অকাল
প্রকাশিত: মে ২৭, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 111 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখক: সোহেল রানা শামী
(মে – ২০১৮)
……………

রাত তখন এগারোটা। গ্রাম এলাকার জন্য এটা একটা গভীর রাত। সবাই তখন ঘুমিয়ে পড়ে, এলাকাটাও নিশ্চুপ হয়ে যায়। নাজমুল সাহেব ফিরছেন বাসায় এই সময়ে। ইদানীং তিনি গভীর রাত হলেই বাসায় ফেরেন। তাছাড়া উনি বাসায় গেলেই খালি অশান্তি আর অশান্তি দেখেন। তাঁর স্ত্রীর সাথে ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সারাক্ষণ ঝগড়া বিবাদ লেগেই থেকে। এসব দেখতে দেখতে অসহ্য হয়ে উঠেছেন তিনি। তাই রাত করেই বাসায় ফেরা।

স্ত্রীর নাম নাম ধরে দরজায় ঠোকা দিলেন নাজমুল সাহেব,
-রেহেনা… রেহেনা?’
একটু পর রেহেনা বেগম দরজা খুলে দিলেন হাতে একটা ল্যাম্প নিয়ে। ল্যাম্পের আলোয় নাজমুল সাহেব দেখলেন, স্ত্রীর মুখটা ভার হয়ে আছে। আজকেও হয়তো ঝগড়া হয়েছে। তা আর নতুন কী?
নাজমুল সাহেব মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলেন। দরজাটা লাগিয়ে রেহেনা বেগম রাগান্বিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
-কোথায় ছিলে এতক্ষণ? এদিকে তোমার ভাই আর ভাইয়ের বউ মিলে আমাকে পারলে চিবিয়ে খেতে পারছে না, সেই খেয়াল আছে?’
স্ত্রীর কথার জবাব না দিয়ে নাজমুল সাহেব বললেন,
-খিদে লাগছে, খেতে দাও।’
রেহেনা বেগম মুখ ভার করে স্বামীকে খেতে দিলেন। স্বামী খাচ্ছিলেন, আর রেহেনা বেগম গলা উঁচু করে আবার বললেন,
-তুমি এর একটা বিচার আজ করবেই করবে। ওরা জামাই বউ মিলে আমাকে কতো অপমান করেছে আজ।’ বলেই শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন উনি।
-কী হয়েছে? কান্না থামাও। মুখে এক গ্রাস ভাত তুলতে গিয়ে থেমে গেলেন নাজমুল সাহেব। রেহেনা বেগম কান্না বাড়িয়ে বললেন,
-কী হয়নি তাই বলো। আজ আমাদের মুরগিটা ওদের ঘরের ভেতর ঢুকেছিল, তাই বলে মেরে ঠ্যাং ভেঙে দিবে মুরগির? ঝগড়া আমাদের মধ্যে হয়েছে। কিন্তু অবুঝ প্রাণীটা কী দোষ করেছে? মুরগির ঠ্যাং ভাঙছে কেন জিজ্ঞেস করায় তোমার ভাইয়ের দাজ্জাল বউটা বলে কিনা আমারও ঠ্যাং ভেঙে দিবে।’
রেহেনা বেগমের কথা শেষ হতেই বাইরে জোর গলায় একটা কণ্ঠ শোনা গেল,
-ভাবী, খবরদার! দাজ্জাল মেয়ে বলবে না। তোমাদের মুরগিটা আমাদের ঘরে ঢুকে ঘর নষ্ট করছিল তাই রেগে তক্তা মেরেছি। মুরগিটা মুরগির মালিকের মতোই হয়েছে।’
রেহেনা বেগম দ্রুত উঠে বাইরে বের হলেন। চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন,
-ঐ রহিমানি, কী বললি তুই? মুরগিটা মুরগির মালিকের মতো হয়েছে মানে কী? কথাবার্তা সাবধানে বলবি বলে দিলাম।
-সাবধানে না বললে কী করবে তুমি? আর খবরদার নাম বিশ্রী করবে না। আমার নাম রহিমা, রহিমানি না।
-এহহহ! কী একটা নামরে! যেন কোনো রাজবংশের নাম।
-ভাবী, তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো।
-তুই সীমা ছাড়িয়েছিস। তুই এখন আমার মুরগির ঠ্যাং ভালো করে দে।
-পারলে নিজে ঠিক করোগা। নিজের মুরগি সামলাতে পারো না?
-মুরগি কী সামলাবো রে? এরকম ঘরে মাঝেমাঝে ঢুকবে মুরগি, তাই বলে ঠ্যাং ভেঙে দিবি?
-হ্যাঁ দিবো, একশবার দিবো। যাও থানায় মামলা করো আমার নামে।’
রেহেনা বেগম আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তখন নাজমুল সাহেব বের হয়ে একটা চড় দিয়ে তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর রহিমা বেগমকে বললেন,
-রহিমা, তুমি ভেতরে যাও, সাজ্জাদকে একটু আমার কাছে পাঠাও।’
রহিমা বেগম ভেতরে চলে গেলেন। আর নাজমুল সাহেব একা একা বাইরে পায়চারি করতে লাগলেন একটা টর্চলাইটের আলো জ্বেলে। একটু পর তাঁর ছোট ভাই বের হয়ে ডাক দিলেন,
-ভাইজান।’
নাজমুল সাহেব ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-সাজ্জাদ, তোর ভাবী তোদের চেয়ে বয়সে বড়। তার সাথে তোরা এরকম আচরণ করিস কেন?
-আমি তো কিছুই করিনি ভাইজান।
-তোর বউ এখন যা করলো তা কি ঠিক? তুই তোর বউকে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলছিস।’
-ভাইজান, আপনি আপনার বউ এর পক্ষে কথা বলছেন। আপনি আপনার বউকে একটু সামলান। আমাকেও তো কম কথা শুনায়নি উনি।’ কথাটি বললেন রহিমা বেগম। উনি স্বামীর পিছুপিছু বের হয়ে ঘরের একটা খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নাজমুল সাহেব তাঁর দিকে বাতির আলো ফেলে বললেন,
-আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে কথা বলছি তুমি চুপ থাকো।’
রহিমা বেগম মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললেন,
-কথাটা তো আমাকে নিয়েই হচ্ছে। চুপ থাকবো কেন?’
-সাজ্জাদ দেখ তোর বউ আমার মুখের উপর কথা বলছে। তুই কিছু বলবি না ওকে?’
বড় ভাইয়ের কথাটি শোনে সাজ্জাদ সাহেব স্ত্রীকে বললেন,
-রহিমা, তুমি ভেতরে যাও।’
রহিমা বেগম ভেতরে চলে গেলে নাজমুল সাহেব বলেন,
-সাজ্জাদ, তোর বউকে একটু নিষেধ করিস এসব না করতে। কয়েকটা দিন একটু ঝগড়া বিবাদ না করতে বল। আমরা চলে যাবো এখান থেকে। দূরের একটা এলাকায় জায়গা নিয়েছি। কাল থেকে ঘর বানাতে লোক লাগাবো। ঘর তৈরি হয়ে গেলেই আমরা চলে যাবো।’
করুণকণ্ঠে কথাগুলো বললেন নাজমুল সাহেব। তাঁর কথা শোনে সাজ্জাদ সাহেব কোনো কথা বলতে পারছিল না কিছুক্ষণ। কয়েকমুহূর্ত নিস্তব্ধ হয়ে রইলো চারপাশটা। কে যেন বলেছিল, ‘ভাই বড় ধন, একই রক্তের বাঁধন, যদিও বা পৃথক হয়, এক নারীর কারণ।’ কথাটির সত্যতা আজ বোঝতে পেরেছেন দুইভাই। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সাজ্জাদ সাহেব বললেন,
-ভাইজান, তোমরা আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?
-কী করবো ভাই? সংসারে অশান্তি, কলহ আর ভালো লাগে না।’ কথাটি বলে ছোট ভাইয়ের কাঁধে আলতো করে হাত চাপড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন নাজমুল সাহেব। বাইরে অন্ধকারে অনেকক্ষণ একা একা পায়চারি করলেন সাজ্জাদ সাহেব। একসময় রহিমা বেগম একটা ল্যাম্প নিয়ে বের হয়ে স্বামীকে ঘরে নিয়ে গেলেন।

পরদিন আবার ঝগড়া লাগলো দুই ভাইয়ের স্ত্রীর মধ্যে। ঝগড়ার কারণ অতি সামান্য। নাজমুল সাহেবের ছেলে সেলিম আর সাজ্জাদ সাহেবের ছেলে কামাল মিলে বাড়ির উঠোনে মারবেল খেলছিল। খেলতে খেলতে হঠাৎ দুজনের মধ্যে ঝগড়া লাগে। তখন রহিমা বেগম এসে ভাসুরের ছেলেকে একটা চড় দিয়ে নিজের ছেলেকে বললেন,
-ওর সাথে তোকে কে খেলতে বলেছে? জানিস না ও ওর মায়ের মতো ঝগড়াটে?’
বলেই উনি ছেলেকে নিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেলেন। আর সেলিম কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গিয়ে সব কথা বলে দিলো। রেহেনা বেগম তখন বের হয়ে বাড়ি মাথায় তুলে ফেললেন। বাচ্চাদের ঝগড়াটা তখন বাড়ির কর্তাদের ঝগড়ায় পরিণত হলো। রেহেনা বেগম চিৎকার করে বললেন,
-ঐ রহিমানি, তোর কতো বড় সাহস! আমার ছেলের গায়ে হাত তুলিস?’
রহিমা বেগমও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী না। ঘর থেকে বের হয়ে কোমরে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে বললেন,
-নিজের ছেলেকে সামলাতে পারো না? আমার ছেলের সাথে খেলতে কে বলেছে?
-তোর ছেলে খেলছে কেন?
-আমার ছেলে খেলেনি, তোমার ছেলে এসে ওকে খেলতে ফুঁসিয়েছে।
-কী পেয়েছিস তুই? কাল আমার মুরগির ঠ্যাং ভেঙে দিছিস তক্তা মেরে, আজ আবার আমার ছেলেকে মারছিস। রাণী হয়েছিস নাকি তুই?
-হ্যাঁ আমি রাণী হয়েছি। তুমি তো হতে পারলে না।
-এ্যাহ! আমার রাণী রে! বাপের বাড়িতে খাবারের চাউল নাই, উনি আবার রাণী।
-খবরদার ভাবী! বাপের বাড়ি তুলে কথা বলবে না।
-কী করবি তুই বাপের বাড়ি তুলে কথা বললে?
-বলি, তোমার বাপের বাড়িতে কী আছে? বিয়ের সময় তো একটা কানাকড়িও দেয়নি ভাইজানকে। আর আমাকে কতকিছু দিয়েছে দেখেছো তো।
-আমার স্বামী আমাকে যৌতুক ছাড়া বিয়ে করতে চেয়েছে। আমার বাপের বাড়ি থেকেও অনেক কিছু দিতে চেয়েছিল। তোর বাপের বাড়ির মতো ফকির না আমরা।’
ঝগড়া এভাবে চললো আরো বেশ কিছুক্ষণ। একসময় দুইভাই এসে নিজ নিজ স্ত্রীকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন। তারপর কিছুটা থামলো ঝগড়া। তবুও ঘরের ভেতর থেকে দুই বউয়ের ঝগড়ার রেশ চললো আরো কিছুক্ষণ।

একসময় নাজমুল সাহেবের বাড়িটা তৈরি হয়ে যায়। এই পর্যন্ত আরো অনেকবার ঝগড়া লাগে দুই ভাইয়ে বউদের মধ্যে। যেদিন নাজমুল সাহেব বউ বাচ্চা নিয়ে নতুন বাড়িতে চলে আসেন, সেদিনই সব ঝগড়া থামে। চলে যাওয়ার সময় দুইভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে পরস্পর থেকে বিদায় নিলেও, রেহেনা বেগম এবং রহিমা বেগম কথা বলেনি কেউ কারো সাথে। রেহেনা বেগম জিনিসপত্র সব একটা ভ্যানগাড়িতে তুলে দিয়ে নিজেও উঠে বসলেন ছেলেকে নিয়ে। আর রহিমা বেগম একটা গোয়াল ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন একা একা। ওদের চলে যাওয়ার দিকে ফিরেও তাকাননি উনি। হয়তো মনেমনে ভাবছেন, ‘বেশ হয়েছে ওরা চলে যাচ্ছে।’

অনেকদিন কেটে গেল। দুই পরিবারের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু একদিন রহিমা বেগমের বড় ধরনের একটা অসুখ দেখা দেয়। সাজ্জাদ সাহেব স্ত্রীকে শহরের হাসপাতালে ভর্তি করান। ওখানে তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসা চলতে থাকে। কিন্তু দিনদিন রহিমা বেগম আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। স্মৃতিশক্তিও মাঝেমাঝে হারিয়ে ফেলেন উনি। স্বামী বাচ্চাকে চিনতে কষ্ট হয় মাঝেমাঝে। ডাক্তাররাও বোঝে উঠতে পারছেন না তাঁর অসুখটা কী। কঠিন অসুখ! সাজ্জাদ সাহেব স্ত্রীকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু কয়েকদিন হাসপাতালের বিল দিতে দিতে তাঁর সব টাকা শেষ হয়ে যায়। স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে তিনি ফিরে আসেন গ্রামে। ঘরে তার জমানো আর কোনো টাকা নেই। গ্রামের কয়েকজন থেকে টাকা ধার করে আবার ফিরে আসেন তিনি হাসপাতালে। এই টাকাগুলোও হাসপাতালের বিল দিতে দিতে শেষ হয়ে যায়। তবুও তাঁর স্ত্রীর অসুখের কোনো উন্নতি হলো না। শেষ পর্যন্ত মনে হয় তিনি তাঁর স্ত্রীকে বাঁচাতে পারবেন না। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন রহিমা বেগম। শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে গেছেন উনি। স্ত্রীর এ অবস্থা দেখে সাজ্জাদ সাহেব হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে কাঁদতে লাগলেন নীরবে। অনেক চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর আর সামর্থ্য নেই টাকা খরচ করার। এখন বাঁচা মরার ভার আল্লাহর হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।
ছেলেকে পাশে বসিয়ে সাজ্জাদ সাহেব আড়ালে চোখের জল মুছেন। কিন্তু ছেলেকে কিছুই বোঝতে দেন না তিনি। বোঝতে দেন না যে তার মায়ের কঠিন অসুখ। ছেলে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি ছেলেকে বলেন ‘তার মা খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে।’ হয়তো মিথ্যে আশ্বাস দেন তিনি ছেলেকে।
-সাজ্জাদ…’
একটা কণ্ঠস্বর শোনে চমকে তাকান সাজ্জাদ সাহেব। দেখেন তাঁর ভাই আর ভাবী দাঁড়িয়ে আছেন ছেলেকে নিয়ে। দু’চোখ মুছে সিঁড়ি থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর “ভাইজান” বলে ডুকরে কেঁদে নাজমুল সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। পেছন থেকে তাঁর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে রেহেনা বেগম বলে উঠলেন,
-কেঁদো না ভাই, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
ছোট ভাইকে বুক থেকে ছাড়িয়ে নাজমুল সাহেব বললেন,
-রহিমার এতো কঠিন অসুখ হয়েছে, তুই একবারও আমাদের জানাবার প্রয়োজনবোধ করলি না? এতটাই পর হয়ে গেলাম আমরা তোদের?
-ভাইজান, আমার মাথা ঠিক ছিল না। ওর পেছনে এখন সব টাকা শেষ। খরচ করার মতো আর কোনো অবশিষ্ট টাকা জমা নেই আমার কাছে। উল্টো কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে, তাও শেষ! এখন ওকে এই হাসপাতাল থেকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করার মতো টাকা আমার কাছে নেই।
-এভাবে বলছিস কেন? তোর এই ভাই কি মরে গেছে?
-ভাইজান, তুমি দিবা টাকা?’
-হ্যাঁ, দিবো…’
আবারও ভাইকে জড়িয়ে ধরলেন সাজ্জাদ সাহেব। আবেগে চোখের জল ঝরালেন আবার। তখন একটা নার্স এসে বললো,
-আপনাদের রোগীটা তাঁর ছেলেকে দেখতে চায়ছেন। ছেলেকে নিয়ে যান।’
সবাই মিলে তখন রহিমা বেগমের বেডের পাশে এলেন। রহিমা বেগম হাতের ইশারায় ছেলেকে কাছে ডেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন। কাঁদার শক্তিটুকুও উনার নেই। তবুও ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। হয়তো তিনি বুঝেছেন এভাবে আর কখনও ছেলেকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ পাবেন না তিনি। তাঁর ছোট্ট ছেলেটাও এবার কেঁদে উঠলো মাকে কান্না করতে দেখে। এতক্ষণে সে হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছে মাকে সে হারাতে বসেছে। তার বাবা তাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছে।’

মা ছেলের এমন আবেগী মুহূর্তে রেহেনা বেগম রহিমা বেগমের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-এভাবে কাঁদিস না বোন। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এবার রেহেনা বেগমকে ‘ভাবী’ বলে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন রহিমা বেগম। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন,
-ঠিক হবে না ভাবী। এটা আমার পাপের শাস্তি। তোমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতাম, তাই আল্লাহ আমাকে এমন অসুখ দিয়েছেন।
-ছিঃ বোন, এভাবে বলিস না। আমরা তোকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে আরো ভালো চিকিৎসা করাবো। তারপর তুই ভালো হয়ে যাবি।
-না ভাবী, আর কষ্ট করার দরকার নেই। আমার আশা তোমরা ছেড়ে দাও। আমাকে তোমরা ঘরে নিয়ে চলো। ঘরের মাটিতে শুয়েই মরতে চাই আমি।’ রহিমা বেগমের কণ্ঠটা ক্ষীণ হয়ে এলো। কথাগুলো অস্পষ্ট শুনালো। মনে হচ্ছে গভীর থেকে অনেক কষ্টে বেরিয়ে আসছে কথাগুলো। রেহেনা বেগম সান্ত্বনার সুরে বললেন,
-কিচ্ছু হবে না, বলছি না? আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। ভালো হয়ে যাবি। তুই এভাবে চলে গেলে আমি কার সাথে ঝগড়া করবো রে? আমার কষ্ট হবে না বুঝি? সেই ঝগড়ার দিনগুলোকে খুব মিস করি রে। তুই ভেঙে পড়িস না বোন। একবার সুস্থ হয়ে উঠ, আমি তোর সাথে আর একবার ঝগড়া করতে চাই।’ বলতে বলতে ভারী হয়ে উঠলো রেহেনা বেগমের কণ্ঠ। চোখ বেয়ে তাঁর জল গড়িয়ে পড়লো। তখন রহিমা বেগম বিদ্রপ করে হেসে বললেন,
-ঝগড়া! সে আশায় গুঁড়েবালি।’ বলেই একটু থামলেন তিনি। তারপর ছেলের হাতটা রেহেনা বেগমের হাতে রেখে বললেন,
-আমি চলে গেলে আমার ছেলেটা খুব একা হয়ে পড়বে। ওকে তোমার হাতে তুলে দিলাম ভাবী। নিজের ছেলের মতো একটু মানুষ করবে, কথা দাও ভাবী…’
-চুপ কর তো তুই…’
-তুমি আমাকে কথা দাও… কথা দাও ভাবী।’ বলতে বলতে কাশতে লাগলেন রহিমা বেগম। কাশির সাথে তাঁর রক্ত বের হতে লাগলো। অবস্থা তখন গুরুতর। নাজমুল সাহেব তখন বাইরে গিয়ে একটা এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করলেন। তারপর রহিমা বেগমকে হাসপাতাল থেকে বের করে এ্যাম্বুলেন্সে তুললেন। এ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দিলো ঢাকার পথে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের আর ঢাকা পর্যন্ত যাওয়া হয়ে উঠলো না। একসময় নিস্তেজ হয়ে গেল রহিমা বেগমের দেহ। শোক নেমে এলো এ্যাম্বুলেন্সের ভেতর। কয়েকটা কণ্ঠে কান্নার শব্দ শোনা গেল। নাজমুল সাহেব হতাশকণ্ঠে ড্রাইভারকে বললেন,
-এ্যাম্বুলেন্স ঘুরিয়ে নাও।’
ড্রাইভার এ্যাম্বুলেন্স ঘুরালেন। তারপর ওরা ফিরে চললেন লাশ নিয়ে। রহিমা বেগমের শেষ ইচ্ছেটাও আর পূরণ হলো না। ঘরের মাটিতে শুয়ে তাঁর আর মরা হলো না।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *