মা ও মাতৃভাষা
প্রকাশিত: মে ১৭, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 93 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখিকা: আয়েশা সিদ্দিকা
(মে – ২০১৮)
………………

মাস খানেক নানা রকম অসুস্থতার পরে একটু সুস্থ হলো তিতলি। তখনই ডাক্তার আঙ্কেল বললেন হাওয়া বদল করতে। বাবা এসে জানতে চাইলেন কোথায় যেতে চায় তার একমাত্র মেয়ে। তিতলি এক কথায় বলল, ‘পাহাড়! আমি পহাড়ের কাছে যেতে চাই বাবা। এ শহর থেকে বহু দূরে…’
তাহমিদ সাহেব মেনে নিলেন। খুব ছোট বেলায় মা হারানো মেয়েটা ছাড়া তার আর আছেই বা কি!
তিতলি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে। ওর মাতৃ বিয়োগের পরে বাবা আরেকটা বিয়ে করেননি পাছে মেয়ের অযত্ন হয়! তিতলি বড় হয়েছে ওর দাদির হাতে। মেয়ের দেখাশোনার জন্য তিনি বাড়িতে একজন আয়াও রেখে দিয়েছেন। সবদিক দিয়ে গুণবতী হলেও মা হারা মেয়েটা হয়েছে জিদি আর একগুঁয়ে। নিজের ইচ্ছে না হলে সে কিছুই করে না। না খাওয়া-দাওয়া, না ঘুম, না গোসল! যার ফলে সারা বছর কোন না কোন অসুখ লেগেই থাকে। তিতলিও ভাবে সে বদলে যাবে। বদলানো দরকার। তবে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার কথা ভাবলেই মায়ের কথা মনে হয়। ওর একটা মা কেনো নেই? কি হতো একটা মা থাকলে? যে ওর জীবনটা সাজিয়ে গুছিয়ে দিত। এসব ভাবলেই ওর মন খারাপ হয়ে যায়। তাই শেষমেশ আর হয়ে ওঠে না বদলে যাওয়া। মাঝে মাঝে ও নিজেকেই বলে এভাবে অসুস্থ হতে হতে আমি আম্মুর কাছে চলে যাবো। আবার ভাবে তখন বাবার কি হবে? বাবা যে আমায় বড্ড ভালোবাসে! তখন একটু লক্ষী হয়ে ওঠে ফের।

রাঙামাটি, সাজেক ভ্যালির পাহাড়ের উপরে একটি কাঠের দোতলা কটেজের নিচতলার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে তিতলি। কি অসম্ভব সুন্দর যে জায়গাটা! তাহমিদ সাহেব পাশে এসে দাড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘এখন কেমন লাগছে মা? ভালো?’
তিতলি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘খুব ভালো বাবা। এমন ভালো বহুদিন লাগেনি!’
‘খোঁজ নিয়ে এই ভ্যালির সবচে সুন্দর কটেজটার বুকিং দিয়েছি আমার মামণির জন্য।’
‘হ্যাঁ। তা দেখতে পাচ্ছি বাবা। আমায় এত ভালোবাসো কেন বাবা তুমি?’ বলে কেঁদে ফেলে তিতলি।
‘আরে আরে কি করিস? এমন জায়গায় কাঁদতে হয় নাকি? দেখি এখনি হাসি দে বড় করে।’ মেয়ের চোখ দু’টো মুছে দিতে দিতে বলেন তাহমিদ সাহেব।
‘আজ তো পৌঁছালাম কেবল। বাপ, বেটি মিলে অনেক ঘুরবো। যা, জলদি ফ্রেস হয়ে খেয়ে একটু বিশ্রাম কর মা।’
তিতলি ফ্রেস হতে চলে আসে।

সপ্তাহ দু’য়েক থাকবে ওরা এখানে। দু’দিন ধরে বাবার সাথে ভ্যালিটা ঘুরে বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠে ও। এখানকার প্রত্যেকটি জিনিসের সাথেই তিতলির গভীর সখ্যতা হয়ে উঠছে। ভালোলাগছে সবকিছুই। ওদের হোটেলের যে মালিকটাকে প্রথমদিন একটা কাঠখোট্টা প্রাণী মনে হয়েছিলো তাকেও আজকাল বেশ লাগছে। এত ভদ্র সুপুরুষ ছেলে আজকাল কমই দেখা যায়। তিতলি রাতে বাবার কাছে প্রশ্নের পসরা সাজিয়ে বসে।
‘আচ্ছা বাবা এ বাড়িটার দোতলায় কারা থাকে?’
‘এ বাড়ির মালিকেরা। কেন রে?’
‘নিচ তলার বেলকনি থেকেই যদি পাহাড়গুলো দেখতে এত দারুণ উপর থেকে তাহলে কত না অসাধারন লাগে, না বাবা?’
‘হ্যাঁ মা।’
‘বাড়ির মালিক বলতে হোটেলের ঐ ভদ্রলোকটি?
‘হ্যাঁ। শুনেছি তার মায়ের সাথে থাকে। তুই যদি যেতে চাস তো আমি কাল ছেলেটার সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করে দেবো।’
‘আচ্ছা বাবা। থ্যাংক ইয়্যু।’ বলে ঘুমাতে চলে আসে তিতলি।

পরদিন তিতলিকে নিয়ে ওর বাবা দোতলায় আসে। সাথে হোটেল মালিক। ছেলেটার সাথে ওর বাবার ভালোই ভাব জমে গেছে। ওর সাথে কথা বলেই সব ম্যানেজ করেছেন তাহমিদ সাহেব। দোতলার একটি ড্রয়িং রুমে ওর বাবাকে বসতে দিয়ে তিতলিকে নিয়ে তার মায়ের ঘরে আসে ছেলেটি। এত ছিমছাম আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় তিতলি। কাঠের বাড়ি এত সুন্দর হয়! তবে দালান কেন বানায় সবাই মাথায় আসে না ওর। ঘরটির খাটের পাশে হুইল চেয়ারে অপরুপ একজন মহিলা বসা। ও ভেবে নেয় এটা তাহলে ভদ্রলোকের মা! উনি পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘মা, ইনি মিস তিতলি। ওনারা ঢাকা থেকে এসেছেন। আর মিস তিতলি, ইনি আমার মা। আপনারা কথা বলুন আমি আসি।’ বলে মৃদু হেসে চলে যায় ছেলেটি।
অপরুপা ভদ্রমহিলা একটি বেতের মোড়া দেখিয়ে বসতে বলেন তিতলিকে।
টুকটাক কথা বলা শেষে তিনি বলেন, ‘ইমরুলের থেকে শুনলাম তোমার এই বারান্দা থেকে পাহাড় দেখার খুব শখ। এসো মা আমার সাথে।’ বলে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে বারান্দায় আসেন তিতলিকে নিয়ে। ‘ওহ্ ছেলেটার নাম তবে ইমরুল! বেশ বেশ!’ মনে মনে হাসে তিতলি আর কি নৈস্বর্গিক সুন্দর যে এখানকার প্রকৃতি তা নতুন করে অবলোকন করে। বেশি আলাপ না হলেও সেদিন মনোয়ারা বেগমের পছন্দ হয় তিতলিকে। নিচে ফেরার সময় ওকে ইচ্ছেমত দোতলায় আসতে বলে দেন উনি। শুনে তিতলিও খুব খুশি হয়।

পরেরদিন সময় করে ও আবার দোতলায় আসে। গেট খোলাই ছিলো। তিতলি বাহির থেকে বলে, ‘আসবো আন্টি?’ মনোয়ারা বেগম হেসে আসতে বলেন। তারপর বলেন, ‘আমাদের সময় মায়ের বয়সী সবাইকে খালাম্মা ডাকা হতো। ডাকের সাথে মা জুড়ে দেওয়া। শুনতে কত মিষ্টি না?’
তিতলি মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বলে।
‘আচ্ছা তোমার মা আসেনি সাথে?’
‘না আন্টি। সি ইজ নো মোর।’ মন খারাপ হয়ে যায় ওর।
‘ওহ্! আমি খুব দুঃখিত মা। বুঝতে পারিনি।’
‘ইটস ওকে আন্টি।’ ছোট থেকে সবাইকে আন্টি ডেকে অভ্যস্ত। চট করে খালাম্মাতে আসতে পারছে না তিতলি।
‘আমার বাড়িতে এখন আমি ছাড়া কেউ নেই। তোমার নিকাবটা খুলতে পারো মা।একটু দেখি মুখটা।’
তিতলি লজ্জা পেয়ে নিকাব খোলে মুখের। ছোট থেকেই নামাজ আর পর্দাটা খুব আগ্রহের সাথে মেনে চলে ও। দাদি শিখিয়েছে। মনোয়ারা বেগম দেখে বলেন মাশাআল্লাহ্। এরপরের ক’দিনে খুব আলাপ জমে যায় দু’জনের।

তিতলি এখনও খালাম্মা ডাকতে পারেনি মনোয়ারা বেগমকে। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। ঢাকা ফেরার তিনদিন আগের ঘটনা। তিতলি উপরে এসে দেখে উনি কুরআন পড়ায় ব্যস্ত। রুকু শেষ করে বলেন তিনি, ‘কাল ভাষা শহীদ দিবস। দু’খতম কুরআন বকশিয়ে দেওয়ার নিয়ত করেছি মা। এক খতম হয়েছে। আরেকটু পড়লেই আরেক খতম হবে। তিতলি বলে, ‘আপনি পড়ুন আন্টি। আমি বারান্দায় বসি।’

কুরআন খতম বকশিয়ে বারান্দায় আসেন মনোয়ারা বেগম।
তিতলি বলে, ‘বাবার সাথে তো অনেক ঘুরলাম। আপনার সাথেও কোথাও যেতে ইচ্ছে করে খুব!’
মনোয়ারা বেগম হাসেন। তারপর দূরের পাহাড়ে দৃষ্টি মেলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘কোথাও ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্নকে মাটি চাপা দিতে হয়েছে বহু বছর আগে।’
তিতলি কৌতুহলি চোখে চেয়ে থাকে। উনি বলেন, ‘এখন ২০০০ সাল চলছে না?’
‘জ্বী আন্টি।’
‘গত বছর ইউনেস্কো ২১ এ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলো না?’
‘হ্যা। আমি ফার্স্ট ইয়ারে তখন।’
‘ঠিক এমন একটা দিনেই আমার সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো মা!’
তিতলি কিছু না বুঝে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওনার দিকে।
‘তখন মাত্র ১০ বছর বয়স আমার। প্রচণ্ড রকম টইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছি। আব্বা, আম্মা যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন তাদের একমাত্র মেয়েকে সুস্থ করে তুলতে। একদিন ভোরে খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। ডাক্তার চাচা এসে দেখে কিছু ওষুধ এনে তখনই খাওয়ায়ে দিতে বললেন।’ বলে থামেন মনোয়ারা বেগম।
তিতলি চাতক পাখির মতো বলে ওঠে, ‘তারপর?’
একটু শ্বাস নিয়ে ফের বলতে শুরু করেন তিনি, ‘মধ্যবিত্ত সংসার আমাদের। আব্বা ছিলেন একজন সহকারী লাইব্রেরিয়ান। জ্বরের ঘোরেই দেখলাম সে তার কালো চামড়ার ব্যাগ নিংড়ে টাকাগুলো নিয়ে ওষুধ আনতে ছুটলেন। আর মা শিওরে বসে মাথায় জলপটি করে চলছেন একনাগারে। এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, এমন করে সকাল গড়িয়ে বিকেল। আমার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল। সন্ধ্যায় আকরাম চাচা এসে মায়ের হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, সকালে আব্বা তাকে এগুলো বাসায় দ্রুত পৌঁছে দিতে বলে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের মিছিল। চাচা উল্টো পথে ওষুধগুলো নিয়ে ফিরছিলো। কিছুদূর এগোতেই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে শহর। ধোয়ায় ভেসে যায় চারপাশ। চাচা হতভম্ভ হয়ে যান। কি করবেন দিশে না পেয়ে মিছিলের দিকে ছোটেন। রাজপথে এসে দেখেন রক্তে ভেসে যাচ্ছে সব। ছিটিয়ে আছে রক্তাক্ত লাশ আর লাশ। আর কিছু লাশ পুলিশ দ্রুত গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে। চাচা পাগলের মত খুঁজতে থাকেন আব্বাকে। সবভুলে সারাটা দিন হন্য হয়ে খুঁজতে থাকেন তার ছোট ভাইকে।’
এ পর্যন্ত বলে থেমে চশমা খুলে চোখটা মুছে নেন মনোয়ারা বেগম। তিতলি দাঁড়িয়ে হাত রাখে ওনার কাঁধে।
তিতলির হাতে হাত রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলে ওঠেন উনি, ‘ওরা দেয়নি রে মা। আব্বাকে আমাদের কাছে ফিরতে দেয়নি। সময়মত পৌঁছাতে দেয়নি আমার ওষুধগুলোও। শুনেছি সেদিন ছিলো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।’
তিতলির চোখ দিয়েও অঝোরে পানি পড়তে থাকে।
‘এরপর সবকিছু খুব দ্রুত বদলে গেল। আমি না মরে বেঁচে রইলাম পঙ্গুত্ব বরণ করে। সবাই বলে এই কালোজ্বর নাকি যেদিক দিয়ে যায় ধ্বংস করে যায়। আমার নাকি পা দিয়ে চলে গেছে। নষ্ট হয়ে গেল দু’টি পা। হারিয়ে ফেললাম চলার ক্ষমতা। ক্র্যাচ আর হুইলচেয়ার হলো নিত্য সঙ্গী। দাদাবাড়ির সবাই আমাকে আর মাকে অলক্ষী বলে নানাবাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। তখন থেকে ঢাকা ছেড়ে আমরা এখানে। মা কুটির শিল্পের কাজ করে নানার দেয়া এই জমিতে বহু কষ্টে এ বাড়িটা করলেন। অনেক কষ্টে বড় করেছেন আমাকে। তাই যে বাংলার জন্য এত বলিদান, অপ্রয়োজনে কারো মুখে ইংরেজি শুনলে খুব কষ্ট হয় রে মা।’

তিতলি ওর ভুলগুলো বুঝতে পেরে বলে, ‘আমাকে ক্ষমা করুন খালাম্মা। কখনও আর আন্টি ডাকবো না আপনাকে। আসলে এভাবে বুঝিয়ে বলার কেউ ছিলো না যে আমার!’
মনোয়ারা বেগম খুশি হয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে শুরু করে, ‘দিন, বছর গড়ালো। সাক্ষী হয়ে রইলাম ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধসহ আরও অনেক কিছুর। ৭১ এ স্বাধীন বাংলাদেশ পাই আমরা। ভেবে নেই আমিও স্বাধীন। আমার বর্ণহীন জীবনে বসন্ত আসে ১৯৭২ সালে। ইমরুলের বাবার সাথে বিয়ে হয়। তিন বছর পর জন্ম হয় ইমরুলের। সুখেই কাটছিলো দিন। আবার সব অন্ধকার হয়ে এলো। ইমরুল উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার পর ওর বাবা আমায় ডিভোর্স দিলো। বিশ্বাস করো মা, আমার এই পঙ্গুত্বের কোনো প্রভাব আমি সংসারে পড়তে দেইনি। তবুও আমায় পঙ্গু বলে সেদিন ত্যাগ করেছিলো সে। পরে বুঝেছিলাম তার ছিলো আমার বাবার সম্পত্তিতে লোভ। শুনেছি নতুন বিয়ে করেছে পাশের গ্রামে। তখন থেকে পুনরায় শুরু আমার রঙহীন জীবন। ছেলেটাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি কোনো মতে।’ বলে আবার নয়নের নোনাজলগুলো মুছে নেন উনি। তিতলি টেবিলে রাখা গ্লাসের পানি এগিয়ে দেন ওনার দিকে।
একটু পানি খেয়ে উনি বলেন, ‘তবে আল্লাহর রহমতে হীরের টুকরো একটা ছেলে পেয়েছি। ওর বাবা যাওয়ার পর থেকেই হোটেলটা ও দেখে। বয়স তো পঁচিশে পড়লো। ভুলেও বিয়ের কথা বলে না। আমি বললে বলে তার বৌ যদি এসে কষ্ট দেয় আমায়! জানো মা? নিজেকে এখন ছেলের বোঝা মনে হয়।’ বলে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন বয়স্ক মানুষটি।
তিতলি বোঝায়, ‘আপনি এভাবে বলবেন না খালাম্মা। ইমরুল ভাই অনেক ভালো। সে এটা শুনলে কিন্তু কষ্ট পাবে।’
মনোয়ারা বেগম ওর হাত ধরে বলেন, ‘জানি না এত বছর পর কেনো তোমায় এতকিছু বললাম। তবে খুব হালকা লাগছে এখন। মনে হচ্ছে একটা মেয়ের অভাব দূর হয়েছে যেন। হোক না ক্ষণিকের জন্য। কিছু মনে করো না মা।’
‘নাহ্ খালাম্মা। আমারও তো মা নেই। কাউকে জীবনের কোন এক প্রান্তে একটুখানি মায়ের মত পাওয়া কি সৌভাগ্যজনক নয়?’ তিতলির গাল বেয়ে টপটপ করে অশ্রুবিন্দু গড়ায়।
মনোয়ারা বেগম তা মুছে দিয়ে বুকে টেনে নেন ওকে।

শেষ যেদিন বিদায় নিতে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠছিলো তিতলি, ইমরুলও নামছিলো নিচে। একদম মাঝামাঝিতে এসে দু’জন মুখোমুখি হয়। তিতলি ডানে সরে গেলে ইমরুলও ডানে সরে, আবার বামে গেলেও তাই। এমন কয়েকবার হতেই দু’জন অপ্রস্তুত হয়ে যায়। শেষে ইমরুল একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় ওকে যেতে বলে। তিতলি উঠে আসে মনোয়ারা বেগমের সাথে শেষ দেখা করতে।

বিদায়ের পালা শেষে বাবার সাথে ফিরে আসে তিতলি ইট, কাঠ, পাথরের ঢাকা শহরে। মনোয়ারা বেগম ফেরার দিন কেঁদে বলেছিলেন, ‘আর ক’টা দিন থেকে গেলে হয় না মা?’
‘যেতে তো হবেই খালাম্মা একটা সময়’ বলে চোখের পানি লুকাতে দৌড়ে নেমে এসেছিলো তিতলি। তবে খালি হাতে ফিরে আসেনি ও। মাতৃভাষার প্রতি অসীম ও অগাধ শ্রদ্ধা নিয়ে ফিরেছিলো। যে ভাষার অর্জনের তরে গড়ে উঠেছে এত কষ্টের মরুভূমি সে ভাষাকে অবহেলা করে এমন সাধ্য কার! ও অনুধাবন করতে পেরেছে মা ছাড়া সন্তান যেমন অসম্পূর্ণ, অসহায় মাতৃভাষা ছাড়া মানুষও ঠিক তাই।

২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির এক বিকেল। দশম শ্রেণি পড়ুয়া এক মিষ্টি মেয়ে ও অষ্টমে পড়ুয়া এক দুষ্টুমিষ্টি ছেলেকে তাদের মা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বলছে। শোনো বাচ্চারা, ‘বাঙালি পরিচয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো গৌরবজ্জ্বল মহিমা যুগে যুগে বহুবার আমরা অর্জন করেছি। বিদেশি শাসনের অপচ্ছায়ায় বারবার ম্লান হয়ে গেছে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। খ্রিস্টীয় নবম শতকে এর ওপর জেঁকে বসেছে সংস্কৃত, ত্রয়োদশ শতক থেকে ফারসি ও আরবি, আঠারো শতক থেকে ইংরেজি ও ফরাসি, অতঃপর এই অশুভ ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পরে বাংলার ওপরে নেমে আসে উর্দুর অভিশাপ। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে দম্ভ করে ঘোষণা দিয়েছিলো, ‘Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan’, তখন প্রতিবাদে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাভাষী লাখো ছাত্র, জনতা। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচারী পাকিস্তানি মিলিটারির রাইফেলের গুলিকে উপেক্ষা করে বীর বাঙালি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ঢাকার রাজপথ সেদিন লাল হয়ে যায় রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অারো নাম না-জানা অনেক তরুণের তাজা রক্তে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে দেশবাসী প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উপায় না দেখে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানী হায়েনারা।’
মায়ের এমন কঠিন ভাষণ শুনে বাচ্চারা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। কিছু হয়ত বুঝতে পারে কিছু পারে না। পাশের ঘর থেকে ইমরুল এসে দাড়ায় তিতলির পাশে। পাহাড় অঞ্চলে শীত এখনও কমেনি। কাঠের ঘরে ঠাণ্ডার প্রকোপ আরও বেশি। ইমরুল তিতলির গায়ে একটা শাল জড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘সোনামণিরা, তোমাদের মা সর্বপ্রথম কোন শহীদের নাম বলেছে বলতো?’
দুই ভাইবোন পাল্লা দিয়ে বলে ওঠে, ‘শহীদ রফিক।’
‘হুম। ইনি ছিলেন আমাদের প্রথম ভাষা শহীদ। তিতলি তুমি তো গুছিয়ে বলতে পারো। ওদের শহীদ রফিকের ইতিহাসটা জানিয়ে দাও। বাচ্চাদের দেশের সঠিক ইতিহাস জানানো মা-বাবার দায়িত্ব।’
তিতলি একটু হেসে বলতে শুরু করে, ‘আচ্ছা। তাহলে মন দিয়ে শোনো তোমরা, একুশের প্রথম শহীদের নাম রফিকউদ্দিন আহমদ। যাকে আমরা রফিক নামে চিনি। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামের আবদুল লতিফ এবং রাফিজা খাতুনের বড় ছেলে ছিলেন তিনি। তাঁর পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ব্যবসায়ী, কলকাতায় ব্যবসা করতেন। রফিকরা ছিলেন পাঁচ ভাই ও দুই বোন।’
বাচ্চা দু’টো আশ্চর্য হয়ে বলে, ‘পাঁচ ভাই ও দুই বোন! এত!’
‘হুম। সে সময় এমন অনেক ভাইবোন ছিলো। ভাইদের মধ্যে রফিক ছিল সবার বড়। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে রফিক অংশগ্রহণ করেন। ঘটনার সময় শহীদ রফিকের বয়স হয়েছিল মাত্র ২৬ বছর। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের কারণে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে আশ্রয় নেওয়ার সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন রফিক। গুলিতে তাঁর মাথার খুলি উড়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তখনই মারা যান তিনি।’
স্বামী ও সন্তানেরা ব্যথিত মনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকে সব।
তিতলি বলে যায়, ‘প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুল্লাহর উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা পড়ান আজিমপুর মসজিদের ইমাম হাফেজ আবদুল গফুর। রাত তিনটায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় সঙ্গোপনে, আত্মীয়-স্বজনের অজ্ঞাতে ঢাকার আজিমপুর গোরস্তানে দাফন করা হয় শহীদ রফিকের মরদেহ। তাঁর এই আত্মত্যাগের কারণে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে। মহান উদ্দ্যেশ্য করা কোন আত্মত্যাগই বৃথা যায় না বুঝলে?’
ছেলে মেয়ে দু’টো মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ জবাব দেয়।
‘মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। নামাজ পড়ে, নাস্তা করে পড়তে বসবে দু’জন কেমন? দেশের প্রতি আমাদের অনেক দায়িত্ব। মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশের সেবা করতে হবে তাই না? ‘
হ্যাঁ বলে, মায়ের কথা শোনার সাথে সাথে ওরা উঠে ওযু করতে যায়।

নামাজ শেষে তিতলি ওর প্রিয় কাঠের বারান্দায় এসে দাড়ায়। সামনে আসমান ভর্তি তারা, জমাট বাঁধা ভাসা ভাসা নীলচে মেঘ আর দৈত্যর মত বিশাল বিশাল কালচে পাহাড়। তবুও কি অপূর্ব! মনে মনে সুবহানাল্লাহ্ বলে ও। মসজিদ থেকে ফিরে ইমরুলও ওর পাশে এসে দাড়ায়।
তিতলি বলে, ‘ভাগ্যিস মা চিঠিতে বাবার কাছে আমাদের বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলো নইলে জীবনসঙ্গী হিসেবে এত পবিত্র একটা মানুষ আর জায়গাটা থেকে চিরকাল বঞ্চিত হতাম। একজন ভাষা শহীদের নাত বৌ হতে পারাটাও আমার জন্য তুমুল আনন্দের। জানেন, এতদূর জন্য প্রথমে বাবা রাজি না হলেও পরে আমার ইচ্ছে দেখে হ্যাঁ বলেছিলো।’
ইমরুল তিতলির মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বলে, ‘আর তোমাকে না পেলে আমার জীবনের সকল পবিত্রতা অপূর্ণ রয়ে যেত, সব আনন্দ হতো মাটি! খুব ভালো করেছিলো বাবা হ্যাঁ বলে।’
‘এই বিয়েটা আমার মায়ের অভাব পূরণ করেছিলো আর আপনার বাবার। আচ্ছা সময় এত দ্রুত যায় কেন বলুন তো? মা কত তাড়াতাড়িই না আমাদের ছেড়ে গেলেন। ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। দেখতে দেখতে আটটা বছরও কেটে গেল।’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে তিতলির।
ইমরুলের চোখেও বর্ষা নামে। মায়ের অনুপস্থিতি যে খুব অনুভব করে সে। তিতলি আঁচলে তার চোখ মুছে দিয়ে বলে, ‘আপনি কাঁদলে তো মা কষ্ট পাবে! প্রথমত মাতৃভাষার জন্য তারপর সারাটা জীবন যে কষ্টে তিনি কাটিয়েছেন দয়াময় চাইলেই তাকে শহীদের মর্যাদা দিতে পারেন। চলুন আমরা সেই দোয়াই করি।’
পরিশুদ্ধতার বন্ধনে আবদ্ধ এ জুটি হাত তোলে স্রষ্টার দরবারে। দোয়া করে তাদের মায়ের জন্য, মাতৃভাষা ও সকল শহীদের জন্য। তা দেখে ঝিকমিক করে আকাশের তারামণ্ডল আর দূরের কোনো পর্বতের অজানা নিষ্পাপ পাখি ডানা ঝাপটে জানান দেয়, হ্যাঁ আমিও শামিল হয়েছি তোমাদের মোনাজাতে…

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *