অদৃশ্য অবছায়া
প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০১৮
লেখকঃ

 41 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

K. H Tusher

“মামা,ভাড়া টা দেন”।
.
বাসের হেল্পারের কথায় হঠাৎ নড়েচড়ে বসলাম।বাসে উঠার পর সারাদিনের ক্লান্তির অবসাদে একটু তন্দ্রায় পরে গিয়েছিলাম। পকেটে হাত দিয়ে দেখি মানি ব্যাগ গায়েব! বুঝলাম ব্যাস্ত শহরের কোনো এক ব্যাস্ত মানুষ এই কাজ টা করেছে।অগ্যতা হেল্পারের দিকে তাকিয়ে বললাম,
>আসলে মামা,আমার মানিব্যাগ টা হারিয়ে গেছে!
:-কি বলেন মামা?ভাড়া দেন আগে!
এই আরেক মহাঝামেলা।কি করব ভাবছি পকেটে টাকাও নাই যা ছিলো সব মানিব্যাগে।এর মাঝেই পিছন থেকে একজন বলে উঠলো,
“ভাড়া টা আমার কাছ থেকে নিন”।
পিছনে তাকিয়ে দেখি একটা মেয়ে।আপাততো সৌজন্যমূলক হাসি দিলাম।তবে পিছনে ঘুরে আরেকবার মেয়েটাকে দেখে কেমন চিনা মনে হলো বোধহয় কোথাও দেখছি!কিন্তু মনে পরছে না।
.
আমার গন্তব্যে আসতেই নেমে পরলাম।পিছনে মেয়েটাও নামলো।এখন অনেকটা সন্ধ্যে হয়ে গেছে।আমি ভাবছি মেয়েটাকে কোথায় দেখেছি!হঠাৎ মনে পরলো মেয়েটাকে সপ্তাহ খানেক আগে আশফাব সাহেবের সাথে দেখেছি। কে এই মেয়ে? আশফাব সাহেব বিশাল ব্যাবসায়ী।অনেক বড়লোক তার কাজই মেয়ে নিয়ে ফূর্তিতে মাতা।তাহলে কি এই মেয়েটা! এসব ভাবছি এমন সময় পিছন থেকে মেয়েটা বলে উঠলো,
>কি ভাবছেন?
:-না কিছু না।
>আমাকে চিনছেন?আমি আপনাকে দেখেই চিনেছি।
:-আমাকে চিনলেন কিভাবে?
> আপনি রফিক সাহেবের অফিসে চাকুরী করেন।
এবার আমার ধারনা সত্যি হলো।রফিক সাহেব আমার অফিসের বস।আশফাব সাহেব আর রফিক সাহেব বন্ধু।অইদিন একটা মিটিংয়ে আমরা আশফাব সাহেবের অফিসে গিয়েছিলাম তখন ই মেয়েটাকে দেখেছি।
মেয়েটা বললো,”পাশেই আমার বাসা।চলুন এক কাপ চা খেয়ে যাবেন”।
আমার মধ্যে একটা বিষয় ই কাজ করছে এই মেয়েটা কে? কৌতুহল মেটাতে রাজি হয়ে গেলাম মেয়েটার সাথে যেতে।
.
একটু এগিয়েই মেয়েটার বাসা।বাসার ভিতরে ঢুকে দেখলাম বেশ পরিপাটি।জিজ্ঞেস করলাম,
>বাসায় কেউ নেই?
:-আমি একা থাকি।
আমাকে বসিয়ে রেখে মেয়েটা ভিতরে চলে গেলো।আমি ভাবছি মেয়েটাকে কিভাবে জিজ্ঞেস করব সে আশফাব সাহেবের সাথে কেনো?এর মাঝেই মেয়েটি চা নিয়ে এলো।চা য়ে চুমুক দিয়ে বললাম,
>আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করার ছিলো।
:-জানি!
>!কিভাবে?
:- আমি আশফাব সাহেবের সাথে কেনো তাই জিজ্ঞেস করবেন তো?
> এবার আমি একটু অবাক হলাম। আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটা বললো,
:- আপনি যেখানে বসে আছেন এখানে কারা বসে জানেন?
>না।
:- “সমাজের আপার সোসাইটির লোকেরা এখানে আসে,বসে ফূর্তি করে।আমার পরিচয় জানেন না তাই হয়তো এসে বসেছেন।আমি আপনাদের ভদ্র সমাজের কথিত “কল গার্ল”। যাকে আপনারা বিভিন্ন উপাধী দিয়ে থাকেন”।
মেয়েটার কথা শুনে এবার আমার মাঝে একটা অজানা ভয় কাজ করছে।কি বলবো বুঝতেছি না।ইচ্ছে করছে উঠে পালাই!কিন্তু অজানা এক কৌতুহলের কারনে তা পারলাম না।জিজ্ঞেস করলাম,
>আপনি এ পথে কেনো?আপনাকে দেখেতো মনে……….
আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে মেয়েটা আমার হাতে ছোট্ট একটা কাগজ দিয়ে বললো,”পারলে কাল বিকালে কাগজে লেখা ঠিকানায় চলে আসুন”।
আমি কাগজ টা হাতে নিয়ে চুপচাপ রুম থেকে বেড়িয়ে পরলাম।
.
রুম থেকে বেড়িয়ে ল্যাম্পপোস্টের নিচে হাটছি আর আপন মনে ভাবছি কি অদ্ভুত এই দুনিয়া!কারো চেহারা দেখে বুঝার উপায় নেই সে কেমন!আচ্ছা এমন কোনো মেশিন যদি তৈরী করা যেতো যাতে চেহারা স্ক্যান করা যাবে তাহলে কেমন হতো?
উহুম ভেবে কাজ নেই এতো কিছু আমার অনুরন সাপোর্ট দিবে না।আপাততো ভাবছি কাল বিকালে যাবো কি না! মেয়েটার পরিচয় পাওয়ার পর যেতে ইচ্ছে না হলেও একটা কৌতুহল কাজ করছে মেয়েটার আসল রহস্য জানার জন্য।এসব ভাবতে ভাবতে নিজ বাসার দিকে হাটলাম।
.
পরদিন অফিসের কাজের চাপে গতকালের কথা ভুলতেই বসেছিলাম।হঠাৎ মনে পরলো ঠিকানার কথা!অগ্যতা অফিস থেকে বেড়িয়ে ছুটলাম সেই ঠিকানায়।মাথায় ১ মিলিয়ন প্রশ্ন!মেয়েটা আমাকে ফাঁসাবে না তো!যাক সেসব পরে দেখা যাবে আগে তো দেখি মেয়েটা কি রহস্যের ঘেরা।
ঠিকানা অনুযায়ী পৌছাতেই দেখি এখানে একটা কবরাস্থান! এবার কেনো জানি একটু ভীতি কাজ করছে। কে এই মেয়েটা? খেয়াল হলো মেয়েটা একটা কবরের সামনে বসে অঝোড়ে কাঁদছে। মেয়ে যেমন ই হোক পরিচয় যাই হোক এই অবস্থায় মেয়েটা কে দেখলে অন্তত কোনো স্ব-জ্ঞানে থাকা মানুষ ঘুনাক্ষরেও মেয়েটার অন্য কিছু জানতে চাইবে না।।।চুপচাপ মেয়েটার পাশে গিয়ে দাড়ালাম।মেয়েটা আমাকে দেখে ইশারায় বসতে বললো।
> আপনি আসবেন ভাবি নি।
:-না মানে——
>জানতে চান এখানে কে শুয়ে আছে?
:- আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি।
> এখানে আছে আমার সন্তান!
এবার পুরো হচকচিয়ে গেলাম।আসলে কি বলবো আর কি ভাববো সেটা বুঝতেছি না।দীর্ঘক্ষন নীরবতার পর মেয়েটা বলতে শুরু করলো,,
:-” আমি অহনা। এক অজপাড়াগায়ের মেয়ে।ছোটবেলায় ই মা-বাবা মারা যায়। চাচা -চাচীর কাছে বড় হয়েছি।ছাত্রী হিসেবে খুব ভালো ছিলাম। তাই সবার কটু কথা সহ্য করেও অদম্য ইচ্ছে শক্তিতে পড়ালেখা চালাই।তবে কথায় বলে না গরীবের মেয়ের দাম শুন্যের কাথায়।একদিন এলাকার এক গন্যমান্য ব্যাক্তি আমাকে সাহায্য করবে বলে তার বাড়িতে ডেকে নেয়।তখন ক্লাস নাইনে পড়তাম।।সেইদিন আমার জীবনের কালো অধ্যায় শুরু।সেই ব্যাক্তি সাহায্যের নাম করে আমাকে জোর করে ধর্ষণ করে।
কিন্তু এই কথা কাউকে বলতে পারি নি।কারন আমার কথা বিশ্বাস করার মতো কেউ নেই।এ ঘটনার পর জীবনের এলোমেলো শুরু।কোনো ভাবে ম্যাট্রিক পাশ করে ঢাকায় চলে আসি।।।। পড়ালেখা চালনোর জন্য চাচা তার এক বন্ধুর বাসায় আমাকে একটা কাজ দেয়।তাদের যাবতীয় সব কাজ করতাম।একটা কলেজে ভর্তি হই।চাচার বন্ধুটা ভালো মানুষ ছিলেন তাই কলেজের খরচ টা উনি ই দিতেন।এরপর কয়েক মাস ভালোই কেটে যায়।
একদিন এই বাসায় কয়েকজন মেহমান আসে।তাদের মধ্যে ছিলো আশফাব সাহেব এবং তার এক বন্ধু।আমাকে দেখে আমার পরিচয় নিয়ে তার বন্ধু বলে যে সাহায্য করবে। দেখে ভেবেছিলাম হয়তো বড় শহরের মতো বড় মনের মানুষ!তবে ভাবি নি সাহায্য টা সেই গন্যমান্য ব্যাক্তির মতো হবে। অচেনা শহরে কিছুই চিনতাম না তাই দিনের পর দিন ধর্ষন হওয়ার পরেও কিছু করতে পারি নি।হাত শিকলে বাধা ছিলো। এভাবে চলতে চলতে আমার পেটে আসে তার সন্তান।কিন্তু এই অবৈধ সন্তান পৃথিবীতে টিকে নি তার স্থান হয়েছে অই মাটির নিচে।এর পর ই পুরো কালো অধ্যায়ে আমি।এখন দেখেন না কতো বাড়ি টাকা-পয়সা এটাই আমার কাজ। এই নিয়েই এখন আমি এই শহরের বিখ্যাত কর্ল গার্ল।”
মেয়েটার কথা শুনে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।টের পেলাম চোখ দিয়ে টপাটপ পানি ঝরছে।কি আজব এই মানুষ!চিনা নাই জানা নেই সেই মানুষের জীবনের কাহিনী শুনে চোখ দিয়ে পানি ঝড়ে।দুনিয়াটা একটা নাট্যশালা এখানে সবাই অভিনেতা মস্ত বড়।
মেয়েটা কে আর কিছু বলার সাহস পেলাম না।শুধু এক বাক্যে বললাম,
>কাল বিকালে ” স্কয়ারে” দেখা হবে।
আর কিছু না বলে চলে আসলাম।
.
আমার মাথায় এখন শুধু মেয়েটার কথাগুলোই ভাসছে।একটা মানুষ কি করে পারে এতো অভিনয়ের ভার সামলাতে? মেয়েটার পেশা আর কাজ দেখে কেউ কি বিন্দু মাত্র ভাববে এই মেয়েটার আসল কাহিনী?কেউ জানতে চাইবে কখনো কেনো মেয়েটা আজ নামকরা কলগার্ল? সব প্রশ্নের তো উত্তর নেই।কিছু প্রশ্ন সিগারেটের ধোয়ার মতো উড়িয়ে দিতে হয় দূর আকাশে।
.
পরদিন বিকালে মেয়েটার সাথে দেখা হলো।ভাবছি কি বলব মেয়েটাকে! আজ কেমন জানি অনেকটা মায়াবতীর মতো লাগছে তাকে।কল্পনাও আসে না এই মেয়েটাই………
আমি ই বলা শুরু করলাম,
>কেমন আছেন?
:-আমাদের এই কাজে খারাপ থাকতে নেই।আমরা টাকায় ভালো থাকি টাকাই সব।
>আশফাব সাহেব জানতো সব?
:-হ্যা।সেই তার বন্ধুকে প্ল্যান করে দিয়েছে।তাদের দরুনেই তো আজকের অহনা।
একমনে ভাবছি মেয়েটার কথা।।আসলে কোনো উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করবো?
এই মেয়েটা একটু পরে হয়তো অন্যরূপে ধরা দেবে অন্য কারো কাছে।আমি কি পারব তাকে আলোয় ফিরাতে? না আমাদের সমাজে অসম্ভব ব্যাপার।আমি ই পারলাম না মহাপুরুষ হতে।মেয়েটার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। আবেগ অনুভুতির বিপরীতে হাটতে হবে যে।কারন আমার হাত পা শিকলের পৃষ্ঠে বাধা।
.
এইযে দুনিয়া! এই যে মানব নামের অভিনেতা/অভিনেত্রীরা অভিনয়ে ব্যাস্ত।কয়দিন চলবে এই অভিনয়। অভিনয় তো একদিন ফুরিয়ে যাবে অজানায়।
একটা জিনিস যতোই ভাবছি ততই গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি!যেই মেয়েটা আমার কাছে এক রূপে সেই মেয়েটাই আরেকজনের—–
না জীবন নামক রেলগাড়িকে কোনো স্টেশনে থামাবো না।আচ্ছা আশফাব সাহেব দিন শেষে তার মেয়ের সামনে কিভাবে দাঁড়ায়?একবার ও কি ভাবে না অহনা ও তার মেয়ের বয়সী!মানুষ এর মুখোশ পরা লোকদের জন্য কি আদালত হবে এই পারে!না সব ওপারে!
না তার জানার আর সুযোগ হবে না।অন্তত এই কাজটা করতে পারি!
.
এভাবে কেটে গেলো কয়েকদিন।একদিন অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছি এমন সময় বস ফোন দিয়ে বললো,
> তুষার,আশফাব মারা গেছে।কেউ ওকে খুন করেছে।
:- কি!!! কখন স্যার?
>একটু আগে।তুমি ওর বাসায় আসো আমি আছি।
যাচ্ছি বিখ্যাত ব্যাক্তির বাসায়।তবে যাওয়ার সময় দোকান থেকে হাতে ব্যান্ডেজ প্যাচিয়ে নিলাম।কারন এই বিখ্যাত ব্যাক্তিকে ছুরি মারার সময় আমার হাত টাই যে কেটে গেছে!!
সামনে শুয়ে আছে আশফাব সাহেব নামক লাশ!অহনা কি জানবে কখনো কিভাবে কি হলো?না। কেউ ই জানবে না কিছু। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি আশফাব সাহেবের চেহারাটা! যেখানে মিশে আছে এক নারীর জীবনের ঘটে যাওয়া অদৃশ্য এক অবছায়া।দেখা হবে,সব লেনা দেনা হবে পরপারে!

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

১ Comment

  1. Parvej mosharof

    খুন করেই কি সম্ভব অপরাধীর কমতি, নাকি করা যাবে অপরাধের কমতি? খুন নিজেই তো একটা অপরাধ, তবে সেটা যখন অন্যায় দমনে হয় তাহলে যেনো মনে হয় খুন উচিত বিচার। গল্পটা অসাধারণ ছিলো। অসাধারণ ছিল গল্পের বিষয় বস্তু। লেখনীর ভাষা দারুণ। নতুন গল্পের আশায় আছি।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *