অপূর্ণ স্নেহ
প্রকাশিত: জানুয়ারী ১১, ২০১৯
লেখকঃ

 52 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখক-মোঃ মাঝারুল ইসলাম
….
ছোট্ট লামিয়া আজ বাবাকে চেয়ে দেখবে অনেকক্ষণ ধরে। অভিমান করে বলবে-আব্বু তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? আমার কথা কি একদম মনে পড়েনি তোমার? এতটুকু ছোট্ট মেয়েকে রেখে কোথায় লুকিয়ে ছিলে? বুকের জমানো কথা গুলো আজ সব বলবে বাবাকে। সেই আশায়ই পথ চেয়ে লামিয়া। মনে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে লামিয়া বাবার পানে চেয়ে আছে। আজ হয়তো বাবা ফিরবে বাসায়।
আজ লামিয়ার সাত বছর পূর্ণ হবে। গত রাত্রে লামিয়া মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলো তার আব্বু কি আসবে না? মা বলেছিলো-“তুমি এখন ঘুমাও, তোমার আব্বু আগামীকাল আসবে”। এই আশ্বাস দিয়ে মা তাকে ঘুম পাড়িয়েছিলো। লামিয়ার মায়ের নাম সায়লা খাতুন। গত চার বছর ধরে লামিয়াকে এই আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। আর লামিয়াও মায়ের আশ্বাসে বাবাকে দেখার আশায় বুক বেঁধে আছেন। ছোট্ট মেয়েটাকে আর কতবারই বা মিথ্যে আশ্বাস দেওয়া যায়। চার বছর ধরেই মা সায়লা খাতুন লামিয়াকে মা-বাবা দুজনের আদর দিয়েই বড় করছে।
লামিয়ার বাবা কাওসার। সায়লা খাতুনের সাথে তার স্বামীর শেষ দেখা হয়েছিলো চার বছর আগে। লামিয়ার বয়স তখন ছিলো তিন বছর। লামিয়ার তিন বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে বাবা কাওসার লামিয়ার সুস্থতা কামনায় বাসায় একটা দোওয়া মাহফিলের আয়োজন করেছিলো। কাওসার লামিয়াকে খুবই ভালবাসতো। কাওসার আর সায়লার বিয়ে হয় ২০১০ সালে। দুই বছরের মাথায় সায়লা আর কাওসারের কোল জুড়ে আসে ফুটফুটে লামিয়া। কাওসার আর সায়লা সেদিন দুনিয়ার সমস্ত দুঃখ ভুলে গিয়েছিলো। মেয়েকে নিয়ে বুনেছিলো হাজারো স্বপ্ন। বেশ সুখেই দিন কাটতে লাগলো তাদের।
কাওসারের বাজারে একটা মুদির দোকান ছিলো। দোকানে আগে তার বাবা বসতো। এখন কাওসারই বসে। বাবা বাসায় থাকে। কাওসার বাজারের ভিতরে অপেক্ষাকৃত সৎ হওয়ায় তার দোকানে বেচাকেনা বেশ ভালোই হতো। তবে সময়টা খুব একটা ভাল না। চারিদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা। মানুষের ভিতরে ভয় কাজ করছে। রাত্রে মানুষ ঘুমাতে পারে না ঠিকমতো। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারে হাজারো মানুষ ঘরছাড়া। পুলিশ দেখলেই সবার মধ্যে ভীতি জেগে ওঠে।
সময়টা তখন ২০১৫ সালের মাঝামাঝি। এই দশক যেন ভাল যাচ্ছে না। ২০১০ এর পর থেকেই যেন মানুষের উপর জুলুম বেড়েই চলেছে। সেদিন ছিলো শুক্রবার। সাধারনত ছুটির দিনের রাত্রে বেচাকেনা একটু বেশিই হয়। সকল কর্মজীবী মানুষেরা বাজার করতে আসে। রাত প্রায় ১১ টা বাজে। কাওসার দোকানে তালা দিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়। রাতটা ছিলো ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারিদিকে কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দে কানে যেন তালা লেগে যাচ্ছিলো। ছোট্ট লামিয়া বেশ খানিক সময় আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আব্বু আব্বু করে কাঁদতে কাঁদতেই মেয়েটি ঘুমাতো রোজ। সায়লা খাবার টেবিলে বসে আছে কাওসারের অপেক্ষায়। দরজায় কড়া নড়ার সাথে সাথেই সায়লা ছিটকিনি খুললো।
কাওসার- “তুমি এখনও ঘুমাও নি? তোমাকে না নিষেধ করেছি এভাবে আমার জন্য বসে থাকতে।”
সায়লা-আচ্ছা দোকানটা একটু সকাল সকাল বন্ধ করলে কি হয় বলো তো। মেয়েটা যে কেঁদে কেঁদে একটু আগেই ঘুমালো। মেয়ের কথা মনে পড়ে না তোমার?
পরিচিত অনেক কাস্টমার আসে রাত্রে। কী করবো বলো? এই বলে কাওসার বাথরুমে ঢুকলো। হঠাৎ করে দরজায় আবারো কড়া নড়লো। সায়লা দরজা খুলে দেখে পুলিশের পোশাক পরিহিত পাঁচজন লোক। তারা জানতে চাইলো তার হাজবেন্ড কোথায়। ঠিক তখনি কাওসার ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখে কতিপয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-তোর নাম কি কাওসার?
কাওসার- জ্বি! আমার নাম কাওসার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-আমাদের সাথে তোকে একটু থানায় যেতে হবে।
কাওসার-আমার অপরাধ??
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-আগে চল, তারপর বুঝতে পারবি।
সায়লা আর কাওসারের হাজারো আকুতি কতিপয় স্বার্থান্বেষী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকের বিবেককে জাগ্রত করতে পারেনি। সেই যে সায়লা কাওসারকে শেষবারের মত দেখেছে আর কখনো তার দেখা পায়নি। সেই রাত্রেই সায়লার ভাইয়েরা, কাওসারের আত্মীয়-স্বজনেরা থানা পুলিশ সব করেছে। কিন্তু কোথাও কাওসারের খোঁজ মেলেনি। লামিয়ারও দেখা হয় নি সেদিন বাবার সাথে।
সেই যে অপেক্ষার পালা শুরু। আজও সায়লা আশায় বুক বেঁধে আছে। তার স্বামী হয়তো ফিরে আসবে। মেয়েকেও প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখিয়েছে। পিতৃস্নেহ বলতে লামিয়া তেমন কিছুই পায়নি। তার কাছে মা’ই সব। কাওসার যখন নিখোঁজ হয় লামিয়া তখন খুবই ছোট। বুদ্ধি-বিবেক কিছুই ছিলো না তখন তার। বাবার চেহেরাটাও আজ সে ভুলে গেছে।
দিনে দিনে বাবাকে দেখার স্বাদ বেড়েছে তার। বাবার স্নেহ পেতে খুব মন চাইছে তার। আজ তার জন্মদিন। যেখানেই থাকুক, বাবা হয়তো আজ ফিরে আসবে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলো। তবুও বাবা এলো না। লামিয়ার চোখ বেয়ে অশ্রুর ফোঁটা টপটপ করে নিচে পড়তে লাগলো। মায়ের চোখেও অজস্র অশ্রুর ফোঁটা। কষ্টের আঁধারে চারিদিক যেন ভারী হয়ে এলো। এ এক নির্মম-নিদারুণ কষ্টের গল্প। লামিয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মা লজ্জায় মুখ ঢেকে আছে। গত রাত্রেই সে মেয়েকে বলেছে তার বাবা ফিরে আসবে আজ।
প্রতীক্ষার পালা বাড়তে থাকলো। আজও কাওসার ফিরে এলো না। বাবার স্নেহের কোলে আর ওঠা হলো না লামিয়ার। ছোট্ট লামিয়া নিস্তব্ধ কষ্টের বেড়াজালে আবদ্ধই থেকে গেলো।__°°
#একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না কাওসার কোথায় আছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরিহিত হাজারো অমানুষ প্রতিনিয়তই কাওসারের মত শত শত মানুষকে অন্যায়ভাবে গুম করে চলেছে কোন এক নিকৃষ্ট স্বার্থের মোহে। যেখানেই থাকুক ভাল থাকুক নিখোঁজ (গুম) হওয়া সকল কাওসার। ভাল থাকুক পিতৃহারা নিষ্পাপ সকল লামিয়া আক্তার মীম।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৩ Comments

  1. halima tus sadia

    চমৎকার লিখেছেন।
    তবে আরেকটু বড় করলে পারতেন।

    লামিয়া আর বাবাকে দেখতে পেলো না।
    বাবার স্নেহ অপূর্ণই রয়ে গেল।
    প্রতিটি সন্তানের বাবার আদর পেতে মন চায়।

    কিন্তু আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিলো না।
    অপরাধ ছাড়াই অপরাধের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়।

    দোওয়া–দোয়া

    শুভ কামনা।

    Reply
  2. Md Rahim Miah

    ছোট্ট-ছোট (ছোট্ট শুধু নামের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়)
    কথা গুলো-কথাগুলো (গুলো শব্দের সাথে বসে)
    রাত্রে-রাতে
    ছোট্ট-ছোট
    দোওয়া-দোয়া(এটা হবে মনে হয়)
    রাত্রে-রাতে
    ঘুমাও নি-ঘুমাওনি(নি শব্দের সাথে বসে)
    রাত্রে-রাতে
    রাত্রেই-রাতেই
    হয় নি-হয়নি
    কোন-কোনো (কোন দিয়ে প্রশ্ন বুঝায়)

    বাহ্ বেশ ভালো লিখেছেন তো। গল্পের মাধ্যমে সমাজের একটা বাস্তবতা দিক ফুটে তুলেছেন। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছি না কাওসারকে গুম করবে কেন? সে তো রাজনৈতির সাথে জড়িত ছিল না। সে তো একজন সৎ ব্যবসাহীক ছিল। এই ক্ষেত্রে বলা যায় এইখানে একটা ভুল হয়েছে। যাইহোক বানানে দিকে আগামীতে খেয়াল রাখবেন আশা করি, আর শুভ কামনা রইল।

    Reply
  3. আফরোজা আক্তার ইতি

    ঘটনাটা বাস্তবের একাংশ তুলে ধরলেন বলেই মনে হচ্ছে। সুন্দর হয়েছে।
    বর্তমানে অনেকেই সৎপতথে কাজ করেও হেনস্তা হচ্ছে পুলিশের কাছে। হয়তো দেখা যায়, পুলিশ এক অপরাধীকে খুঁজছে কিন্তু নামের মিল থাকায় আর কোন প্রমাণাদি না নিয়েই একজন নিরপরাধীকে প্রাণ দিতে হচ্ছে ক্রসফায়ারে। বিনা অপরাধে জেলে পঁচে মরতে হচ্ছে কিছু অসৎ মানুষকে।
    খুবই সুন্দর লিখেছেন। করুণ বাস্তব তুলে ধরেছেন। কতো সন্তান যে পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে,স্বামীর সোহাগ থেকে স্ত্রী বঞ্চিত হচ্ছে তার হিসেব নেই।
    আছেন- আছে। যেহেতু লামিয়া ছোট।
    দোওয়া- দোয়া।
    ভাল- ভালো।
    শুভ কামনা।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *