ইসালামের পতাকাতলে
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৫, ২০১৮
লেখকঃ

 24 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

গল্প: “ইসলামের পতাকাতলে”
লেখা: আখলাকুর রহমান
.
সন্ধ্যাকালে আকাশের লাল একটা আভা নদীর পানিতে ছড়িয়ে জানিয়ে দিচ্ছে আঁধার নেমে আসবে এক্ষুনি। শ্রীকান্তের চোখ দু’টো একটি মুহুর্তের জন্যও সেই নদীর পানি থেকে আলাদা হচ্ছে না। হয়তো চোখ দু’টো নদীর পানির সাথে মিশে গেছে।
কিন্তু না! কিছুক্ষণ পরেই সেই পানি চিরে ঘাটে এগিয়ে এল একটা ডিঙি। ঢাক বেজে চলেছে অনবরত। ছোট ছেলে-মেয়ে ডিঙির কোণে বসে আনন্দে হাঁক ছাড়ছে।
একজন ফতুয়া-ধুতি পরিহিত লোক ঘোমটা দেওয়া একটা মেয়েকে হাত ধরে নামিয়ে নিয়ে এলো ডিঙি থেকে।
হয়তো বিয়ে করে ফিরছে দূর কোনো গাঁ থেকে।
সন্ধার সর্বশেষ আলোতেও লোকটার মাথার টোপরটা চকচক করে উঠল।
শ্রীকান্ত দ্রুত সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
– কুলি চাই বাবু?
টোপর পরা লোকটি আঙুল দিয়ে ডিঙির ছাউনির নিচে ইঙ্গিত করে বললেন,
– ওই স্যুটকেস তিনটে নিয়ে নাও।
– বাবু কোথায় নিয়ে যেতে হবে এগুলো?
– যাবো হরিনগর। তুমি যেতে পারবা?
– কী যে কন! ওটা তো পাশের গ্রাম। চলুন বাবু।
স্যুটকেস দু’টো মাথায় নিয়ে আর একটা হাতে ঝুলিয়ে হরিনগরের দিক পা বাড়াল শ্রীকান্ত। শরীরে একটি মাত্র বস্ত্র, ধুতি। চিকন দেহের অধিকারী। তবে শরীরে জোর আছে বেশ।
সে হাটা শুরু করল। সামনে পালকিতে চলেছে টোপর পরা লোক আর তার সদ্য বিয়ে করা বউ। পাশে ঢাক ও সানাই বাজাচ্ছে একদল যুবক ও ছোট বাচ্চারা।
সন্ধ্যার পর্ব শেষ হয়েছে বহু আগে। এখন আকাশে চাঁদ-তারার লুকোচুরি খেলা হচ্ছে। যাদের একমাত্র সঙ্গী কয়েকগুচ্ছ মেঘ।
গাঁয়ের মেঠো পথে কোনো হ্যারিকেন না জ্বালিয়েই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে পথ এগিয়ে চলেছে তারা।
মাঝে মধ্যে ঢাক সানাইয়ের শব্দ ভেদ করে পালকির ভেতর থেকে পুরুষ এবং নারী কণ্ঠের হাসাহাসি ভেসে আসছে।
আশে-পাশে চোখ ঘুরিয়ে নিল শ্রীকান্ত। একটা ঘরের বাইরে কুপি জ্বলছে। তার সামনে একটা টিলার উপর একজন লম্বা সাদা জামা পরিহিত লোক দুই কানে হাত দিয়ে দাড়িয়ে উচ্চারণ করছে-
“আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার
আসহাদু আল্লাহ্ ইলাহা ইল্লাল্লাহ্”
থমকে দাড়ায় শ্রীকান্ত। ঢাক সানাইয়ের বাজনাও থেমে নেই। কিন্তু এই সুরটা তার হৃদয়ে সাড়া তুলল। আগে হরিনগরে বহুবার এসেছে। কিন্তু এই গান সে আগে কখনো শুনেনি। যিনি এই মধুর সুরে গেয়ে চলেছেন তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। যদিও কুপির আলোতে আবছা দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ সামনে থেকে একজন ডাক দিলো,
– কইগো কুলি, দাড়ালে কেন?
– আসতেছি দাদা।
শ্রীকান্ত আর দেরি না করে হরিনগরের পথে হাটতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা হরিনগরে এসে পৌঁছালো।
মাথা থেকে স্যুটকেস নামাতে গেল, হঠাৎ টোপর পরা লোকটি পালকি থেকে নেমে তেড়ে এল।
– করো কী বাপু? আস্তে নামাও। কত দামি জিনিস আছে তা আর জানো কি!
– আস্তেই নামাইতেছি বাবু।
টোপর পরা লোকটা ফতুয়ার পকেট থেকে চকচকে এক’শ টাকার একটি নোট হাতে ধরিয়ে দিলেন শ্রীকান্তের।
– বাবু, আমার কাছে ভাংতি নেই। আপনি ভাংতি করে দিন।
– ভাংতি লাগবে না। এটা রাখো তুমি।
শ্রীকান্ত রুক্ষ একটা হাসি দিয়ে বলল,
– আইচ্ছা। যদি প্রয়োজন হয় আবার ডাকবেন। আমি ঘাটেই থাকবো।

বেশি দেরি না করে বাড়ির পথে হাটা শুরু করল সে। পথটা চাঁদরে আলোতে পরিচ্ছন্ন।
সেই ঘরটার সামনে এসে দাড়াল শ্রীকান্ত, যেখানে ওই লম্বা জামা পরা লোকটা গানের সুর তুলছিল।
রাস্তা থেকে দেখা যাচ্ছে, একদল লোক বসে আছে।
সবার মাথায় টুপি পরা আর গায়ে পান্জাবি।
আস্তে আস্তে ঘরটার দিকে এগিয়ে যায় শ্রীকান্ত। দরজার পাশে চুপিচুপি দাড়িয়ে পড়ে, উঁকি দেয় ভেতরে।
একজন লোক মাঝখানে বসে আছে। অন্যরা তার চারদিকে ঘিরে আছে।
মাঝখানের লোকটা কিছু বলছে।
কান পেতে বেশ শুনতে থাকে সে।
– কে ওখানে? দরজার পেছনে কে?
ভেতর থেকে হাঁক ছাড়ে একজন। হয়তো শ্রীকান্তকে দেখে ফেলেছে, কিংবা তার ছায়া পড়েছে ঘরে।
– আজ্ঞে বাবু আমি।
– কে? ভেতরে আসো।
শ্রীকান্ত এগিয়ে যায় ভেতরে। একজন লোক বলে ওঠে,
– ওই ব্যাটা হিন্দু। এইখানে আইলে আমগো পাপ হইবো।
মাঝখানে বসে থাকা লোকটি বলল,
– চুপ থাকো কলিমউল্লাহ্। বাবাজি তোমার নাম কী?
লোকটা শ্রীকান্তের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
– আমি শ্রীকান্ত। পাশের গ্রামে থাকি। কুলির কাজ করতে এইখানে আইছিলাম। আপনাদের দেখে এলাম। আগে তো দেখি নাই।
– বসো এইখানে। আমরা এই গ্রামে আসছি ইসলামের দাওয়াত দিতে।
– ইসলাম কী?
– মানুষরে ভালো করার নাম হলো ইসলাম।
পাশ থেকে কলিমউল্লাহ্ আবার বলে উঠল,
– হেই তো মুনাফিক। হিন্দু আবার ভালো হইবো ক্যামনে হুজুর?
– চুপ করো। আর কখনো কাউকে মুনাফিক বলবা না। আমার রাসুল নিজে নিষেধ করেছে কাউকে সরাসরি মুনাফিক বলতে।
কথাটা শুনে চুপ হয়ে যায় কলিমউল্লাহ্। সে এই গ্রামের মানুষ। গত কয়েকদিন হলো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। তাই ইসলামের নিয়ম সম্পর্কে তেমন অবগত নয়।
রাসুল শব্দটা পুরোপুরি অচেনা মনে হলো শ্রীকান্তের। কৌতূহল মেটাতে জিজ্ঞেস করল,
– রাসুল কী হুজুর?
– রাসুল হলো বিশ্ব মানবতার দূত। মানুষদের ভালো করার জন্য যাকে খোদা পাঠিয়েছেন।
– আপনারা কী বেতন পান এই দাওয়াত দিলে?
কথাটা শুনেই মজলিশে থাকা সকলে হেসে উঠল জোরে।
– হাসছো কেন? অট্টহাসি দেওয়া উচিৎ নয়। সবাই চুপ করো।
হুজুর একটু চুপ থেকে শ্রীকান্তের দিকে তাকালেন।
– আমরা বেতন পাই। তবে সে বেতন দেখা যায় না।
– তাহলে সেই বেতন দিয়ে কোনো লাভ হয় আপনাগো?
– হ্যাঁ, অনেক লাভ হয়। এই বেতন গচ্ছিত রাখতে হয়। মৃত্যুর পরে এই বেতন দিয়ে জান্নাতে যাওয়া যায়। যেখানে সুখের কোনো অভাব নেই।
– মরে গেলে তো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবে। তখন আবার সুখ আসবে কোত্থেকে?
– মরে গেলে কবর দিতে হয়। পুড়িয়ে ফেলতে নেই।
– আমগো এইদিক পুড়িয়ে দেয়।
– আচ্ছা আজ মজলিশ এখানে শেষ হোক। আমরা কাল সন্ধ্যায় আবার বসবো।
– হুজুর আমি আসবো?
– অবশ্যই, চাইলে তুমি আসতে পারো।
শ্রীকান্ত বের হয়ে চলে এলো বাড়িতে। হুজুরের কথাগুলো তার অনেক ভালো লেগেছে। মনের খাতায় যেন সবকিছু গেঁথে নিয়েছে।
বাড়িতে সে আর তার স্ত্রী বসবাস করে। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছে বছর পাঁচেক হয়ে গেছে। দু’জনের সংসার বেশ ভালোই চলে শ্রীকান্তের কুলিগিরির রোজগারে।
ভাত খেয়ে দ্রুত শুয়ে পড়ল সে। কাল ভোরে উঠতে হবে, ঘাটে যেতে হবে কাজের জন্য।
গভীর রাতে শ্রীকান্ত স্বপ্ন দেখছে।
হরিনগরের হুজুরগুলোর সাথে সে বসে আছে লম্বা জামা পরে। মাথায় একটা সাদা টুপি। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাঁড়িগুলো নেই, লম্বা হয়ে গেছে সেগুলো।
অনেক সুন্দর লাগছে তাকে। বেশ খুশি সে!
আলতো করে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ভেসে উঠল।
– কীগো? হাসো কেন এতো রাইতে?
শ্রীকান্তের স্ত্রী বলে উঠল।
– বউ, হরিনগর একদল হুজুর আইছে। তারা মানুষের কাছে শান্তির দাওয়াত দেয়। মরার পরে সুখের টিকেট বিলিয়ে বেড়ায় তারা।
– তাই? তুমি জানলে ক্যামনে?
– আজ গেছিলাম ওদিকে। আসার সময় ক্ষণেক বসছিলাম। সকালে আবার যাবো।
– খবরদার! ওদের ধারেও ঘেষবা না। ওরা আমাগো বাপ-দাদার ধম্ম থেকে তোমায় অন্য ধম্মে নিয়ে যাবে। কী জানি কয়, হ্যাঁ! ইসলাম ধম্ম।
– আমি তো ধম্ম ছাড়তেছি না। আগে দেখি ওদের কাছে ঘেষে।
– আর যাইও না কইলাম। আমি তাইলে ঠাকুর মশাইরে বইলা দিমু।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল শ্রীকান্ত। তারপর বলল,
– আইচ্ছা, যাবো না।

বহুক্ষণ নীরব থাকল সে। এই নীরবতা ভাঙার ইচ্ছা হলো না আর। ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালের আকাশটা বেশ স্বচ্ছ।
শ্মশান ঘাটে বসে আছে শ্রীকান্ত। মরণের পর তাদের এখানেই পোড়ানো হয়। পোড়ানোর কথা মনে হতেই চোখটা দিয়ে পানি ঝরতে লাগল।
বছর দু’য়েক আগের কথা মনে হতে লাগল।
– বাবা শ্রীকান্ত আসছোস? বস বাবা। তোরে একটা কথা কইতাম।
– কও আব্বা।
– আমি তো আর বাঁচুম না বেশিদিন। ব্যারামটা জেঁকে ধরেছে। তয় আমি মরলে আমারে কবর দিস না বাপ। আমার খুব কষ্ট হইবো।

শ্রীকান্ত সেদিন কথা দিয়েছিল মৃত্যুশয্যায় কাতর তার বাবাকে। মৃত্যুর পর তার লাশ পুতে দেবে।
কিন্তু পারেনি! ঠাকুর মশাই জোর করে পোড়াইয়া দিছে।
শ্মশান ঘাট থেকে উঠে আসে শ্রীকান্ত। বাড়িতে যেতে ইচ্ছা করছে না হয়তো। ঘাটেও যাবে না।
হাটা শুরু করল হরিনগরের পথ ধরে। সেই ঘরের কাছে গিয়ে ডাক দিল,
– হুজুর আমি শ্রীকান্ত। আছেন নাকি?
ভেতর থেকে জবাব এল,
– আসো শ্রীকান্ত।
– হুজুর আমি আপনাদের মতো লম্বা জামা আর টুপি পরতে আসছি।

কথাটা শোনার পরই ভেতর থেকে সকলে ছুটে বেরিয়ে আসে।
অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
হুজুর তার চোখের দিকে তাকায়। পতপত করে উড়ছে ইসলামের কালেমার পতাকা। যার ছায়াতলে দাড়িয়ে আছে পরিবারের অন্যায় নিষেধাজ্ঞা বর্জন করে ছুটে আসা শ্রীকান্ত।
হুজুরের মুখ দিয়ে অস্পষ্ট ধ্বনি বেরিয়ে এল,
“সুবহান আল্লাহ্। শ্রীকান্ত নয়, সে আজ আব্দুর রহমান”।
____সমাপ্ত

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *