অবহেলিত মা
প্রকাশিত: মে ২৬, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 241 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখা : জান্নাতুল মমি
(মে – ২০১৮)
………………

ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালের উপর। একটাই ঘর; যেখানে পশ্চিম কোণায় রয়েছে ছোটখাটো চৌকি, উত্তর পাশে রয়েছে একটা মাটির কলস, দক্ষিণে ভাঙা জানালা আর পূর্বে টিনের দেয়াল ঘেঁষে টাঙানো এক মধ্য বয়সী পুরুষের ছবি।
চৌকির উপর জীবন্ত একটি বৃদ্ধার লাশ রয়েছে। নড়তে পারে তবে চলাফেরা করতে পারে না। সে অক্ষম বৃদ্ধাটি এখন প্রায় ষাটের কোঠায়। অথচ এ বয়সেও তার যৎসামান্য খেয়াল রাখার মানুষ নেই। মানুষ নেই বললে ভুল হবে। একটা ছেলে, দুইটা মেয়ে আছে তার। কিন্তু তিন ছেলেমেয়ে নিজেদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে মাকেও ছেড়ে দিয়েছে। এতে আক্ষেপে ফেটে পড়েছিল বৃদ্ধা। কিন্তু সন্তানদের উপর মায়েদের আক্ষেপ থাকে না, থাকে না কোনো রাগ, থাকে না কোনো অভিযোগ। সন্তানরা ভালো থাকুক এমনটিই তারা চায়। এ বৃদ্ধাও এমনটিই চেয়েছিলেন।
মাঝেমধ্যে তিনি পূর্বদিকে টাঙানো স্বামীর ছবির দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। জল গড়িয়ে তার বালিশ ভিজে যায়। অথচ তার স্বামী জীবিত থাকতে স্বপ্ন দেখতেন তাদের ছেলেমেয়ে আর সব অন্য ছেলেমেয়েদের থেকে আলাদা হবে। তারা বৃদ্ধ হয়ে গেলেও তাদের সন্তানরা আগলিয়ে রাখবে, ঢাল হয়ে রবে জীবনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। এরপর একদিন সময় হলে দুই বুড়ো বুড়ি নিশ্চিন্তে মৃত্যুকে বরণ করবেন। কিন্তু এমন কিছুই হয়নি। বৃদ্ধার স্বামীর অকাল মৃত্যু হলো। এরপর একা নিজ হাতে তিন সন্তানের দায়িত্ব নিলেন এই মা। ছেলেমেয়েদের মানুষ করলেন; উচ্চশিক্ষিতও করলেন বটে। কিন্তু বৃদ্ধা জানতেন না উচ্চশিক্ষিত হলেই সন্তানরা নিজের মাকে ভুলে যায়। যদি জানতেন তবে হয়ত তিনি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতেন না।

খুশখুশে কাশি দিয়ে পানি খাওয়ার জন্য বৃদ্ধা উঠে বসলেন। চোখের দৃষ্টি একেবারে নেই বললেই চলে। ভাঙা চশমাটা পাশ থেকে নিয়ে চোখে দিয়ে পানি খাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই ধুম করে পড়ে গেলেন মাটিতে। ব্যথায় গোঙরাতে লাগলেন তিনি। অথচ বৃষ্টি পতনের শব্দে কারও কানে তার আওয়াজ পৌঁছালো না। বৃদ্ধা চিৎকার করছেন, ব্যথায় সর্বাঙ্গ শরীর শেষ হয়ে যাচ্ছে তার। তিনি মনে মনে ভাবলেন, এই বুঝি তার শেষ সময় এগিয়ে এলো। একসময় বৃদ্ধার শক্তি ফুরিয়ে যায়। চোখ বুজে ফেলে। এরপর ঘরের ভেতর থেকে আর একটিও শব্দ পাওয়া যায় না।

চারিদিকে তখন টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ।
প্রায় ঘন্টা খানেক বৃদ্ধা পড়ে রইলেন মাটিতে। তখন বৃষ্টি প্রায় নেই বললেই চলে। বৃদ্ধাকে আজকের মতো দেখতে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী সাহেরা খাতুন এসেছে। বৃদ্ধার বড় মেয়ে সাহেরা খাতুনকে মার দেখাশোনার জন্য রেখেছিল। অল্প স্বল্প টাকা দেয় বলে সাহেরা খাতুনও ঠিক সেভাবে যত্ন করে না বৃদ্ধার। দায়সারা কাজই বলতে পারা যায়।
সাহেরা খাতুন ঘরে ঢুকেই বৃদ্ধাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে। এরপর চিৎকার চেঁচামেচিতে আশপাশ কাঁপিয়ে তুলে। সাহেরা খাতুনের চিৎকার শুনে অনেক মানুষজন ভীড় করে বৃদ্ধার ছোট টিনের ঘরে। কয়েকজন মিলে বৃদ্ধাকে চৌকির উপর শুয়ে দিলো। অনেকে মনেই করেছিল বৃদ্ধা আর নেই। পাশ থেকে একজন বৃদ্ধার ছেলেকে ফোনে বৃদ্ধার মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে দেয়। কিন্তু অনেকের মন তাতে সায় দিচ্ছিল না। দু’চার জন ডাক্তার ডেকে এনে পরীক্ষা করে দেখে এখনো প্রাণ আছে তার। এ কথা শুনে অনেকেই চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জল মুছে ফেলে। গ্রাম্য ডাক্তার জানায়, বৃদ্ধাকে জরুরী ভিত্তিতে বড় কোনো হাসপাতালে নিতে হবে; নইলে প্রাণ সংকটে পড়বেন উনি।
এরপর বৃদ্ধার ছেলেমেয়েদের থেকে অনুমতি না নিয়েই তাকে শহরের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে ডাক্তার জানান, এ যাত্রায় তিনি বেঁচে গেছেন। তবে পুরো শরীর প্যারালাইজড। কথাটি মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক। বৃদ্ধার এ খবরে অনেকে আফসোস করে। কারণ তারা সকলেই জানেন, বৃদ্ধাটি তাদের জন্য কি না করেছিলেন!
অথচ বৃদ্ধা বাইরের মানুষদের থেকে যত না সেবা যত্ন পাচ্ছেন তার কানাকড়িও ভালোবাসা সন্তানদের থেকে পাননি।

পাঁচদিন কেটে গেল। বৃদ্ধা জীবিত আছেন শুনে তার সন্তানরা তাকে দেখতে আসেনি। অজুহাত ছিল ব্যস্ততার। সন্তান বিহীন যাবতীয় সকল দায় দায়িত্ব এসে পড়ে সাহেরা খাতুনের উপর। এত বড় দায়িত্বে সেও হাঁপিয়ে গিয়েছে।
তাছাড়া বৃদ্ধাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়া, নিয়ম করে ওষুধ খাওয়ানো, গোসল দেওয়াসহ আনুষঙ্গিক যাবতীয় কাজগুলো যে খুবই হালকা এমনও নয়, তার উপর একা হাতে সামলানো।
দিনক্ষণ দেখে বৃদ্ধার তিন ছেলেমেয়ে তাদের মাকে দেখতে আসবে বলে জানিয়েছে সাহেরা খাতুনকে। খবর পাওয়া মুহূর্ত বাঁকা ঠোঁটে অস্পষ্ট কণ্ঠে “আহ” শব্দ করে উঠেন বৃদ্ধা।
তবে এ শব্দের হেতু খুঁজতে গেলে অনেক কিছুই আসবে। শব্দটি এক বছর বাদে সন্তানদের দেখতে পাবে বলে আনন্দের হতে পারে আবার তাদের অবহেলা আর সহ্য হচ্ছে না ভেবেও হতে পারে।
কিন্তু মা তো অভিমান করতে জানে না। তাই বৃদ্ধার চোখে মুখে সন্তানদের দেখতে পাওয়ার আনন্দই ফুটে উঠেছে।
কিন্তু এ আনন্দের রেশ কেটে গেল পাঁচদিন পর। ছোট মেয়ের জর্জ কোর্টে কাজ পড়ে গেছে। সে আসতে পারবে না। তা শুনে বড় মেয়ে আর ছেলেও আসবে না বলে দিয়েছে।
খবরটি বৃদ্ধার কানে গেলে অপেক্ষা নামক সময়কে বড্ড বিতৃষ্ণায় গিলে ফেললেন। মা প্যারালাইজড হয়ে পড়ে আছে সে খবরও কি তাদের সন্তানদের বুককে কাঁপিয়ে তোলে না? নাকি সন্তানরা আজ অনেক বেশি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাচ্ছে?

কেটে গেল আরও তিন মাস। বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থার অবনতি দিনদিন বেড়েই গেল। এখন সাহেরা খাতুনও নিয়ম করে বৃদ্ধার যত্ন নেন না। অযত্ন, অবহেলায় বৃদ্ধা গুনতে লাগলেন জীবনের শেষ কয়’টা দিন।
একদিন খুব সকালে সাহেরা খাতুন বৃদ্ধার ঘরে এলো। সচরাচর এমন সময় সে আসে না। কিন্তু আজ যখন আসলো, এসে দেখে বৃদ্ধার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ। টিনের ঘরে তার হাউমাউ কান্না ছড়িয়ে গেল পুরো গ্রামে।
সত্যিই এবার বৃদ্ধা পরাজিত। হয়ত অভিমান এবার তার মনকে ঘিরে ফেলেছিল। আর তা হবেই না বা কেন!
সন্তানদের এ অবহেলা মায়েরা কি সহ্য করতে পারে? এতটা শক্ত মন মায়েদের হতে পারে? মা তো মমতাময়ী। নরম মনের অধিকারী। তাদের মনে যদি সন্তানরা আঘাত দেয় আর তা যদি প্রতিনিয়ত চলে তবে মাও যে ভেঙে পড়বে এটা স্বাভাবিক নিয়ম।
সেক্ষেত্রে ষাট বছর বয়সী এ মাও তার সহ্য সীমা অতিক্রম করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
কিন্তু দায়ী করে যাননি কাউকেই।
অনেকে বলছে, নিশ্চিন্তে ঘুমের মধ্যেই হয়ত চলে গেছে বৃদ্ধা। কিন্তু যে মায়ের মনে হাহাকার রয়, যেখানে কেবল অশান্তি বাস করে সেখানে নিশ্চিন্তে ঘুমের ভেতর কীভাবে চলে যেতে পারেন তিনি?
এমনও তো হতে পারে, বৃদ্ধা সন্তানদের চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে না পেরে ব্রেইন স্টোকেই মারা গিয়েছে!
সেসব তো অজানাই রইবে; আমাদের কাছে আবার তার সন্তানদের কাছেও।

শেষ দেখা দেখতে পারলো না বলে আজ তিন ছেলেমেয়ে গলা জড়িয়ে কাঁদছে। অথচ সমাজ তাদের দিকে থুতু ছিটিয়ে নিন্দে করছে।
একজন বৃদ্ধার ছেলেকে তো বলেই বসলেন, ‘ডাক্তার হয়েছ অথচ নিজের মার চিকিৎসা নিজ হাতে করতে পারলে না!’
বড় মেয়েকে ধিক্কার দেওয়া হলো, ‘ নিজের মায়ের যত্ন নিজের হাতে করতে হয়। তোমার মেয়ে যখন ঠিক এমনই আচরণ তোমার সাথে করবে তখন বুঝবে কতটা কষ্ট নিয়ে তোমার মা চলে গেলেন।’
ছোট মেয়ে তখন বৃদ্ধার বালিশ নিয়ে কান্না করছিল।
সাহেরা খাতুন এসে তাকে বলল, ‘ উকিল হয়েছ বলেই মায়ের খোঁজ নিতে পারলে না? কত যুক্তি তর্ক তোমার কিন্তু মায়ের অসুখের সময় মেয়ে তাকে দেখতে আসবে না এটা কোন যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করবে?’
অথচ আজ এসব কথা বৃদ্ধার তিন ছেলেমেয়েদের বলে লাভও নেই। সন্তানরা ভুল বুঝলে মায়েদের থেকে ক্ষমা চায় কিন্তু আজ তাদের সামনে সে সুযোগ নেই। নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে যেন অনুশোচনায় আজ তারা জর্জরিত। বৃদ্ধা যদি এসব দেখে যেতে পারতেন তবে হয়ত শেষ সুখ নিয়েই পরলোকগমন করতেন।
কিন্তু তারপরও সন্তানদের ভালোবাসা দিয়ে যায় মায়েরা। কারণ তারা জানে, তাদের সন্তানদের ঠিকই একদিন ভুল ভেঙে যাবে । বৃদ্ধাও হয়ত এমনটিই চেয়েছিলেন। যার কারণে আজ তার তিন ছেলেমেয়ে মায়ের সব স্মৃতি আগলিয়ে রেখেছে খুব যতনে। তাতেও যদি বৃদ্ধা দূর থেকে তার সন্তানদের এই ভালোবাসা দেখে চোখের দু’ফোটা আনন্দের পানি ছলছল করে খেলা করে!

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *