মেঘের পরে রোদ
প্রকাশিত: অগাস্ট ১৮, ২০১৮
লেখকঃ

 29 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখা:পুলক মন্ডল।

রশীদ সাহেব ঘামছেন। অস্বাভাবিক মাত্রায় তার গলা বেয়ে টপটপ করে ঘাম পড়ে শার্টের ভেতর অস্বস্তি তৈরী করছে। অথচ এসি রুমের ভেতর এইভাবে ঘেমে নেয়ে উঠবার কথা নয়। তিনি আলমকে ডাকলেন। বললেন, এসির টেম্পারেচার আরো একটু কমিয়ে দিতে। আলম অবাক হলো। এখনই এসি চলছে আঠারো ডিগ্রীতে। এর চেয়ে কমালে চেয়ার-টেবিলে পর্যন্ত কুয়াশা জমে যাবে। সাহেবের মুখের দিকে তাকালো আলম। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, অতএব কথা না বাড়িয়ে সে এসির টেম্পারেচার কমিয়ে দিলো।
রশীদ সাহেব সামনে থাকা ফাইলগুলো আরো একবার হাতে নিলেন। এলোমেলো ভাবে কিছুক্ষণ নড়াচড়া করলেন। তারপর অর্থহীন চোখে তাকিয়ে রইলেন সেগুলোর দিকে, যেমন ভাবে তাকালে সামনে কোনো কিছুই দেখা যায় না- তেমনি।
আলম আবার ভেতরে এলো। তাকে বারবার বলা হয়েছিলো, খুব দরকার ছাড়া দরজা খুলে ভেতরে না আসতে। কাজে মনোযোগ নষ্ট হয়। একে একদিন শক্ত বকা দিতে হবে। মিনমিনে কথায় এর কাজ হবে না, রশীদ সাহেব মনে মনে ভেবে ফেললেন। ফাইল থেকে চোখ সরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন তিনি। আলম মৃদু স্বরে বললো,
“বড় সাহেব আপনারে সালাম দিছেন।”
রশীদ সাহেবের কুঁচকানো ভ্রু ঠিক হয়ে এলো। এই আশংকাটাই তিনি করছিলেন দু’দিন ধরে। ভেবেছিলেন দুদিনে ঝামেলাটা সেরে ফেলবেন। হয়নি, তৃতীয় দিনে স্যারের রুমে ডাক পড়লো।
তিনি খানিক পর ধীর পায়ে স্যারের রুমে গেলেন। কাজ থেকে মুখ না তুলেই স্যার বললেন,
“রশীদ সাহেব, বসেন।”
তিনি চেয়ারটা খুব সাবধানে টেনে নিয়ে বসলেন, যেন এতটুকু শব্দ না হয়।
“ঝামেলাটা কোথায়, বলুন তো?”
রশীদ সাহেব ঢোক গিললেন। গলায় টাইয়ের নটটা যেন ফাঁসির মত লেগে গেছে, এক্ষুনিই খুলতে না পারলে দম বন্ধ হয়েই মারা যাবেন। তিনি দুই আঙ্গুল দিয়ে নটটা একটু ঢিলে করে নিয়ে বললেন,
“কোন ঝামেলার কথা বলছেন, স্যার?”
আফজাল সাহেব এইবার চোখ তুলে তাকালেন।
“রশীদ সাহেব, ঝামেলার কথা আপনি জানেন, তবে আপনি বোধহয় জানেন না, আমিও কিছুটা জানি। আমি চাচ্ছি না সেটা বলে আপনাকে বিব্রত করি। আপনি কি সেটা চান?”
রশীদ সাহেব মাথা নিচু করলেন।
“প্রজেক্টটা তো আপনার আন্ডারে ছিলো, না? কয়েক লাখ টাকার গরমিল হয়ে গেলো, আপনি বুঝতেই পারলেন না? অথচ আপনার ভার্সিটি রেজাল্ট তো এত খারাপ নয়, যে একাউন্টে এত বড় ভুল করবেন।”
রশীদ সাহেব কিছু বলার মত খুঁজে পেলেন না। তার সামনে যেন সবকিছু দুলতে লাগলো। সামনে ভারী টেবিল, তার ওপাশে মানুষ, সবই হালকা হয়ে চোখের সামনে নড়তে-চড়তে শুরু করলো।
টেবিলের এক পাশে পানির গ্লাস ঢেকে রাখা ছিল। তিনি খুব কষ্ট করে সেটা ধরতে পারলেন। তারপর দুই ঢোকে শেষ করে বললেন,
“আমি ঠিক করে ফেলবো স্যার, কয়েকটা দিন সময় লাগবে শুধু।”
স্যার মাথা ঝাঁকালেন।
“সময় লাগবে, দিচ্ছি। তবে সময় শেষে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে। নাহলে আমি চাইলেও আপনাকে রাখা সম্ভব হবে না। আমিও তো আপনার মত হুকুমেরই গোলাম।”
বলে খানিকটা হাসলেন আফজাল সাহেব। রশীদ সাহেবও একটুখানি হাসতে চেষ্টা করলেন কি-না, বোঝা গেলো না। তিনি মৃদু পায়ে স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে এলেন।
মাহবুবের ইচ্ছে ছিলো রেণুকে সারপ্রাইজ দেবেন। সামনেই বিবাহবার্ষিকী। সেই উপলক্ষ্যে সারপ্রাইজ। তবে শেষ পর্যন্ত দেয়া গেলো না। তিনি উত্তরায় একটা গাড়ির শোরুমে ঢুকে খানিকক্ষণ দেখে বেরিয়ে এলেন। গাড়ির রঙ পছন্দ করা এত ঝক্কির কে জানতো? কী সুন্দর সুন্দর রঙের গাড়ি। একবার মনে হয় এইটা ভালো, আবার অন্যটা দেখে আরো ভালো লাগে। তিনি তাই শেষমেশ হাল ছেড়ে দিলেন। গাড়ি তো আর দুই-চার হাজার টাকার বিষয় নয়, যে যা-তা একটা কিনলেই হলো। অতএব সিদ্ধান্ত হলো, রেণুকে নিয়ে দুজনের পছন্দেই গাড়ি কিনবেন। এবং সেটা অবশ্যই বিবাহবার্ষিকীর আগেই।
মাহবুব আজ একটু আগেই অফিসে এলেন। তিনি ক’দিন ধরে খেয়াল করছেন, রশীদ সাহেব থম ধরে বসে থাকেন। কথাবার্তা তেমন বলেন না। তিনি নিজ ডেস্ক থেকে উঠে গিয়ে রশীদ সাহেবের সামনে বসলেন।
“স্যার, কোনো সমস্যা?”
রশীদ সাহেব অন্য কোথাও তাকিয়ে ছিলেন। একজন এসে সামনে চেয়ারে বসেছে, খেয়ালই করেন নি। চমকে উঠলেন খানিকটা। তারপর একটু হাসলেন।
“না, কিছু না তেমন।”
মাহবুব খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
“স্যার, আমাদের প্রজেক্টে না-কি হিসেবে গরমিল পাওয়া গেছে? ওটার একাউন্টস সাইডটা তো আমি দেখেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করেন স্যার, আমি এই অনিয়মের ব্যাপারে কিচ্ছু জানি না।”
“হুঁ। আমি বুঝতে পারছি না, কিভাবে হলো এটা। আপনারা যারা কাজ করেন, সকলেই আমার খুব বিশ্বস্ত। এইজন্যে উপর থেকে চাপ দেয়ার পরও আপনাকে কিছুই বলিনি, মাহবুব সাহেব।”
তিনি মাথা নিচু করে রইলেন। এরপর একসময় উঠে গিয়ে নিজের ডেস্কে বসলেন।
গাড়িটা কিনে মাহবুব যখন ফিরছেন সন্ধ্যা হব-হব করছে। গাড়ি হাইওয়ের ধরে মোটামুটি গতিতে চলছে। ড্রাইভার আকবর আলী, নিজ গ্রামের লোক। পরিচিত, বিশ্বস্ত। লোকটা গাড়িও চালায় ভালো, বেশ অনেক বছরের অভিজ্ঞতা। পাশে বসা রেণুর মুখে তাকালেন মাহবুব। খুশির ঝিলিকে রেণুর বয়স অনেকটা কমে গেছে, মনে হলো তার। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে সে। মাহবুব কিছু উত্তর দিচ্ছেন, কিছু দিচ্ছেন না। রেণু অবশ্য উত্তরের জন্যে অপেক্ষাও করছে না। মাহবুব হঠাৎ রেণুর দিকে একটু সরে এসে তার হাতটা নিজের মুঠোয় তুলে নিলেন। বাইরে রাস্তায় রাতের আলো জ্বলে উঠছে। এই আলোয় সবকিছু বড় উজ্জ্বল মনে হতে থাকলো মাহবুবের।
দুজন যখন গাড়ি নিয়ে ফিরলেন, রাত প্রায় দশটা বাজে। মাহবুব গেইট খুলতে গিয়ে দেখলেন, দরজার সামনে উল্টোদিকে ফিরে কেউ একজন বসে আছেন। এত রাতে তার দরজার সামনে কে বসে থাকবে? বেশ খানিকটা অবাক হলেন তিনি। সামনে এগিয়ে গেলেন। রশীদ সাহেব। অন্ধকারে মাথা নিচু করে বসে আছেন। মাহবুব ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“স্যার, আপনি এখানে এভাবে কেন?”
রশীদ সাহেব মুখ তুললেন।
“বিদায় নিতে এলাম, মাহবুব সাহেব। আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।”
মাহবুব অনেকক্ষণ কোনোকিছু বলতে পারলেন না। দরজা খুলে তাঁকে ঘরের ভেতর নিয়ে বসাবার কথা পর্যন্ত ভুলে গেলেন। রশীদ সাহেব বললেন,
“চাকরী গেছে, আফসোস নাই। আফসোস হলো দোষ না করে দোষের অংশীদার হওয়া। এইটা খুবই লজ্জার বিষয়। তার উপর মেয়েটাকে বাইরে নেয়ার সময় হয়ে এলো। এতগুলো টাকা…”
কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি। মাহবুবের মনে পড়লো, স্যারের ছোট্ট মেয়েটার কঠিন অসুখ। তাকে বছরে একবার অন্তত ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়।
রশীদ সাহেব আর কিছু বললেন না। শেষে খুবই মৃদু স্বরে বললেন,
“ভালো থাকবেন, মাহবুব সাহেব।”
এই লোকটা তার নাম ধরে ডাকেন, সবসময়। এত ভালো লাগে এটা মাহবুবের। অন্ধকারে অনেকটা টলতে টলতে এগিয়ে গেলেন তিনি। মাহবুব তাকিয়ে রইলেন শেষ পর্যন্ত।
গাড়িটা গ্যারেজে রাখতে দিয়ে রেণু বাইরে থেকে খাবার আনতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে মাহবুবকে অন্ধকারে ওভাবে বসে থাকতে দেখে ভীষণ আশ্চর্য হলেন। এরপর কত প্রশ্ন করলেন, কিচ্ছু জানতে পারলেন না। সে রাতে কিছু খেতে ইচ্ছে হলো না মাহবুবের। তিনি বললেন,
“খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি খাবো না আর। ঘুমুবো এখন। প্লিজ, ডেকে দিও না।”
লাইট অফ করে বেডরুমে গিয়ে শুয়ে রইলেন তিনি। রেণু প্রায় ঘন্টাখানেক পর ঘরের কাজ শেষ করে শুতে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, ঘন্টাখানেক ধরে শুয়ে থাকা মানুষটা এখনো ঘুমায় নি। মাহবুব খানিক পর খেয়াল করলেন, রেণু ভীষণ অস্বস্তিতে বিছানার এপাশ-ওপাশ করছে। তার ইচ্ছে হলো খুব, একটা হাত রেণুর গায়ের উপর তুলে দেয়। তারপর দুই হাতের ভেতর ছোট্ট চড়ুই পাখির মতো আবদ্ধ করে নিজ স্ত্রীকে। পারলেন না। হাতটা এক চুল নড়াতে পারলেন না যেন তিনি। বিছানায় শুয়ে থাকা দুজন মানুষই জানলেন কেউ ঘুমুচ্ছে না, তবু নিজেকে আড়াল করবার জন্যে দুজন গভীর অন্ধকারে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে শুয়ে রইলেন। মানুষ মাত্রই নিজেকে আড়াল করবার এত চেষ্টা কেন, কে জানে? পশুর এমন চেষ্টা নেই। খুব সম্ভবত, মানুষ ছাড়া জগতে অন্য কারো আড়াল করবার মতো কিছু থাকে না।
আকবর আলী দক্ষ ড্রাইভার। গাড়ি চালিয়ে তার হাত পাকানো হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করেও গাড়ি চালাতে পারবে, এমন ধরনের আত্মবিশ্বাস তার। মাহবুব অন্যমনস্ক ছিলেন। গাড়ির দুই পাশের জানালা তুলে দেয়া হয়েছে। ভেতরে তাই নীরবতা। যে রাস্তা ধরে গাড়ি চলছে, সেটা হাইরোড। চওড়া সোজা রাস্তার খানিকটা দূরে হুট করে কোত্থেকে যেন এক বাচ্চা মেয়ে চলে এলো। লাল রঙের একটা ফ্রক পরনে তার। আশ্চর্য হয়ে মাহবুব খেয়াল করলেন, আকবর গাড়ির গতি কমাচ্ছে না। তিনি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।
“কী করছো? মেয়েটাকে মেরে ফেলবে না-কি?”
আকবর পেছনে তাকালো। তারপর আবার সোজা রাস্তায়। গাড়ির গতি আরো একটু বাড়লো বোধহয়। সুইচ টিপে পাশের জানালাটা খুলে পানের পিক ফেলে বললো,
“মেয়ে কই স্যার? রাস্তা তো পুরা ফকফকা।”
মাহবুব সাহেব দেখলেন গাড়ির ঠিক মিটার খানেক সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটা যেন হাসছে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন।
“খবরদার, গাড়ি থামাও বলছি।”
আকবর ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গাড়িটা হার্ড ব্রেক কষে থামালো।
মাহবুব সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নামলেন। কিন্তু কী আশ্চর্য, হাইওয়ে ধরে যতদূর চোখ যাচ্ছে, কাওকে দেখতে পেলেন না তিনি। বিভ্রান্তের মতো তিনি গাড়িতে উঠে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে আবার বেরিয়ে পড়লেন। বললেন,
“তুমি গাড়িটা বাসায় নিয়ে যাও। তোমার ম্যাডাম বাইরে বেরোবে। আমি এমনিই যেতে পারবো।”
আকবর আলী কিছু বললো না। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
সেদিন থেকে মাহবুব ছোট্ট মেয়েটাকে বারবার দেখতে লাগলেন। মেয়েটা যে ভয় দেখায়, বা কোনো ক্ষতি করে- এমন নয়। গাড়িতে উঠে বসলেই তার মনে হয়- মিটার খানেক সামনেই সে দাঁড়িয়ে। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন,
“তুমি কি গাড়িতে বসে সামনে কোনো বাচ্চা মেয়ে দেখতে পাও?”
রেণু আশ্চর্য হলেন।
“পাবো না কেন? রাস্তায় কোনো বাচ্চা মেয়ে থাকলে দেখব না?”
মাহবুব খানিকটা চুপ করে রইলেন। কীভাবে স্ত্রীকে বিষয়টা বোঝাবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না। তারপর বললেন,
“সেরকম না। ধরো তুমি গাড়িতে বসে দেখলে একটা বাচ্চা গাড়ির খুব কাছেই, দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এরপর গাড়ি থামিয়ে নেমে দেখলে সেখানে কেউ নেই। এমন হয়েছে কখনো?”
রেণু এবার হাসলেন।
“কি যে বল তুমি। এমন কেন হবে?”
এরপর খানিকটা উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“আচ্ছা, তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?”
মাহবুব মাথা নাড়লেন। না, তার শরীর খারাপ লাগছে না।
এর সপ্তাহ খানেক পর রাস্তায় রশীদ সাহেবের সঙ্গে দেখা মাহবুবের। তিনি খুবই ধীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মাহবুব ডাকলেন তাকে। রশীদ সাহেব ফিরে তাকাতেই চমকে উঠলেন তিনি। চোয়াল ভেঙে দু’ গাল যেন লেগে গেছে। চোখের নিচে চামড়ায় ভাঁজ। হুট করে বছর দশেক বেড়ে গেছে তার। খানিকক্ষণ কথা বলতে পারলেন না মাহবুব। একসময় জিজ্ঞেস করলেন,
“এই অবস্থা কেন?”
অভ্যাসবশত ‘স্যার’ প্রায় বলেই ফেলছিলেন। শেষ মুহূর্তে সামলে নিলেন মাহবুব।
“একটু দুশ্চিন্তায় আছি ভাই। নতুন চাকরী পাওয়া ভীষণ কঠিন। তার উপর বয়েসও হয়েছে। কে দেবে, বলেন? মেয়েটার চিকিৎসার ব্যবস্থা এখনও করে উঠতে পারিনি।”
দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ। সঙ্গে উত্তপ্ত বাতাস। সেই রোদে দাঁড়িয়ে রোদের মতোই তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি।
এই দীর্ঘশ্বাসটা মাহবুব কেন যেন কিছুতেই ভুলতে পারলেন না সারাটা দিন। অফিসে যাওয়া, ফাইল দেখা, লাঞ্চ করা, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা, সবসময় এই দীর্ঘশ্বাসটা তার বুকের ভেতর খচখচ করতে থাকলো। তিনি এই অস্বস্তি বুকে করে রাতে ঘুমুতে গেলেন। ঘুম এলো না। রেণু পাশে শুয়ে ঘুমুচ্ছে হয়তো। ওপাশ ফিরে আছে সে, মাহবুব দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি একটা হাত তার গায়ের উপর দিতেই রেণু এপাশে ফিরলেন। মাহবুব জিজ্ঞেস করলেন,
“ঘুমাওনি যে এখনও?”
দেয়ালের উপরে ছোট্ট কিন্তু সুন্দর নকশার ঘুলঘুলি। ঘুলঘুলি দিয়ে দূরে কোথাও থেকে নকশা করা আলো এসে ঘরে পড়ে। মাহবুব সেই আলোয় অস্পষ্ট দেখলেন, রেণু একটু হাসলো। বললো,
“তুমিও তো ঘুমাওনি। ক’দিন ধরে তোমাকে অন্যরকম লাগছে। কোনো সমস্যা?”
মাহবুব চুপ করে রইলেন। প্রথমটায় ভাবলেন, এই মুহূর্তে চুপ করে থাকা ছাড়া কিছু করবার নেই। ঘুমানো যাক। পরবর্তীতে আবার মনে হলো, কথাটা বলবার এর চেয়ে ভালো সময় আর কখনো না-ও হতে পারে। কী সুন্দর আবছা আলো-অন্ধকার। দিনের আলোয় কথাটা তিনি বলতে পারবেন না। দিনে বলতে হয় সুন্দর কথাগুলো, রাতের অন্ধকার কেবল ভয়ানক, অসুন্দরের জন্যে।
তিনি বললেন,
“গাড়িটা তো আমাদের খুব বেশি দরকার নেই, তাই না রেণু? ওটা বিক্রি করে দিই? আমি তো বাসে চড়ে অফিস যেতে পারি। তুমি নাহয় রিক্সায় বেরুলে। খুব সমস্যা হবে?”
রেণু চুপ করে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন,
“দরকার হলে অবশ্যই বিক্রি করবে। তোমার প্রবলেম আমি বুঝবো না? তবে এত শখের জিনিসটা কেন বিক্রি করতে চাইছো?”
মাহবুব রেণুর হাতটা এক হাতে আলতো করে ধরলেন। তারপর ফিসফিস শব্দে বললেন,
“এটা জানতে চেও না, প্লিজ। আমি বলতে পারবো না।”
রেণু কী বুঝলেন, কে জানে। ছোট কিন্তু গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন।
সরু সিঁড়ি বেয়ে এই ঘরে উঠে আসতে মাহবুবের রীতিমত কসরত করতে হয়েছে। এর চেয়ে সমস্যা ছিলো ঠিকানা যোগাড় করা। আগে রশীদ সাহেব থাকতেন অন্য বাসায়। চাকরীটা চলে যাবার পর এই কানাগলির ভেতরে দিনের বেলায়ও রাতের মতো অন্ধকার হয়ে থাকা বাসাটা ভাড়া নিয়েছেন। কাওকে কিচ্ছু জানান নি। অফিসের পিওনের বাসা এইদিকে হওয়াতে তার থেকেই ঠিকানা নিয়ে এসেছেন মাহবুব। বাইরের তীব্র আলো থেকে হঠাৎ রাতের মতো অন্ধকার ঘরে এসে মাহবুব প্রথমটায় কিছুই দেখতে পেলেন না। এরপর আস্তে আস্তে চোখে সয়ে এলো। তার মনে হলো, এর চেয়ে জরাজীর্ণ বাসা ঢাকা শহরে খুব বেশি নেই। আসবাব প্রায় নেই বললেই চলে। শতবর্ষ পুরোনো ধরনের এক রংচটা আলমারি ঘরের কোণে। আর একটা জামাকাপড় রাখার আলনা। আলনায় পায়া প্রায় ভেঙে যাচ্ছে। খুব কষ্টে সে কাপড়গুলোর ভার বহন করছে। রশীদ সাহেব সেদিকে তাকিয়ে হাসলেন। লাজুক হাসি। বললেন,
“বাবার আমলের জিনিস তো, ফেলে দিতে পারিনি।”
মাহবুব জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনার আগের বাসার ফার্নিচার গুলো সব কোথায়?”
“বিক্রি করে দিয়েছি। মেয়েটার চিকিৎসার জন্যে টাকা ম্যানেজ করে ফেলেছি প্রায়। অল্প কিছু বাকি।”
“আপনার মেয়েটাকে কি একবার দেখতে পারি?”
কিছুটা মিনতির মতো শোনায় মাহবুবের কন্ঠ। রশীদ সাহেব খুশি হলেন খানিকটা।
“নিশ্চয়ই। ভেতরের ঘরে আছে সে।”
ছোট মেয়েটা পাশ ফিরে শুয়ে ছিলো। রশীদ সাহেব স্নেহ ভর্তি কন্ঠে তার মেয়েকে ডাকলেন। মেয়েটা ধীরে সুস্থে এপাশ ফিরলো। মাহবুব চমকে উঠলেন মেয়েটাকে দেখে। অবিকল সেই মেয়েটার মতো। রাস্তার মাঝে গাড়ির সামনে কতবার দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে দেখেছেন ঠিক এই মেয়েটিকেই।
মাহবুব কিছু বলতে পারলেন না একে। চুপ করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। রশীদ সাহেব আশ্চর্য হলেন খানিকটা।
তিনি খেয়াল করলেন, মাহবুব ঘামছেন। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে, তবু অস্বাভাবিক মাত্রায় ঘামছেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনার শরীর খারাপ লাগছে? পানি দেবো?”
মাহবুব মাথা নাড়লেন। এরপর পকেট থেকে একটা খাম বের করে রশীদ সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। রশীদ সাহেব খেয়াল করলেন মানুষটার হাত কাঁপছে। খামটা হাতে নিলেন তিনি। পাঁচশো টাকার নোটের কয়েকটা বান্ডিল। বিস্মিত হয়ে তিনি মাহবুবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কথা বলতে ভুলে গেলেন খানিকক্ষণ।
মাহবুব চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“কীসের টাকা এগুলো?”
মাহবুব একটু হাসলেন। বললেন,
“আপনারই। মেয়ের চিকিৎসা করাবেন। আর এই বাসায় কিভাবে আছেন আপনি? কাল সকালে অফিসে যাবেন। আপনার চেয়ার খালি পড়ে আছে, আর আপনি বাসায়- এটা কেমন কথা?”
এইটুকু বলে মাহবুব বেরিয়ে এলেন। ভেতরের অন্ধকার থেকে খোলা রাস্তায় নামতেই চোখ খানিকটা অস্বস্তিতে চিড় চিড় করে উঠলো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে। গাড়িটা নেই। মাহবুব হাত বাড়িয়ে একটা রিক্সা ডাকলেন। কিছু বললেন না, ভাড়া জিজ্ঞেস করলেন না- উঠে পড়লেন। রিক্সাওয়ালা একবার বললো,
“কই যামু?”
মাহবুব জবাব দিলেন,
“যেদিকে তোমার খুশি।”
রিক্সাটা সত্যিই খুশিমতো চলতে থাকলো।
মাহবুব খেয়াল করলেন, কাল থেকে তার চাকরী থাকবে না- অথচ এই নিয়ে এতটুকু দুশ্চিন্তা হচ্ছে না। গরমিল করে রাখা ফাইলটার দায় স্বীকার করে একটি চিঠি তিনি বসের টেবিলে রেখে এসেছেন। সেটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে সাসপেন্ড করে রশীদ সাহেবকে আবার চাকরীতে নেয়া হবে। মাহবুবের ইচ্ছে হলো- নতুন করে পুরোনো চেয়ারটাতে বসার পর রশীদ সাহেবের মুখটা কেমন হয়, দেখতে। সম্ভব নয়। সেই অফিসে আর যাবেন না তিনি।
রিক্সা চলছে। সামনের সেই ছোট্ট মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছেন না আর মাহবুব। তার খুব ইচ্ছে করছে, যদি আর একবার মেয়েটা তার সামনে এসে এভাবে হাত নাড়তো। তিনি মেয়েটাকে রিক্সায় তুলে নিতেন। তারপর বলতেন,
“আমি আমার সব দোষ স্বীকার করে নিয়েছি মা। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও এবার।”
রিক্সা জ্যামে আটকে আছে। পড়ন্ত বিকেলের রোদ তার কপালে এসে পড়ছে। সেই আলোয় কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করছে। মাহবুবের এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। তিনি সম্পূর্ণ মনযোগ নিয়ে তাকিয়ে আছেন ফুটপাতের এক নগ্ন প্রায় বাচ্চার দিকে। বাচ্চাটা তার মায়ের সঙ্গে লুকোচুরি জাতীয় খেলা খেলছে। জরাজীর্ণ শাড়ি পরা মা তার বাচ্চাকে দেখতে পেয়েও দেখছে না। পেছন থেকে মাকে ছুঁয়ে চমকে দিয়ে সে কী হাসি বাচ্চাটার। মাহবুবের ঠিক এই বাচ্চাটার মতো সুখী সুখী লাগছে। তিনি একবার ভাবলেন, গাড়ি বিক্রি করে পাওয়া পকেটের শেষ পাঁচশো টাকার নোটটা এদেরকে দিয়ে দেন। জ্যাম ছেড়ে দিলো। রিক্সা চলতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত মাহবুব টাকাটা দিলেন না। এই সুখী মানুষেরা এখন সব আশা-আকাঙ্খার উপরে। জগতে কেবল আশা-আকাংখা ছাড়া মানুষগুলোই সুখী হতে পারে।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৪ Comments

  1. আফরোজা আক্তার ইতি

    দারুণ। আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষের জন্যই বিশ্বস্ত আর সৎ মানুষগুলো এত কষ্ট ভোগ করছে। মাহবুব সাহেব তার ভুল বুঝতে পেরে টাকা ফিরিয়ে দিয়ে এবং নিজের দোষ স্বীকার করে কহহুবই ভালো কাজ করেছেন। অন্যায় পথে অর্জিত টাকায় কখনোই শান্তি আসে না। এক কথায় ভীষণ সুন্দর একটি গল্প। আমার বেশ বালো লেগেছে। শেষেরটুকু পড়ে আমার চোখে পানি এসে গেছে। চমৎকার একটি গল্প। সাজানো গুছানো, পরিচ্ছন্ন হাতের লেখা। ভালো লাগলো। বানানে তেমন কোন ভুল নেই। অনেক শুভকামনা আপনার জন্য।

    Reply
  2. Sajjad alam

    অল্পকিছু ভুল চোখে পড়েছে,
    .
    যেমন ভাবে___যেমনিভাবে/যেমনভাবে
    .
    গলায় টাইয়ের নটটা যেন ফাঁসির মত লেগে গেছে___ (মতো হবে। মত ও মতো শব্দের অর্থ অালাদা।)
    .
    গেলো___ গেল। (দু’টোরই অর্থ অালাদা)
    .
    কী সুন্দর সুন্দর রঙের গাড়ি।___ ( বিস্ময়সূচক চিহ্ন হবে।)
    .
    করেন নি___ করেননি
    কিভাবে___ কীভাবে
    ঘুমায় নি___ ঘুমায়নি
    .
    কাওকে দেখতে পেলেন না তিনি।___ (কাওকে বেমানান। কাউকে হলে ভালো হতো।)
    .
    কন্ঠ___ কণ্ঠ
    জানান নি___ জানাননি
    ফার্নিচার গুলো___ ফার্নিচারগুলো
    চিড় চিড়___ চিড়চিড়
    .
    নামকরণটা যথার্থ….
    গল্পের প্লটটাও খুব সুন্দর।
    পাকা হাতের লেখনী।
    বাক্যগঠনও বেশ পাকাপোক্ত।
    .
    সত্যি এভাবে যদি সমাজের মানুষেরা তাদের দুর্নীতি সম্পর্কে বুঝতো তাহলে হয়তো দুর্দিন অামাদেরকে দেখা লাগতো না।
    .
    সবমিলে গল্পটা ভালো লেগেছে।
    শুভ কামনা রইলো।

    Reply
  3. Halima tus sadia

    ভালো লিখেছেন।
    অনেক বড় গল্প।বর্ণনাভঙ্গিও ভালো।

    অন্যায়পথে টাকা অর্জন করলে সে টাকা থাকে না।
    অন্যায় পথ থেকে যদি কেউ ফিরে এসে নিজের ভুল বুঝতে পারে তাহলেতো ভালোই।
    জীবনে স্বার্থকতা রয়েছে।
    নিজের দোষটা মাহবুব সাহেব স্বীকার করে ভালো করেছে।
    কারো টাকা আত্মসাৎ করলে শান্তি নাই।
    সংসারে অশান্তি লেগেই থাকে।
    করেন নি–করেননি
    ঘুমায় নি–ঘুমায়নি
    কন্ঠ-কণ্ঠ
    জানান নি–জানাননি
    কাওকে–কাউকে

    শুভ কামনা রইলো।

    Reply
  4. আরাফাত তন্ময়

    শুভ লামনা রইলো দাদা

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *