কিছু বিষাদ গল্প হোক
প্রকাশিত: অগাস্ট ২১, ২০১৮
লেখকঃ

 6 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখা: তামান্না স্নিগ্ধা

.
নিলু জানালার গ্লাসটা টেনে দিলো। নীল থাই গ্লাস সাদা আকাশটাকে হালকা নীলাভ করে দিয়েছে। মানুষের মনটাকেও যদি এমন করা যেত! এলোমেলো চিন্তাগুলোকে জানালার মত একটানে বন্ধ করা যেত!
নিলুকে আমি চিনি ওর দুই বছর বয়স থেকে। আমার তখন পাঁচ। আন্টি ওকে কোলে করে আমাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে আসতো তারপর আম্মুর সাথে গল্প জুড়ে দিত। আমি আর নিলু খেলতাম। অবশ্য একে খেলা বলেনা। ও ছোটাছুটি করত, আর আমি ওকে ধরে রাখতাম।
আমাদের বাসায় আসলে ওর প্রিয় কাজ ছিলো মাটি খাওয়া! আম্মুর তখন গাছপালার খুব শখ ছিলো। ঘর ভর্তি টবে বিভিন্ন রকমের গাছ। নিলু টবের কাছে যেয়ে আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মাটি খেতো। আন্টি খুব রাগ করতো আর আম্মু বলতো ও বড় হয়ে বৃক্ষপ্রেমী হবে।
কিন্তু না, নিলু বড় হয়ে আকাশ হয়েছিলো। এতটাই দূরের যে আমি চাইলেও হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারতাম না।
.
ওহ, আমার পরিচয় তো দেয়া হয় নি। আমি সৌম্য। এই একাকী বিবাগী মনখারাপী নিলুর ছোটবেলার একমাত্র খেলার সাথী।
নিলুর প্রতি আমার ভালবাসা নাকি মমতা কোনটা বেশী তা এখনো বুঝে উঠতে পারি নি বলে ওকে এখনো ভালোবাসি বলা হয়ে ওঠে নি।
তবে নিলুকে আমার ভিষণ ভালো লাগে। এ ভালো লাগা অনেকটা দিঘীর শান্ত পানির মত, নিস্তরঙ্গ। এখানে কোন জোয়ার ভাটা নেই। প্লাবনের চিন্তা করা তো বাতুলতা মাত্র।
আমার প্রতি নিলুর ধারনা কি তা আমার জানা নেই। জানার যে খুব চেষ্টা করি তাও না। জীবন এই চলছে যেমন তাতেই আমি খুশী।
.
বাসা থেকে বেশ কিছুদিন বিয়ে নিয়ে বেশ তোড়জোড় চলছে। আম্মু আভাসে ইংগিতে নিলুর কথা বলছে। কিন্তু নিলুর মনোভাব না জেনে আমি আম্মুকে কিছু বলতে চাচ্ছিনা।
আম্মু বলার পরে কয়েকদিন থেকে মনে মনেই ভাবছি নিলুকে জিজ্ঞেস করব, ‘আমাকে বিয়ে করতে তার আপত্তি আছে কিনা?’ কিন্তু নিলুর সামনে গেলেই অস্বস্তিতে এই কথা আর মুখ থেকে বের হয় না।
আজকে হুট করে নিলু আমার রুমে ঢুকে পড়ে বললো, ‘সৌম্যদা তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।’
আমি চেয়ারটা টেনে দিয়ে বললাম, ‘বস, তারপর কথা বলি।’
নিলু বলল, ‘এখানে না ছাদে চলো।’
আমাদের ছাদ ভর্তি হরেক রকম ফল আর ফুলের গাছ। এত অযত্নে অবহেলায়ও এরা নিজ দায়িত্বে তরতর করে বেড়ে চলছে।
ছাদের একদম মাঝ বরাবর একটা শ্বেতপাথরের গোল টেবিল আর ক’খানা সিমেন্টের চেয়ার। আব্বু বেঁচে থাকতে প্রতি সন্ধ্যায় এখানে আম্মু চা নাশতা বানিয়ে ট্রেতে করে নিয়ে আসতো। আমি আর আব্বু নিয়ম করে আম্মুর বানানো পালংপুরি, কোনদিন হালিম কোনদিনবা চিকেন স্যান্ডুইচের খুঁত ধরতাম। আর আম্মু রেগে গিয়ে বলত, ‘এখন থেকে তোরা বাপ ব্যাটা হোটেলের রান্না খাবি। খবরদার আমাকে এটা খাব ওটা খাব অর্ডার করবি না।’
রেগে গেলে আম্মুর নাকের ডগা একদম টমেটোর মত লাল হয়ে যেত। আব্বু এই নিয়ে যে আম্মুকে কত রাগাত! বলতো, ‘সৌম্য’র মা, তোমার গাছে টমেটো না ধরলে টেনশন করবা না বুঝছো, তোমার নাকটাকে সুতা দিয়ে ঝুলিয়ে দিলেই চমৎকার একটা টমেটো হয়ে যাবে।’ আম্মু তখন রেগেমেগে আব্বুর সামনে থেকে চায়ের কাপ টেনে নিয়ে গাছের গোড়ায় ঢেলে দিত।
কি সুখেরই না দিন ছিল তখন!
আর এখন মাসের পর মাস চলে যায় আম্মু তবু ছাদে আসে না।
– ‘তুমি কি কিছু ভাবছ?’
নিলুর কথায় অতীত থেকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
– না তেমন কিছু না। কী যেন বলবি বলছিলি?
নিলু সম্পূর্ন অপ্রাসঙ্গিকভাবে বললো, ‘কমলা গাছটাতে কি পরিমান কমলা ধরছে দেখেছো সৌম্য’দা?’ অথচ ছোটবেলায় এই গাছে একটা করে কমলা ধরতো। আর সেই একটা কমলা নিয়ে তুমি আর আমি কি মারামারিটাই না করতাম!’
আমি হেসে উঠে বললাম, ‘মারামারিতে আমি জিতলেও আম্মু কিন্তু কমলার কোয়া তোকেই বেশি দিত।’
নিলু কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো। তারপর ঢোক গিলে আবার বলল,
-তুমি আন্টিকে বলে দাও যে আমাকে বিয়ে করবে না।
– কেন?
শব্দটা খুব কষ্ট করে আমার হতভম্ব গলা থেকে বের হল।
– আমি আসলে একজন কে ভালবাসি। কিন্তু বাবা আর আম্মি তোমাকে এত পছন্দ করে যে আমার কোন কথাই শুনবে না। জোর করে ঠিকি তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে।
-তুই টেনশন করিস না। তোর মতের বিরুদ্ধে কিছুই হবেনা।
কথাটা বলেই আমি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসলাম।
আসলেই তো নিলুর পছন্দ অপছন্দ থাকতেই পারে। আমি তো ওকে কখনো বলিনি যে ‘ওকে আমার ভালোলাগে কিংবা আমি ওকে ভালবাসি!’ ওতো আমার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ না। কখনো ছিলও না। কিন্তু তাহলে কেন আমার এত খারাপ লাগছে? কেন প্রবল বিষাদে সমস্ত অন্তর ভরে যাচ্ছে? যেন আমি মনে মনে ঠিকই জানতাম নিলু একান্তই আমার। যে আমার অধিকারেই আছে তার উপর আবার অধিকার প্রতিষ্ঠার কি দরকার! আর এটাই তো সত্য। নিলু কেন বোঝেনি? কেন?
.
-সৌম্য জেগে আছিস?
– হ্যাঁ। কিছু বলবা আম্মু?
– না কিছু বলব না বাবা, ঘুমা তুই।
– আম্মু আসো তো। বসো এইখানে।
– না, তোর রুমের লাইট অফ দেখছি তো।
– মাথা ব্যাথা করছিলো খুব, তাই লাইট অফ করে শুয়ে ছিলাম।
– নিলুর সাথে কথা হইছে তোর?
– কে বলল তোমাকে?
– নিলুর মা এসেছিলো সন্ধ্যার পরে। বিকেলে তোকে আর নিলুকে ছাদে কথা বলতে দেখছে। জিজ্ঞেস করছিলো, ‘তোরা দুজন রাজি আছিস কিনা?’
– কেন নিলু কিছু বলে নাই?
– নিলু নাকি কোন উত্তর দেয় নাই। অনেক চাপাচাপি করার পর বলছে, ‘তোর কাছ থেকে শুনে নিতে।’ কোন সমস্যা বাবা?
– না আম্মু কোন সমস্যা না।
– আসলে তোর আব্বু মারা যাবার পর থেকে আমি তো তোর দিকে তেমন খেয়াল দিতে পারি নাই। তাই যখন নিলুর মা তোদের দুজনের বিয়ের কথা বলল, ভেবে দেখলাম আসলেই তো ব্যাপারটা মন্দ হয় না। তুই অফিস থেকে নাহয় ক’দিনের ছুটি নে। আমরা মা ছেলে মিলে আবার আগের মত শপিং করি, ঘরের জিনিসপত্র কিনি।
– আচ্ছা আম্মু। তুমি যা বল তাই হবে।
.
আশ্চর্য আমার উচিৎ ছিল নিলু যা বলছে সেটা আম্মুকে বলে দেয়া। অথচ আমি চুপ করে থাকলাম?
রাগে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে এখন।
আসলে আম্মু এত উচ্ছ্বাস নিয়ে কথা বলছিলো যে আম্মুর মনটা খারাপ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। গত সাতবছরের ভিতর আম্মুকে এই প্রথম যেন একটু হাসিখুশি দেখলাম।
বিকেলে আম্মু ট্রেতে পাটিসাপটা পিঠা আর চা নিয়ে বলল, ‘ছাদে চল।’
– আমি অবাক চোখে হঠাৎ করে তরুণী হয়ে ওঠা আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুমি ট্রে ফেলে দিবা তো, আমার হাতে দাও।’
– আম্মু উচ্ছ্বল তরুণীর মত সিঁড়ি ভেঙে উঠতে উঠতে বললো, ‘ফ্রিজ থেকে এক বোতল ঠান্ডা পানি নিয়ে আসিস।’
– এ যেন আমার সত্যিকারের আম্মু। এতদিন যাকে কোন ডাইনী বুড়ি গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে রেখেছিলো। আনন্দে আমার চোখে পানি চলে আসলো।
পানির বোতল আর একটা গ্লাস নিয়ে ছাদে যেয়ে দেখি, চেয়ারে নিলু আর নিলুর আম্মি বসে আছে।
আন্টি আমাকে দেখে নুডুলসের বাটি সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো, ‘নিলু করেছে তোমার জন্য।’
আমি আড়চোখে একটু নিলুর দিকে তাকালাম। ও একমনে বাগানের হাস্নাহেনা গাছের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেন যত সৌন্দর্য সব হাস্নাহেনার পাতায়!
আম্মু আর আন্টি খুব গল্প করে যাচ্ছিলো কিন্তু তারপরেও আসর খুব একটা জমলো না। আমি আর নিলু দুজনেই আড়ষ্ট হয়ে বসে ছিলাম।
আম্মু সিদ্ধান্ত নিল আন্টির সাথে কালকেই আংটি দেখতে যাবে। তারপর বাসায় এসে সবাই মিলে বসে এনগেজমেন্টের ডেট ফাইনাল করবে। নিলু স্থির চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।
ছেলে হয়েছি বলে কেন আমাকেই দোষ ঘাড়ে নিতে হবে। নিলুর আমাকে পছন্দ না, ও বলুক ওর বাবা মা’কে। আমি কিছু বলতে পারব না। সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে মনে এগুলাই ভাবছিলাম। ধ্যান ভাঙলো মোবাইলের রিংটোনে। খালাত ভাই রুপল কল করেছে ইতালি থেকে। আম্মু এখনি বিয়ের খবর সবাইকে জানাতে শুরু করেছে।
নাস্তার টেবিলে আম্মু প্লেটে ডিমপোচ তুলে দিতে দিতে বললো, ‘অফিস যাওয়ার পথে নিলুকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিস তো, ওদের গাড়িতে কি নাকি প্রবলেম হয়েছে নিলুর মা ফোন করে বললো।’
বুঝলাম এটা এই মধ্যবয়সী দুই ভদ্রমহিলার চাল। তারা চাচ্ছে আমি আর নিলু দু’জনে একসাথে একটু সময় কাটাই। ভবিষ্যৎ নিয়ে প্ল্যান করি।
খুশি মনে গাড়ি নিয়ে নিলুদের বাসার সামনে দাঁড়ালাম। নিলু দেখছি আগে থেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। বিনা বাক্যব্যয়ে ও গাড়িতে উঠে বসল। তারপর বলল, ‘সৌম্য’দা তোমাকে আমি দাদা কেন ডাকি জানো?’
-আমার আবছা আবছাভাবে মনে হতে লাগল, ছোট বেলায় নিলু আমাকে নাম ধরে ডাকত। আম্মু আর আন্টি ওকে এত ভাইয়া ডাক শিখাত ও তবুও আমাকে ‘সুমমো সুমমো’ করে ডাকত।
আমি জিজ্ঞাসু চোখে ওর দিকে তাকাতে ও বললো-
– আম্মি আমাকে বলেছিলো, ‘নাম ধরে ডাকলে তোমার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিবে।’ তাই আমি তোমাকে আর নাম ধরে ডাকতাম না। এক কথাতেই অবুঝ আমাকে আম্মি থামিয়ে দিয়েছিলো। দেখেছো, আমি ছোটবেলা থেকেই তোমাকে বিয়ে করতে চাইতাম না!
-নিজেকে হঠাৎ খুব ছোট মনে হল। নিলুকে ক্যাম্পাসে নামিয়ে দিয়ে এসে রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে উদ্দেশহীনভাবে হাঁটতে শুরু করলাম। হাতের ডানপাশে একটা ছোটখাটো পার্ক দেখে ভিতরে ঢুকলাম। চারপাশে কপোত-কপতীর ভিড়। ম্যাক্সিমামই ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। মাঠের একপাশে গোল হয়ে বসে একদল ছেলেমেয়ে বার্থডে কেক কাটছে। কয়েকজন আবার ফটোশেসন করতে ব্যস্ত। একদম কোণায় নিরিবিলি একটা বেঞ্চে যেয়ে মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে বসলাম। নিলুর কথামত আম্মুকে যদি বিয়ের ব্যাপারে নিষেধ করে দিই তাহলে আম্মু আবার আগের মত হয়ে যাবে, যেটা আমি কোনক্রমে হতে দিব না। অনেক কষ্টে আমার মায়ের মুখে হাসি ফুটেছে, আমি চাইনা কোন বিষাদ এসে সেটা আবার কেড়ে নিক। আবার আম্মুর সুখের জন্য যদি নিলুকে বিয়ে করি সেটা আরো খারাপ হবে। ‘ভালোবাসার মানুষকে তিলে তিলে কষ্ট দেয়া মানে যে তার প্রতি ভালোবাসাটা কখনোই সত্যি ছিলো না’ একথাটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।
এই উভয় সঙ্কটের মধ্যে পড়ে আমি নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর উপর সমর্পণ করে দিলাম। যে আমাকে সৃষ্টি করেছে আমার ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব তো তারই। নিশ্চয় আমার জন্য যেটা মঙ্গলজনক তিনি সেটাই নির্ধারণ করে রেখেছেন।
এই সিদ্ধান্তটা নেয়ার পর বুকের উপর থেকে যেন পাথর নেমে গেল।
মাথা ঠান্ডা করে পার্ক থেকে একটা কোল্ডড্রিংকস কিনে নিয়ে বের হয়ে এলাম। গাড়ি নিয়ে এবার সোজা অফিসের দিকে রওনা দিলাম। ইউনিভার্সিটি এলাকা পার হতেই দেখি নিলু একটা ছেলের সাথে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছে।
মন খারাপ ভাবটা পাত্তা না দিয়ে যোগ না করে ফিবোনাচ্চি সিরিজ কতদূর মনে করতে পারি সেই চেষ্টা করতে লাগলাম। ক্ষনিকের খারাপলাগাটা তাড়িয়ে দিলেও মনের ভিতর আটকে থাকা বিষাদটা উড়িয়ে দিতে পারলাম না।
.
বাসায় ফিরতেই আম্মু বললো এংগেজমেন্ট আগামীকাল হবে। আর এক সপ্তাহ পর বিয়ের ডেট মুরব্বিরা সবাই মিলে ফাইনাল করে ফেলেছে, আমার কোন আপত্তি আছে কিনা?
আমি না বোধক উত্তর দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লাম। সবকিছু আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি। এখন যা হওয়ার হোক। আমার আর চিন্তা কিসের!
বাসা ভর্তি হয়ে গিয়েছে ফুপি, খালামনি আর কাজিনদের আগমনে। একেক জন একেক রকম ইয়ার্কি করে যাচ্ছে। আমি চুপচাপ সব হজম করছি। নিলুর অবস্থাও মনে হয় আমার মত।
ধুর ছাই, এর ভিতরেও আমি নিলুকে ভাবছি!
খুব অনাড়ম্বর পরিবেশে পরিবারের সবার উপস্থিতিতে আমাদের এংগেজমেন্ট হয়ে গেল। নিলু আমি দুজনের কেউই কারো সাথে কথা বললাম না। কাজিনরা বলতে থাকলো আমরা নাকি সবাইকে দেখানোর জন্য কথা না বলে ঢং করতেছি। নিলু ওখান থেকে উঠে চলে গেল। আমি ভাবতে লাগলাম মানুষের কত তুচ্ছ কারণেই না বিয়ে ভেঙে যায়, আমাদেরটাও তেমন হলে বেচে যেতাম।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বিয়ের দিন মহাসমারোহে এগিয়ে আসতে লাগলো। আম্মুকে কয়েকবার ‘আমি বিয়ে করবনা’ বলতে গিয়েও ফিরে এসেছি। আত্মীয় স্বজনে বাড়ি গিজগিজ করছে। আম্মুর সাথে সবসময় কেউ না কেউ আছেই। আব্বুর মৃত্যুর পর এই প্রথম পরিবারের সবাই একসাথে হয়ে আনন্দ উল্লাস করছে। আমি কি করে এটা থামিয়ে দেব!
চিন্তায় চিন্তায় আমার মুখ আরো শুকিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ আমার এই দূরবস্থা থেকে কিভাবে রক্ষা করবে ভেবেও কুল কিনারা করতে পারছি না।
.
আজ আমার আর নীলুর বিয়ে। কমিউনিটি সেন্টারে শেরওয়ানি পরে বসে আছি। পিচ্চিপাচ্চা শালিকারা একেকজন একেক স্টাইলে বসে, দাঁড়িয়ে সেলফি তুলেই যাচ্ছে। নিলু পার্লার থেকে এখনো এসে পৌঁছায় নি।
বসে বসে ভাবতে থাকলাম আমার সাথে বিয়ে হলে নিলুকে কি দূর্বিষহ জীবন কাটাতে হবে। সংসার করবে আমার সাথে অথচ মনের ভিতর বাস করবে আরেকজন। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম তখনই। খালাতো ভাই রুপলকে এক সাইডে ডেকে নিয়ে বললাম আমার একটু ফ্রেস এনভায়রনমেন্ট দরকার। নিলু পার্লার থেকে আসলে আমাকে একটু ফোন দিস। রুপল মনে হয় বুঝতে পারছিলো সামথিং ইজ রং। ও খুব জোরাজুরি করছিলো সাথে আসার জন্য। আমি ওর কাছ থেকে বাইকের চাবিটা নিয়ে বের হয়ে আসলাম। রুপল হা করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি বাইক নিয়ে একটানে মেইন রোডে। রাস্তায় চটপটি, ঝালমুড়ি থেকে শুরু করে আমড়া, শশা, ছোলাভাজা যা দেখতে পেলাম তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে লাগলাম। যেন আমার পেটে রাক্ষুসে ক্ষিদে! শেরওয়ানি পরা কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্ট্রিট ফুড খাচ্ছে এটা মনে হয় খুব একটা উপভোগ্য ব্যাপার না। চারপাশের মানুষের দৃষ্টি বিরক্তিকর লাগা শুরু হতেই মনে পড়ল সেদিনের সেই পার্কের কথা। যাক বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ নিরিবিলিতে থাকা যাবে ভেবে আবার বাইক স্টার্ট দিলাম।
আজকে কি কোন বিশেষ দিন নাকি কে জানে, পার্কে তিল ধারণের জায়গা নেই। খুঁজে পেতে সেদিনের বেঞ্চটাতে যেয়ে দেখি বোরকা পড়া এক মেয়ে বসে আছে। পাশে বেশ মোটাসোটা একটা ব্যাগ দিয়ে জায়গা দখল করা।
আমি চুপচাপ বেঞ্চের কর্ণারে গিয়ে বসলাম। ততক্ষণে ফোনে কল আসা শুরু করে দিয়েছে। আস্তে করে ফোনটা সাইলেন্ট করে দিলাম। এতক্ষনে নিশ্চয় আমাকে নিয়ে খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেছে। নিলু মনে হয় বউ সেঁজে স্টেজে বসে আছে। আচ্ছা আমাকে না পেলে ওরা কি নিলুকে নিলুর পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে? কে জানে হয়ত দিতেও পারে। নিলুর বাবা যে রাগী। সম্মান বাচাঁনোর জন্য মরিয়া হয়ে তিনি যেকোন সিদ্ধান্ত নিতেই পিছুপা হবেন না। তাতে নিলুর ভালোই হবে। আচ্ছা সে সময় কি নিলুর একবার হলেও আমার কথা মনে পড়বে?
ভাবনায় ছেদ পড়ল পাশের মেয়েটার ফোঁপানির শব্দে।
এতক্ষণ নিজের চিন্তাই এতটাই বিভোর ছিলাম যে পাশে অন্যকারো উপস্থিতি ভুলেই গিয়েছিলাম।
মেয়েটা মনে হয় বাসা থেকে পালিয়ে যাবে বলে এসেছে। যদিও আমার দিকে উলটো হয়ে বসে আছে তবুও বারবার কানে ফোন ধরা আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনে অনেকটাই নিশ্চিত হলাম এখন। আর প্রমাণ স্বরুপ পাশে তো ব্যাগ রয়েছেই। এত বড় ব্যাগ নিয়ে কেউ আবার বাস স্ট্যান্ডে না যেয়ে পার্কে আসে নাকি?
আমি বরং এখান থেকে উঠি। মেয়েটাকে কেউ নিতে এলে পাশে আমাকে দেখলে ভুল বুঝতে পারে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাম। পৃথিবীতে মানুষের কত রকম যে দুঃখ।
ক্লান্ত স্বরে মেয়েটাকে বললাম, ‘কষ্ট পাবেন না। পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই আসল। এর থেকে আনন্দের আর কিছু নেই। দেখবেন, আপনার জন্যে ভালো কিছুই অপেক্ষা করছে।’
কথাটা মেয়েটাকে নাকি নিজেই নিজেকে স্বান্তনা দেয়ার জন্য বললাম জানি না।
মেয়েটা পিছন ফিরে একবারো আমার দিকে তাকাল না। আমি ক্লান্ত পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
-‘একটু শোনেন’
কান্নাভেজা এক নারী কন্ঠের ডাকে থমকে দাঁড়ালাম। মেয়েটা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠিক চিনতে না পারলেও অবয়বটা অনেক পরিচিত লাগছে। মুখের নেকাবটা সরিয়ে দিয়ে মেয়েটা আমাকে বলল, ‘সৌম্য’দা তুমি নেবে আমাকে সাথে?’
কান্না গলায় আটকে নিলুর মুখে সৌম্য ডাক সুমমো শোনা যাচ্ছে।
যেন ছয় সাত বছরের কোন পিচ্চি তার খেলার সাথীকে আবদার করছে তাকে খেলতে নেবার। আমি ছোটবেলার মতই নিলুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। জানি একবার ধরলে নিলু এই হাত আর জীবনেও ছাড়বে না।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৪ Comments

  1. Mahbub Alom

    বাকি রোমান্টিক ভালোভাসাগুলোর মতোই লেগেছে।তবে একটা জিনিস খুব ভালো লেগেছে।সৌম্যর আম্মুর ফল ফুলের গাছ লাগানো।আর ছাদে আব্বু,আম্মুর সাথে সৌম্যর আড্ডা,খাওয়া দাওয়া।
    এইটুকুই কাহিনীটাকে একটু আলাদাভাবে ভাবাতে শুরু করেছে।

    Reply
  2. আরাফাত তন্ময়

    গাছ তুমি গল্পেও আছো! একটা ইনোসেন্ট লাভ। শুভ কামনা রইলো।

    Reply
  3. Halima tus sadia

    ভালো লিখেছেন আপু।পড়ে ভালো লাগলো।
    নিলু যদিও অন্য কাউকে ভালোবাসতো সবশেষে সৌম্যর ভালোবাসা পূর্ণতা পেলো।
    সৌম্যকে ভালোবাসে না নিলুর এ কারণটা বুঝলাম না।
    সৌম্য ঠিকই নিলুকে ভালোবাসতো।
    অবশেষে তাদের হাতটা বাড়িয়ে দিল।
    বানানে কিছু ভুল আছে
    বেশী–বেশি
    হয় নি–হয়নি
    ধারনা–ধারণা
    ব্যাথা -ব্যথা
    এতক্ষনে–এতক্ষণে
    স্বান্তনা-সান্ত্বনা
    ক্ষনিকের–ক্ষণিকের
    সাতবছরের–সাত বছরের
    কোনদিনবা–কোন দিন বা

    শুভ কামনা রইলো।

    Reply
  4. আফরোজা আক্তার ইতি

    অনেক অনেক অনেক সুন্দর একটা গল্প। পড়ে মনটা বেশ ভালো লাগলো। সৌম্য নিলুকে প্রচন্ড ভালোবাসতো আর এজন্যই তাদের ভালোবাসা পরিশেষে পূর্ণতা পেয়েছে। নিলু বাসা থেকে পালিয়ে যাবার পর বুঝতে পেরেছে যে সে যাকে ভালোবাসতো সে তাকে ধোঁকা দিয়েছে। তাই যখন সৌম্যকে কাছে পেয়েছে তখন সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। এদিকে তার মায়ের খুশিও আর নষ্ট হবে না। অনেক সুন্দর একটা গল্প। বানানে কিছু ভুল আছে, সংশোধন করে দিচ্ছি।
    দিঘী- দিঘি।
    ভিষণ- ভীষণ।
    বেচে- বেঁচে।
    সেঁজে- সেজে।
    আমার তখন পাঁচ- আমার বয়স তখন পাঁচ।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *