অপেক্ষা
প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 69 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখা: হাসিনা ইসলাম
(জুন- ২০১৮)
……………..

-দেখ তো ইরা, কেমন হলো তোমার বাড়িটা!
-ওয়াও! অন্নেক সুন্দর! আমি ভাবতেই পারছি না, তুমি আমার জন্য এতো সুন্দর একটা বাড়ি বানিয়েছ!
-এই নাও চাবি, চল ভিতরটা দেখবে।
– চলো, চলো….
ভিতরে ঢুকে ইরা মুগ্ধ হয়ে গেলো। সব দামি দামি আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রতিটা রুম। অধিকাংশই দেশের বাইরে থেকে আনা হয়েছে। ইরা পুরো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। যতই দেখছে তই সে মুগ্ধ হচ্ছে। নিজেকে যেন রাজরানী মনে হচ্ছে! ৫তলা বাড়িটি এখন তার! নিজেদের থাকার জন্য তিন তলা এবং চারতলায় ৪টি ফ্ল্যাট, বাকিগুলো ভাড়া দেয়া হবে। দেখতে দেখতে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যায় ইরা। তার কতদিনের স্বপ্ন এমন একটা বাড়ির! ঘুরতে ঘুরতে চারতলার ডানদিকের ফ্ল্যাটের একটা রুমে নজর পড়ে ইরার।
– এদিকে আসো তো রুমন।
– হ্যাঁ বলো ইরা
– এই রুমটা? এটা কার? এরকম পুরাতন আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়েছ কেন?
হা হা করে এক প্রস্থ হেসে রুমন বলে,
– আরে এটা তো মায়ের, নতুনগুলো মা ব্যবহার করতে পারবেন না তাই পুরাতনগুলিই দিয়েছি।
– হোয়াট! তোমার মা? তোমার মা এই ফ্ল্যাটে থাকবে? নেভার! আমি এটা কিছুতেই সহ্য করবো না।
– প্লিজ, ইরা বুঝতে চেষ্টা করো। শত হলে তো উনি আমাকে জন্ম দিয়েছেন, মানুষ করেছেন।
-জন্ম দিলে তোমাকে দিয়েছেন, আমাকে না। আমি ওই বুড়ির মুখ কিছুতেই দেখতে পারবো না।
– আরে রাগ করছো কেন? মা’র জন্য তো কাজের লোক থাকবে।
– তাও এখানে রাখা পসিবল না। আমার বাচ্চারা ওই বুড়ির জন্য নষ্ট হয়ে যাবে। তুমি এক্ষুণি ওই রুম পরিস্কার করে ফেলো নইলে আমি গেলাম। তোমার মাকে এই বাড়িতে রাখলে, আমাকে এখনই শেষ দেখা দেখে রাখ। যত্তসব!
– ঠিক আছে, তুমি যা বলবে তাই হবে।

রুমন গিয়ে দাঁড়াল ‘শেষ আশ্রয়’ বৃদ্ধাশ্রমের কাছে। ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকল সে। কয়দিন আগেই মা’কে বলেছিল, বাড়ির কাজ শেষ হলেই এসে নিয়ে যাবে নতুন বাড়িতে। কিন্তু আজ এসেছে মাকে বাড়িতে নিতে পারবে না, সে কথা জানাতে।-মা, মা…
– রুমন এসেছিস বাবা! কতদিন তোকে দেখি না!
– আমার কী আর সময় আছে মা, দেখই তো কত ব্যস্ত থাকি।
– তা তো জানিই বাবা। কিন্তু কি করবো বল? তোকে যে খুব দেখতে ইচ্ছে করে! তুই ছাড়া তো আমাকে ‘মা’ বলে ডাকার কেউ নেই। সেই যে তোর তিনবছর বয়সে তোর বাবা মারা গেল তারপর থেকে তোকে ঘিরেই তো আমার যত সুখ-দুঃখ। তুই পড়াশুনা করলি যতদিন আমি তোর কাছাকাছিই ছিলাম। এরপর বিদেশ গেলি। তখন থেকেই তোকে একনজর দেখার জন্য মনটা হাহাকার করে। বিয়ে করলি চার বছর। বিয়ে করার পর থেকেই তোকে আর মন ভরে দেখতে পাই না। হুটহাট এসে আবার চলে যাস্। আজ একটু থাক বাবা।
– না মা, হাতে একদম সময় নাই। ৫মিনিটের জন্য এসেছি। জরুরি কাজ আছে বাইরে। একটা কথা বলতে এসেছি।
– বল বাবা।
– হয়েছে কী মা, ইরা মানে তোমাদের বৌমা…
– বৌমাকে নিয়ে এলেই তো পারতি, খুব লক্ষী মেয়ে।
– না মানে, ঐ যে তোমাকে বলেছিলাম এই সপ্তাহেই বাড়ির কাজ শেষ হবে…
– হা, বলেছিলি তো, কাজ হলে আমাকে নিয়ে যাবি। আহা! কতদিন নাতিটাকে দেখি না! বৌমাকে দেখি না।
– আসলে হয়েছে কী মা, ভেবে দেখলাম, তুমি ওইরকম পরিবেশ পছন্দ করবে না। বোঝই তো সব কিছু আধুনিক। তোমার ভালোর জন্যই মা… চিন্তা করে দেখলাম তুমি এইখানেই থাকো। আমি মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে দেব।
– রুমন! তোর কী মনে হয় তুই টাকা না দিলেই আমি না খেয়ে মরে যাব? নারে বাবা, এখানে অনেকেই সাহায্য করে। তাদের অনেকেরই বাবা নেই, মা নেই। একটা ছেলে আছে, প্রতিমাসে এসে আমাকে ফল কিনে দেয়। ওর বাড়ি নিয়ে যেতে চায়, কারন ওর মা নেই। রুমন! বৃদ্ধ বয়সে মানুষ খাবারের চিন্তা করে না। নিজের ছেলেমেয়েকে দু’চোখ ভরে দেখতে চায়। রাতের পর রাত আমি তোকে একনজর দেখার জন্য অপেক্ষা করি। নিজের সুখের কথা চিন্তা না করে দিনের পর দিন তোকে বুকে আগলে রেখেছিলাম। এখন তো তুই বড় হয়ে গেছিস। সুখে থাক বাবা… একটা কথাই কেবল মনে রাখিস, তুইও একদিন তোর সন্তানের মুখে ‘বাবা’ ডাক শোনার জন্য রাতের পর রাত অপেক্ষা করবি।
বলেই টলমল চোখে রাফেদা খানম ভিতরে চলে গেল।
রুমনের ফোনটা বেজে ওঠল। নতুন বাড়িতে ইরা তার জন্য অপেক্ষা করছে। বাইরে বের হয়ে এল সে। দোতলার জানালার কাছে এক বৃদ্ধার চোখের জল আর ভারি দীর্ঘশ্বাসের খবর তার জানার এখন আর প্রয়োজন নাই।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *