পরী
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮
লেখকঃ

 38 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

গল্প: পরী।
লেখক: আকরাম হোসেন ফারাবি।

সাল ১৯৭১। রবিবার সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, তবুও বৃষ্টি থামার কোনো আশংকা নেই। ঘরের চালা অনেকটা ভেঙ্গে গেছে, বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে ঘরের মধ্যে। পরী চালার সেই ভাঙ্গা জায়গাটা ঠিক করছে। বাবা হারা এই মেয়েটির নাম পরী বানু। গ্রামের মানুষ আদর করে পরী বলে ডাকতো। বাবা #অক্কা_পাওয়ার পর পরী আর পরীর মা মিলে তাদের পরিবার। খুবই চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে সে। উঠতি বয়সী একটা মেয়ে যেমন হয় ঠিক তেমনটাই দেখা যায় তার মাঝে। পরী দেখতে ছিল অপরূপা সুন্দরী। তার বয়সটা তখন ষোলো কি সতেরো হবে। সারাদিন ঘুড়ে বেড়াতে ভালোবাসতো মেয়েটি। গ্রামের মানুষের অনেক কাজও করতো পরী। তাই গ্রামের প্রায় সব মানুষ নিজের মেয়ে আর বোনের মতো ভালোবাসতো তাকে। তাদের গ্রামের নাম হিজলতলী। আমার এক বন্ধুর বাড়ি হিজলতলী গ্রামে। বন্ধুর দাদু ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার নাম ছিল বরকত। যুদ্ধের সেই সময়টাতে হিজলতলী গ্রামের একজন প্রভাবশালী লোক ছিলেন সামাদ মিয়া। পরীর বয়স আর সামাদ মিয়ার বয়স একদম #আকাশ_পাতাল , তবুও মেয়ের বয়সী পরীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় সামাদ মিয়া। পরী সামাদ মিয়ার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে। রবিবার সারাদিন বৃষ্টি হলো। পরদিন সকালে গ্রামে হানাদার বাহিনী প্রবেশ করে। গ্রামের একটি মাদ্রাসা দখল করে হানাদার বাহিনী। মাদ্রাসাকে ক্যাম্প বানায় তারা। সোমবার গ্রামের পরিবেশ একদম শান্ত ছিল। ঠিক পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকে গ্রামে হানাদার বাহিনীর হামলা শুরু হলো। যাকে যেখানে পাওয়া যায় তাকে সেখানেই হত্যা করতে থাকে মানুষরূপী হায়েনার দল। প্রাণের ভয়ে হানাদার বাহিনীর সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তোলে সামাদ মিয়া। মঙ্গলবার দুপুরে আবারও বৃষ্টি শুরু হলো। সেদিন বৃষ্টির কারণে হানাদার বাহিনী ক্যাম্প থেকে আর বের হয়নি। সারাদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হলো। গ্রামের কোনো মানুষও ঘর থেকে বের হয়নি মিলিটারির ভয়ে। পরদিন সকাল থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রতি আবারও অমানুষিক নির্যাতন শুরু হলো। পরীর মা পরীকে ঘর থেকে বর হতে দেননি। ঠিক দুপুরের দিকে হানাদার বাহিনী গ্রাম থেকে কোথাও চলে যায়। দুপুরের পর পুরো গ্রামে হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। রাস্তার পাশে, খালে, আরও অনেক জায়গায় প্রচুর লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেল। গ্রামের মানুষ গ্রাম থেকে পালাতে লাগলো। পরীদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। তাই তারা গ্রামেই রয়ে গেল। গ্রামের বরকত সাহেব বুঝতে পারলেন হায়েনাদের সঙ্গে লড়তে হবে, নয়তো সবাইকে নীরবে নির্যাতন সহ্য করতে হবে। বরকত সাহেব গ্রামের যুবকদের একত্রিত করে বললেন, “শয়তানগো লগে আমাগোর লড়তে অইবো, যুদ্ধ করতে অইবো, না অইলে আমাগোর হকলরে মরতে অইবো।” বরকত সাহেবের কথায় সকলেই সহমত জানায় এবং এক হয়ে গেল। তৈরি হলো মুক্তিফৌজ দল। বরকত সাহেব তার দলকে ট্রেনিং দিতে থাকে। দু’দিন হয়ে যায় হানাদার বাহিনী ফিরে আসেনি গ্রামে। গ্রাম থেকে পালানো সব মানুষ আবার ফিরে আসতে শুরু করলো গ্রামে। তারা ভেবেছিল হানাদার বাহিনী চলে গেছে। সবার ভাবনাকে মিথ্যে করে দিয়ে হঠাৎ এক রাতে গ্রামে ফিরে আসে হায়েনার দল। আবারও হৈচৈ শুরু হয়ে গেল গ্রামে। রাতের আঁধারে হানাদার বাহিনী অনেক ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে সাধারণ মানুষকে। বরকত সাহেবের দল লড়তে পারেনি হানাদার বাহিনীর সাথে। কারণ, তাদের দল হানাদার বাহিনীর তুলনায় খুবই দূর্বল। রাজাকার সামাদের সহযোগীতায় রাতে হানাদার বাহিনী পরীকে ধরে নিয়ে যায়। পরীর মা কিছুই করতে পারেননি পরীকে হায়েনাদের হাত থেকে বাঁচাতে। পরীর মাকে গুলি করে হত্যা করে হায়েনার দল। দু’দিন পর হানাদার ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসে পরী। জানোয়ারদের নির্যাতনের ফলে ভালোভাবে হাঁটতে পারছে না সে। খুব কষ্ট হচ্ছে হাঁটতে। প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে ক্ষত স্থান থেকে। শরীরের প্রতিটি স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন। পরী তার বরকত চাচার কাছে চলে যায়। পরীকে দেখেই বরকত সাহেব বললেন, “পরী মা, তুই বাঁইচা আছোস!” বরকত সাহেবের কথার উত্তর দেয় পরী, “হ চাচা বাঁইচা আছি, তয় অনেক কষ্ট অইতাছে, জানোয়ারা হকলে মিইলা নষ্ট কইরা ফালাইছে আমারে।” মানুষরূপী জানোয়ারের দল অমানবিক নির্যাতন চালায় পরীর প্রতি। সাত-আটজন জানোয়ার মিলে খুবলে খুবলে খেয়েছে তার দেহটাকে। নির্যাতিত হওয়ার পরেও আত্মহত্মা করেনি পরী। কারণ, তার চোখে ছিল প্রতিশোধের আগুন। পরী বুঝতে পারে এভাবে নীরবে বসে থাকলে গ্রামের কোনো মা-বোন রক্ষা পাবে না শয়তানদের হাত থেকে। জানোয়াররা হয়তো অন্য মা-বোনকেও খুবলে খুবলে খাবে। তার নিজের একটা জীবনের বিনিময়ে যদি গ্রামের সব মানুষ হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা পায় তাহলে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত সে। তাই পরী বরকত সাহেবকে দিয়ে মাইন আর গ্রেনেড সংগ্রহ করে। রাতে মাইন আর গ্রেনেড সঙ্গে নিয়ে হানাদার ক্যাম্পে পৌঁছায় সে। পরী মাইন আর গ্রেনেড কোথাও লুকিয়ে রাখে। পরীকে দেখে আবারও লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মানুষরূপী জানোয়াররা। অনেকটা সময় কয়েকজন জানোয়ার মিলে আবারও ভোগ করে পরীর দেহটাকে। নিস্তেজ হয়ে যায় তার দেহটা, লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। প্রায় মধ্য রাতের দিকে সুযোগ পেয়ে পরী মাইন আর গ্রেনেড ব্লাস্ট করে। মাইন আর গ্রেনেডের আঘাতে পরীর সাথে সাথে উড়ে যায় হানাদার ক্যাম্প। শহীদ হয়ে যায় পরী। স্বাধীন হয় হিজলতলী গ্রাম। এমন শত শত পরীর ইজ্জত আর জীবনের বিনিময়ে আজ আমরা পেয়েছি বিজয় ও স্বাধীনতা। গল্পের সেই মুক্তিযোদ্ধা বরকত সাহেব হলেন আমার বন্ধুর দাদু। কত মানুষ যুদ্ধ না করেও আজ পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা খেতাব। কত মা-বোন পেলেন বীরাঙ্গনা খেতাব। কিন্তু, যে মেয়েটি নিজের ইজ্জত আর জীবনের বিনিময়ে হিজলতলী গ্রামের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনলো, তার নামের পাশে বীরাঙ্গনা খেতাবটি যোগ হয়নি আজও। তাতে কি, আমাদের মতো শত শত লেখকের গল্পে বীরাঙ্গনা হয়ে থাকবে পরী। সারাজীবন লেখা হতে থাকবে বীরাঙ্গনা পরীর বীরত্ব। বিজয়ের মাসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি পরীর মতো প্রতিটি বীরাঙ্গনা আর মুক্তিযোদ্ধাকে। “সমাপ্ত”

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *