কর্মের ফল
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০১৮
লেখকঃ

 164 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম
.
.
নিশুতি রাত। চারদিকে ছিমছাম পরিবেশ। মাঝে মাঝে কয়েকটা শিয়ালের ডাক ছাড়া কোনো কিছুই ভেসে আসছে না। চেয়ারম্যান বাড়ির পুকুরপাড়ের চারদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকারা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। চেয়ারম্যান বাড়ির সর্বশেষ ঘরটায় একটা ছোট্ট বাল্ব মিটমিট করে জ্বলছিল। বিছানায় সদ্য সতীত্ব হারানো একটা অভাগী মেয়ে মরিয়ম। পাষণ্ড চেয়ারম্যান মেয়েটাকে এখনও কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। মরিয়মের বাঁচার আকুতি চার-দেয়ালের মধ্যে ম্লান হয়ে যায়। ঘরের বাইরে গোঁফে তা দিতে দিতে বিশ্রীভাবে হাসে জয়নাল। জয়নাল চেয়ারম্যান সাহেবের খাস লোক। মোটা অঙ্কের টাকা পকেটে যায় বিধায় মুখ খোলে না সে। মাঝে মাঝে দরজা কিংবা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতর উঁকি দেয়ার বৃথা চেষ্টা করে।
অনেকদিনের কষ্টের ফসল এই মরিয়ম। কয়েকমাস থেকে কাজ করছে তার বাড়িতে। ভুলিয়ে-ভালিয়ে গফুরের কাছ থেকে কাজের লোক হিসেবে তার মেয়েকে নামমাত্র কাজে নিয়োগ দেয় চেয়ারম্যান। জিনিসপত্র নেয়ার ছলে কিশোরী মরিয়মের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে চেয়ারম্যান। আজ সুযোগ দরজায় কড়া নাড়তেই তার সদ্ব্যবহার করতে ভুল করলো না চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের ছেলে-মেয়ে শহরে পড়ালেখা করার সুবাদে ইট, সিমেন্টের বাড়িটা ফাঁকাই থাকে। স্ত্রী তো কবেই মরে ভুত। চেয়ারম্যান ফাঁকা বাড়িতেই বিভিন্ন সময় মনের তৃপ্তি মেটাতে মেতে উঠে যৌনকর্মে। হোক তা ইচ্ছানুযায়ী বা অনিচ্ছায়।
চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে মরিয়মের। কত স্বপ্নের পৃথিবী যেন নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। সব আশা, ভরসার শব্দগুলো পতপত করে উঁড়তে উঁড়তে পাড়ি জমালো অজানা রাজ্যে।
‘শয়তানের বাচ্চা, তুই আমার সর্বনাশ করলি? আমি সতীত্ব কেড়ে নিলি? আল্লায় তোর বিচার করবে। তোর ধন-সম্পদ সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে। তুই বিনাশ হয়ে যাবি।’
মরিয়মের কথা শুনে হো হো করে ওঠে পাষণ্ডটা, ‘তোর নাদুস-নুদুস শরীরের দিকে অনেকদিন আগেই আমার দৃষ্টি ছিলো। আজকের সুযোগটা ছাড়লে তো আর পেতাম না মনে হয়। শোন, তুই আমার বিছানায় শুবি, তোরে আমি আলাদা বকশিস দিবো।’
দাঁত কটমট করে উঠে মরিয়ম। গর্জন করে বলে, ‘তোর তো মুখোশ আমি খুলবোই। গাঁয়ের মানুষ তোরে জুতোর মালা গলায় দিয়ে সারা গ্রাম ঘোরাবে।’
হাহা করে আবার হাসে চেয়ারম্যান। শেষবারের মতো মরিয়মের শরীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। সারা শরীর দাঁত আর নখের মাধ্যমে ছিঁড়তে থাকে, আর বলে- ‘আজই তোর শেষদিন। তাই ফুর্তিটা একটু বেশিই হোক।’
চেয়ারম্যানের শক্তির কাছে হার মানে মরিয়ম। ভোগ করার পর বালিশ চাপা দিয়ে নিথর প্রায় শরীরটাকে আরো নিথর করে দেয়। ফুরফুরে মেজাজে বাইরে আসতেই ডাক দেয়, ‘জয়নাল, লাশটা বাগানবাড়ীর কোণায় পুঁতে ফেল। কাকপক্ষীও যেন টের না পায়। পুঁতে ফেলার পর লতাপাতা দিয়ে ঢেকে দিবি।’
কপালের ঘাম মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে যায় চেয়ারম্যান। জয়নাল ঘরের ভেতর ঢুকে মরিয়মের নগ্ন শরীরটার বিভিন্নস্থানে ভালোভাবে পরখ করে দেখে। নাহ! বেঁচে নেই মেয়েটা। দ্রুত বাগানের কোণায় গর্ত করে পুঁতে ফেলে মরিয়ম নামের একটা কিশোরী মেয়েকে।
সকাল সকাল চেয়ারম্যানের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে গফুর মিয়া। জয়নাল দরজা খুলে দিয়ে গফুরকে দেখতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। দ্রুত চেয়ারম্যান সাহেবকে ডেকে নিয়ে আসে।
হাই তুলতে তুলতে চেয়ারম্যান এসে বলে, ‘কী খবর গফুর মিয়া? হঠাৎ এত সকাল সকাল?’
ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে বলে, ‘গতকাল মেয়েটা বাড়িতে ফেরেনি। রাতে আপনার বাড়িতে ছিলো কিনা জানতে এসেছি।’
গফুর মিয়ার কথা শুনে চেয়ারম্যান বলে, ‘মরিয়ম তো খাবার নিয়ে সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরেই বাড়ি গেছে। কেন সে বাড়ি যায়নি?’
মাথা নিচু করে না বলে উত্তর দেয় গফুর মিয়া। এমন সময় জয়নাল বলে, ‘চাচা, আমি কাল দেখলাম মরিয়ম রাস্তার পাশের বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে দৌড়াচ্ছে। আমি ওকে দেখে পিছু পিছু গেলাম। কিন্তু যা দেখলাম তা বলা মুশকিল।’
চেয়ারম্যান কিছু্টা রাগতঃস্বরে বললো, ‘এতক্ষণে তোর মুখ দিয়ে এসব কথা বের হলো? তখন থেকে উনি দাঁড়িয়ে আছে না? তারপর কী দেখলি সেটা বল।’
জয়নাল কোনো কথা বলে না। গফুর মিয়াও উৎসুক চোখে জয়নালের দিকে তাকিয়ে আছে, ‘কও বাবা, কী দেখছ?’
‘চাচা আমি দেখলাম পাশের গাঁয়ের মজিদের ছেলের সাথে মরিয়ম ভাগতেছে। আমি আবার পিছু পিছু নিলাম। পরে দেখি ওরা মোটরবাইকে উঠে সাঁই করে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।’
জয়নালের কথা শুনে গফুর মিয়া হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। চেয়ারম্যান নিজ হাতে গফুর মিয়াকে বসিয়ে কাঁদতে নিষেধ করতে বলে বললো, ‘চুপ করেন, এভাবে জানাজানি হলে বিপদে পড়বেন আপনি। মানসম্মান তো থাকবেই না, উল্টো মানুষের কাছে অপদস্থ হবেন। তারচেয়ে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবেন মরিয়ম শহরে কাজে গেছে।’
চেয়ারম্যানের বুদ্ধিটা খুব পছন্দ করলো গফুর মিয়া। ঘরের ভেতর থেকে কিছু টাকার নোট এনে গফুর মিয়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, ‘এতে বিশ হাজার টাকা আছে। এগুলো দিয়ে আপাতত চলেন। পরে মেয়ের খোঁজ পেলে তো কোনো কথাই নেই।’
গফুর মিয়া সরল-সহজ মানুষ, সাদা মনে টাকাগুলো নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির পথ ধরলো। যাবার সময় চেয়ারম্যানের জন্য দোয়া করতে ভুললো না। চেয়ারম্যান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি দিয়ে গফুর মিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। জয়নালের দিকে চোখ চোখ হতেই বললো, ‘গল্পটা খুব ভালো ছিলো জয়নাল।’
.
ধানের জমির আল দিয়ে হাঁটতে থাকে বজু চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের বাবা গোলজার মিয়া আক্বীকা করে ছেলের নাম রেখেছিলেন বজলুর রহমান। গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের নিকটে সেই বড় নামটা ছোটো হয়ে বজু হয়ে গেছে। চেয়ারম্যানের পিছনে তার মাথায় ছাতি নিয়ে হাঁটছে জয়নাল। মুখে পান চিবানোর দৃশ্য।
‘এইবার তো খুব ভালো ধান ফলেছে রে জয়নাল।’ চেয়ারম্যান বলে।
‘হ্যাঁ চেয়ারম্যান সাহেব। মানুষ কত খুশি এবার। অতিরিক্ত গরম নাই, দুর্যোগ নাই।’ পানের পিক ফেলতে ফেলতে বলে জয়নাল।
মনের মধ্যে শয়তানি বুদ্ধির ছক আঁকে চেয়ারম্যান। যে করেই হোক বেশিরভাগ ধান তার পেতেই হবে। এতে গ্রামের মানুষ খেতে না পেয়ে মরলে মরুক। কিছু মানুষ মরলে তো দেশের জনসংখ্যা কমে। রহস্যময় হাসি হাসে চেয়ারম্যান। পিছন থেকে সালাম আসে, ‘আসসালামু আলাইকুম চেয়ারম্যান সাহেব।’
হাঁটা বন্ধ করে পিছনে ঘুরে দেখে বাবলু মিয়া মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সালাম নিয়ে হাসিমুখে বলে, ‘কী খবর বাবলু মিয়া? ভালো আছ তো?’
‘আমার আবার ভালো থাকা চেয়ারম্যান সাহেব। মেয়েটার যৌতুকের টাকা দিতে দিতে সবগুলো ধানী জমিই মনে হয় বেঁচতে হয়।’
‘তোমারে আগেই বলেছিলাম, মেয়েটাকে আমার বাড়িতে কাজে দাও। তা না মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে। শেষে কী হলো? পথে বসতে হলো তোমায়।’
বাবলু মিয়া কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখে টেনে বাবলু মিয়ার ঘাড়ে নিজের হাত দিয়ে আলতো আঘাত করে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে বলে, ‘শোন মিয়া, তুমি বরং বিকেলে টাকাটা নিয়ে যেও। ধান বিক্রি করে না হয় পরিশোধ করো। তবে শর্ত দুটো, সঠিক সময়ে টাকা দিতে হবে আর যা টাকা নিবে তার দ্বিগুণ টাকা ফেরত দিতে হবে। এতে তোমার জমি বিক্রি করা লাগবে না।’
কোনো উপায়ন্তর না দেখে চেয়ারম্যানের কথায় রাজি হয়ে যায় বাবলু মিয়া। সালাম দিয়ে গামছাটা ঘাড়ে ঠিক করতে করতে নিজের কাজের দিকে এগিয়ে যায়। চেয়ারম্যান এবারও হাসে। মনে মনে ভাবে, সবকিছুই আস্তে আস্তে তার হাতের নাগালে আসছে। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি থাকলে দুনিয়াতেই সেই একমাত্র সুখী। বাকি জীবনটা আমোদ ফুর্তি করে কাটিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা তো অনেক আগে থেকেই। পরকালের কথা না হয় পরকালেই ভাবা যাবে।
.
মসজিদের ইমাম সাহেব গুটিগুটি পায়ে চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। চেয়ারম্যান সাহেব তখন বাগানবাড়ীতে বসে গোঁফে তা দিচ্ছিলো, পাশাপাশি বাবলু মিয়ার কাছে তার ধানী জমি লিখে নিচ্ছিলো। বেশ ফুরফুরে মেজাজে চেয়ারম্যান সাহেব। মলিন মুখে দলিলে সাইন করছে বাবলু মিয়া। সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও বাবলু মিয়া চেয়ারম্যান সাহেবের টাকা ফেরত দিতে পারেনি। তাই মূল টাকার সাথে সুদ যুক্ত হয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। টাকার পরিমাণ এতো বেশি ছিলো যে তা পরিশোধ করা বাবলু মিয়ার পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে চেয়ারম্যান সাহেবকে তার ধানী জমি লিখে দিতে হচ্ছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে বাবলু মিয়ার দিকে করুণার চোখে তাকালেও মনে মনে ভীষণ খুশি বজু চেয়ারম্যান। ইমাম সাহেব চেয়ারম্যান সাহেবকে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। চেয়ারম্যান সাহেব মুচকি হেসে তাকে বসতে বলে।
ইমাম সাহেব বলেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেব, আর কত ধন-সম্পদ করবেন? এবার তো পরপারের জন্য কিছু সঞ্চয় করুন।’
মুচকি হেসে চেয়ারম্যান বলে, ‘পরপারের কথা না হয় পরপারেই ভাবা যাবে ইমাম সাহেব।’
চেয়ারম্যান সাহেবের কথা শুনে খানিকটা অবাক হয় ইমাম সাহেব। বারবার নামায আদায় করার জন্য দাওয়াত দিলেও চেয়ারম্যান সে কথায় কোনো গুরুত্ব দেয় না। চেয়ারম্যান তো জুম’আর দিনের নামাযী। ইমাম সাহেবকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে সম্মান করলেও তাকে ভীষণ তেতো মনে হয় তার। সুযোগ পেলেই ইসলামের কথা বলা শুরু করবে।
ইসলামের কথা শোনাটা তার কাছে বেশ অর্থহীন। কী লাভ এসব জেনে! পৃথিবীতে এসেছি, চলে যাব, এই তো! এরপর আর কোনো জীবন আছে বলে মনে করে না চেয়ারম্যান।
ইমাম সাহেব বলেন, ‘এ কী কথা চেয়ারম্যান সাহেব! আল্লাহ আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন আমল সঞ্চয় করার জন্য। যে যত আমল সঞ্চয় করবে তার জন্য পরপারে ততটাই সুবিধা। জান্নাতে প্রবেশ করা খুবই সহজে হয়ে যাবে।’
ইমাম সাহেবের কথা খুব বেশি গুরুত্ব দেয় না চেয়ারম্যান। জয়নালকে বলে, ‘হুজুরের জন্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা কর তো জয়নাল।’
ইমাম সাহেব না করে দেন। জয়নাল আর ঘরের দিকে পা না বাড়ায়। চেয়ারম্যান সাহেবের পেছনে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকে। বাবলু মিয়া কাজ হওয়ার পর ছলছল চোখে বাড়ির পথ ধরেছে। এতদিনের ধানী জমি লিখে দেওয়ার সময় বুকে আঘাত লেগেছে।
‘চেয়ারম্যান সাহেব, যেজন্য আসলাম। মাশা-আল্লাহ আল্লাহ আপনাকে অনেক ধন-সম্পদ দান করেছেন। কিন্তু আপনি দান-খয়রাত তো করেনই না আবার যাকাতও দেন না। আপনার উপর যাকাত দেয়া ফরজ হয়ে গেছে।’
যাকাতের কথা শুনে মাথায় রাগ উঠে চেয়ারম্যান। বড় বড় চোখে তাকায় ইমাম সাহেবের দিকে। রাগকে সংযত করে বলে, ‘দেখেন হুজুর, এ সম্পদগুলো আমার খুব কষ্ট করে গড়ে তোলা। আল্লাহ আমাকে দেয়নি, আমি নিজেই সব করেছি। তাই আমি যাকাত দিতে পারবো না। আপনার কথা শেষ হলে যেতে পারেন।’
‘দেখেন চেয়ারম্যান সাহেব, হাদীসে আছে, ‘যাদের যাকাত ফরজ হবে এবং তা সত্ত্বেও যাকাত দিবে না, কিয়ামতের দিন তার সে সম্পদকে বিষধর সাপে পরিণত করা হবে। তখন সে সাপ তার মালিককে দংশন করতে করতে বলবে, আমি তোমার সম্পদ।’
এবার রাগে গজগজ করতে থাকে চেয়ারম্যান। দাঁতের সাথে দাঁত রেখে কটমট করতে করতে বলে, ‘হুজুর আপনার ওয়াজ শোনার জন্য বসিনি। আমার সম্পদ আমি কষ্ট করে করেছি। তাতে যাকাত দিবো কী দিবো না তা আপনাকে বলতে হবে না। আপনি আপনার কাজে যান।’
ইমাম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললেন, ‘হায়রে মূর্খ জনতা!’
ইমাম সাহেবের এক বুক আশা নিয়ে আসলেও সে আশায় বালি পড়লো। এক বুক কষ্ট নিয়ে পাড়ি জমালেন নিজ গন্তব্যে।
কিছুক্ষণ পর কিছুটা রাগ কমলো চেয়ারম্যানের। জয়নালকে বললো, ‘আজ রাতে ফুর্তির ব্যবস্থা কর। কচি মেয়ে হলে ভালো হয়। যা দাম চায় প্রয়োজনে তার চেয়ে বেশি দিস।’
জয়নাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, ‘চেয়ারম্যান সাহেব কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?’
‘বল।’
‘আপনার তো ফুর্তির খুব শখ। প্রায় প্রায় টাকা দিয়ে মহিলা না এনে বিয়ে করলেও তো পারেন।’
‘গর্দভ কোথাকার! এ বয়সে বিয়ে করলে আমার ছেলে-মেয়ে কী বলবে রে? তাছাড়া বিয়ে করলে তো একজনকেই করতে হবে। এক স্বাদ কতদিন নিবো? আমার নতুন নতুন স্বাদ চাই।’
জয়নাল কোনো কথা না বলে হাত পাখাটা টেবিলে রেখে চলে গেল। ইমাম সাহেবের কথাগুলোও জয়নালের মনে দোলা দিতে শুরু করেছে। ইমাম সাহেব যা বললেন তা তো ঠিক। আমরা যা করছি তা ভুল। চেয়ারম্যানকে তার কাজে সাহায্য করে বড় ভুল করছি। মনে মনে ভাবে জয়নাল।
বজু চেয়ারম্যান দলিলটা হাতে নিয়ে স্মিত হাসে।
.
জয়নাল মিয়া এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে। রমযান মাসে রোযা রাখে, যতটুকু সামর্থ্য ততটুকু দান-খয়রাত করে। চেয়ারম্যানের পিছু ছেড়ে নিজে মেহনত করে খায়। আগের থেকে অনেক বেশি সে সুখে আছে। চেয়ারম্যান সাহেব এখন আরও বেশি একাকীত্বে ভোগে। আগের মতো ফুর্তি করা হয় না। খুব কমই ফুর্তি করা কপালে জোটে।
বেলকনিতে বসে ইজি চেয়ারে চা খাচ্ছিলো চেয়ারম্যান সাহেব। মোবাইল ফোনে ক্রিং ক্রিং শব্দে কল আসে। গ্রামে যে কয়জনের হাতে মোবাইল আছে তার মধ্যে বজু চেয়ারম্যান অন্যতম। অপরিচিত নাম্বার দেখে হাতে তুলে নেয় মোবাইলটা। ওপাশ থেকে বলে উঠে, ‘বজলুর রহমান বলছেন?’
‘জ্বী বলছি।’
‘আপনাকে একবার থানায় আসতে হবে যে।’
‘কী সমস্যা বলুন?’
‘আসলেই বুঝতে পারবেন।’
ফোনটা কেটে যায়। বুকটা ধুকধুক করতে থাকে চেয়ারম্যানের। দেরি না করে থানার দিকে পা বাড়ায়। আগের মতো মানুষজন তার সাথে কথা বলে না। কথা বললেও সালাম ও কুশল বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বড় একা হয়ে পড়েছে সে।
থানায় গিয়ে আশ্চর্য হয়ে যায় চেয়ারম্যান। তার ছেলে রুকু হাজতে বন্দি। বুকটা কাঁপতে থাকে চেয়ারম্যানের। রুকু বাবাকে দেখেই মুখটা সরিয়ে নেয়। লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে থাকে।
‘আমি বজলুর রহমান।’
ওসি সাহেব মাথা তুলে তাকে বসতে বলে।
‘আপনার ছেলেকে কেন আটক করা হয়েছে তা জানেন?’
মাথা ঝুকিয়ে না বলে উত্তর দেয় চেয়ারম্যান।
‘আপনার ছেলে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। পাঁচশো পিচ ইয়াবাসহ তাকে আটক করা হয়েছে। আমরা তাকে কোর্টে চালান করে দিয়েছি।’
‘এখন কী জামিনের কোনো আশা নেই?’
‘আমি দুঃখিত। কোর্টের রায়ের পর বোঝা যাবে রুকুর দোষ। সে আসলেই দোষী, না তার পেছনে আরও কেউ আছে। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
চেয়ারম্যান সাহেব রুকুর দিকে একবার তাকিয়ে ধীরগতিতে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়। বুকের ব্যথাটা আস্তে আস্তে বাড়ছে।
ফার্মেসী থেকে ওষুধ কিনে একাই খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে চেয়ারম্যান। বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। কিছুদিনের মধ্যে ছেলেটাকে বিয়ে দিয়ে বাড়িটা জমজমাট করতে চেয়েছিল। তার মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটে যাবে তা কল্পনাও করেনি বজু চেয়ারম্যান।
দু’দিন পর…..
বজু চেয়ারম্যান ভাবছে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে আসবে। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ইমাম সাহেবের কথামতো ভালো হয়ে যাবে। মেয়েকে ফোন দেয় চেয়ারম্যান,
‘ফাতেমা?’
‘হ্যাঁ বাবা। কেমন আছো?’
‘ভালো নেই মা। তুই বাড়ি চলে আয়। তোকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।’
‘বাবা তোমার শরীর কি খুব খারাপ?’
‘হ্যাঁ রে মা।’
‘ঠিক আছে বাবা। আমি পরশু বাড়ি চলে আসব।’
মেয়ের সাথে কথা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারম্যান। চোখের সামনে ভাসতে থাকে হাজারো দৃশ্যপট। কত মেয়ে, মহিলার সাথে কুকর্ম করেছে তার ইয়ত্তা নেই।
আজ মরিয়মের কথা বড্ড মনে পড়ছে। মেয়েটার আকুতির দৃশ্যটা মনে ভাসতে থাকে। আজ যখন সে অনুতপ্ত ঠিক তখনি মেয়েটার কথা মনে হতেই চোখের জল গড়াতে থাকে।
.
চেয়ারম্যান বাড়ির সামনে ছোটোখাটো একটা জটলা বেঁধেছে। রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করার কিছুক্ষণ পর বিশ্রাম নিয়ে ফজরের নামায আদায় করে ঘুমিয়েছিল। ঘুমের মধ্যে আজেবাজে সব স্বপ্ন দেখে ঘুমের ঘোরেই কেঁদেছে চেয়ারম্যান। গতকাল ফাতেমা বাসায় ফিরতে চাইলেও ফিরে আসেনি। নাম্বারটাও বন্ধ বলছে। মেয়ের মুখটাও আচমকা স্বপ্নে ভেসে উঠে।
জয়নাল দূর থেকে নম্রভাবে ডাকে,
‘চেয়ারম্যান সাহেব, চেয়ারম্যান সাহেব?’
‘উহ।’
‘একটু বাইরে আসুন তো।’
বিছানা থেকে উঠে দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে যায়। ফাতেমার ক্ষতবিক্ষত লাশ! আস্তে আস্তে মেয়ের পাশে বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। পরণের কাপড়ের বিভিন্ন স্থানে ছেঁড়া। কেউ তাকে ভোগ করে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়েছিল। কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎই ফাতেমার লাশের উপরে মরিয়মের ক্ষতবিক্ষত লাশটা ভেসে উঠে। চমকে উঠে চেয়ারম্যান। মরিয়মের শেষ কথাগুলো মনে খুব মনে পড়ছে, ‘আল্লায় তোর বিচার করবে। তোর ধন-সম্পদ সব শেষ হয়ে যাবে। তুই বিনাশ হয়ে যাবি শয়তান।’
চেয়ারম্যান আর কাঁদে না। সে তো তার পাপের শাস্তি পেয়েছে মাত্র।
ছোটবেলায় ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কত সুখের সংসার ছিলো তার। হঠাৎই পরিবর্তন। নারী, ধন-সম্পদের প্রতি লোভ! সবকিছু তাকে পরিবর্তন করে দিয়েছে।
রাত আস্তে আস্তে বাড়ছে। চারদিকে শুন-শান পরিবেশ। বাগানবাড়ীতে ভুতুরে পরিবেশের ছোঁয়া। মরিয়মকে পুঁতে রাখার স্থানে কড়জোড়ে ক্ষমা চেয়ে চোখের পানি ফেলে চেয়ারম্যান।
কয়েকদিন পর,
সকাল সকাল একটা কাজে চেয়ারম্যান বাড়ি অাসে জয়নাল। অনেকবার ডাকার পরও কোনো শব্দ পায় না সে। দরজা ঠেলতেই খুলে যায়। জয়নাল দেখে চেয়ারম্যান সাহেব চেয়ারে বসে অাছে। একেবারে নিরব। জয়নাল এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বোলাতেই চমকে ওঠে সে।
চেয়ারম্যান সাহেব আর নেই! খবরটা চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পরে। জয়নাল লাশের পাশে দাঁড়িয়ে দু’ফোঁটা পানি ফেলে মনে মনে ভাবে,
‘ধন-সম্পদের খুব বড়াই ছিলো আপনার। আজ সবই শেষ হলো।’

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

১ Comment

  1. বুনোহাঁস

    ছিমছাম সাধারণত কোনো মানুষের ধরণ কিংবা ঘর বাড়ির পরিবেশ নিয়ে বলে, রাতকে নিয়ে এমন কথা বলা মানায় না। আর ঝিঁঝিঁপোকা ডাকে শুনেছি জ্বলতে শুনিনি,
    গল্পটা ভালো লেগেছে।
    শুভ কামনা রইলো

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *