নির্বাণ
প্রকাশিত: মে ২৯, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 131 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখকঃ Khairunnesa Sultana
(মে – ২০১৮)
………………………

” অন্ধকারে কোনো আলো নেই কিন্তু তারপরও, অন্ধকার রাতগুলোতে এত্তো প্রশ্ন থাকে কেন? কেন বারবার নিজেকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে চাই ? কি হবে এত্তো ভেবে? ” —— 25/01/16

“আমার আর কিছু ভালো লাগছেনা! মৃত্যু আর কত দূরে?”—– 12/03/16

” আজ বাইশে শ্রাবণ! খুব সুন্দর একটা দিন, আজ হয়তো সব ভালো যাবে ” —- বাইশে শ্রাবন।

” নিরাশায় থাকতে থাকতে নিজেকে হারিয়ে ফেলছি, এইবার আশাবাদী হবো, এইবার রুদ্রের হাত ধরে বাঁচবো আমি ” ———09/07/16

শেষের লেখাটা পড়ে রাতুলের হাত থেকে ডাইরিটা পড়ে গেল !
কে রুদ্র?
কি জানতো সে? …এমন হাজারটা প্রশ্ন উড়তে থাকলো রাতুলের চিন্তার আকাশে!
রাতুল কিছুক্ষণ ভাবলো! তারপর সে ঠিক করলো এই রহস্য তাকেই বের করতে হবে। রাতুল তার সব বন্ধুদের থেকে খোজ নিলো রুদ্রের সম্পর্কে, কিন্তু কেউ তাকে চেনেনা! অদ্ভুত তো! একজনও চিনলোনা!

রাতুলের খুব কস্ট হচ্ছে! খুব অসহায় লাগছে নিজেকে! বারবার মনে হচ্ছে যদি দুইবছর আগে সে একটাবারের জন্য রামিসার সাথে কথা বলতো! একবার যদি কলটা ধরতো! তাহলে হয়তো আজ সব আলাদা হতো ।

রাতুলের চোখ থেকে পানি পড়তে লাগলো। আজ পুরো দুইবছর হলো। পুরোপুরি দুটোবছর কেটে গেল কিন্তু এই দুইবছরে রাতুলের রামিসার কথা ভেবে যতটা কস্ট হয়নি আজকে তার চেয়ে অনেকবেশি হচ্ছে। কারন এখন সে খুব কুৎসিত একটা সত্য জানে। সে জানে রামিসা সেদিন একসিডেন্ট করেনি, হয়তো ইচ্ছে করেই সে গাড়ির সামনে চলে আসে! রাতুল এখনো সঠিক জানেনা, হয়তো রুদ্র সব জানে!
কিন্তু …….

এত্তোদিন রাতুল আর সবাই জানতো রামিসার একসিডেন্টে মৃত্যু হয়েছে। কালো রঙের একটা বড় গাড়ির নিচে পড়ে স্পটডেথ হয় তার, অন্তত তথ্যসূত্র হিসাবে পত্রপত্রিকায় তাই লেখা হয়েছিলো। রাতুলও পত্রিকা পড়েই তার বাল্যকালের বান্ধবীর মৃত্যুর খবর জানতে পারে। রাতুল তখন দেশে ছিলোনা। বন্ধুদের সাথে নেপাল ট্রিপ, খুব আনন্দ! এত্তো আনন্দ যে পুরো দুইদিন নিজের মোবাইল ফোনটা স্পর্শ করারও সুযোগ পায়নি সে। ফেরার পথে দেখে মোবাইলে রামিসার সতেরোটা মিসড কল! সাথে সাথে কল ব্যাক করলেও ওইপাশ থেকে কেও সারা দেয়নি, রাতুল তত কিছু ভাবে না, সে অনুমান করেই নিলো যে রামিসা নিজে থেকে আবার কল করবে , দুশ্চিন্তার কিছু হয় নি। কিন্তু দেশে এসে ফ্ল্যাটের দরজায় অযত্নে পরপর চারদিনের পড়ে থাকা খবরের কাগজের একটার প্রথম পৃষ্ঠায় রামিসার ছবিসহ তার একসিডেন্টের খবরখানা ছাপা হয়েছিলো ।প্রথমে রাতুল বিশ্বাস করতে পারেনা কিন্তু তারপর বন্ধুদের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়েই রামিসার বাসার দিকে ছুটে সে। বাসা খুব দূরেনা, কাছাকাছি এলাকা। দৌড়াতে দৌড়াতে রাতুল হাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু রামিসায় বাসায় গিয়ে সে যা দেখলো তার জন্য সে প্রস্তুত ছিলোনা! রামিসার প্রায় সব আত্মীয়রা সেখানে উপস্থিত , সবাই কাঁদছে, কয়েকজন বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছেন, কেও কেও আবার রামিসার মাকে স্বান্তনা দিচ্ছেন। রাতুলকে দেখে রামিসার মা “বাবা” বলে চিৎকার করে উঠলেন। রাতুল ভাবছিলো রামিসার সাথে তার শেষ কথাটাও হলো না! তার বারবার মনে হচ্ছিলো যদি সে জানতো সেটাই তাদের শেষকথা তাহলে সে রামিসার কাছে গিয়ে তাকে আগলে রাখতো, কিন্তু তাও তাকে এভাবে হারিয়ে যেতে দিতো না! রামিসার কবরও জিয়ারত করেছে সে কয়েকবার। কিন্তু সেসব দুইবছর আগের কথা, আজকের সময়ে রামিসা হঠাৎই যেন তার জীবনে আবার ফিরে এসেছে!
ঘটনা শুরু হয় যখন রামিসার পরিবার বাসা পরিবর্তন করতে যায়। আর তাদের এই বাসা শীফ্ট করার কাজে রাতুল সাহায্যের জন্য তার বাসায় যায়। সবকিছু মোটামুটি প্যাকিং করা শেষে যখন রামিসার পড়ার টেবিলটি খোলা হয় তখন তার ড্রয়ারের নিচে টেপ দিয়ে একটা ডাইরি আটকানো থাকে। রাতুল ডায়রিটা দেখে চমকে উঠে আর তার ভেতর লেখাটা যে রামিসার তাতে রাতুলের সন্দেহ নেই। টেবিলের ফাকে বেশ ভালো ভাবেই লুকানো হয়েছিলো ডায়রিটা তাইতো দুইবছর পরও রামিসার পরিবার এর সম্পর্কে কিছু জানতোনা। রাতুল ডায়রিটা নিয়ে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে আসলো, আর পড়তে লাগলো।

” আজকে সবটা কেমন জানি গেল! বুঝতে পারছিনা কি লিখবো। জীবনটা এমন কেন? ” ——–23/04/16

রাতুল ডাইরির যত গভীরে গেল ততই সে জানতে লাগলো রামিসার একাকিত্বের কথা। রাতুলের বিশ্বাস হয়না সবার সামনে এত্তো হাসিখুশি থাকা মেয়েটা এত্তো একা!! কেও বুঝতে পারেনি, এমনকি সেও নিজেও বুঝতে পারেনি!
রাতুল পড়ছে, সে জানছে রামিসার জীবনের অজানা সব রহস্য। অদ্ভুত ব্যাপার যে ডায়রিটাতে খুব স্পষ্ট ভাবে রাতুলের নাম আছে, যেন কি এটা তাকে লেখা, আচ্ছা রামিসা কি জানতো রাতুল এটা পড়বে? এইজন্যই কি সেদিন কল দিয়েছিলো? কলটা ধরলে কি রামিসা তার গুপ্ত ডায়রির সন্ধান দিতো রাতুলকে? রাতুল এসব প্রশ্ন ভাবে, আর ভাবে যে সেদিনের কথা যেদিন খুব একা একটা মেয়ে শেষ বারের জন্য তার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলো! আচ্ছা রাতুলের কি কিছু করার ছিলো? যদি সেদিন কলটা ধরতো তাহলে কি আসলেই রামিসা আজ বেচেঁ থাকতো? হয়তো রাতুলের সাথে তার বিয়েও হতো পারতো, কারন রাতুল মনে মনে রামিসাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু রাতুলের এখন মনে হয় সে কখনোই রামিসাকে ভালোবাসতে পারেনি, যদি তাই বাসতো তাহলে রামিসার কস্ট সে বুঝতে পারতো। আচ্ছা রামিসা কি তাকে ভালোবাসতো? তাহলে রুদ্র কে? কাকে নিয়ে আশাবাদী ছিলো রামিসা?

রাতুল সব সুত্র খাটিয়ে দেখলো কিন্তু রুদ্রের কোনো খোজ পেলনা।

রামিসার ডাইরির পাতা :

“রাতুল, তুই বল তো কেমন হবে যখন আমি বিয়ে করে চলে যাবো? সহ্য হবে তোর? আচ্ছা কখনো কিছু বলিস না কেন আমাকে?
আমি চলে গেলে খুব কাদবি কিন্তু এই বাজি রেখে গেলাম “——-12/07/16

” আমার সাহায্য লাগবে, ইদানিং কি জানি হইসে আমার! কি ভাবি, কি চিন্তা করি কে জানে! পাগল হয়ে যাচ্ছি? ডাক্তার দেখাবো ভাবছি কিন্তু নরমাল কাউন্সিলিং এর জন্য গেলেও তো অনেক অপমান হতে হবে, সমাজ পরিবার সবাইকে বুঝিয়ে বলা এত্তো কঠিন কেন!!! ” ——- 26/08/16

আজকে পুরো দেড়মাস হয়ে গেছে কিন্তু রাতুল এখনো জানেনা রুদ্র কে। সে সন্দেহ করছে আদৌ রুদ্র নামে কেও ছিলো কিনা! হয়তো সে কখনো জানতে পারবেনা, হয়তো একসময় খোঁজাখুঁজিও বন্ধ হয়ে যাবে, আবার হয়তো একদিন সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে!

…কিন্তু গেল দিনগুলোতে রাতুল অনেক কিছু শিখেছে। সে এখন জানে পৃথিবীতে প্রতি চল্লিশ সেকেন্ডে একজন আত্নহত্যা করে! আগে রাতুল ভাবতো এদের কি বাচতে ইচ্ছে করেনা? কিন্তু এখন রাতুল জানে যে এদেরও খুব বাচতে ইচ্ছে করে, খুব বেশি ইচ্ছে করে! কিন্তু তারা পারেনা!

সুইসাইড কোনো অপশন না এটা নরমালি বলাটা যতো সোজা একজন ভিকটিমের দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা বলা দুরে থাক ভাবাটাও ততোটা সোজা না। মানুষগুলো এই পৃথিবীর আড়ম্বর দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে যায় না বরং তারা বাস্তবতার আঘাতে হাঁপিয়ে উঠে! কেউ কেউ তাও বেচেঁ থাকে আবার কেউ কেউ পারেনা। …আমরা অনেকে এদের লুজার বলি কিন্তু সে হেরে গিয়েছিল বলেই সে এই দুনিয়ার “সো কলড রেইস” থেকে সরে এসেছে। ধর্মীয় ভাবে তো অনেক আইন আছে এই জীবন মৃত্যু খেলা নিয়ে আর যেটা সঠিকও, কিন্তু আমরা মানুষজনের বিবেক কোথায় হারিয়ে গেছে? আমরা কিভাবে একজনকে এত্তোটাই অসহায় করে দিতে পারি যে সে মৃত্যুর জন্য আকুল হয়ে পড়ে!! মাঝে মাঝে কয়েকটা কেইসে যে সুইসাইড তাকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে কিন্তু মোস্ট অব দ্য কেইসে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে নিজেকে, নিজেদের সমাজ ব্যবস্থাকে!

রাতুল এইসব ভাবতে ভাবতে আর ভাবতে পারেনা। সে হয়তো জানেনা রামিসা কেন মারা গেছে, কোনো অবান্তর কারণেই মারা গেছে নাকি বুকের মধ্যে সমুদ্র -মহাসমুদ্র পরিমান কষ্ট চেপে মুখ বুজে চলে গেছে। কিন্তু সে জানে রামিসার সাহায্যের দরকার ছিলো হয়তো মেডিক্যাল হেল্প কারন ডিপ্রেশন ছেলেখেলা না। কিন্তু সে সাহায্যের জন্য কোনো এগিয়ে থাকা হাত পায় নি! এটাই হয় সমাজে। এই ” সাহায্যের হাত “টা পাওয়া এখন খুব কঠিন!

রামিসার শেষ লেখা :

” অনেক চেস্টা করলাম কিন্তু পারছিনা! আমি একটা টোটাল লুজার তাই তাদের মতোই চলে গেলাম! ” ——–29/09/16

একইদিনে রামিসার একসিডেন্ট হয়। কেও জানেনা অথচ যে প্রতিদিন মরতো সে একদিন সত্যি সত্যিই মারা গেল! তবুও কেউ জানেনা কেন, কি জন্য, কিভাবে!

রাতুল জানে!
হয়তো তার জানার ছিলো এগুলা, হয়তো রুদ্রও জানতো!

অন্ধকারে ছাদে সিগারেট জ্বালিয়ে রাতুল আকাশ দেখছে। আজকে চাদটা দেখতে বেশ বড়ো লাগছে, রাতুল ভাবছে এই চাঁদটা দেখার জন্য হলেও সে কখনো সুইসাইড করবেনা। দুনিয়াজুড়ে অনেক অশান্তি আছে , অনেক হাহাকার আছে ঠিক, কিন্তু তাও হারতে হয় না , এই চাদ, এই আকাশ সবকিছু দেখলে মনে হয় এই অশান্তির ভিড়েও নির্বাণ আছে, শান্তি আছে ।
কখনো সেটা ভিড়ের মধ্যমণি হয়ে পাওয়া যায় অথবা ভিড়ের থেকে সরে এসে পাওয়া যায়। কিন্তু কখনো ভিড়ের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলে পাওয়া যায় না।
রাতুল চোখের পানি মুছে নিচ্ছে, রামিসার জন্য তার আফসোসটা সারাজীবনের জন্য থাকবে, সেদিন কলটা না ধরার জন্য রাতুল কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেনা। কিন্তু ক্ষমাহীন প্রান্তর জুড়েই তো আমাদের বাঁচতে হয়, তাই না?

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *