সাকু বাদশা
প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 12 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

গল্প লেখকঃ
লেখকঃ তাহসিন আহমেদ ধ্রুব
(মার্চ – ২০১৮)
…………

ছোট্ট কুড়েঘরটির ডান পাশের অংশ খসে পরে যাচ্ছে। উপরে দেয়া গোলপাতার আস্তরণ ভেদ করেও পানি পরে। মেঝে ভিজিয়ে দেয়। একটু জোরে বাতাস বইলেই ঘরটি হয়তো কোথাও উড়ে চলে যাবে।

কুড়েঘরটির সামনে এসে দাঁড়াল জালাল। জোরে ডাক দিল সাকু বাদশা বলে।

ঘর থেকে বের হলেন পঞ্চাশোর্ধ এক পুরুষ, যাকে বৃদ্ধই বলা চলে। পরনে ঢিলেঢালা লুঙ্গী, গায়ে হলুদ রঙের ফতুয়া। ঘাড়ে রেখে দেয়া গামছা। চুলগুলো বড় বড়, কানের পাশ দিয়ে সেগুলো পেছনে চলে গেছে। চোয়ালে এক আঙ্গুল পরিমাণ দাড়ি। দাড়িগুলো ভেজা। বোঝাই যাচ্ছে, কেবলই গোসল করে এসেছেন তিনি।

— কে আপনে? কি চান?
— দশ গ্রামের নামকরা গজলশিল্পী সাকু বাদশার বাড়ি এইটা না?
— হুম, কি দরকার?
— আপনের সাথে না, ওস্তাদ সাকু বাদশার সাথে কথা কইবার চাই।
— আমিই সাকু। কি কবেন, কন!

চমকে উঠল জালাল, নামকরা এই গজল শিল্পী তবে এই! খুব অবাক লাগলো তার বর্তমান অবস্থা দেখে। প্রথমবারের ধাক্কাটা অনেকেই হজম করে উঠতে পারেন না। তবে জালাল সেটা খুব ভালোভাবেই পারে। সে সাধারণভাবেই বলল,

— সামনের শুক্রবার, আজিজ মাষ্টারের বাড়ি। সারারাইত গজল চলবো। আপনেরে দাওয়াত। সময়মত আইসা পইরেন।
— আচ্ছা ঠিকাছে।

জালাল চলে গেল। সাকু বাদশা এখনো দরজার সামনে দাড়িয়ে আছেন। তার পৃথিবী ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। সারা জীবন গজল গেয়ে দিন কাটানো সাকু বাদশার আজ গজলের দাওয়াত পেয়েও চোখদুটি ছলছল করে উঠলো। ভেবেছিলেন আর কখনো গজল গাবেন না কিন্তু তিনি না ও করতে পারেন না কাউকে। কোন কথার উত্তরে সরাসরি “না” বলে দেওয়ার ক্ষমতা কিংবা সাহস কোনোটাই বিধাতা তাকে দেননি। তিনি ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন।

কবিতা খাটের ওপরে বসে কাঁথা সেলাই করছিল। বাবাকে দেখে তার হাত থেমে গেল। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কেডা আইছিল?
— জালাল
— কিসের জন্য?
— “গজলের দাওয়াত দিবার জন্য”, বলেই মাথা নিচু করে ফেললেন সাকু বাদশা।
মুহুর্তেই জ্বলে উঠলো কবিতার চোখ। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মুখে যেন খই ফুটতে লাগলো,
” রাজি হয়া গেছ! তাই না? আমি জানতাম তুমি রাজি হয়া যাবা। কিয়ের পিরিত এই গজলের জন্য? যেই গজল তোমারে সম্মান দেয় নাই। মাথাটা উচু করে বাঁচতে দেয় নাই। তিনবেলার খাওন ঠিক করে দেয় নাই। দু’পয়সা গাঁটে রাখার মতো ক্ষেমতা দেয় নাই। সেই গজলের জন্য? মায়েরে পারছিলা ডাক্তার দেহাইতে? পারছিলা দুইটা বড়ি খাওয়াইতে? পারছিলা বাঁচাইতে? পারোনাই তো। তাইলে আবার এই গজল গজল করো ক্যান? ক্ষেতা পুড়ি তোমার গজলের। যেদিকে চউখ যায় হেদিকে চইলা যামু। তবু তোমার উঠান মাড়ামু না। থাকো তুমি তোমার গজল নিয়া।”
সাকু বাদশা শূন্যদৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি জানেন যে, কবিতা তাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। তবুও এসব কথা প্রতিদিন শুনতে কার বা ভালো লাগে?
গজল সাকু বাদশার প্রান, তার ভালবাসা। যেই ভালবাসা তার বাপজান তাকে দিয়ে গিয়েছিল। শ্রদ্ধার সাথে সেই প্রতিভাগুলো তুলে রেখেছিল সে। আজ সেগুলো হারতে বসেছে। ভাতের কষ্ট তিনি অনেক করেছেন কিন্তু কখনো ছেড়ে দেননি ভালবাসার এই গজলকে। সাকু বাদশার মনে প্রাণে একটাই কথা।
“আমার প্রাণ আমার গজল। গজল হলো একটা শিল্প। আর আমি এই শিল্পের একজন শিল্পী”
শুক্রবার। ভরা মজলিসে চেয়ারমান আবদুল কুদ্দুস সাহেব বসে আছেন। সাকু বাদশার সামনে মাইক, মুখটা মাইকের সামনে নিয়ে তিনি বললেন,
“জাতি ভাইয়েরা, সালামু আলাইকুম। আইজ আপনেগো যেই গজলটা শুনামু। এইটা প্রাণের নজরুলের গজল। এই গজলটা তিনি একবসায় লিখিছেন। কত বড় প্রতিভা আছিলেন! সুবহানআল্লাহ। আইজ তাহার গানে মশগুল হই। আপনারা জানেন, তিনি মসজিদের পাশে ঘুমায়া আছেন। তার রুহের প্রতি মাগফেরাত নিয়া সবাই শুনবেন।”
ভরা গলায় গজল ধরলেন সাকু বাদশা। হাতে থাকা ব্যান্জোতে বাজছে করুন সুর। যেন মৃত্যু চারপাশ ঘিরে আছে। ব্যান্জোতে হাতের আঙ্গুল দেখা যাচ্ছেনা সাকু বাদশার, সুরের তালে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।

“হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ
দিলাম তোমার চরণ তলে হৃদয় জায়নামাজ।

আমি গোনাহগার বে-খবর
নামাজ পড়ার নাই অবসর
তব, চরণ-ছোওয়ার এই পাপীরে কর সরফরাজ।।

তোমার অজুর পানি মোছ আমার পিরহান দিয়ে
আমার এই ঘর হউক মসজিদ তোমার পরশ নিয়ে
যে শয়তান ফন্দিতে ভাই
খোদার ডাকার সময় না পাই

সেই শয়তান থাক দূরে তকবীরের আওয়াজ
হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।।”

উপস্থিত দর্শকদের চোখ বেয়ে পানি পরছে। সবাই সাকু বাদশার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দর্শকদের সবার চোখের পানি ঠিক যতটুকু বের হয়েছে, তার চেয়েও বেশী পানি ঝরছে দশ গ্রামের বিখ্যাত গজলশিল্পী সাকু বাদশার গাল বেয়ে। গাল বেয়ে পরা পানিগুলো তার দাড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে।

পৃথিবীর কাছে প্রশ্ন থাকে, এই চোখের পানি কি কারো প্রতি মমতার? না, এটা কারো প্রতি মমতার নয়। এটা একজন শিল্পীর শিল্পের প্রতি, দুর্নিবার আকর্ষনের সামান্য নমুনা মাত্র।

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *