রূপালী রাত
প্রকাশিত: মে ৪, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 83 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখকঃ
সামিও রাহমান
(মে – ২০১৮)
…………

উৎসর্গঃ প্রিয় উম্মে তাসবিহ, আপনি যে আমার স্ত্রী এবং আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ সেটা কি জানেন?

জগতেরে আমি দেখিবার লাগি
হেঁটে যাই পথে পথে
জগত আমারে দেয় না দেখা
সে চলে তাহার মতে
ভোর ছ’টা বাজতে না বাজতেই তাহিনার ঘুম ভেঙ্গে যায়। মিনিট দশেক এপাশ ওপাশ করেও ঘুমটাকে শোয়াতে না পেরে শেষ অবধি নিজেই উঠে পড়ে। মিনিট খানেক বিছানায় বসে থেকে বাসি মুখেই রান্নাঘরে গিয়ে বেশ কিছুক্ষন খুটখাট করে এক কাপ আদা চা বানিয়ে ছোট্ট বারান্দাটায় এসে বসে। যাই যাই করা শীতের রেশটুকু তাহিনার গায়ে জড়ানো চাদর ভেদ করে দেহে হুল ফোটায়। ভেতরের ঘর থেকে মায়ের কোরআন তেলোয়াতের শব্দ ভেসে আসে। তাহিনা গায়ে শীত মাখিয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে মায়ের কোরআন তেলোয়াত শুনতে থাকে। হঠাতই মায়ের কোরআন তেলোয়াতের শব্দকে ছাপিয়ে তাহিনার মোবাইলটা বেজে উঠে। তাহিনা চায়ের কাপটা রেখে তার রুমে গিয়ে বিছানা থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখে সিমিনের ফোন। ‘এতো ভোরে সিমিনের ফোন কেন?’ ভাবতে ভাবতে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে সিমিন গড়গড় করে যে কথাগুলো বলে উঠে, তার সারমর্ম হলো – গতরাতে সিমিন, রেহনুমা, নুপুর, আলেয়া এবং মুন্নি মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ রাতের বাসে তারা সেন্টমার্টিন যাচ্ছে, তাহিনাও তাদের সাথে যাচ্ছে। পাঁচ হাজার টাকা করে চাঁদা ধরা হয়েছে। তাহিনা যেন ব্যাগ ব্যাগেজ গুছিয়ে বিকেলেই হোস্টেলে চলে আসে।

তাহিনা জগন্নাথ ইউনিভার্সিটির অ্যাকাউন্টিং এর শেষ বর্ষে পড়ছে। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার এক মাসের ভেতরে সিমিন, তাহিনা, নুপুর, রেহনুমা, আলেয়া, মুন্নি – এই ছয়জন মিলে নিজেদের অজান্তেই একটি গ্রুপ তৈরি করে ফেলে। রেস্টুরেন্টে যেমন সেট মেন্যু থাকে, তাদের ডিপার্টমেন্টে তারা ছয়জন তেমন সেট মেন্যু। কেউ যদি সেট মেন্যুর এক আইটেমকে কোন কাজে ডাকে, তবে অন্য আইটেমেরাও তার সাথে সাথে হাজির। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা এবং পুরুষদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা সকলই কিছু বিষয়ে একমত পোষন করে। যেমন –
১) তারা কখনোই বিয়ে করবে না।
২) কোন পুরুষ যদি তাদের কারো সাথে ছোক ছোক করে, তবে বাকি সকলে তার পাশে গিয়ে সেই পুরুষকে নাকানি চুবানি খাওয়াবে (ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজনকে খাওয়ানো হয়েছে)।
৩) তারা সকলেই নিরাপত্তার সার্থে তাদের হ্যান্ডব্যাগে একটি ছুরি রাখে, যেন একাকী অবস্থায় লোলুপ পুরুষ নামক কুকুরের দল থেকে নিজেকে বাচিয়ে রাখতে পারে।
৪) পড়াশোনা শেষ করে তারা সকলে মিলে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে বাকি জীবন সেখানেই কাটিয়ে দেবে।

তাহিনা সিমিনের সাথে কথা বলা শেষ করে একই সাথে বেশ উত্তেজিত এবং চিন্তিত হয়ে পড়ে। উত্তেজিত হওয়ার কারন – বহুদিন ধরে স্বপ্ন দেখছে সেন্টমার্টিন যাবে। কিন্তু এই ঝামেলা, সেই ঝামেলায় শেষ অবধি আর যাওয়া হয়ে উঠেনি। আজ সে স্বপ্ন পুরন হতে যাচ্ছে। আর চিন্তিত হওয়ার কারন – মাসের শেষ, এই মুহূর্তে পাঁচ হাজার টাকা যোগাড় করবে কিভাবে। যে টিউশনী দু’টো করে সেখানেও আজ অফ ডে। ফোন করে টাকার কথা অবশ্য বলা যায়, কিন্তু তাহিনার মন তাতে সায় দেয় না। তা ছাড়া বাসাতেও ম্যানেজ করার বিষয় আছে। হায়রে মেয়ে মানুষ! বিয়ের আগে মা বাবা ভাইকে, বিয়ের পর স্বামীকে আর বিয়ের পর সন্তানদের – তাদের সারাটা জীবন কেটে যায় ম্যানেজ করতে করতে।

রাত ৮টা বেজে ৮ মিনিট। তাহিনারা সবকিছু ম্যানেজ করে এই মুহূর্তে শ্যামলীর টেকনাফগামী বাসে বসে আছে। তাহিনার টাকাটা আপাতত নুপুর দিচ্ছে, টিউশনীর টাকা পেলে তাহিনা দিয়ে দিবে। আর বাসায় বড় ভাইয়াকে বুঝিয়ে বলতেই ভাইয়া মা বাবাকে ম্যানেজ করে নেয়। তার বড় ভাই বেশ প্রগতিশীল মনের মানুষ। মেয়েরা কোন পুরুষ ছাড়া দূরে কোথাও যেতে পারবে না – এমন ধ্যান ধারণা পোষন করে না। তবে শর্ত দিয়েছে সাগরের খুব কাছে যাওয়া যাবে না। বড় ভাইয়েরা বোনদের শুধু শাসনই করে না, স্নেহও করে। সমস্যা হচ্ছে তাদের স্নেহগুলো বেশিরভাগ সময়ই রাগের চাদরে ঢাকা পড়ে থাকে।

৮ টার সময় বাস ছাড়ার কথা। আরো ৮ মিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার পরো বাস না ছাড়াতে আলেয়া অস্থির হয়ে উঠে। ‘কিরে! বাস ছাড়ছে না কেন এখনো?’ ‘ছাড়বে ছাড়বে, অত অস্থির হইস না। তুই তো তোর জামাইয়ের কাছে যাচ্ছিস না।’ পাশ থেকে ফোঁড়ন কাটে নুপুর।

সিমিন হচ্ছে তাহিনাদের দলনেত্রী। খুব অ্যাকটিভ এবং ঠান্ডা মাথার মেয়ে। একদিনের ভেতর সেন্টমার্টিনে রিসোর্ট বুকিং, বাস টিকেট, শীপ টিকেট – সব অ্যারেঞ্জ করে ফেলেছে। রেহনুমা ঠিক এর উলটো। প্রচন্ড ভীতু টাইপের মেয়ে। আরশোলা উড়তে দেখলেই মূর্ছা যায়। নুপুর আবার এই দু’জনের ঠিক মাঝামাঝি ধরনের – না সাহসী, না ভীতু। পড়াশোনায় বেশ ভালো। তবে পড়ার বই থেকে গল্পের বই-ই বেশি পড়ে। আর হ্যা, বেশ স্পষ্টবাদী। উচিত কথার ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয় না। আলেয়ার বিষয়ে তো আগেই বলা হয়েছে – খুব অস্থির ধরনের মেয়ে, তবে মনটা বেশ নরম। তা ছাড়া তার আরেকটি বিশেষ গুন রয়েছে – খুব সুন্দর ছবি তুলতে পারে। মুন্নি। পৃথিবীর প্রতিটি ভার্সিটিতে এমন কিছু মেয়ে থাকে যারা পারে না এমন কোন কাজ নেই। মুন্নি হচ্ছে সেই ধরনের মেয়ে। মা বাবার ডিভোর্স হয়েছে ১২ বছর আগে। ডিভোর্সের দু’ বছরের মাথায় বাবা আরেক মহিলাকে বিয়ে করে সংসার পেতেছে। মা একটি প্রাইভেট ফার্মে জব করে। সে মায়ের সাথেই থাকতো। বছর তিনেক আগে অফিসের বিপত্নীক বসের সাথে মায়ের ঘনিষ্ট মেলামেশাটা চোখে পড়ার পর নিজেই আয়োজন করে মায়ের বিয়ে দিয়েছে। তারপর তাদের সুখে শান্তিতে থাকতে দিয়ে নিজে একটি মহিলা হোস্টেলে উঠে গিয়েছে (পরে অবশ্য সিমিনদের হোস্টেলে জয়েন করে)। মা অবশ্য প্রতি মাসে খরচ পাঠিয়ে দেয়। তা ছাড়া সৎ বাবা মানুষটাও খারাপ না। প্রতি মাসেই এটা ওটা নিয়ে এসে দু’জনে দেখে যায় তাকে। তাহিনা নিজে একটু চুপচাপ ধরনের মেয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি টুকটাক কবিতা লেখে। দু একটা বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায় ছাপাও হয়ে যায়। এ ছাড়া গানটাও বেশ ভালোই গায়।

বাস ছেড়েছে ৮টা ২২ মিনিটে। তাহিনা মুন্নিকে বলেছিলো জানালার পাশে বসবে কি না। কিন্তু মুন্নিই না করেছে। ‘আরে নাহ, তুই বোস, লাগলে পরে আমি বসবো নে।’ প্ল্যান করার পর থেকে গাড়ি ছাড়ার আগ পর্যন্ত তাদের মাঝে প্রচন্ড এক এক্সাইটমেন্ট কাজ করছিলো – কে জানালার পাশে বসবে, সেন্টমার্টিন গিয়ে কে কোন মাছ খাবে, কে কতক্ষন সাগরে গোসল করবে, কে কে সাইকেল চালাবে – এসব বিষয়ে তারা সারাদিনই দফায় দফায় বৈঠক করেছে। আর তাই বাস ছাড়ার পর ভেতরের বাতি নিভিয়ে দিতেই এক একজন ঘুমে ঢলে পড়ে। ৩ ঘন্টা লাগিয়ে কাচপুরের জ্যাম ঠেলে রাত তিনটার সময় এসে ফেনীতে বিরতি দিতে তাদের সেই ঘুম ভাঙ্গে। বাস থেকে নেমে রেস্তরায় ফ্রেশ হয়ে সবজি পরোটা আর চা খেয়ে একসাথে গ্রুপ সেলফি তুলে পুনরায় বাসে এসে বসে। তারা যখন সেলফি তুলছিলো তখন আশেপাশের যাত্রী, রেস্তরার ম্যানেজার, ওয়েটাররা হা করে তাকিয়ে ছিলো। রাত তিনটার সময় এভাবে ছ’টা মেয়ে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে – বিষয়টা তারা সহজভাবে নিতে পারছে না। তবে ব্যতিক্রমও ছিলো। তারা যখন সেলফি তোলা শেষে বাসে উঠতে যাবে তখন ৫৫ থেকে ৬০ এর মাঝামাঝি বয়সের এক মহিলা স্বামী সমেত তাদের কাছে এসে বলেন – ‘আমি সুলতানা ইয়াসমিন বলছি। তোমাদের সাথে একটু কথা বলতে পারি ?’
‘জী বলুন।’
‘কোথায় যাচ্ছো তোমরা দলবল বেধে?’
‘জী, সেন্টমার্টিন।’ উত্তর দেয় সিমিন।
‘তোমাদের মা বাবারা এভাবে যেতে দিচ্ছে?’
‘যেতে না দেওয়ার মত কি কিছু করছি আমরা?’ খানিকটা ঝাঁজ মিষিয়েই প্রশ্নের উত্তরে উলটো প্রশ্ন ছুড়ে দেয় নুপুর।
‘না না, আমি তা বলছি না। আমি আসলে ভাবছি তোমরা কত লাকী।’ সিমিন নুপুরকে আরেকটি প্রশ্ন করতে দেখে কড়ে আঙ্গুলে আলতো করে চিমটি দিয়ে থামাতে চায়। কিন্তু যে কোন কারনেই হোক নুপুর খেপে গিয়েছিলো। তাই সিমিনের চিমটিকে অগ্রাহ্য করে পুনরায় প্রশ্ন করে -‘কিছু মনে করবেন না ম্যাম, একটি প্রশ্ন করি?’

‘কী, বলো।’ ‘আপনার মেয়ে যদি এভাবে সেন্টমার্টিন যেতে চাইতো, আপনি দিতেন?’ নুপুরের প্রশ্নতে মুহূর্তেই পুরো জায়গাটায় একটি অস্বস্থিকর নীরবতা নেমে আসে। মহিলা কিছুক্ষন এক দৃষ্টিতে মুন্নির দিকে তাকিয়ে থেকে আলতো করে একটা হাসি দিয়ে বলেন – ‘কি ব্যাপার মা, টিচারদের প্রতি কি তোমার অনেক রাগ?’ মহিলার স্বামী কিছু একটা বলতে যেতেই তিনি থামিয়ে দেন। ‘আমাকে প্রশ্নটি করেছে, আমাকেই উত্তর দিতে দাও।’ কথাটা বলে কিছুটা দম নেন সুলতানা ইয়াসমিন। তারপর মিষ্টি একটা হাসি ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে বলেন – ‘মা, আমার মেয়ে আদৃতা ইয়াসমিন একজন মাউন্টেনিয়ার, এভারেস্ট জয়ের চেষ্টা করছে। বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বচ্চ্য উঁচু পর্বত শৃঙ্গ অ্যাকোনকাগুয়া জয় করতে আর্জেন্টিনায় আছে। তবে হ্যা, সেখানে তার সাথে আরো কিছু ছেলে পর্বতারহী আছে, তোমাদের মত শুধু মেয়েরা না।’ কথাটা বলেই সুলতানা ইয়াসমিন এমনভাবে হেসে উঠে যে মেয়েদের মনে হয় তাঁর মত ভালো মানুষ এই পৃথিবীতে আর একটিও নেই। ঝুমুর তো ‘স্যরি’ বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেললো।

বিরতির পর বাসে উঠতে গিয়ে ছোটখাটো একটা সমস্যা হয়। তারা যখন একসাথে বাসে উঠছিলো তখন সবার পেছনে ছিলো মুন্নি। তার পেছনে এক হ্যান্ডসাম পুরুষ। পোশাক আশাকে মার্জিতভাব স্পষ্ট। মুন্নি বাসে উঠতে গিয়ে লক্ষ করে সেই মার্জিত পোশাকের হ্যান্ডসাম যুবক অকারণেই পেছন থেকে হালকা ধাক্কা দিচ্ছে। মুন্নি প্রথমবার কিছু বলেনি, কিন্তু সেকেন্ড দশেকের বিরতির পর পুনরায় যেই ধাক্কা দিয়েছে ওমনি পেছন ফিরেই কলার ধরে ঠাটিয়ে চড়। তারপর কোন কথা নেই, এলোপাতাড়ি কতক্ষন চড় কিলঘুষি চালালো। লোকজন এসে মুন্নিকে থামাতে থামাতে যুবকের দফারফা। বাসের অন্যরা সব শুনে পুনরায় আরেক দফা মারের প্রস্তুতি নেয়, কিন্তু মুরুব্বী গোত্রীয় একজন ছেলেটিকে মুন্নির কাছে মাফ চাইয়ে সবাইকে নিরস্ত্র করেন। বাস চট্টগ্রাম আসতেই ছেলেটি মাথা নিচু করে দ্রুত বাস থেকে নেমে যায়।
কাচপুরের জ্যামের কারণে ৮টার বাস সাড়ে ১০টায় এসে পৌঁছায়। ততক্ষনে তাহিনাদের শীপ সহ অন্যান্য শীপগুলোও টেকনাফ ছেড়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছে। তাহিনারা ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে কিছুক্ষন বোকার মত শীপঘাটে দাঁড়িয়ে থাকে। সিমিন সবার আগে নিজেকে সামলে নিয়ে অন্যদের প্রশ্ন করে – ‘এখন তাহলে কী করা যায় ?’
‘কি আর করবো, এখানেই একটা হোটেল টোটেল খুঁজে বের করে আজকের দিনটা কাটিয়ে কাল সেন্টমার্টিন যাবো।’ সিমিনের প্রশ্নের উত্তরে বলে উঠে রেহনুমা।
‘কিন্তু তাহলে তো একটা দিন শেষ হয়ে যাবে!’ পাশ থেকে বলে উঠে আলেয়া।
‘গেলে আর কি করার। এ ছাড়া তো আর কোন উপায়ও নেই।’
‘আছে, উপায় আছে।’ সকলে একসাথে মুন্নির দিকে তাকায়।
‘আমরা ট্রলারে যাবো।’
‘কি বলিস! ট্রলার জার্নিতো অনেক ভয়ংকর।’ সিমিন বলে উঠে।
‘তাতে কি! আমরা তো ভয়ংকর সৌন্দর্য দেখার জন্যই এখানে এসেছি।’
‘ঠিক।’ মুন্নিকে সায় দেয় নুপুর।
‘না বাবা, আমি ট্রলারে করে যেতে পারবো না। ভয়ে মরেই যাবো।’ ভেটো দিয়ে বলে উঠে রেহনুমা।
‘তুই মরে গেলে আমরা তোকে বাঁচাবো। কিন্তু এখানে থেকে একদিন নষ্ট করা যাবে না। থাকবোই দু’দিন, তার মাঝে একদিন নষ্ট হয়ে গেলে একদিনে সেন্টমার্টিন কি ঘোড়ার ডিমটা দেখবো!’ বলে উঠে নুপুর।
শেষ অবধি সিদ্ধান্ত হয় তারা ট্রলারে করেই সেন্টমার্টিন যাবে। সেই মোতাবেক বাক্স প্যাটরা নিয়ে সব ট্রলার ঘাটের দিকে রওনা করে।
ট্রলার ঘাটে এসে দেখে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে শেষ ট্রলারটি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তারা সকলে মিলে ‘এই! থামেন থামেন।’ বলে কোনমতে ট্রলারটি থামিয়ে জনপ্রতি একশ’ টাকা করে টিকেট কেটে ট্রলারে উঠে বসে।
ট্রলারে তারা ছাড়াও ঢাকা থেকে আগত এবং স্থানীয় মিলিয়ে আরো কিছু যাত্রী ছিলো, যারা সকলেই তাদের দিকে আড়চোখে দেখছিলো। ঢাকা থেকে নতুন বর সমেত আগত এক মেয়ে তো চোখ বড় বড় করে বলেই ফেললো- ‘আপনারা কোন ছেলে মানুষ ছাড়া এভাবে একা একা সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন ?!’
ট্রলার ছাড়ার পর মেয়েরা ছোট্ট বাচ্চাদের ন্যায় হাউকাউ এ মেতে উঠে। এমন কি যে রেহনুমা ভয়ে ট্রলারে করে যেতে চায়নি, সেও এমন শান্ত সাগর দেখে নিজেই নিজেকে নিয়ে ফোড়ন কেটে উঠে –‘ধুর! এমন শান্ত সাগরে ট্রলারে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম!’ ট্রলারের হেলপার রেহনুমার কথাটা শুনে মনে মনে বলে উঠে – ‘দইজ্যার বিছখানে যাই লঅঅ, বাদে বুজিবা অনে টলারত চরিবার মজা।’
ঘন্টা দেড়েক যাওয়ার পর ট্রলার যখন উত্তাল সাগরে পড়লো, তখন শুরু হলো এক একজনের হাউকাউ। আগের হাউকাউ এ ছিলো উৎসবের আমেজ, আর এখনের হাউকাউ এ মহা প্রলয়ের সুর। এক একটা ঢেউ যখন ট্রলারে আছড়ে পড়ে ট্রলারটাকে কাত করে দিচ্ছে, তখন মেয়েদের সে কি চিৎকার। মাঝি যতই তাদের চুপ করে বসে থাকতে বলছে, তারা তত জোরে চিৎকার করে উঠছে। আলেয়া ইতিমধ্যে দুই দফা বমি করে ফেলেছে। রেহনুমা কাঁদতে কাঁদতে বলছে –‘আমি বাসায় যাবো।’ সিমিন রেহনুমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঝাড়ি মারে। -‘একবারে চুপ, এখন বাসার দিকে গেলে কি ঢেউ কমে যাবে? ঐ যে দেখ, সেন্টমার্টিন দেখা যাচ্ছে। আর একটু অপেক্ষা কর, পাঁচ মিনিটের ভেতর ট্রলার থেকে নেমে যাবো।’ রেহনুমা সিমিনের কথানুযায়ী সামনে তাকিয়ে সত্যি সত্যি সেন্টমার্টিনের অবয়ব দেখতে পেয়ে কান্না থামায়।
ট্রলার থেকে নেমে তাদের এক একজনের চেহারা হয়েছে দেখার মত। মুন্নি আর সিমিনকে তাও চেনা যাচ্ছে, অন্যদের তো একেবারে যাচ্ছে তাই অবস্থা। কোনমতে লট বহর নিয়ে জেটির সাথের একটি হোটেলে ঢুকে বেশ অনেকটা সময় নিয়ে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে নেয়। ইতিমধ্যে তারা যে রিসোর্ট বুকিং দিয়েছে, সেখান থেকে লোক এসেছে তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। খাওয়া দাওয়া শেষে দুটো ভ্যান নিয়ে গাইড সমেত রিসোর্টের দিকে রওনা দেয়। মিনিট বিশেক যাওয়ার পর ভ্যানওয়ালারা তাদেরকে যেখানে নিয়ে আসে, সেখানে দাঁড়িয়ে তারা কিছুক্ষনের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। পুরো রিসোর্টটা ছোট ছোট কুটির দিয়ে সাজানো। কুটিরগুলোর চারপাশে অসংখ্য নারিকেল গাছ। কুটিরের প্রধান ফটক দিয়ে সামনে তাকালেই সাগর। বিশ কদম হেঁটে গেলেই সাগর ছোঁয়া যায়! প্রধান ফটকের পাশেই কিছু নারিকেল গাছে হেমক (দড়ির বিছানা) বেধে দেওয়া হয়েছে। চাইলেই যখন তখন হেমকে শুয়ে সাগরের গর্জন শুনতে শুনতে বিভূতি বাবু, সমরেশ বাবুদের সাথে খোশ গল্পে মেতে উঠা যায়। যেই রেহনুমা মাঝ সাগরে ট্রলার ঘুরাতে বলছিলো বাসায় চলে যাবে বলে, সেই রেহনুমাই প্রকৃতির এই অকৃত্রিম রূপ দেখে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলে উঠে –‘আমি এখান থেকে কোত্থাও যাবো না! কোত্থাও না!!’
প্রকৃতি আমি তোমার কাছে
চাই না যে আর কিছু
চাইছি শুধু থাকতে দিও
তোমার পিছু পিছু

রিসোর্টে এসে প্রথম কিছুক্ষন তারা এক ধরনের বিভ্রমের মাঝে চলে যায়। বিভ্রম কেটে যেতেই ব্যাগ ব্যাগেজ কোনমতে কুটিরে রেখে কাপড় চোপড় না ছেড়েই সোজা সাগরে দৌঁড়। তারা যেন এক মুহূর্তেই কোন এক টাইম মেশিনে চড়ে দশ বছর পেছনের শৈশবে চলে গিয়েছে। আলেয়া আর সিমিন বিচ থেকে দৌঁড়ে গিয়ে সাগরের ঢেউয়ে লাফিয়ে পড়ছে। ঝুমুর, রেহনুমা, মুন্নি কোমর পানিতে নেমে একে অপরের গায়ে পানি ছুড়ে মারছে। তাহিনা সাগর পাড়ে ঝিনুক কুড়ুতে ব্যস্ত। স্রষ্টা উপর থেকে অবাক নয়নে হঠাতই কৈশরে ফিরে যাওয়া মেয়েগুলোর কাজ কারবার দেখতে থাকে।
রাতে বারবি কিউ পার্টি করে ফানুস উড়িয়ে ডাবল বেডের এক কুটিরে এক এক খাটে তিনজন জড়াজড়ি করে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন ভোরবেলা তাহিনা ঘুম থেকে উঠে সাগরের পাড়ে এসে ডেক চেয়ারে চুপ করে বসে থাকে। সাগরের ঢেউগুলো একের পর এক এসে আছড়ে পড়ে তাহিনার পায়ের কাছে। তাহিনা এক দৃষ্টিতে ঢেউয়ের আসা যাওয়া দেখতে থাকে। হঠাতই ঝুমুর পেছন থেকে এসে ‘ভাউ’ বলে চমকে দেয়।
‘এতো ভোরে একা একা কী করিস ?’
‘সাগর দেখি। এত্ত সুন্দর একটা জায়গায় মাত্র দু’দিনের জন্য এসেছি ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাই যত পারছি মন ভরে দেখে নিচ্ছি। ঢাকা গেলে তো সারাদিন ঘুমাতেই পারবো।’
‘আসলেই। পৃথিবীটা এতো সুন্দর কেন বলতো। আমার না এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করছে না।’
তাহিনা লক্ষ করে চার পাঁচটা বখাটে টাইপ ছেলে তাদের আশে পাশে ঘোরাফেরা করছে। আবার কেমন করে যেন তাকাচ্ছেও। বিষয়টা ঝুমুরকে বলতেই ঝুমুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে – ‘চল, রিসোর্টে যাই।’
বল দেখি কোথা যাই,
কোথা গেলে শান্তি পাই??
ভাবিলাম বনে যাবো,
তপিত হিয়া জুড়াবো।
সেথা দেখি অর্ধ রাত্রে,
কাঁদে মৃগী,, কম্প গাত্রে !!
সকালে নাস্তার পর তারা বোটে করে ছেড়াদ্বীপ যায়। ট্রলারে করে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন আসাতে সকলেরই ঢেউভীতি কেটে গিয়েছে। আধাঘন্টার মত বোট জার্নির পর তারা যখন ছেড়াদ্বীপে এসে নামে, তখন তাদের মনে হতে থাকে তারা জান্নাতুল মাওয়া থেকে জান্নাতুল ফিরদাউসে চলে এসেছে। তফাত শুধু একটি – এখানে ছোক ছোক করা পুরুষ আছে। তাই কিছুটা বাধ্য হয়ে ছেড়াদ্বীপ পুরোটা না ঘুরেই চলে আসে।
বিকেলে সাইকেল ভাড়া নিতে গিয়ে জানা গেলো সিমিন আর মুন্নি বাদে আর কেউ সাইকেল চালাতে জানে না। তাই আর সাইকেল ভাড়া না নিয়ে বিচে ঘোরাঘুরি করে তাজা ফিশ ফ্রাই খেয়ে রিসোর্টে ফিরে আসে। রাতে খাওয়া দাওয়ার পর বিচে গানের আসর বসে। তাহিনাকে বহুত হাতে পায়ে ধরার পর কিন্নর কন্ঠে গেয়ে উঠে –
আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে
নীলজল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো
আমি শুনেছি সেদিন তুমি নোনা বালি তীর ধরে
বহু দূর বহু দূর হেটে এসেছ

আমি কখনো যাই নি জলে কখনো ভাসিনি নীলে
কখনো রাখিনি চোখ ডানা মেলা গাংচিলে
আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নান -এ যাবে
আমাকে ও সাথে নিও নেবে তো আমায় বল
নেবে তো আমায়

গান শেষে বেশ কিছুক্ষন বিচে হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত লাগার কারনে কুটিরে এসে শুয়ে পড়ে সবাই।
মাঝরাত্রিতে কেন যেন তাহিনার ঘুম ভেঙ্গে যায়। পাশ ফিরে দেখে আলেয়া নেই। বাথরুমে গিয়েছে ভেবে জানালা দিয়ে সাগর দেখার জন্য তাকাতেই আলেয়ার ন্যায় একটি অবয়বকে দেখে সাগরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। বাকিদের মড়ার মত ঘুমুতে দেখে কাউকে আর না ডেকে নিজেই চাদরটা গায়ে দিয়ে আলতো করে কুটির থেকে বের হয়ে আসে। তারপর ধীরে ধীরে আলেয়ার পেছনে এসে দাঁড়ায়। আলেয়া সাগরের দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। কান্নার দমকে দমকে তার শরীর কেঁপে উঠছে। আলেয়া কি কারণে কাঁদছে সেটা তাহিনা জানে না, তথাপি আলেয়ার জন্য তার খুব কষ্ট হচ্ছে। তার ইচ্ছে করছে পেছন থেকে আলেয়ার কাঁধে হাত রেখে দুঃখটাকে ভাগ করে নিতে। কিন্তু তাহিনা সেটা করে না। মেয়ে মানুষের এমন কিছু দুঃখ রয়েছে, যে দুঃখ কেবল তাকেই বয়ে বেড়াতে হয়। অন্য কেউ সে দুঃখের ভাগীদার হতে পারে না।
তাহিনা সাগর তীরের বালি ঠেলে ধীর পায়ে কুটিরের দিকে হেঁটে যায়। আলেয়া সাগরপানে তাকিয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে…………..

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *