ক্ষমা করে দিও
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারী ১১, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 207 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখকঃ তাহসিন আহমেদ ধ্রুব
M Tahsin Dhrubo
(ফেব্রুয়ারী’১৮)
………………

নীলাকে নিয়ে রাত ১১ টার সময় হাসপাতালে যেতে হলো। হাসপাতালে ভর্তি করা, সিজারের জন্য রক্ত সংগ্রহ করা কোনকাজেই বিরক্ত হচ্ছেনা শোয়েব। সে আজ বড়ই আনন্দিত, আজ সে বাবা হবে। দিনের পর দিন একটা নতুন প্রাণ দেখার আনন্দময় অপেক্ষাটার অবসান হবে আজ!
৫ মিনিট পর নার্স এসে ডেকে নিয়ে গেল শোয়েবকে। রাশভারী, গম্ভীর ডাক্তার ভুরু কুচকে শোয়েবের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,
– শোয়েব সাহেব, রক্তের ব্যবস্থা হয়েছে?
– “জি স্যার”, রাশেদ জবাব দিল।
– “ও আচ্ছা, তবে আপনার স্ত্রীর যা অবস্থা…….”থামলেন ডাক্তার।
আবার শুরু করলেন,” তাতে তার বেঁচে থাকার গ্যারান্টি আমরা দিতে পারবো না।”
– “কেন স্যার?”, উদ্ধিগ্ন হয়ে উঠলো শোয়েব।
– সব “কেন”র উত্তর হয়না শোয়েব সাহেব।
শোয়েব মাথা নিচু করে রইল। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে টাইলসের মেঝেতে লেপ্টে গেল। ৩ বছরের ভালবাসা আজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতে দোদুল্যমান।
– “শোয়েব সাহেব, নিজেকে শক্ত করুন। আমরা আপনার বাচ্চাকে বাচানোর চেষ্টা করছি।”, রাশভারী ডাক্তার সান্ত্বনার বাক্য শোনালেন। শোয়েব বাইরের বেঞ্চিতে এসে বসলো।

বিয়ের তিনবছর পর আজ নীলা মা হওয়ার আনন্দ নিয়ে হাসতে হাসতে এসেছিল। তবে আনন্দের সমাপ্তিও যে আজই হবে তা কি সে জানত?
শোয়েব সেই মুহুর্তগুলি খুব মিস করবে। আর কেউ, রাত তিনটায় ঘুমন্ত শোয়েবকে জাগিয়ে আগমনীবাক্য শোনাবেনা। ঘন্টার পর ঘন্টা ভবিষ্যতের গল্পও কেউ শোনাবে না। কেউ তার সাথে নাম রাখা নিয়ে ঝগড়াও করবেনা। কেউ পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়েও ধরবে না। পুতুলের সাথে খেলতেও তাকে বাধ্য করবেনা।
কষ্টে শোয়েব পাথর হয়ে গেছে। তার পাশে দাড়ানোর মতো আজ সে কাউকেই দেখতে পাচ্ছেনা। চোখে অন্ধকার দেখছে, সাথে চারপাশে শুধু গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ। শহরবাসীও আজ গভীর ঘুমে অচেতন। কোথাও কোন শব্দ নেই। মাঝে মাঝে কুকুরের ডাকটা মাইল দূর থেকে ভেসে আসছে। সব শব্দকেও আজ মলিন মনে হচ্ছে!

আধঘন্টা পর নার্স এসে শোয়েবকে ডেকে নিয়ে গেল। ডাক্তার সাহেব বললেন,
– “শোয়েব সাহেব, কষ্ট হলেও সত্যিটা আপনাকে বলতে হচ্ছে – “, ডাক্তার বড় করে নিঃশ্বাস নিলেন।
– “আপনার যে সন্তানটি হয়েছে তা মৃত।”,আবার বললেন ডাক্তার।
– “আর নীলা?”, শোয়েব ডুকরে কেদে উঠে বলল।
– আই অ্যাম সরি।
শোয়েব কাঁদতে কাঁদতে অরুকে(নীলার দেয়া নাম) দেখার জন্য নার্সের পিছুপিছু হাটতে লাগল। একটা ঝুড়ির মতো দোলনায় একটি শিশু ঘুমিয়ে আছে। তার সারা শরীর হাসপাতালের কাপড়ে মোড়ানো। শিশুটি নীলার মতো গোলগাল চেহারা, কপালের অর্ধেক পর্যন্ত চুল, দুটো গোলাপী রঙের ঠোট সহ সুন্দর একটি চেহারার। শোয়েবের মনে হচ্ছে, সে স্বর্গের কোন অপ্সরীর পাশে দাড়িয়ে আছে। শিশুটিকে আস্তে করে কোলে তুলে নিলো শোয়েব। মাথাটা হেলেদুলে যাচ্ছে, তবুও কোনমতে অরুকে বুকে চেপে ধরল শোয়েব। বাধভাঙ্গা কান্নার শব্দ হয়, বুকফাটা আর্তনাদের শব্দ হয় কিন্তু বেচে থেকেও মরে যাওয়ার কোন শব্দ নেই। বেচে থেকেও মৃত, শোয়েবের শব্দহীন কান্না, কাঠফাটা আওয়াজের মতো শোনা যাচ্ছে। কোলে মমতায় শোয়ানো কন্যাকে আগলে রেখে, বিছানায় রাখা লাশটির বেরিয়ে আসা হাতটিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পরলো শোয়েব।

মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসলো, মন্দির থেকে ঘন্টার আওয়াজ শোনা গেল। জীবনটা সকালের উদ্ভাসিত আলোর মতই উজ্জ্বল আবার ঘোর আমাবস্যার রাত্রির মতো অন্ধকার। খোলা ভ্যানে স্বামীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে ষোড়শী নীলা, তার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে দুঘন্টার অরু। খোলা চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে শোয়েব। পৃথিবী এখন অন্ধকার, শুধু কি তা শোয়েবের জন্যই?
পৃথিবী তাকিয়ে আছে সবার দিকে, সে অস্ফূটস্বরে বলল,”আমরা তোমাদের বাঁচতে দেইনি অরু, ক্ষমা করে দিও”

আয়শা বেগম ভাল করে হাটতে পারেননা তবুও লাঠি ভর দিয়ে বারান্দায় এসে দাড়ালেন, তার নাতনীকে দেখার আশায়। যদিও শোয়েব বলেছিল,” সবকিছু ঠিক করতে ২ দিন লাগবে। তারপর আসতে পারবো”।
বৃদ্ধ মানুষের আশার প্রদীপ কখনোই নিভেনা, আধো জ্বলন্ত সে আশা নিয়ে তারা অপেক্ষার প্রহর গুনে। তাদের সে আশা পুরণ হবে কি না? তাও তাদের জানা নেই। তারা শুধুই অপেক্ষমাণ তালিকায়!!!

ভোরের সূর্যের আলোয় পৃথিবী উজ্জ্বল হয়ে গেছে। শোয়েবদের বাড়ির সামনের রং-ওঠা সাইনবোর্ডের লিখাটাও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আজ তাকে আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে । সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা,
” গর্ভবতী নারীর যত্ন নিন
শিশু ও প্রসূতি মায়ের জীবন রক্ষা করুন।”

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *