প্রায়শ্চিত্ব
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮
লেখকঃ

 54 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

ফারিয়া কাউছার
.
গুনগুন শব্দে নিপার ঘুম হালকা হয়ে এলো। এখন আর এলার্মের কর্কশ আওয়াজ শুনতে হয় না। এখন জীবনের জন্য লড়তে গিয়ে টিউশনির জন্য তাড়াতাড়ি উঠতে হয় না। নিপা ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখে মুহিব কোরআন পড়ছে। বিয়ের আজ মাত্র চার মাস পেরুল। এরই মাঝে কত পরিবর্তন! এই কি সেই ছেলেটি? প্রায়শ্চিত্তের খাতিরেই কি তার এত পরিবর্তন এসেছে? গুনগুন শব্দ সুরেলা হয়ে আরেকবার নিপার কানকে মৃদুভাবে ছুঁয়ে গেল। নিপা চোখ নামিয়ে মেঝেতে তাকালো। এই যেন নতুন এক সূর্যের মিষ্টি রোদ ছেয়ে রয়েছে মেঝেতে।
ঠিক ছয়মাস আগে এভাবেই টাইলসের মেঝেটা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছিল। এই বুঝি সূর্য উঁকি দিচ্ছে। একটু আগেই তো নিপা ফজরের নামাজটা আদায় করল! কিসের ওপর দুই ঘণ্টা পেরিয়ে এত তাড়াতাড়ি সাতটা বেজে গেছে? কেউ একজন হয়ত ঠিকই বলেছে। ক্লাসের মধ্যে টিচার কান ধরে পাঁচ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখলে তা এক ঘণ্টার সমতুল্য লাগে। কিন্তু কোনো রমণীর পাশে এক ঘণ্টা বসলে তা পাঁচ মিনিটের মতোই লাগে। কে যেন বলল উক্তিটি? নিপার সহজেই মনে পড়ছে না। হয়ত গ্যালিলিও। না না নিউটন। আচ্ছা, উক্তিটা কি হুবহু এমন? দূর, এই সকালে কীসব নিয়ে মস্তিষ্ককে জ্বালাচ্ছে সে! ভাবা বন্ধ করে এলার্ম বন্ধ করল সে। নিত্যদিনের ন্যায় তাড়াহুড়ো করে খেয়ে টিউশনির জন্য বেরিয়ে পড়ল। এই সময় বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায় দুটো স্টুডেন্ট পড়াতে হয়। আবার আটটার দিকে তাদের সামনের ফ্ল্যাটের পিচ্চি ছাত্রী রাফাকে পড়াতে হয়। বিল্ডিংয়ের হাতে গোনা কয়েক ছেলেমেয়েকে ইন্টার পড়ুয়া মেয়ে নিপাই পড়ায়। আবার নয়টার দিকে দুই বিল্ডিং পেরিয়ে চিকন একটি নিস্তব্ধ গলির ছোটখাটো একটি বাসায় রূপা নামের একটি মেয়েকে পড়াতে যেতে হয়। সবশেষে সে নিজ প্রতিষ্ঠানে যায়। সবই প্রয়োজনের তাগিদে তার কাছে অগত্যা করতে হয়। গ্রামের বাড়িতে নিপা পড়ালেখা আগাতে অক্ষম ছিল অর্থের অভাবে। সক্ষমতা আনতেই এখানে খালার বাসায় ওঠে আসে। খালা বললেন, এখানে বেশ কয়েকজন ভালো হোম টিউটর চায়। তোর চেয়ে ভালো কেউ হতে পারে না। তাই চলে আসা। টিউশনির মাধ্যমে যে হাজার কতক টাকা আসে, তা দিয়েই পড়া চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জীবনের জন্য লড়তে মেয়েটি বোরকা পরে বেরুয় রোজ সকাল সাতটায়। মাঝখানের ছোটখাটো বিরতি বাদ দিলে বাসায় সন্ধ্যার আটটা নাগাদ ফেরেই না।
যথারীতিতে সে চতুর্থ তলার স্টুডেন্ট দু’জনকে পড়িয়ে রাফাকে পড়াতে যায়। নয়টার দিকে রূপাদের গলিতে ঢুকে। রূপা মেয়েটি উচ্চতার দিক থেকে নিপারই সমান। মাঝে মাঝে সে লজ্জায় ডুবে মরে। তার চেয়ে বড়জোর বছর তিনেক ছোট ছাত্রী কিনা তারই সমান! নিপার মতো করে সে বোরকা পরলে হয়ত দু’জনকে সনাক্ত করাই দায় হয়ে পড়বে।
যথারীতিতে নিপা কলিং বেল চাপল। কেউ খুলছে না দেখে বারবার চাপছে। ইতোমধ্যে পাশের ফ্ল্যাটের একটি ছেলে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে শুরু করেছে। এই বাসাটি তার নামেই। বেশ কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে দরজা খুলল। একটি ছেলে খুলেছে। ছেলেটিকে দেখার আগেই নিপা চোখ নিচু করে ফেলল।
‘কী চায়?’, বলল ছেলেটি।
‘আমি রূপার হোম টিউটর। ওকে পড়াতে এসেছি ভাইয়া।’
‘আমি রূপার ভাইয়া হই। তোমার না।’
‘ও কখন আসবে?’
‘কেন? ও কি বেড়াতে যাওয়ার কথা বলেনি?’
‘কাল সম্ভবত কল করেছিল। খেয়াল করিনি।’
‘আমি ঢাকা থেকে আব্বার সাথে ফেরার পর তাঁর সাথে রূপারা বেড়াতে গিয়েছে। সন্ধ্যা নাগাদ চলে আসবে।’
নিপা কথা আর না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল। অজানা ছেলেদের সাথে কথা বলা তার স্বভাবে নেই। আজ একটু বিরতি পাওয়ায় কলেজের জন্য না বেরিয়ে বাসার দিকে রওনা দিল। এমন সময় হুট করে কে যেন পেছন থেকে তার মুখ চেপে ধরল। নিপা ধস্তাধস্তি শুরু করলে ক্রমে তার হাতগুলোও জোরে কে যেন চেপে ধরল। সিগারেটের গন্ধ চারিদিকে ভোঁ ভোঁ করছে। তবে কী সেই ছেলেটিই? একসময় মাথার ওপর ধাম করে কী যেন পড়ায় দৃষ্টির চারিপাশটা একবার ঘুরে উঠল। কেউ কি তাকে লাঠি জাতীয় কিছু দিয়ে বাড়ি দিয়েছে? এত যন্ত্রণা হচ্ছে কেন? চাপটা সইতে না পেরে একসময় আগন্তুকের গায়ে হেলিয়ে পড়ল নিপা। চোখ বেঁধে গেল। এরপর তাকে পুনরায় পেছন দিকে নিয়ে যাওয়া হলো, যেদিক দিয়ে একটু আগে সে ফেরত এসেছিল। পার্থক্য হলো, এইবার তার কাছে পায়ে হেঁটে যেতে হয়নি।
.
ঘণ্টা দুয়েক পেরুনোর পর নিপা চোখ মেলেছে। মাথায় তার তীব্র যন্ত্রণা। মস্তিষ্ক যন্ত্রণার খবর পেতেই নিপার হাত ক্ষতস্থানে চলে গেল। ফের চোখের সামনে হাত এনে দেখে রক্ত লেগে আছে তাতে। সচেতন হওয়ার পর নিপা চোখ পিটপিট করে ওপরে ঘুরতে থাকা পাখার দিকে তাকালো। পাখাটি অচেনা ঠেকছে। খুব সম্ভব অনেক পুরাতন সেটি। গায়ে অদ্ভুত এক নোংরা ভাব অনুভূত হতেই সজাগ হয়ে সে উঠে পড়ল। সে অজ্ঞাত একটি রুমে শুয়ে আছে। গায়ে তার বোরকা নেই। মুখের নিকাবটাও নেই। বাসায় পরে থাকা পোশাকটি এলোমেলো হয়ে আছে। পাশ ফিরে দেখে বিছানার সাথে লাগানো একটি স্টুল। তাতে তার বোরকা পড়ে আছে। তার পাশে একটি ঘড়ি এবং একটি এশট্রে। অজানা একটি আশংকা খপ করে ধরল নিপার হৃদপিণ্ডকে। সপ্তাহ খানেক আগেই একটি মেয়ের ধর্ষণের খবর চারিদিকে ছড়িয়েছিল। আজ তার নিজের সাথে কিছু হয়নি তো? নিপা কাঁপতে কাঁপতে বোরকা পরে বেরিয়ে পড়ল। বেরুনোর সময় বাথরুম থেকে কারো গলা খাঁকার দেয়ার মৃদু আওয়াজ পেয়েছিল। নিপা শব্দটি অধিক শোনার শক্তি আর জোগাতে পারল না। প্রাণপণে বাসাটি থেকে বেরিয়ে এলো। সেই ছোটখাটো বাসাটি থেকে সে বেরিয়েছে, যাতে আছে মাত্র দুটো ফ্ল্যাট। রূপাদের পাশের ফ্ল্যাট থেকে সে বেরিয়েছে। এবং সেখানেই থাকে ফ্ল্যাট দুটোর মালিক ওয়াজিদ।
নিপা আগপাছ কিছুই না দেখে ছুটতে ছুটতে নিজ খালার বাসায় চলে এলো। কলেজে আর যাওয়া হয়নি তার। সারাদিন রুম বন্ধ করে নিপা কান্নাকাটি করে গেল। খালা বারবার দরজা খুলতে আদেশ দিয়েছিলেন। নিপা তবু খুলল না। চোখের পর্দায় তার কেবল একটিই দৃশ্য ভাসছে, একটি ছেলে সময় সময় সিগারেটে লম্বা টান দিচ্ছে। নিপা আড়চোখে একবার তাকিয়ে আবার কলিং বেল চাপানোতে মন দিল। ছেলেটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখছিল। তার তখনের বীভৎস চেহারার বিকৃত হাসি দেখতে না পেয়ে সহসা ডুকরে কেঁদে ওঠে নিপা। না, এভাবে অসহায়দের মতো কাঁদলে হবে না। সবার নিজ নিজ কর্মের ফল পেতে হয়। ছেলেটিরও পেতেই হবে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে সে একা কীভাবে লড়বে? তার সাথে ঘটে যাওয়া এত বড় একটি ঘটনা খালাকেও শেয়ার করতে বুক সহসা কাঁপছে।
দরজা খুলে সে খালার প্রশ্নের মিথ্যে জবাব দিয়ে ফিরল। বলল, তার মাথা ফেটে যাওয়ায় অসুস্থ বোধ করছিল। খালা তাকে তড়িঘড়ি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ড্রেসিং করিয়ে তাকে নিয়ে এলেন। পরদিন খালা তাকে টিউশনিতে যেতে দিলেন না। তবে রূপা একবার কল করেছিল। বলল; গতকাল পড়া হয়নি, আজও না পড়লে মা বকা দেবে। সামান্য সুস্থ বোধ হওয়ায় নিপা তাকে নিজ বাসায়ই পড়তে আসতে বলল। রূপা বাসায় আসে পড়ার জন্য। গতকাল স্কুলে জটিল একটা বাড়ির কাজ দিয়েছিল গণিত স্যার। করে নিতে না পারলে গতকালের না যাওয়ার শাস্তি প্রবলভাবে ভোগ করতে হবে। নিপা তাকে অংক সব বুঝিয়ে দিচ্ছে।
‘তোমার মা এখানে আসতে দিলেন?’, নিপা বলল।
‘উনি থাকলে আসতে দিতেন না। জানেনই, আমাকে বাসা থেকে স্কুলে যাওয়া ব্যতীত কমই বেরুতে দেন। পাশের ফ্ল্যাটের মালিককেও আমার কেমন যেন লাগে! নিছক ভাইয়ার সাথে বন্ধুত্ব আছে বলেই আমার দিকে খারাপ নজর এখনও ফেলেনি।’
‘উনারা কি ফেরেননি?’
‘না, মা-বাবা রয়ে গেছে। স্কুল থাকায় ভাইয়া গিয়ে নিয়ে এলো।’
নিপা পুনরায় তাকে অংক বুঝাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হুট করেই রূপা বলে উঠল, ‘আপু, ড্রেসিং টেবিলে যে একটি ঘড়ি দেখছি, ওটা কার?’
নিপা কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে রূপার দিকে চেয়ে রইল।
‘না মানে বলছিলাম,’ ইতস্তত করে রূপা বলল, ‘কালরাত ভাইয়া তার এই প্রিয় ঘড়িটি অনেক খুঁজেছিলেন। কিন্তু পাননি। কোথায় রেখেছেন, তাও মনে করতে পারেননি।’
মুহূর্তেই নিপার শূন্য দৃষ্টি নেচে উঠল। মালিকের ফ্ল্যাটের ওই রুমটিতে রূপার ভাইয়ার ঘড়ি, মালিকের সাথে তার ভাইয়ার আবার বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
রূপা ভ্যাবাচ্যাকায় পড়েছে। নিপা তাকে কেমন এক অদ্ভুত চাহনিতে দেখছে। নিপার চোখ এখন পানিতে টলমল করছে। না, ভেঙে পড়লে চলবে না। নিপা কান্না মুছে নিল।
‘আপু, সব ঠিক আছে তো?’, রূপা বলল।
মৃদুভাবে সায় দিলো নিপা। ঘড়িটি নিয়ে সে রূপাকে দিলো।
‘এই ঘড়িটি আমি কুড়িয়ে পেয়েছি। কিন্তু কার জানতাম না। তাই সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছি। তোমার ভাইয়ার হলে নিয়ে যেতে পারো। আচ্ছা, একটি কাজ করতে পারবে?’
‘কী কাজ?’, অবাক হলো রূপা। তাকে আগে কখনো নিপা কোনো কাজ দেয়নি।
‘একটি কঠিন সত্য আমি তোমাকে বলতে চাই, যদি কিছু মনে না করো। আমি কিন্তু এখনও কাউকে বলিনি কথাটি।’
‘জ্বি, বলুন।’
‘আমি কাল তোমার বাসা থেকে ফিরে আসার সময় কে যেন আমার মুখ চেপে ধরে পেছন থেকে। আমার মাথায় ব্যান্ডেজ দেখছ? আমি ধস্তাধস্তি করায় আমার মাথায় কী দিয়ে যেন বাড়ি দেয়া হয়েছিল। এরপরের কিছু আমার মনে নেই। আমার যখন হুঁশ ফিরে, তখন আমি নিজেকে ওয়াজিদ ভাইয়ার ঘরে আবিষ্কার করি।’
নিপা এইটুকু বলে কিছুক্ষণ নীরব রইল।
‘তার মানে উনি আপনাকে..?’ বলতে গিয়েও বাধা পেল রূপার মুখের কথা।
‘আমার হুঁশ ফেরার পর আমার বোরকার সাথে এই ঘড়িটা পাই। সাথে করে নিয়ে আসি আমি। কারণ আমার ধর্ষণকারী দুইজন বলে আমার সন্দেহ হয়েছিল। একজন আমার মুখ ধরে, এবং অন্যজন যে কিনা আমার মাথায় বাড়ি দেয়। ঘড়িটি দেখে সম্ভবত বুঝছ, দ্বিতীয়জন কে হতে পারে।’
রূপা কাঁপতে লাগল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম পরিলক্ষিত হচ্ছে। ঢোক গিলছে সে। নিজের ভাইই এমন ঘৃণিত কাজ করেছে?
‘এখন আপনি কী করবেন?’ বলল রূপা।
‘চিন্তা করো না। তোমার পরিবারের সম্মান খোয়াবে না।’ তার কাছাকাছি গিয়ে মৃদুভাবে বলল নিপা, ‘কিন্তু তোমার ভাইকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে চাই। মালিককে দিতে না পারলেও আমার খারাপ লাগবে না। কারণ তাঁর পরিজন নেই। তার কাছে সম্মান নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। কাজেই তোমার ভাইয়াকে শিক্ষা দিয়েই আমি শান্তি পাব।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিপা।
‘কী করতে চান আপনি?’
নিপা আলনায় ঝুলানো বোরকার দিকে একবার তাকালো এবং পরক্ষণে রূপার দিকে একবার তাকালো।
‘তোমার ভাইয়া কি জানে, তুমি এখানে পড়তে এসেছ?’
‘জানেন না, উনি নয়টায় কী সাড়ে নয়টায় ঘুম থেকে মোটে ওঠেন।’
গম্ভীর দেখালো নিপাকে। রূপা দেখল, রাগে সে ফুঁসছে।
.
নিস্তব্ধ গলির সেই ছোটখাটো বাসার বামের ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে চলেছে। বেশ কিছুক্ষণ পর একটি ছেলে দরজা খুলল। গতকালের বোরকা পরিহিতা মেয়েটিকে দেখে সে প্রথমে হকচকিয়ে গেল। পরক্ষণে তার পুরো শরীর নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত দেখে ছেলেটি বলল, ‘কী চায়?’
‘আমি রূপাকে পড়াতে এসেছি ভাইয়া।’
‘আগেও বলেছিলাম, আমি ওর ভাইয়া। তোমার নই। আর স্বরটা এমন কেন লাগছে?’
‘সর্দি হয়েছে। রূপা কি বাসায় আছে?’
‘না। সম্ভবত স্কুলে চলে গেছে। নাস্তা আমার নিজের কাছেই বেড়ে খেতে হলো। তোমার যাই হয়ে যাক না কেন, টিউশনি ছাড়ো না। তাই না?’
‘ওটা জেনে আপনার কিছু করার নেই।’
দরজা বন্ধ করে দিল ছেলেটি। ওয়াজিদও প্রতিদিনের ন্যায় এই সময় সিগারেট টানছে।
গলিতে বেরিয়ে পড়ল রূপা। নিপা আপু বলেছিলেন, তাকে একা পেয়ে এই দুইজন অবশ্যই তাকে ধরে নিয়ে যাবে। কিছু হচ্ছে না কেন? রূপা খুব সন্তর্পণে হাঁটছে। নিকাবের নিচে লুকিয়ে ছুরিটি সে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। হঠাৎ করেই তার মুখ কে যেন চেপে ধরল। নিপার কথানুযায়ী রূপা ধস্তাধস্তি করল না। সম্ভবত তারা তাকে আঘাত করে বসবে। পেছনের ছেলে দুটো মেলা সুযোগ পেয়ে গিয়েছে। গতবারের কাণ্ডের পর মেয়েটি হয়ত দূর্বল হয়ে পড়েছে। ওদেরই সুবিধা হলো। দু’জনই তাকে তোলে নিয়ে ডানপাশের ফ্ল্যাটে চলে গেল। সৌজন্যে রূপা কেবল ছেড়ে দিতে বলেছিল। প্রকৃতপক্ষে সে চেয়েছিল, তাকে যেন তারা নিয়ে যায়। মুহিত আর ওয়াজিদ রূপার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই রূপা মুখের নিকাবটা তোলে ফেলল। সাথে সাথে ছুরিটি শক্ত করে সামনে তোলে ধরল। রাগে সে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, ‘আসুন ভাইয়ারা। আসছেন না কেন? আসুন। আমিও তো একটি মেয়ে।’
মুহিত পিছিয়ে গেল। নকল ব্যান্ডেজ পরিহিতা মেয়েটি তারই আপন বোন! সে কাঁপাস্বরে বলল, ‘তু-তুই আজ বোরকা পরেছিস কেন?’
‘ছিঃ ভাইয়া। আপনি এখনও বুঝতে পারেননি? আমার হোম টিউটর নিপা আপু আমাকে সবকিছুই বলেছেন। ছিঃ আপনাকে নিজের ভাই হিসেবে দেখতেও গা শিরশির করছে। আজ যদি আমি নিকাবটা না সরাতাম, তবে হয়ত ভুলেই যেতেন আমি আপনার নিজের বোন।’
ওয়াজিদ বলে উঠল, ‘মুহিত, দেখছিস কী? তোর বোন আমাদের মসিবতে ফেলতে পারে। কিছু কর।’ মুহিতকে নিশ্চুপ দেখে গর্জে উঠল সে, ‘তুই দাঁড়িয়ে তামাশা দেখ। এই মেয়েকে আমি দেখে নিচ্ছি।’ বলেই সে রূপার দিকে এগিয়ে গেল। এমতাবস্থায় লুকিয়ে থাকা নিপা এবং তার খালাতো ভাই বেরিয়ে এলো। কিন্তু তাদের কিছু করার প্রয়োজন পড়েনি। ওয়াজিদের শার্টের কলার কষে ধরে মুহিত তার গালে চড় বসাতে শুরু করল। দ্বন্দ্ব লেগে গেল তাদের মাঝে। রূপা কিছুই বলল না। কাঁদতে কাঁদতে নিপাকে সে জড়িয়ে ধরল।
‘দুঃখিত আপু, আমি আপনার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়টা ঠিক করতে পারলাম না।’
বোনের কথায় মুহিব উঠে দাঁড়াল। তাকে মাথা নিচু করে রাখতে দেখে ওয়াজিদও সহসা কিছু বলার জন্য উদ্যত হতে পারল না।
নিপা এগিয়ে গিয়ে মুহিতকে বলল, ‘যা করেছেন, একটিবার কেন ভাবেননি, আমিও কারো বোন হতে পারি?’
জবাবের আশা না রেখে হাতে থাকা ঘড়িটি মুহিবের দিকে ছুড়ে মেরে নিপা বেরিয়ে গেল। এই শিক্ষাটিই দুইজনের জন্য যথেষ্ট। এখন থেকে কোনো মেয়ের দিকে তারা হয়ত ফিরেও তাকাতে পারবে না।
.
পর্দা করেও কারো নজর খারাপ থাকায় নিপার সাথে যা ঘটল, সে আর খালার বাসায় থাকার সাহস করেনি। গ্রামের বাড়ি চলে আসে সে। পড়ালেখা আর করে না। তাকে বিয়েও দেয়া সম্ভব নয়। দুইমাসের অন্তঃসত্ত্বা সে। ফিরে আসার পর মা-বাবাদের সে সবকিছু জানিয়ে দিয়েছে। কারণ সত্যের ওপর থেকে পর্দা একদিন ওঠারই ছিল। তাই এখন সে অসহায়। গুণী হয়েও সে তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু পায় না। অতীতের কথা ভাবতে ভাবতে নিপার চোখে ভিজে এলো। মন খারাপ থাকলে সে কোরআন পড়তে শুরু করে। কোরআন নিয়ে সে গুনগুন করে পড়তে লাগল। দরজার ওপাশ থেকে মা ডেকে উঠল, ‘নিপা, তোর সাথে রূপা দেখা করতে এসেছে।’
গুনগুন আওয়াজ থেমে গেল। কেন এসেছে রূপা? সে আবার কী চায়?
নিপা বেরিয়ে বসার ঘরে এলো। রূপা বোরকা পরে আছে। মুখের নিকাবটা তোলে সে নিপাকে সালাম করল।
‘কেন আসা হলো তোমার?’, বলল নিপা।
‘আমাকে আপনার ভাগ্য এখানে এনেছে। হয়তো কারো প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ দেয়ার জন্য। আপনার কথা মা-বাবাকে বলার পর ওঁরা ভাইয়াকে বের করিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া ভাইয়া বড্ড বেনামাজি। তাঁরা ভাইয়াকে এমনিতেই পছন্দ করতেন না। তার ওপর এসব করাটা উনারা আর মেনে নিতে পারেননি। ভাইয়াকে চোখের সামনেই পড়তে নিষেধ করেছেন। দুইমাস যাবৎ ভাইয়া ওয়াজিদ ভাইয়ার সাথে থাকছে। কোনোভাবে আমার সাথে যোগাযোগ করে পাপমোচন করার জন্যই এখানে নিয়ে এলেন। উনি আপনার সাথে কথা বলতে চান।’
‘উনার সাথে আমার কোনো কথা নেই।’
‘আপু, আমার মাঝে মাঝে লাগে, ভাইয়ার গুনাহের ভাগীদার আমরাও। আমাদের মাঝেও একই রক্ত। মা প্রায়ই বলেন, ভাইয়াকে প্রশ্রয় অতিরিক্ত দিয়ে ফেলেছিলেন বলে আজ ওই দিন দেখতে হলো। এবং এও বলেছেন, যতদিন না আপনি ভাইয়াকে ক্ষমা করছেন, মা-বাবাও তাঁকে ক্ষমা করবেন না।’
‘আল্লাহই বিচারক। শাস্তি দেয়ার আমি কেউই নই। উনাকে শিক্ষা দেয়ার আমি কেবল উৎস ছিলাম। উনি যদি চান, বান্দা প্রায়শ্চিত্তের পথে আসুক, তবে তা যেন সফলভাবে হয়। দেখি, আসতে বলো উনাকে। বেশিক্ষণ কথা বলতে চাই না।’
রূপা গিয়ে মুহিবকে ডেকে আনল। সে বিনয়ী হয়ে নিপার কাছে ক্ষমা চাইল। বলল, ‘আমার প্রায়শ্চিত্তের একটা সুযোগ আমায় দাও।’
‘আমার হাতে কিছু নেই। যা করার আল্লাহই করবেন। ন্যায় করার থাকলে উনিই করবেন।’
‘হয়ত উনিই পাঠিয়েছেন। উনার প্রতি আস্থা তেমন নেই। তবে তোমার কাছে আসার জন্য সামান্য জোগাতে হয়েছে। আমি অনেক বড় পাপ করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও। নচেৎ বাবারা আমার মুখও দেখতে চাইবেন না কখনও।’
‘আমি মাফ করার কেউই নই।’
‘তোমার ক্ষমা আমি এক উপায়েই পাব। হয়ত এতক্ষণে বুঝেছ, আমি বিয়ের কথা বলতে এসেছি। অনেক বড় একটি কলঙ্ক লাগিয়েছি তোমার জীবনে। শোধরাতে দাও আমায়। আর এই বাচ্চাকেও তার বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করো না।’
বিদ্রূপ করে মৃদু হাসল নিপা, ‘ বাচ্চাটির প্রকৃত বাবা কে সেটাই তো জানি না।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মুহিব, ‘আমিই। ওয়াজিদ তোমাকে ধর্ষণ করেনি। আমি যখন বাথরুমে ছিলাম, তখন সে রুমে এসেছিল। তার আগেই হুঁশ ফিরিয়ে পাওয়ায় তুমি পালিয়ে গিয়েছিলে। কাজেই ওয়াজিদ কিছু করতে পারেনি।’
নীরবতা ছেয়ে গেল দুইজনেরই বিরশ মুখে।
নিপা চোখ বন্ধ করে অতীত জীবনের পৃষ্ঠা উল্টানো বন্ধ করে দিল। কে যেন তার গায়ে চাদর ভালো করে জড়িয়ে দিচ্ছে। পরক্ষণে একটি আঙুল নিপার চুলে এসে বিলি কেটে গেল। মৃদুভাবে শিহরিত হলো নিপা। বুঝি মুহিব তার প্রায়শ্চিত্ত সফলভাবে করতে পেরেছে।
(সমাপ্ত..)

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

২ Comments

  1. আফরোজা আক্তার ইতি

    বাহ! লেখাটি পড়ে ভীষণ ভালো লাগল। লেখনী খুবই সুন্দর। পাঠক হৃদয়কে আকৃষ্ট করবে সহজেই। উপস্থাপন অসাধারণ।
    “কি চায়?”, ছেলেটি বলল। মূলত এখানে “কি চাই?” কথাটিই বেশি শোভনীয়।
    ছুড়ে- ছুঁড়ে।
    অনেক শুভ কামনা রইল।

    Reply
  2. মাহফুজা সালওয়া

    খুব সুন্দর একটা থিম নিয়ে লিখেছেন।
    লেখার ধাঁচ ও দারুণ।
    শেষকালে মুহিবের প্রায়শ্চিত্ত, গল্পের নতুন মোড় দিয়েছে।
    ভালো লাগলো উপস্থাপন ভঙ্গি ও।
    শুভকামনা রইলো আপনার জন্য

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *