অপেক্ষা
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮
লেখকঃ

 197 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

নীরা, তোমাকে তো বলা হয়নি। তোমার জন্যে ঐ দিন স্টেশনে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম। মিন্টু বলেছিল তুমি নাকি বাড়ি আসছো। আমি সেই শীতের রাতে প্লাটফর্মে বসেছিলাম তোমার জন্যে। জানো রাতে বেকার সময়টাতে প্লাটফর্মে তেমন কেউ থাকে না। তবে একেবারেই যে থাকে না তা কিন্তু নয়।

আমাদের স্টেশনটা ছোট। গ্রামের স্টেশন অতবড় হয় না। কিন্তু তারপরও দেখলাম কয়েকটা বৃদ্ধ আর বেশ কিছু টোকাই গোছের বাচ্চা ছেলে এক কোনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে আছে। একটা পরিবারও মনে হয় আছে সেখানে। এই শীতেও তারা কি করে ঘুমুচ্ছে তা আসলেই চিন্তা করার মত বিষয়।
ভুল হয়ে গেছে নীরা। আসলে বাংলাদেশের ট্রেন গুলি যে সময় মত আসে না তা আমার জানা আছে। তবুও অনেক আগেই চলে এসেছি। আসলে তুমি আসছো এইটা শুনে আর অন্য কোথাও অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছিলো না। এখন মনে হচ্ছে একটা বই নিয়ে আসার প্রয়োজন ছিলো। গল্পে ডুবে থেকে তোমার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকালে হয়তো সময়টা মন্দ কাটতো না। কিন্তু দ্রুত চলে আসলাম, মনেই ছিল না একটা বই সাথে করে নিয়ে আসার কথা। আচ্ছা কোন বইটা নিয়ে আসতে চাইছি বুঝতে পেরেছ তো? সেই যে তুমি “অপেক্ষা” নামের একটা বই খুঁজতে গিয়েছিলে লাইব্রেরিতে, সেই বইটা। আসলে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তো তোমার জন্যে, তাই আজ ওটার কথাই মনে হচ্ছিল বার বার।

নাহ, আজ মনে হয় অনেক বেশীই দেরি হচ্ছে কোথাও। না হয় ট্রেন তো চলে আসার কথা এই সময়ের মাঝে। কি জানি? হয় তো ট্রেনই লেট ছিল আজ। তাই সব কিছুতেই লেট হচ্ছে। আর ঠাণ্ডাটাও মনে হয় বেড়েছে। লেট যেহেতু হচ্ছে তাই চিন্তা করলাম স্টেশনের বাইরে থেকে চা খেয়ে আসি। দিনের বেলায় হলে বাইরে যাবার ঝামেলা ছিলো না। ছোট ছোট কতগুলি বাচ্চা ছেলেই তো চা’য়ের ফ্লাস্ক নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এক ইশারাতেই চা হাজির হয়ে যেতো। কিন্তু রাতের বেলাতে তো আর তা সম্ভব না। তাই স্টেশনের বাইরে যেতেই হবে।
বাইরে বেরিয়ে দেখি এই রাত দুপুরেও একটা হোটেল খোলা রয়েছে। আর হোটেল দেখেই খিদেটা টের পেলাম। গিয়ে দেখি দোকানি আর দুইটা ছেলে আছে হোটেলটাতে। অলস সময় পার করছে। তারাও আমার মত অপেক্ষা করছে ট্রেনটার। অল্প কিছু সময়ের জন্যে ট্রেনটা থামলেও এর মাঝেই অনেকে চলে আসে এখানে পেট-পূজা করতে। অন্য সময় হলে ছেলে দুইটার যে কোন একজন দৌড়ে আসতো কি খাবো তা অর্ডার নিতে। কিন্তু এখন তাদের কোন ব্যস্ততা দেখছি না। একবার আমার দিকে তাকিয়ে দেখেই আগের মতই নিজেদের মাঝে আলাপ করছে তারা। আলাপ করার ভঙ্গি দেখে মনেই হবে না শীতের রাত জেগে থাকার কোন দুঃখ আছে এদের কারো।
ক্যাশে বসে থাকা লোকটাই জানতে চাইলো কি লাগবে। তাকে জিজ্ঞাস করলাম কি পাওয়া যাবে এখন। জানালো রুটি-পারোটা, মোঘলাই, ডিম ভাজি, আর সবজি হবে এই মুহূর্তে। খিদেটা আরো একটু বাড়লো কিন্তু হুট করে ট্রেন চলে আসলে তোমাকে এক পলক দেখার চান্সটা মিস হবে তাই বললাম একটা মোঘলাই আর চা দিতে। শুনে সে নিজেই মোঘলাই তৈরি করতে গেলো ক্যাশ ফেলে, ছেলেদের ডেকে আর বিরক্ত করলো না। আমি সামনের দিকের একটা টেবিলে বসে স্টেশনের দিকে চেয়ে আছি। দ্রুতই সে মোঘলাই দিয়ে গেলো। তার কাছে জানতে চাইলাম রাতের ট্রেনটা কখন আসে। জানালো এই সময়ের মাঝে চলে আসার কথা। হয়তো কোথাও দেরি হয়ে গেছে, তাই আজ লেট। তবে খুব দ্রুতই চলে আসবে বললো।
ট্রেন হুট করে চলে আসতে পারে ভেবে যত দ্রুত পারি খেয়ে নিলাম। তারপর প্লাস্টিকের কাপে চা নিয়ে বিল মিটিয়ে আবার এসে বসলাম প্লাটফর্মের টুলটাতে। চারদিক অন্ধকার আর প্লাটফর্মের অল্প আলোয় চারদিক আরো বেশী অন্ধকার মনে হচ্ছিলো। চা’টা শেষ করেও ট্রেনের দেখা পেলাম না। বসে অপেক্ষায় আছি আর মনে পড়ছে এভাবেই বসে থাকার কথা, তোমার পথ চেয়ে। সেই শীতের সকাল বেলায় অপেক্ষার কথা, তোমার কলেজে যাওয়ার পথে। সময়গুলি কত দ্রুত চলে গেলো। তুমি কলেজে পড়া শেষ করে ভার্সিটি ভর্তি হলে। ঢাকা চলে গেলে হোস্টেলে। আর আমি এখনো তোমার অপেক্ষায় বসে আছি এই নির্জনে…

সাখাওয়াত আলী

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৪ Comments

  1. Toishi

    আদউ এই অপেক্ষার শেষ হবে?
    খুব ভালো লাগলো ????????

    Reply
  2. সজীব

    সুন্দর লিখেছো।

    Reply
  3. আফরোজা আক্তার ইতি

    মনের মানুষটির জন্য অপেক্ষা করার তৃপ্তিই আলাদা। মনে হয় যেন এ অপেক্ষা শেষ হবার নয়।যুগ যুগান্তর ধরে অপেক্ষা করা। আদৌ এই অপেক্ষা শেষ হবে কিনা তা কেউ জানে না।
    ভালো লিখেছেন। গল্পের ধারাবাহিকতা আর লেখার ধাঁচ সুন্দর। বানানে কোন ভুল নেই।

    Reply
    • সাখাওয়াত আলী

      ধন্যবাদ আপনার মূল্যবাদ মতামতের জন্য। আপনাদের অনুপ্রেরণাই আমাকে শক্তি জুগাবে…

      Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *