স্মৃতি চিহ্ন
প্রকাশিত: মে ২১, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 55 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

গল্প লেখকঃ
sharmin khanom
(মে – ২০১৮)
……………

কাসফির বিয়ে হয়েছে পরিবারের ইচ্ছেতেই। অবশ্য কাসফির কোনো নিজস্ব পছন্দও ছিলো না। সে ছোট থেকেই ভেবে এসেছে বাবা মায়ের পছন্দ করা কোন ছেলেকেই জীবন সাথী হিসেবে মেনে নেবে। প্রত্যেকটা মেয়ের মত তারও অনেক স্বপ্ন ছিলো তার বর তাকে খুব ভালোবাসবে। সে সারা জীবন ধরে যে ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছে তা দিয়ে ভরিয়ে দিবে তার জীবন। কিন্তু বাস্তবতা বড্ড কঠিন। তমাল খুব কম কথা বলা মানুষ। সে প্রয়োজনের বাইরে কথা বলেনা। কাসফির সাথে হাসি মুখে কথা বলা তমালের কাছে নেকামো মনে হয়।

নিজের স্ত্রী কে আবার ভালোবাসি ভালোবাসি বলার কি আছে? ওকে ভালোবাসার প্রমান দেওয়ারই বা কি আছে? দু’জনের বিয়ে যখন হয়েছে তখন দু’জনের সংসার করতে হবে। প্রয়োজনে কথা বলা হবে এর বাইরে কি কথা থাকতে পারে দু’জন মানুষের? সে ঘরের বউ ঘরের কাজ করবে স্বামী সংসার সামলাবে। এর বাইরে আর কি চাওয়ার আছে একটা মেয়ের?
কথাগুলো তমাল রুক্ষভাবেই বলেছিলো তার ভাবিকে। ভাবি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলো কখনো বউকে ভালোবাসি বলেছো? বউ এর জন্য ভালোবাসার একটা গোলাপ হাতে করে বাসায় এসেছো কখনো?

কাসফি আড়াল থেকে সব কথায় শুনে ফেলেছিলো। তমালের কন্ঠ শুনে এগিয়ে এসেছিলো। কথা গুলো শুনার পর আর না শুনে ফিরে যেতে পারেনি। কথা গুলো হয়তো কাসফি মনে মনে উপলব্দি করতেই পারছিলো। কিন্তু সেই উপলব্দ কথাগুলো যে তমাল এভাবে করে ভাবিকে বলবে সেটা কাসফি বুঝতে পারেনি।

কাসফি বিয়ের দু’দিন পর তমাল কে জিজ্ঞেস করেছিলো, আপনার আমাকে পছন্দ হয়নি? তমাল অনেক সময় পর জবাবে বলেছিলো, তোমাকে পরিবার বিয়ে করতে বলেছে তাই বিয়ে করেছি এতে পছন্দ অপছন্দের কি আছে?
তমালের পাল্টা প্রশ্নের কোনো জবাব কাসফির কাছে ছিলো না। তাই সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাগ্যকে দায়ী করে সবকিছুই মেনে নিয়েছিলো। কিন্তু অন্যের সামনে নিজের অপমানটা ঠিক মেনে নিতে পারছিলো না।

কয়েকমাস পরেই কাসফি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। অত্যাধিক মানসিক চাপ আর না খেয়ে থেকে একে বারে দুর্বল হয়ে পড়ে সে।তমাল বাসায় ফিরে কাসফিকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে তার মা কে ডেকে বলে, এমনিতেই আমাদের বাসায় জামেলার শেষ নেই। এর মধ্যে ওর সেবা করার মতো কেউ এ বাসায় নেই। তুমি ওকে ওদের বাসায় পাঠিয়ে দাও। সুস্থ হয়ে আবার নিজেই ফিরে আসতে পারবে।

কাসফি কথা গুলো শুনছিলো আর কাঁদছিলো। পরদিন ভোরেই কাসফি তার বাবার বাসায় চলে যায়। কাসফির ছোট ভাই অনিক কাসফিকে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যায়। পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর জানা যায় কাসফি মা হতে চলেছে। সবার চোখে মুখে আনন্দ। কিন্তু কাসফির চোখে আতঙ্ক। সে ভাবতে পারছেনা তমাল এটা কিভাবে নিবে।
তমাল বাবা হতে যাওয়ার খবর শুনে বেশ খুশি মনেই কাসফিকে নিতে চলে আসে। কাসফি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। তার মনে হচ্ছিলো সে এত দিন যে তমালকে দেখে এসেছে আজ সে আসেনি। আজ এক অন্য তমাল এসেছে। ঠিক তার স্বপ্নের সাথে মিলে যাওয়া তমাল।

তমাল খুব যত্ন সহকারে কাসফিকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো। মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক সময় ধরে বুঝিয়ে চলেছে, এখন তোমাকে নিজের সাথে সাথে আরো একজনের দায়িত্ব নিতে হবে। শরীরের প্রতি একদম অবহেলা চলবে না। সময়মত খাওয়া দাওয়া করতে হবে। আর ডাক্তার যা যা বলে দিয়েছেন সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।
কাসফি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তমালের কথাগুলো শুনছে আর সেই আগের মতই কাদঁছে। যদি কান্নার আলাদা আলাদা রং থাকতো তবে বুঝা যেত কাসফির আজকের কান্না আর সেই দিনের কান্না এক নয়। সেই দিন ছিলো নিজের স্বপ্ন ভাঙ্গার আর না পাওয়ার বেদনার্ত কান্না। আজকের কান্না স্বপ্ন পূরণ আর ভালোবাসা পাওয়ার আনন্দে উচ্ছসিত কান্না।

পুরো নয়টা মাস তমাল নিজের সর্বস্ব দিয়ে আগলে রেখেছে কাসফি আর তার অনাগত সন্তানকে। আজ তার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটার সময়।
কাসফিকে ওটিতে পাঠানো হবে। কাসফি ওটিতে যাওয়ার আগে তমাল তার হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলছে, ভয় পেয়োনা কিচ্ছু হবেনা। আল্লাহর ওপর ভরসা কর। আর আমিতো আছি তোমাদের অপেক্ষায়।
কাসফি তমালের হাত চেপে ধরে বলে, আমার তো আজ কোন ভয় নেই। আমার কোন দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। জানো আমার নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হয়। তোমার মতো কাউকে স্বামী হিসেবে পাওয়া সত্যিই আমার জন্য বড় সৌভাগ্যের। তমাল কাসফির ভেজা চোখ মুছিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলে, তুমি আমায় ক্ষমা করে………..! তমালের কথা শেষ হওয়ার আগেই কাসফি মুখ চেপে ধরে বলে, চুপ করো প্লিজ। আমার কাছে তোমার কোন অপরাধ নেই, থাকতে পারেনা। তুমিতো আমাকেই নিজের কাছে অপরাধী করে দিয়েছো। আমি তোমাকে চিনতে ভুল করেছিলাম। তাই যেদিন সত্যিকারের তোমার দেখা পেয়েছি সেদিন থেকেই তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সব থেকে নিস্পাপ।

কাসফির কথা গুলো শুনে তমাল নিজের চোখের জলের ধারা আটকে রাখতে পারেনি। কাসফি তার আচল দিয়ে তমালের চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলে, তুমি অপেক্ষা করো তোমার ভালোবাসার জোড় ফিরে আসার ওপেক্ষা।

প্রায় আধ-ঘন্টা পর ওটি থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। তমাল আলহামদুলিল্লাহ বলে ওঠে দাঁড়ায়। একজন নার্স এর কোলে করে একটা ফুটফুটে মেয়ে এসে হাজির হলো তমালের সামনে। নার্স এসে জিজ্ঞেস করলো বাচ্চার বাবা কে আপনি?তমাল উত্তর দেয়ার আগেই যেন উনি বুঝে গেছেন সেই মেয়ের বাবা।

নার্স তরিঘড়ি করে বলতে শুরু করলো যান আগে আরো দুই ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করুন তারপর মিষ্টি কিনে আনবেন। রুগীর অবস্থা ভালো না। আগে থেকে যে এক ব্যাগ রেডি করা ছিলো তা চলছে। কিন্তু তাতে হবে না কমপক্ষে আরো দুই ব্যাগ লাগবে।

তমাল কিছু না ভেবেই বলে দিলো, আমার আর ওর ব্লাডগ্রুপ একই। আমি দিতে পারবো?
নার্স বললো, হ্যা দিতে পারবেন। তারাতারি করুন। কিন্তু আরো একজন ডোনার জোগার করা দরকার। আচ্ছা অন্য কেউ সে ব্যবস্থা করুন আপনি ভিতরে আসুন।
তমাল ভিতরে ঢুকেই দেখলো কাসফি কেমন নিথর হয়ে ঘুমাচ্ছে। তবে কেনো জানি আজকেই কাসফিকে তার সব থেকে বেশি সুন্দরী মনে হচ্ছে। তমাল ভিতরে ডুকতেই ডাক্তার বললো, সরি। আর কিছুই করার নেই। ব্লিডিং এতটাই বেশি হচ্ছিলো যে রুগীর শরীরের পক্ষে সামলে নেয়া সহজ ছিলো না।

তমাল বুঝতে পারছিলো না সে কি শুনছে! সে কাসফির কপালে হাত রেখে বললো, আরে ওতো ঘুমাচ্ছে। আপনারা কি বলছেন আমিতো কিছুই বুঝতে পারছিনা!

তমাল হয়তো বুঝবে সে দায়িত্ব নিতে শিখেছে দেখে কাসফি নিজের কাঁধে থাকা দায়িত্ব গুলোও তার হাতে দিয়ে গেছে। হয়তো কাসফির মতো করে আবার আগলে রাখবে কাসফির রেখে যাওয়ার ভালোবাসার স্মৃতি চিহ্নের।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *