নীড়ু
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৮
লেখকঃ

 104 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখক: রেজাউল করিম
.
একটা চড়ুই উড়ে গেল। মুখে তার চিকন দুটি কুটো। তিন তলার বারান্দা থেকে সেটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। হয়তো নতুন করে ঘর বাধছে। আমরাও বাধছি। তবে কলোনিতে নতুন। এ ফ্লাটে আজকেই শিফট হয়েছি আমরা। আমরা বলতে আমি আর আমার স্ত্রী নীরা। আমি ডাকি নীড়ু বলে। ঘর গোছানো শেষ হতে আর অল্প বাকি। আমি বসে আছি। নীড়ুর জন্য অপেক্ষা করছি। ঐতো নীড়ু চলে এসেছে। তার হাতে কয়েকটি ফুলদানি। একাই সবগুলো মেঝেতে নামাতে পারছেনা। আমি নামাতে সাহায্য করলাম। নীড়ু বারান্দায় যাওয়ার দরজাটা বন্ধ করে তার সামনে টেবিল রাখলো আর টেবিলের উপর সেই ফুলদানিগুলো। আমি বললাম,
“দরজাটা খোলা থাকলে ভালো হয় না?”
“না হয় না!”
“বলছি কী, দরজাটা খোলা থাকলে বারান্দায় বাতাস পেতে সুবিধা হতো।”
“লাগবে না এই দরজা। যদি আবার একটা দূর্ঘটনা ঘটে। যদি হুইল চেয়ার থেকে পড়ে যাও। কী হবে তোমার? একবার কী ভেবে দেখেছো?”
“কী আর হবে! মরে যাবো।”
কথাটা শুনেই চোখে তার কান্নার বাঁধ ধরেছে। মনে হচ্ছে যেকোন মুহুর্তে সে বাঁধ ভেঙ্গে যেতে পারে। রাগের আভা চেহারায় ফুটে উঠেছে। কিছু না বলেই হুড়হুড় করে নিচে নেমে গেল। নীড়ুটা বড্ড অভিমানি। রাগ আর অভিমান এক নয়। অভিমানের পাল্লাটা রাগের থেকে একটু বেশি। আর সেই অভিমানটা শুধু আমার উপরেই দেখায়। আমারো ভালো লাগে তার অভিমান ভাঙ্গাতে। তাকে একটু একটু করে ভালোবাসতে।
.
এইতো সেদিনের কথা, ওকে প্রথম যেদিন দেখতে যাই বেশ শান্ত শিষ্ট একটা মেয়ে। মাথায় লম্বা একটা ঘোমটা নিয়ে গুটিশুটি পায়ে হাজির হয় আমার সামনে। আমি লজ্জায় তার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। চুপটি করে বসেছিলাম সেদিন। পাশ থেকে মামা বলেছিলো,
“কী মামা! পছন্দ হয়েছে?”
আমি শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি দিয়েছিলাম। তৎক্ষনাত বিয়ের বন্দোবস্ত। বিয়ের রাতেই ওর নামটা প্রথম জানতে পারি। তাসফিয়া ফারহানা নীরা। ভারি মিষ্টি দেখতে, ঠিক ওর নামের মতোই। তারপর শুরু হয় আমাদের ছোটখাটো একটা সংসার। একে অন্যের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সম্বোধনটা আপনি থেকে তুমিতে নামে। মিশতে থাকি একে অপরের সুখ জড়ানো মায়াতে। সব মিলিয়ে স্বপ্নের মতোই যাচ্ছিল সময়গুলো। কিন্তু স্বপ্নের মাঝেও দুঃস্বপ্ন থাকে। সেই দুঃস্বপ্ন হয়ে আসলো একটা ট্রাক। কোথা থেকে যেন এসে পিছন থেকে ধাক্কা দিলো। আমি বাইকসহ ছিটকে গিয়ে পড়লাম ফুটপাতের উপর। ছিড়ে গেল একটি পা, ক্ষত বিক্ষত হলো অন্যটি। এখন চলাচলের সম্বল হিসাবে হুইল চেয়ারটাই সঙ্গি। পঙ্গুত্বের দরুন চাকরিটাও চলে যায়। সেই তখন থেকে নীরা একাই সংসারের ঘানি টেনে আসছে। নিজে চাকরি করে আমায় ভরনপোষন দিচ্ছে। নীড়ুর ভালোবাসাটা আছে বলেই আমি বেচে আছি। নইলে কবেই মরে যেতাম। তার অভিমানটা কতটুকু আমি জানি। অফিস থেকে ফিরেই বলবে,
“কী রান্না করছো?
আজ আমার খেতে একদমই ইচ্ছে করছে না!
তুমি খাইয়ে দাও!”
খেয়েই বসবে গল্প শুনাতে। এমন একটা ভাব নিবে দেখে মনে হবে অভিমানটা ও নয়, আমি করছি। নীড়ুর জন্য রান্না করে সেই কখন থেকে বসে আছি।
সন্ধে নামে নাম অবস্থা। তার আগেই নীড়ু চলে এলো। আমায় কিছু না বলেই শুয়ে পড়লো। আমি বললাম,
“কি হলো এটা! কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়লে যে!”
ওপাশ থেকে কোন সাড়া পেলাম না। চেয়ারটা ঠেলে এগিয়ে গেলাম কাছে। আমাকে দেখে অন্যপাশে মুখ ঘুড়ালো। আমি বললাম,
“কী! খাবে না? কথা বলবে না আমার সাথে?”
শুনসান নিরবতা। নীড়ু হয়তো ভেবেই নিয়েছে ও আর আমার সাথে কথা বলবে না। আমি পিছিয়ে জানালার কাছে গেলাম। যেখানে বন্দি খাঁচায় ময়না পাখিটাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তার উদ্দেশ্যে বললাম,
“বুঝলি ময়না, কেউ না খেয়ে থাকলে আমার খুব কষ্ট হয়। তার থেকে বেশি কষ্ট হয় কথা না বললে!”
নীড়ু কান পেতে শুনছে। কোন জবাব দিচ্ছে না। আমি আবার বললাম,
“তবুও কেউ খাবে না! খেলো না। আমিও খেলাম না।”
এই বলে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু নাহ্ কিছুতেই ঘুম ধরছে না। ঘুমানোর ভান করে চোখ বুজলাম। একটু পরে চোখ খুলে দেখি নীড়ু এসে আমার পাশে বসেছে। হাতে তার খাবার। মুখের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো, “হা করো!”
আমি বললাম, “না, তুমি আগে খাও।”
“তোমাকে না খাইয়ে কখনো একা খেয়েছি?”
“না।”
“তাহলে বলছো কেন? নাও, হা করো!”
“হাআআ”
“নীড়ু”
“হুম”
“খাওয়া শেষে আমরা চাদঁ দেখব কেমন? আজকের চাঁদটা না অনেক সু্ন্দর!”
“রোজ রোজ এই বোরিং চাঁদ দেখতে ভালো লাগে তোমার?”
“তুমি পাশে থাকলে শুধু বোরিং চাঁদ নয়, পাড়া প্রতিবেশীর নিকৃষ্ট মন্তব্যগুলোও ভালো লাগে।”
নীড়ু কিছু বললো না। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে আবার খাইয়ে দিলো।
.
জানালা দিয়ে প্রকান্ড গোল আকৃতির ধবধবে সাদা চাঁদটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সাথে আকাশ ভরা জোৎস্না। সেই জোৎস্নার আলো এসে ঘরে ঢুকে পড়েছে। আমি ওকে জড়িয়ে আছি। খুব করে জড়িয়ে ধরে আছি। আমাদের শরির ঠিক যতটা কাছে তার থেকেও কাছে আমাদের মন। মন থেকেই যেন সে মনকে বলছে ভালোবাসি। প্রচন্ড ভালোবাসি। নীড়ু থেকে থেকে সুরেলা কন্ঠে আওয়াজ তুলছে। একটা গানের আওয়াজ। ভালোবেসে বেচে থাকার গান। যে গানের সুরটা আমাকে নিয়েই লেখা।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৫ Comments

  1. আফরোজা আক্তার ইতি

    অসাধারণ একটি গল্প।ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকলে সবকিছুই ভালো লাগে আর সেই মানুষটি যদি হয় মনের মত তাহলে আর কথাই নেই। তার হাতে হাত রেখেই সমস্ত বাধা জয় করা যায়। বানানে কয়েকটা ভুল আছে।
    বাধছে- বাঁধছে।
    তৎক্ষনাত- তৎক্ষণাৎ।
    ছিড়ে- ছিঁড়ে।
    সঙি- সঙ্গী।
    বেচে- বেঁচে।
    ঘুড়ালো- ঘুরালো।
    শরির- শরীর।

    Reply
  2. রেজাউল করিম

    অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

    Reply
  3. Tusher

    গল্পে ভালোবাসার এক অসাধারন প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। পড়ে খুব ভালো লাগল। আরো সামনে এগিয়ে যান। শুভকামনা রইল।

    Reply
  4. Fardin islam

    অসাধারণ গল্প

    Reply
  5. মাহফুজা সালওয়া

    খুব সুন্দর একটা গল্প।
    মনে হলো চরিত্র দু’টো যেন আমার চোখের সামনে ভাসছে।
    সত্যিই তো,ভালবাসার মানুষ যদি পাশে থাকে,তবে মুহুর্তে পুরো দুনিয়া ও জয় করা যায়।
    আর নিরু তো নিজেই তার তুলনা।
    ভালবেসে ত্যাগ স্বীকার ক’জন করতে পারে?
    শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *