিদিকের সাজ সাজ রব তাকেও বেশ রোমাঞ্চিত করে তুলেছে। সদ্য প্রসূত বাছুর ছানার মতো এবাড়ী ওবাড়ী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সে। বড় বোনদের মলিন মুখ, মায়ের বেদনাক্লীষ্ট চেহারা তাকে প্রভাবিত করতে পারেনি একটুও। করার কথাও নয়, শিশু মনটি ফুর্তিতে ডুবে আছে পুরোপুরি। আজ তাকে কেউ বকছেনা। মামারা কারণে অকারণে ধমকাচ্ছে না। মামীরা ঘৃণাভরে চোখ রাঙ্গাচ্ছে না। মামাতো ভাইবোনেরাও নানা অযুহাতে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে না তাকে আজ। সকলের মুখেই হাসি যান উপচে পড়ছে। শিশুটি কিছু না বুঝেও উল্লাসে ফেটে পড়ে। বাধভাঙ্গা খুশিতে মুক্ত পাখির মতো চারিদিকে ছুটে বেড়ায়।

ঈদ নামাজের ঠিক আগ মুহূর্তে ছেলেকে পোষাক পড়াতে পড়াতে সতর্কবানী শোনায় ফরিদা – শুন বাবা, ঈদের মাঠে গিয়ে কিন্তু কোন দুষ্টমি করবেনা। মামাদের কাছে টাকা চাইবে না। কারো কাছে কিছু খেতেও চাইবে না। তাদের ছেলেমেয়েদের সাথে মেলায়ও যেতে চাইবে না। নামাজ পড়ে সোজা বাসায় চলে আসবে। বাসায় এসে খাবে, বুঝছো? না হলে কিন্তু মার খেতে হবে। মনে থাকে যেন।
মায়ের আশংকার ঘোর প্রতিবাদ করে ওঠে শিশুটি। ছোট ছোট হাত দুটি নেড়ে কচি কন্ঠে উচ্ছাসিত ভঙ্গিতে বলতে থাকে – ইশ! না, আজ তো আমাকে কেউই মারেনি। বকাও দেয়নি। বড় মামা আর সেজমামী আমাকে টাকাও দিয়েছে, এক দেখো! শিশুটি তার কচি হাতের মুঠো থেকে ধাতব মুদ্রা বের করে সোৎসাহে মা’কে দেখাতে থাকে। তারপর কি মনে করে বলে ওঠে – ইশ মা! যদি প্রতিদিন ঈদ হতো তাহলে কত্তো ভালো হতো তাইনা? তাহলে কেউ আর তখন আমাকে বকতো না, মারতো না, এরকম টাকা দিতো। রোজ রোজ টাকা জমিয়ে আমি স্কুলব্যাগ কিনতে পারতাম। একদিনের ঈদে মজা নেই। রোজ রোজ হলেই ভালো হতো, হুম।

ভীষণভাবে চমকে ওঠে ফরিদা। তার কর্মব্যস্ত হাত দুটি থেমে যায়। বুকের ভিতরটা তোলপাড় করে ওঠে চিনচিনে ব্যাথায়। বুক ভর্তি গুমড়ে কান্না চেপে উতলা হয়ে সে ভাবতে থাকে সত্যিই তো, কি লাভ শুধুমাত্র একটা দিনের জন্য এমন মানুষ হয়ে ওঠার? কি পূণ্য মাত্র একটি দিনে সবার সাথে এতো ভালো ব্যবহার করার? যদি বছরের প্রতিটা দিনই সকলে এমন মানুষ হয়ে থাকতো সারাটা বছরই কি ঈদের এই নির্মল আনন্দ ছড়িয়ে থাকতো না এই সমাজের নানা স্তরে বেঁচে থাকা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *