মাতৃহীনা
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারী ৯, ২০১৮
shot ma
লেখকঃ vickycherry05

 27 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

written by#sharmin_khanom
(ফেব্রুয়ারী’১৮)

স্কুল ব্যাগে বইয়ের সাথে কিছু পুরোনো কাপড় নিয়ে বাড়ি ফিরছি। কাপড় গুলো হয়তো আপুটার জন্য পুরোনো হয়ে গেছে। কিন্তু আমার জন্য যে এগুলোই নতুন। এই কাপড়ে কারো গায়ের গন্ধ নেই। নতুন কাপড়ের গন্ধই খুজে পাই আমি। আমিতো ভুলেই গেছি বাজার থেকে কেনা কাপড়ের গন্ধটা। বছরে হয়ত দুইএক বার পেয়েছিলাম। তা কি মনে রাখা যায়।

তবু আমার নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়। কারো কাছে চায়তে হয়না বলে। আমার মতো মাতৃহীনাদের তো কেউ ভালোবেসে কিছু দেয়না। আমাদের জন্য কেবলই সহানুভূতি প্রযোজ্য।

কিন্তু আপুরা আমায় ভালোবেসেই ওদের পুরোনো সব দেয়। ওদের চোখে আমি সহানুভূতি দেখিনি। ওদের ভালবাসার দান আমি চুপচাপ গ্রহণ করি। শুধু কষ্ট দেয় আমার অতীত। আপুদের ভালোবাসায় সে অতীত যে বেশি করে হানা দেয় আমার বর্তমানে।

ওদের মতো আমারও একদিন মা ছিল। আমার মাও আমায় খুব ভালোবাসতো। মা তার নিজের হাতে কাপড়ে নকশি করে আমায় পরাতেন। আমাকে ঘিরে ছিল মায়ের হাজার স্বপ্ন। আমরা হয়তো গরিব ছিলাম। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা গরিব ছিল না। মায়ের স্বপ্ন গুলো গরিব ছিল না। মায়ের সকল অপূর্ণ স্বপ্নগুলো আমার মধ্য দিয়ে পুরনের স্বপ্ন দেখছিলেন। মা বেশি পড়ালেখা করার সুযোগ পায়নি। কিন্তু মায়ের স্বপ্ন ছিল আমি অনেক পড়াশোনা করব। শিক্ষিকা হয়ে আরো শত শত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিব শিক্ষার আলো।

আমি তখনো মায়ের কথার এক বিন্দুও বুঝতে শিখেনি। তবুও মা অনর্গল কথা বলে গেছেন আমার সাথে। আমি শুনতাম আর হাজার প্রশ্নে জর্জরিত করতাম মাকে। মা বুঝাতে ব্যর্থ হয়ে বলতেন, একদিন সব বুঝবি। আমিও হয়তো সেই একদিনের অপেক্ষায় ছিলাম।

একদিন মাকে খুব হাসিখুশি লাগছিল। যদিও মা সবসময় খুব হাসিখুশিই থাকতেন। তবুও সে দিন যেন অন্য কিছু যোগ হয়েছিল মায়ের আনন্দে। আমি মাকে বার বার জিজ্ঞেস করি, মা কি হয়েছে? মা আমায় বলেছিলো তোমার ভাইয়া আসতেছে।
——কোথায় ভাইয়া?
——-তোমার বাবা বাজার থেকে কিনে আনতে গেছে।
——বাবা কখন নিয়ে আসবে ভাইকে?
——-এইতো কদিনের মধ্যেই।
কিন্তু আমার কদিন অপেক্ষা করার ধৈর্য্য ছিল না। এক্ষুনি এনে দাও ভাইকে। এই নিয়ে কেঁদে মাকে কত জ্বালাতন করেছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু মা সব হাসিমুখেই সহ্য করেছিলেন।

কদিন পরেই হঠাৎ একদিন মা অসুস্থ হয়ে পরেন। আমাকে খালামনির কাছে রেখে মা’কে নিয়ে সবাই একটা রুমে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। আমি কত কান্নাকাটি করেছি মায়ের কাছে একটি বার যাওয়ার জন্য। মায়ের মুখটা দেখার জন্য। কিন্তু কেউ আমাকে মায়ের কাছে যেতে দেয়নি। কিছুক্ষণ পরপর মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনতে পারছিলাম। একটা পুরো রাত চলে গেল এভাবেই। সকালবেলা সবাই মাকে একটা গাড়ি করে যেন কোথায় নিয়ে চলে গেল। আমি গাড়ির পিছন ছুটতে ছুটতে রাস্তায় পরে হাতে পায়ে ব্যথা পাই। এদিকে বাড়িতেও আর কেউ নেই। আমি আর খালামনি। বাকি সবাই মায়ের সাথেই চলে গেছে।
মায়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন আমিও ঘুমিয়ে পরেছিলাম। খালামনির কান্নার আওয়াজ শুনে আমার ঘুম ভাঙ্গে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। খালামনির কান্নার কারন আমি জানতাম না। তবুও খালামনির সাথে আমিও কান্না শুরু করি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ভর্তি হয়ে যায় লোকজনে। সবাই কাঁদছে। আবার কেউ কেউ আমাকে খুঁজছে। আমাকে দেখে ওদের কান্নার সুর বাড়তে থাকে।
কিছুক্ষণ পর দাদু বাড়ি ফিরলো। কোলে একটা ছোট্ট বাবু। দাদু আমার কাছে এসে বাবুটাকে এক হাতে কোলে ধরে অন্য হাতে আমায় জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে। আমিও কাঁদতে থাকি। তখনো আমার জানা ছিলো না এই কান্নার কারণ। মনে হচ্ছিল সবাই কাঁদছে তাই আমিও কাঁদছি।

দাদু বাবুটাকে আমার কোলে দিল। ছোট ছোট হাতে ওকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। তাই দাদু আমার হাত ধরে আছেন। আর বলছেন, আজ থেকে তুমি ওর বড় বোন নও। তুমিই ওর মা। তখন বুঝতে পারি ও আমার ভাই। কিন্তু আমাকে কেন মা বলছে? আমাদের তো মা আছে। আবার শুরু হয় আমার মাকে খোঁজা।

কিছুক্ষণ পর সেই গাড়িটা আবার আসলো। যেই গাড়ি করে মাকে নিয়ে গিয়েছিলো। আমি ছুটে গেলাম গাড়ির কাছে। ভাবলাম মাকে হয়তো এই গাড়ি করেই নিয়ে আসছে। আমার ভাবনায় অবশ্য ভুলছিলো না। দুজন লোক একটা লম্বা খাটিয়ায় করে মা’কে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনলো। আর রেখে দিল উঠানের মাঝখানে। মায়ের নিথর দেহ পরে আছে। আমি দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরি। মা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আমার কান্না শুনে মা কখনই এভাবে চুপটি করে শুয়ে থাকতে পারে না। আমি মায়ের চোখের দুপাতা আলাদা করার চেষ্টা করছি। কেউ একজন এসে আমায় সরিয়ে দিল মায়ের কাছ থেকে। আর কোনভাবেই আমি মায়ের কাছে পৌঁছতে পারলাম না।

পাশেই বাবা কাঁদছে। বাবা কিছুক্ষণ পরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। কিছু সময় পর কয়েকজন এসে আমায় নিয়ে গেল মায়ের কাছে। ধবধবে সাদা কাপড়ে ঢাকা মায়ের দেহ। যেন শুভ্রতা জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে সে। মায়ের সে ঘুম আর ভাঙ্গাবার নয়।

মায়ের মুখটি একবার দেখিয়েই সেখান থেকে নিয়ে আসা হয় আমাকে। সেই শেষ বারের মতো দেখেছিলাম মায়ের প্রাণহীন মুখটা। পৃথিবীর সকল মায়ার ছায়া পরেছিল মায়ের মুখে। কিন্তু মা ই ত্যাগ করেছে পৃথিবীর মায়া। মায়ের মৃত্যুর দুই মাসের মধ্যেই বাবা আবার বিয়ে করেন। ছোটো মায়ের ঘরেও আরো দুই জন ভাই বোন এখন। বাবা রিক্সা চালিয়ে ওদের ভরন পোষনেই হিমসিম খায়।

যাদের মা চলে যায় তাদের পৃথিবীর সকল আপনজনই পর হয়ে যায়। এমনকি বাবাও। তবুও দাদা দাদু এখনো আমাদের পাশে আছেন। ওদের জন্যই এখনো বেঁচে আছি ভাই আর আমি । দাদার বয়স হয়ে গেছে । আমাদের জন্য এখনো বাজারে নাইট গার্ডের কাজ করেন ।

মা বেঁচে থাকতে নানা নানু আমায় খুব আদর করতেন। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর সাথে ওদের ভালোবাসারও মৃত্যু হয়েছে। মা ছাড়া ভাইকে বড় করতে দাদুর অনেক কষ্ট
করতে হয়েছে।
ভাইটা আমার পৃথিবীর সব থেকে দুর্ভাগা। যে জন্মের পর মায়ের মুখখানা একটি বারের জন্যও দেখতে পারেনি। যার কাছে মায়ের আদর স্বপ্নের মতো। যা সে কোনোদিনও পাবেনা। আমিতো পাঁচ বছর পেয়েছি মায়ের স্নেহ মমতা। ওর ভাগ্যে সেটুকুও জোটেনি। আমি মায়ের সব স্মৃতি গুলো তাকে শুনাই। আর সে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। ওর চোখে মায়ের জন্য হাহাকার স্পষ্ট হয়ে উঠে।
আমি তাকে সান্তনা দেবার বৃথা চেষ্টাকরি। বড় বোন থেকে মা হয়ে উঠার বৃথা চেষ্টা।

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *