প্রতিচ্ছবি
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮
লেখকঃ

 53 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

পাশের ঘর থেকে পরিচিত সেই হাটার শব্দটা আবার শুনা যাচ্ছে। একটু পর পর শব্দটা হচ্ছে। নির্ঘাত ইদুঁরের শব্দ। শায়ানকে আজকেও বলেছিলাম আসার সময় ইদুঁর মারা বিষ নিয়ে আসতে। কিন্তু আজকেও আনা হলো না। তার এই ভুলো মনের স্বভাবটা হয়ত আর পাল্টবে না। ঐদিন মার্কেটেও এমনটা হলো। অনেকগুলো দোকান ঘুরার পর একটা শাড়ি পছন্দ হলো। সবুজের মধ্যে হালকা হলুদের ছাপ। এত সুন্দর একটা শাড়ি সে কিনা রাস্তায় ভুলে কোথাও ফেলে রেখে আসলো! ঐদিন ইচ্ছে হয়েছিলো জগৎ সংসার ভেঙ্গে ওর উপর রাগ করতে। কিন্তু পারি না। এত ভালো একটা মানুষ হয়ত পৃথিবীতে আর একটাও নেই।

শব্দটা খুবই ধীর গতিতে বাজছে। নায়লা কান পেতে বুঝার চেষ্টা করছে। নাহ, এটা ত ইদুরের শব্দ নয়। শব্দটায় একটা বড় কিছুর হাটার ছাপ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এখানে ত অন্য কারো উপস্থিতি থাকার কথা নয়। নায়লা এবং শায়ানের বিয়ে হয়েছে আজকে ২ বছর। আগে থাকতো বাড্ডার ১১ নাম্বার গলিতে। ভালোই ছিলো তখন। মানুষের মাঝে বসবাস। কিন্তু এখন গাজীপুরের একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে মূল সড়ক থেকে আরো ১৫ মিনিটের রাস্তা। খুবই নির্জন একটা এলাকা। আশেপাশে দু একটা ঘরের বেশি কিছু দেখা যায়। নায়লাদের বাড়িটাও খুব পুরাতন। বড় বড় কামরার কয়েকটা রুম। দুইটা রুম তালা দেওয়া। সেখানে নাকি কি সব জিনিসপত্র আছে।

নায়লার খুব পানির পিপাসা পাচ্ছে। সে কি শায়ানকে ডাকবে। শব্দটা যে বেজেই চলছে। খুবই অনিচ্ছা সত্তে সে শায়ানকে ডাকলো। এই, শুনছো। শায়ান ঘুমে এতটাই বিভোর যে তার ডাকে কিছুই হলো না। নায়লা খুবই ভয়ে ভয়ে লাইটটি জালালো। রান্না ঘরের দিকে যেতেই তার চোখটি জানালায় আটকালো। জানালায় হুবহু সে তার নিজের মত একজনকে দেখতে পাচ্ছে। কালো একটা ছায়া যেনো নায়লারই প্রতিচ্ছবি।নায়লা খেয়াল করলো তার হাত পা কিছুই কাজ করছে না। মুখ থেকে যে সে কিছু বলবে সেই শক্তিটাও পাচ্ছে না। তারপর আর কিছু মনে নেই তার। সে জ্ঞান হারালো।

এখন কেমন বোধ করছেন? এই প্রশ্নের জবাবে নায়লা অনেকটা বিস্মিত হলো। একজন সাদা এপ্রোন পরা ডাক্তার তার ঠিক সামনে বসা। আগে কখনো দেখা হইনি উনাকে। জ্বি, অনেকটা ভালো। খুশির খবর আছে। এখন থেকে রেষ্ট এ থাকবেন। নায়লা তেমন কিছুই বুঝতে পারলো না। ডাক্তার কিছু ঔষুদ লিখে দিয়ে চলে গেলো। ডাক্তারকে বিদায় দিয়ে এসে শায়ান হাসি হাসি মুখে বললো সংসার ৩য় জন আসতে চলেছে। এখন থেকে তুমার সম্পূর্ন রেষ্টে থাকতে হবে। আমি বাড়িতে খবর পাঠিয়েছি। কাল পরশুর মধ্যেই নীলা চলে আসবে।

ভাবী, এই ভাবী। কি ভাবছো? কই, কিছু না ত। উহু, আমি মাত্র দেখলাম তুমি কি যেনো চিন্তা করছো। আমি প্রায়ই খেয়াল করি তুমি কেমন যেনো আনমনা হয়ে যাও। বিষয়টা কি ভাবী। বিষয় কিছুই না। নাহ, তুমি কিছু একটা লুকাচ্ছো আমার কাছে। বলো না ভাবী, কি ভাবছিলে। বললাম ত কিছু না। আচ্ছা, দেখো ত তুমার ভাই এলো কি না। নাহ, ভাবী এখনো আসে নাই। এতক্ষনে ত এসে পরার কথা।সন্ধ্যা হয়ে এলো। তুমার পড়াশুনার কি অবস্থা নীলা? এখন ত বন্ধ চলছে। বন্ধের পর নতুন করে ক্লাস শুরু হবে। অহ। আচ্ছা, চা খাবে? মন্দ হবে না ভাবী । তবে আমারটায় চিনি কিন্তু ২ চামচ। আচ্ছা, ঠিক আছে। দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ বাজছে। নিশ্চয়ই শায়ান এসেছে। নায়লা খুব তারাতারি দরজাটা খুললো। কিন্তু না,শায়ান ত আসে নি। একটা বৃদ্ধ মহিলা দরজার ওপাশে দাড়িয়ে আছে। সাদা ধবধবে একটা শাড়ি পরে আছে। এই সময় ত কোনো ভিক্ষুকের আসার কথা নয়। নায়লা মহিলাকে জিজ্ঞেস করলো, কি চান? বৃদ্ধ মহিলা কোনো জবাব দিলো। শুধু একটু হাসলো। নায়লা আবার জিজ্ঞাসা করলো, কাকে চান? বৃ্দ্ধ মহিলা বললো, নীলিমাকে চাই। নায়লা স্তব্ধ হয়ে গেলো। নীলিমা!!! ভাবী, দরজায় কি দেখছো? এই ভাবী, এখানে দাড়িয়ে আছো কেনো? নায়লা নীলার দিকে তাকালো। তারপর হাতের ইশারায় দরজায় ঐ বৃদ্ধ মহিলাকে দেখানোর চেষ্টা করলো। কি ঐখানে, কেউ ত নেই। তুমি শুধু শুধু এখানে দাড়িয়ে আছো কেনো। ভিতরে আসো। নীলা দরজা বন্ধ করে দিলো। নায়লা কিছুই বুঝলো না। এত বছর পর নীলিমার কথা কেনো উঠলো আর এই বৃদ্ধ মহিলাই বা তার কথা জানে কিভাবে! রাতে নায়লার প্রচন্ড জ্বর আসলো। গা পুড়ে যাবার অবস্থা। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। শায়ান মধ্যরাত ভেদ করেই ডাক্তার আনতে ছুটলো।

নায়লা এক বিশাল আকাশের নিচে খোলা ময়দানে দাড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না সে এখানে কিভাবে এলো। সে চারপাশটা খুব ভালো করে তাকাচ্ছে। কিন্তু কিছুই তার পরিচিত মনে হচ্ছে না। সে আকাশের দিকে তাকালো। কত সুন্দর নীল ঝকঝকে আকাশ। ওমা, এ কি,আকাশের রং যে বদলাতে শুরু করলো। আকাশটা এখন ঘন বেগুনী রঙ্গে পরিনত হয়েছে। আশপাশ থেকে কিছু মানুষের কোলাহল শুনা যাচ্ছে। সামনে কিছুটা দূরে বেশ কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে। চেহারাগুলি তেমন বুঝা যাচ্ছে না। সে ভয়ে ভয়ে সামনে এগুতে লাগলো। তাদের সামনে পৌছানোর পর সে হতবাক হয়ে গেলো। যে মানুষগুলোকে দেখছে সেগুলো তার পরিচিত চেহারা। তাদের দিকে তাকাতেই তার মনে পরলো এরা কেউ ত জীবিত না। সবাই মৃত। কোনো না কোনোভাবে সবাই মারা গিয়েছে। কিন্তু সে তাদেরকে জীবিত দেখছে কিভাবে! তার ভিতরটা এখন শুকিয়ে আসছে। সে ভয়ে নড়তে পারছে না। তারপর হঠাৎ একটা বিকট শব্দ যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।

নায়লা, কি হয়েছে। এমন করছো কেনো? আমার খুব ভয় করছে। আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো। আমি আর এখানে থাকবো না। আহ, কি হয়েছে বলবে ত। নাহ, আগে আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো,আমি আর এখানে এক মুহূর্তও থাকবো না। আমি এখনই বাড়ি যাবো। কি বলছো এসব। এখন যে গভীর রাত। সকালটা হোক তারপর ভাবা যাবে। আমাকে শক্ত করে ধরো, খুব ভয় লাগছে আমার। আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি ভয় পেয়ো না আমি আছি তুমার পাশে। নায়লা শায়নের কোলে মাথা রেখে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো সে নিজেও জানে না।

শায়ান এখন দিনরাত বাসায় থাকে। নায়লার অবস্থা খারাপ। যেকোনো সময় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তার জন্যই সে বেশ কিছুদিন ছুটি নিলো। শায়ানের মাও এসেছে বাড়ি থেকে। সবার মধ্যেই এক ধরনের চাপা অানন্দ আর অস্থিরতা কাজ করছে। সবাই নায়লার খুব যত্ন নিচ্ছে। তাকে সম্পূর্ণ রেষ্ট এ রাখা হয়েছে। সময়টা শড়ৎকাল। হঠাৎ হঠাৎ ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়। শায়ানের কপালে সামান্য ভাজ।খুব চিন্তিত দেখা যাচ্ছে তাকে। হঠাৎ সব অস্থিরতা ভেদ করে বৃষ্টি নামা শুরু করলো। এ যেনো এক কালবৈশাখী ঝড়।আর তখনই নীলা দৌড়ে এসে বললো ভাইয়া, ভাবীর ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে। শায়ান দৌড়ে নায়লার কাছে গেলো। গিয়ে দেখে নায়লার অবস্থা খুবই খারাপ। শায়ানের মা তাকে রুম থেকে বের করে দরজা লাগিলো দিলো। শায়ানের অস্থিরতার বেড়েরই চলছে। ভিতর থেকে নায়লার বুকফাটা আর্তনাদ শুনা যাচ্ছে। ঝড় আর আর্তনাদ একসাথে মিশে ভয়ানক এক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। চারপাশে হাটার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। শায়ানের নিজেরই কেমন যেনো ভয় ভয় লাগছে। কিছুক্ষন পর শায়ানের মা দরজা খুলে বললো, অবস্থা বেশি ভালো না। ডাক্তার লাগলো। শায়ানের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। এই ঝড় বৃষ্টির রাতে ডাক্তার কোথায় পাবে সে। কিন্তু সে এই ঝড়ের রাতেই বেড়িয়ে পড়লো। দিকহারা পথিকের মত সে এদিক ওদিক ছুটছে। শায়ান ছুটে চলছে, ছুটে চলছে এক নিয়তির খোঁজে…

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

১ Comment

  1. আফরোজা আক্তার ইতি

    ভয়াবহ অমীমাংসিত গল্প। নীলিমাটা কে সেটা স্পষ্ট হল না। লেখার ধাঁচ সুন্দর।তবে কথোপকথনগুলো কোটেশনের মধ্যে রাখবেন নাহলে মূল গল্পের সাথে মিলে এলোমেলো লাগে।
    অনেক ভালো লিখেছেন। তবে বানানে কিছু ভুল আছে।সংশোধন করে দেই।
    হাটার- হাঁটার।
    এটা ত- এটা তো।
    দু এক্টা- দু’একটা।
    সে কি শায়ানকে ডাকবে।- এখানে দাঁড়ি হবে না প্রশ্নবোধক চিহ্ন হবে।
    ঔষুদ- ঔষধ।
    তুমার – তোমার।
    দাঁড়িয়ে হবে।
    শুভ কামনা রইল।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *