নির্মম হাহাকারের নয়টি মাস
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮
লেখকঃ

 60 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

নির্মম হাহাকারের নয়টি মাস
সজীব আহম্মেদ

রফিক মিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ প্রাণে চেয়ে আছে। আর আপন মনে শুনছে। উত্তরদিক হতে কানে আউয়াজ আসছে, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি, চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি। এই সুরটা! আবার পূর্বদিক হতে কানে আউয়াজ আসছে, “সবুজের বুকে লাল সে তো উড়বেই চিরকাল। এই সুরটা! আবার পচ্চিম দিক হতে কানে আউয়াজ আসছে, “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা, আমরা তাদের ভুলবো না। এই সুরটা! আবার দক্ষিণ দিক থেকে কানে আউয়াজ আসছে, “সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ সরনে। এই সুরটা! দিনটা ছিল ২০১৫ সাল, ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখ বেলা দশটা। বিজয় দিবস বলে চারিদিকে নানান রকমের বিজয়ের গান বাজছে। তখন রফিক মিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসতে থাকে আর ভাবতে ভাবতে সেই ১৯৭১ সালের নির্মম হাহাকারের ঘটনায় চলে যায়।

১৯৭১ সাল এপ্রিল মাসের ১২ তারিখ, রফিক মিয়ার বয়স ছিল ১৮ কী ১৯। রবিবার অনুমানিক দুপুর দু’টা ত্রিশ মিনিট হবে হয়তো, তখন রফিক মিয়া একটু কাজ করে বাড়ি এসেছে। বাড়ি ফিরে দেখে রফিক মিয়ার বোনকে কযেকজন পাকিস্তানি মিলিটারি টেনে হেছড়ে নিয়ে যাচ্ছে। এলাকার মিজান চেয়ারম্যানও পাকবাহিনীদের সাথে। রফিক মিয়া দৌড়ে গিয়ে তাদের কাছে কাকুতিমিনতি করে। তাতে কোনো কাজ হয়নি। এক পর্যায় সে মিজান চেয়ারম্যান এর পায়ে পড়ে যায়। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। শেষে পাকিস্তানি এক মিলিটারি রফিক মিয়াকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে তার বোনকে নিয়ে চলে যায়। পারেনি সে তার বোনকে বাঁচাতে। পারিনি সে তার আদরের পাখিটাকে বাঁচাতে। এই কথাটা ভেবে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। তখন রফিক মিয়ার মা এসে বলে, “শোন রফিক, তোর বাবা পাক শেয়াল ছানাদের সাথে যুদ্ধ করতে চলে গেছে। তোর বোনকে তারা নিয়ে গেছে। তুইও তোর বাবার মতো যুদ্ধে চলে যা। আমি চাই না আর কারও মায়ের বুক খালি হতে, চাইনা আর কোনো ছেলে মেয়ে তার পিতাকে হারাতে। হয়তো দেশের জন্য শহীদ হবি, নয়তো পাক শেয়াল ছানাদের মেরে দেশটাকে রক্ষা করবি। চলে যা তুই মুক্তিবাহিনীতে রফিক চলে যা তুই।” কথা গুলা বলে মুখে কাপড় চেপে কান্না করতে করতে ঘরের ভিতর চলে যায় রফিক মিয়ার মা।
তার পরেরদিনই রফিক মিয়া মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। চব্বিশজন ছিল মুক্তিবাহিনী, রফিক মিয়াকে নিয়ে পঁচিশজন হয়। পঁচিশজন মুক্তিবাহিনী একটা নিরিবিলি জায়গায় অবস্থান করে। যেন পাক শেয়াল ছানারা জানতে না পারে। পাকবাহিনী ক্যাম্প ছিল চেয়ারম্যান এর বাড়ির দক্ষিণ পাশে।

একদিন পাক শেয়াল ছানারা অনেক গুলা মেয়েদের ধরে নিয়ে যায়। সেই খবর পায় মুক্তিবাহিনী। কিছু মুক্তিবাহিনী বলে ওঠে, “জীবন দিবো নয়তো নিবো এই শপথ করেই যুদ্ধে নেমেছি, এখন আর বসে থাকলে হবে না, ঝাপিয়ে পড়তে হবে পাক শেয়াল ছানাদের উপর।” যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয় মুক্তিবাহিনী, ঝাপিয়ে পড়ে পাক বাহিনীদের উপর। আক্রমন পাল্টা আক্রমন শুরু হয়। কয়েকজন অন্য পাশ দিয়ে যায় বোনদের উদ্ধার করতে। প্লান হলো, এদিকে মুক্তিবাহিনী আক্রমন করবে, আর কয়েকজন গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসবে। সব মেয়েদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু সবাইকে অমানুষিক অত্যাচার থেকে রক্ষা করতে পারেনি। কারণ তাদের ধরে নিয়ে আসার একদিন পর মুক্তিবাহিনীর কাছে খবর পৌঁছায়। এ জন্যই সবাইকে পাক শেয়াল ছানাদের অমানুষিক অত্যাচার থেকে সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীও চার পাঁচজন দেশের জন্য শহীদ হয়ে গেছে। আর পাক বাহিনীদের দশ বারোজন মারা যায়। বাকী কয়জন পালিয়ে যায় শেয়াল ছানারা। মুক্তিসেনা যারা দেশের জন্য শহীদ হয়। তাদেরকে খুঁজে বেড় করে কবর দেয়া হয়।

আস্তে আস্তে চলে আসে ১৫ই ডিসেম্বর দিবাগত রাতে এবং শেষ যুদ্ধ। গ্রামে প্রচুর গুলি আওয়াজ শুনা যায়। এখন ষোলজন মুক্তিবানিনী আছে মাত্র। তাড়াতাড়ি করে যুদ্ধের জন্য রেডি হয়ে নেয় মুক্তিবাহিনী সব। ষোলজন মুক্তিসেনা চার দলে ভাগ হয়। রফিক মিয়া আর তার বাবা, দু’জন দুই দলে যায়। এক দল মুক্তিসেনা জঙ্গল দিয়ে যায়। এক দল মুক্তিসেনা পানি দিয়ে সাতরে যায়। এমন ভাবেই চার দল মুক্তিসেনা চারদিক দিয়ে আক্রমন করে পাক শেয়াল ছানাদের উপর। চলছে আক্রমন পাল্টা আক্রমন, মুক্তিসেনারা গুলি ছুড়ছে একদিক থেকে, পাক বাহিনী গুলি ছুড়ছে অন্যদিক থেকে। হঠাৎ রফিক মিয়ার বাবা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যায়। সে তার বাবাকে ধরার মতো সুযোগ পায়নি। তার বাবার রক্ত মাখা শরীরের দিকে না তাকিয়েই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। এক সময় সব পাক শেয়াল ছানাদের মারতে সক্ষম হয় মুক্তিসেনারা। পরেরদিন ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিসেনারা রেডিওতে শুনতে পায় বিজয়ের স্লোগান। রফিক মিয়া লাল সবুজের একটা পতাকা নিয়ে দৌড়ে মিজান চেয়ারম্যান এর বাড়ির কাছে গিয়ে, পতাকা উড়িয়ে জয় বাংলা বলে জোরে চিৎকার দেয়। পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে বিজয়ের স্লোগান। উড়তে থাকে লাল সবুজের পতাকা। বাজতে থাকে বিজয়ের বাঁশি। তখন দু’জন মুক্তিসেনা মিজান চেয়ারম্যানকে ধরে এনে। লাল সবুজের পতাকার দিকে তাক করে গুলি করে মারে রাজাকার মিজানকে।

চলে গেল দীর্ঘ নয়টি মাস। এই নয় মাসে কতো না নির্যাতন হয়েছে বাংলার মাটিতে। এই নয় মাসে কতো মা তার ছেলেকে হারিয়েছে। এই নয় মাসে কতো মেয়ে তার স্বামীকে হারিয়েছে। এই নয় মাসে কতো বোন তার ভাইকে হারিয়েছি। এই নয় মাসে কতো ছেলে তার মা বোনকে হারিয়েছে। কতটা নির্মম ছিল বাংলার পরিস্থিতি। কতটা নির্যাতিত হয়েছে বাংলার মানুষ। কতটা হাহাকরের ছিল বাংলার অবস্থা। এই কথা গুলা ভেবে, দীর্ঘ এক শ্বাস ফেলে, মু্সকি হাসি দিয়ে চোখের পানি গুলা মুছে ঘরের ভিতর চলে যায় রফিক মিয়া।

এখনের সেই বাংলাদেশে আমরা বসবাসর করি। আমার অনুভব করতে পারব কি সেই নয় মাসের অবস্থা? আমরা অনুভব করতে পারব কি সেই নয় মাসের নির্মম হাহাকারকে? হয়তো পারব না। সেই শহীদ গনের প্রতি আমাদের সঠিক শ্রদ্ধা আর ভালবাসা আছে কি? হ্যাঁ আমরা ১৬ই ডিসেম্বরে শহীদ মীনারে গিয়ে তাদের কবরের পাশে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানাতে চাইবো। এটা কি শ্রদ্ধা আর ভালবাসা জানানো? আমি বলব না। কারণ আপনি তাদের সমম্মান করতে গিয়ে অসম্মান করে আসছেন। ফুল দিয়ে সম্মান জানাতে গিয়ে, সেই ফুলগুলাকেই আমরা পায়ের নিচে ফেলে পিশে দেই আমরা। নয়তো গাড়ি করে ডাস্টবিনে ফালানো হয়। এটা কি সম্মান জানানো হলো নাকি অসম্মান জানানো হলো? তাদের প্রতি যদি আমাদের শ্রদ্ধা সম্মান আর ভালবাসা থেকেই থাকে? এসব ফুল টুল না দিয়ে পারলে মন থেকে প্রাণ খুলে একটু দোয়া করব আমরা তাদের জন্য। এটাই হবে ভালবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান জানানো। যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছে, আমরা কি তাদের জন্য মন থেকে একটু দোয়া করতে পারব না?
ভাই এমনি এমনি এই বাংলাকে আমরা পাইনি। এমনি এমনি এই স্বাধীন দেশ পাইনি। ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে আজকের এই বাংলাকে পেয়েছি। তাদের বিশাল আত্মত্যাগের বিনিমনয়ে মায়ের ভাষাকে পেয়েছি। হাজারো মা বোনও দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। বিজয় বলে বলতে পারি শুধু তাদের এই বিশাল আত্মত্যাগের জন্য। আর আমরা তাদের শ্রদ্ধা জানাই শহীদ মীনারে ফুল দিয়ে। আমরা সেটা না করে, তাদের জন্য মন থেকে একটু দোয়া করি। তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি, এটাই হবে তাদের প্রতি সম্মাননা ভালবাসা।

“তাদের গল্পের সমাপ্ত বললে সমাপ্ত হবে না, তাদের গল্প সারাদিন সারারাত ভর লেখলেও লেখা শেষ হবে না।”

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *