জীবন ছায়া
প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 51 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

written by
sharmin khanom
(মার্চ – ২০১৮)
……………

এক অজানা গন্তব্যের পথে আজ আমি। কে জানে কি আছে এই পথের শেষটায়। চলন্ত ট্রেনের মৃদু হাওয়ায় আমার চুলগুলো সব ভাসছে ।যেমন করে জীবনের স্রোতে ভেসে চলেছি আমি।

জীবনের সতেরটা বছর পার করে এসে জানতে পারলাম জন্ম থেকে যাদের নিজের বাবা মা জেনে এসেছি আমি তাদের পালিতা কন্যা।
একটি সন্তানের অভাবে যে কষ্টের বিষাদ ছায়ায় ডুবে যাচ্ছিলেন তা থেকে পরিত্রাণের আশায় আমাকে কোলে তুলেছিলেন। খুব সুখেই রেখেছিলেন আমায়। সন্তান স্নেহে বড় করেছেন ।

হয়ত আমার ভাগ্যের সুখ প্রদীপটার জ্বালানী শেষ হয়ে এসেছিল। তাই আমার মায়ের কোল আলো করে আসে এক ফুট ফুটে ছেলে সন্তান। খুব খুশি হয়েছিলাম ভাইকে পেয়ে। আমার কল্পনার ক্যানভাসে নানা স্বপ্নের আঁকি বুকি ছিল ভাইকে নিয়ে।
কিন্তু সে স্বপ্নগুলো আর রাঙানো হয়নি জীবনের রংতুলিতে।
ভাই যত বড় হতে থাকে আ্রমার সাথে মায়ের ব্যবহার ততটাই বদলে যেতে থাকে । আগের মতো আর আমার কপালে আদরের চুমু আঁকে না। আমি মাকে আদর করতে চাইলেও রেগে যেতেন মা। তবু আমি বুঝতে চাইনি যে “মা” আর আমায় চায় না ।
কিন্তু বাবা আগের মতই ছিলেন। তাঁর চোখে আমি কখনও পালিত কন্যার স্নেহ খুঁজে পাইনি। বাবার স্নেহময়ী “মা” হয়েই ছিলাম।

মা আমার প্রতি বাবার এ ভালবাসা মেনে নিতে পারছিলেন না। প্রায় প্রতিদিনি বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া হতো। যার কারন ছিলাম আমি। কিন্তু বাবা আমায় তা বুঝতে দিতে চাইতেন না পিছে আমি কষ্ট পাই ভেবে। তাই আমিও বাবার সাথে সুখী থাকার অভিনয় করে গেছি। সুখের মুখোশ পরে অভিনয় করে গেছি বাবার সাথে।

বাবার অতি ভালবাসা আর মায়ের ক্রমশঃ বদলে যাওয়ার মধ্যেই চলছিল জীবন।
মা আমায় আদর করা কমিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু কখনও বকাবকি করতেন না। কিন্তু আমি মায়ের সেই ভালবাসার মিষ্টি স্বাদের বকুনিগুলোই খুঁজে ফিরছিলাম।
আমি চাইতাম মা আমায় বকুনি দিবে আর আমি সেই অভিমানে কেঁদে দু চোখ ভাসাবো।
মা তার আঁচলে জল মুছিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বুকে টেনে নিবে আমায়।
কিন্তু আমার সে চাওয়াগুলো আর পাওয়া হওয়ার নয়।

আমার সেদিন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছিল। প্রত্যাশার চেয়ে খুব খারাপ রেজাল্ট ছিল আমার। বাবা নানা ভাবে সান্তনা দেবার চেষ্টা করলেও মা আমার কাছেও আসেনি ।

পরদিন সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে আমার। কিন্তু মা সেদিন যা বলেছিলেন তা শুনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমি। ঘরে ঢোকেই বলতে শুরু করেন মা, শোন স্নেহা তুমি এখন বড় হয়েছ। এখন তোমার বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে।

আমি বুঝতে পারছিলাম না, মা আমায় কোন বাস্তবতা কে মেনে নিতে বলছেন।

কিন্তু মা বলেই চলেছেন ।
এখন থেকে তোমার নিজের দায়িত্ব নিতে শিখতে হবে। কারন –
এবার মা কিছুটা থামলেন। মায়ের অসম্পূর্ণ কথাটা জানার জন্য আবার জিজ্ঞেস করলাম। বলো মা কি কারন?
-“কারন তুমি আমাদের মেয়ে নও”।
এ কথা শুনার পর আমি নিজের কর্নদ্বয়কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো আমি তখনো গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে কোন দুঃস্বপ্ন দেখছি। নিদ্রাভঙ্গ হলেই আবার সব সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে যাবে। কিন্তু এবার আর তা হয়নি।

মা বলেই চলছিলেন ,
-আমরা তোমায় এক হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসি। শুনেছি তোমার জন্মের আগে আরো আট জন সন্তান জন্ম দেন তোমার মা। যাদের কেউ ই তিন দিনের বেশি পৃথিবীর আলো দেখেনি। তোমার অবস্থাও ভাল ছিলনা। তাই তোমার মা’কে ডিভোর্স দেয় তোমার বাবা। কিন্তু তোমাকে বাঁচাবার শেষ চেষ্টা করেছিলেন তোমার নানা নানু। উনারাই তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলেন। ডাক্তার বলেছিলেন তোমার বাঁচার আশঙ্কা খুব কম।
কিন্তু তোমার চিকিৎসার খরচ বহনের ক্ষমতা তাদের ছিল না। তাই সেই অবস্থায় তোমাকে হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যান তাঁরা। হাসপাতালের খরচে তোমার চিকিৎসা হয়। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠো তুমি। ভাগ্যচক্রে সেই হাসপাতালেই এক আত্বীয়াকে দেখতে গিয়ে তোমার কথা জানতে পারি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনেক খুঁজে তোমার এক দূর সম্পর্কের মামার সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি তোমার নানা নানু কে বুঝিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তারা তোমায় নিতে চায় কিনা জানতে চাইলে তারা জানায়, তোমার মা কে নিয়েই খুব কষ্টে আছেন। তাই আর তোমায় নিয়ে নিজেদের বোঝা বাড়াতে চান না। তাই আমার কোলেই তুলে দেন তোমায়।”
তারপরের সবটা তো তোমার জানা। আজ তোমাকে এ কথাগুলো বলার কারণ আমি চাইনা আমার একমাত্র ছেলের অধিকারের অংশীদারী তুমি হও।

আমি মায়ের কথাগুলো শুনার পর বুঝতে পাড়ছিলাম একটু একটু করে আমার পায়ের তলার মাটি ধ্বসে যাচ্ছে। এক ভয়াল জলোচ্ছাস তীব্র বেগে ধেয়ে আসছে আমার দিকে। যা আমার সকল আয়োজন, আপনজনকে ভাসিয়ে নিবে, শূন্যে ছুড়ে ফেলবে আমাকে। বিষণ কষ্ট হচ্ছিল। এটম কিংবা হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও শক্তিধর সে কষ্ট।

একটা ঠিকানা আর কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে আমার মুখের উপর বাসার দরজাটা বন্ধ করে দিলেন মা। দরজার ওপাশে মা আর অন্য পাশে আমি। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর যদি কোন দরজা থাকত তবে সেই দরজা ভেঙ্গে এখনি চুকিয়ে নিতাম এই পৃথিবীর সকল পাঠ।

ধীর পায়ে শুরু হয় আমার সে যাত্রা। মায়ের দেওয়া ঠিকানা হাতে চলেছি জন্মদাত্রীর খুঁজে।

নানুর বাড়ি পৌঁছে জানতে পারলাম বছর খানেক আগে মারা গেছেন আমার নানা-নানু। মায়ের আবার বিয়ে হয়েছে। বাবাও ভাল আছেন তার ছোট সংসার নিয়ে। তাই আমায় জায়গা দিয়ে কারো সুখের ঘরে দুঃখের আগুন জ্বালাতে রাজী নয় তারা।

তাই আবার ফিরে চলেছি সেই চেনা শহরে, চেনা-অচেনার ভিড়ে। জীবনে স্রোতে সেই ভেসে-চলা। কে জানে কী অপেক্ষা করে আছে!

ট্রেন চলে এসেছে তার গন্তব্যে। এবার নামতে হবে আমাকেও। ট্রেন থেকে নেমে চুপচাপ দাড়িয়ে আছি। বুঝতে পারছিনা কোথায় ভিড়াবো এ জীবন তরী।

হঠাৎ এক পরিচিত ছোঁয়ায় আতকে উঠি। কেউ আমায় পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আপু আপু বলে কাঁদছে।

-একি ভাই! তুই এখানে কেন? আর কাঁদছিস কেন?

-আপু তুমি কোথায় চলে গেয়েছিলে? আমি আর বাবা কত খুঁজেছি তোমায়।

পিছন ফিরে দেখি বাবা মা দু’জনেই দাঁড়িয়ে আছেন। মা জল ভরা চোখে অপরাধীর ন্যায় তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি বুঝতে পারি আত্ব-গ্লানিতে দহনে পুড়ে মা আমার খাঁটি সোনা হয়ে গেছে।

আমি দৌঁড়ে গিয়ে আছড়ে পরি মায়ের বুকে। মা আমায় পরম যত্নে আগলে ধরে হাউমাউ করে কাঁদে বলে
–আমায় ক্ষমা কর মা। তুই আমার মেয়ে। আমার। আমার। আমি তোকে পেটে নয় রে বুকে ধরে ছিলাম।ভতা আজ বুঝতে পারছি।

-হ্যাঁ মা আমি তোমার মেয়ে। তুমিই আমার মা। আমি আর কাউকে চাইনা। তোমার বুকেই আমার সকল সুখ শয্যা।

বাবা আমাদের দিকে উৎসুক দর্শকের ন্যায় তাকিয়ে আছে।

আর এভাবেই জীবনের কালো ছায়াপথ অতিক্রম করে আলোর ভুবনে প্রবেশ হলো আমার।

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *