ঘৃণার সাথে বসবাস
প্রকাশিত: মে ২৭, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 52 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখক : তামান্না স্নিগ্ধা
(মে – ২০১৮)
……………..

ছাদের এক চিলতে বাগানে বসে আছি। গায়ে টুকরো টুকরো বরফ এসে ছিটকে পড়ছে। প্রচুর শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। টবগুলোকে এক সাইডে সরিয়ে আনার দরকার। ভালো লাগছে না কিছু। ঈশান আজকেও আমাকে গালি দিয়েছে। এত তুচ্ছ তুচ্ছ বিষয়ে আজকাল গালাগালি করে মনটাই ছোট হয়ে যায়।
ওর এই অভ্যাস কোনভাবেই থামাতে পারছি না। অথচ বিয়ের আগে বলত ও নাকি গালি দিতেই জানে না।

দিনের পর দিন ওর এইসব কুৎসিত গালি শুনে নিজেকে কন্ট্রোল রাখতে পারছিলাম না। কষ্টে যখন তখন চোখে পানি চলে আসতো। অবশ্য আমার কান্নার গুরুত্ব ওর কাছে কোন কালেই ছিলো না। তাই কয়দিন ভালো থেকে আবার যা তাই শুরু করতো। একশ বার স্যরি বলে আবার সেই গালি।
অতিষ্ঠ হয়ে ওর গালির উত্তরে ওর বলা গালি গুলোই ওকে ফিরিয়ে দিতে লাগলাম। যাতে বোধদয় হয় একটু। কিন্তু না, পাল্লা দিয়ে ওর গালির ভান্ডারের সাথে তাল মিলাতে পারছিলাম না। পরিবার থেকে এমন শিক্ষা কখনোই পায়নি বলে গালাগালি করা মানুষগুলোকেই সবসময় ঘৃণার চোখে দেখে এসেছি।
আর আমার ভাগ্যে কিনা এই হলো!

পাশাপাশি দুইটা ফ্লাটের কমন কিচেন হবার কারনে এপাশের কথাবার্তা ওপাশ থেকে শোনা যায়। মাঝে মাঝে কিচেনে রিনা ভাবির খোঁচা মারা কথাতে বেশ বোঝা যায়। সেদিন যেচে পরে বললেন, “তাড়াতাড়ি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে নেও বাপু, দেখবা তখন এসব অশান্তি উধাও হয়ে যাবে। তোমরা আজকালকার মেয়েরা কেন যে বাচ্চা নিতে এতে গড়িমসি করো বুঝে উঠতে পারি না।”

মাথার ভিতর কয়দিন ধরেই রিনা ভাবির কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। একবার মনে হচ্ছে রিনা ভাবিই ঠিক। আবার মনে হচ্ছে একটা বাচ্চা পেটে আসলে তখন যত খারাপ ব্যবহার ই করুক না কেন তখন কিন্তু আর ফেরার পথ থাকবে না। অদ্ভুত রকমের মানসিক দোটানায় ভুগছি।

আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বজ্রপাত আমার গায়ের উপর হলে ভালো হত। মরে যেতাম ব্যাস সব ঝামেলা শেষ।
দুইহাত দিয়ে হাটু ধরে রেখে তাতে মাথা গুঁজে দিয়ে কান্না করছি। মনে হচ্ছে এই বিশ্ব সংসারে আমার কেউ নেই। এত কষ্ট কেন, বুকের ভিতর! এত কষ্ট কেন আল্লাহ!
চুলের ভিতর আলতো হাতের ছোঁয়া পেয়ে দাঁড়িয়ে দেখি ঈশান। ওর বুকের ভিতর মাথা গুঁজে হুহু করে কাঁদতে লাগলাম।
একসময় মাথা উঁচু করে বললাম, ‘আমাকে তুমি আর ভালোবাসোনা তাইনা, ঈশান?’
ঈশান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বললো, ‘ঢং করতে হবে না এখন আর। বল কার জন্য এই বৃষ্টির ভিতর বসে বসে ভিজছিলি? কই সে? আমাকে দেখে পালিয়ে গেলো নাকি?”
ঘৃণায় আমার গায়ের ভিতর রিরি করে উঠলো। ছিটকে সরে এলাম ওর কাছ থেকে।
অশ্রাব্য গালি আর তুই তুকারির সাথে সাথে ঈশান বলতে থাকলো, “গায়ের সাথে ভেজা শাড়ি লেপ্টানো মানুষকে দেখাতে খুব ভালো লাগে তাইনা? আমার সামনে ওইরকম ছেলে ভুলানো কান্না করা লাগবে না। তোর স্বভাব আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। হাতেনাতে ধরার জন্যেই আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে এসেছি।”

অতিরিক্ত আঘাত পেলে মানুষ নাকি স্তুম্ভিত হয়ে যায়। আমি পুরোপুরি হিস্ট্রিয়াগ্রস্ত হয়ে গেলাম। দৌড়ে ছাদের কার্নিশে ছুটে গেলাম। আত্মহত্যা মহাপাপ জেনেও পা বাড়ালাম সেদিকে। দিনের পর দিন এতটা মানসিক চাপ আমার মস্তিষ্ক আর নিতে পারছিলো না। অবসান চাচ্ছিলো সব অবিশ্বাস থেকে। কিন্তু পারলাম কই!

একদম শেষ মূহূর্তে ঈশান আমাকে ঠেকালো। ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে খুব চেষ্টা করে আমার গায়ে হাত তোলা থেকে নিজেকে সম্বরণ করছে। ওর পুরো মুখ প্রচন্ড রাগে বিকৃত হয়ে গিয়েছে।
নিজের উপর তীব্র ঘৃণা হলো। বাবা মাকে কষ্ট দিয়ে, এই কুৎসিত মানসিকতার ছেলেটির হাত ধরে পালিয়ে এসে বিয়ে করছিলাম বলে।

আজ নামাজের পাটির উপর বসে অনেকক্ষন কান্নাকাটি করলাম। শুধু একটুখানি মুক্তির জন্য। ও আমাকে ছাড়বেনা আমি জানি। ঠিক যতখানি মানসিক প্রেশার দেয়া সম্ভব ততোটুক দিয়ে আমাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে তবু ওর সন্দেহকে ও সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেই ছাড়বে। আমি কী করব আল্লাহ, প্লিজ পথ দেখাও। আমাকে শক্তি দাও।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঈশান পুরোপুরি অন্যমানুষ। যেন তার গতকালের কথা একটুও মনে নেই। খাবার খেতে যেয়ে অফিসের একগাদা গল্প আর মজা করলো। আমাকে প্লেটও ধুতে দিলো না। কিচেনে প্লেট পরিষ্কার করতে করতে রিনা ভাবির সাথে দুষ্টামি করে বলতে লাগলো, “ভাবী মিম্মার জন্য আচার বানানো শুরু করেন, শীঘ্রই কাজে লাগতে পারে।”
আমি লজ্জায় দৌড়ে পালিয়ে এলাম ওখান থেকে।
এটাই তো আমার ঈশান। মাঝে মাঝে কি যে হয় ওর।

রাত্রে ওর বুকের কাছে চুপটি করে শুয়ে বললাম, “তুমি মাঝে মাঝে এমন কর কেন আমার সাথে। আমার যে কষ্ট হয় তুমি বোঝনা।”
ঈশান সাথে সাথেই বলে উঠলো, ‘তোমার জন্যই তো করি। তুমি ভালো হয়ে থাকলে তো আর আমি সন্দেহ করি না।’
আবার কোন কথায় কোন কথা উঠে ঝগড়া বেধে যায়, তাই অস্ফুট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেলাম।

আজকে তাড়াহুড়া করে অফিসে যাওয়ার সময় ঈশান ভুলে ওর একটা ফোন ফেলে রেখে গেছে। আমি সাধারণত অন্য বউদের মত ওর ফোন চেক করে দেখি না। আজ কি মনে করে কল লিস্ট চেক করে দেখলাম রাহা আর সুচি নামের দুইটা মেয়ের সাথে বেশ অনেকক্ষণ কথা বলেছে। দুটোই পরপর দুইদিনে অফিসের লাঞ্চ আওয়ারে। বাসায় আসার পর জিজ্ঞেস করতেই পুরোপুরি অস্বীকার করলো। কল লিস্ট দেখালাম তবু বলছে ও কিছু জানে না। ওর ফোন নিয়ে নাকি ওর এক কলিগ মাঝে মাঝে কাকে কাকে কল দেয়। আমি বললাম তাই বলে তোমার কলিগ অন্যের ফোনে রাহা ১,২ সুচি ১, ২ বলে তাদের দুই দুইটা নাম্বার সেভ করে রাখবে? এটা বিশ্বাসযোগ্য কথা?
আমি যত রাগছিলাম ঈশান ততো নির্বিকারভাবে কথা বলছিলো। বুঝছিলাম ও কিছু লুকাচ্ছে আমাকে। কিন্তু সেটা গোপন করে অদ্ভুত দক্ষতায় দ্বিধাহীনভাবে আমাকে বললো, ‘তুমি এই দুটো নাম্বারে ফোন দাও, দিয়ে শোন।’
ও জানে যে আমি তাদেরকে ফোন দিব না। এতটা ছোটলোক আমি না।
তারপরও, ওর মুখ থেকে সত্যিটা শোনার জন্য দুইজনের নাম্বারই আমার ফোনে তুলে নিলাম। বললাম, আমি কিন্তু ওদের ফোন দিব একদিন দেইখো।
‘ওদেরকে আমি চিনিই না। তুমি যা পারো করো- বলে ঈশান আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কাছে টেনে নিলো।

পরপর কয়দিন ঈশান আমার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করলো। এতই ভালো যে মনে হচ্ছিলো, আমার থেকে সুখী এই পৃথিবীতে বুঝি আর কেউ নেই।
তারপর আবার শুরু হলো সেই মানসিক টর্চার। যত বলি আমার দোষ কী সেটা তো তুমি বলবা আগে। সে অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করে বলে আমার নামে সে কোথা থেকে কী শুনছে। কী যে শুনছে সেটা স্পষ্ট করে বলে না অথচ উঠতে বসতে গালি দেয়।
ধৈর্যের বাধ আগেই ভেঙেছিলো। বিশ্বাসের যে কোনাকানাচি বেচে ছিলো সেটাও ভাঙলো ফোনে যেদিন টুং করে নোটিফিকেশন আসলো, ‘রাহা জয়েন ইমো টুডে।’
ভুলেই গেছিলাম রাহা আর সুমির নাম্বার ফোনে সেভ করছিলাম সে কথা।
ইমোতে রাহার ছবি দেখলাম। লাল শাড়ি পড়া। মাথায় পহেলা বৈশাখের সাঁজ। ছবি দেখে বোঝা যাচ্ছে কলেজে পড়া মেয়ে হিসেবে বেশ ম্যাচিউরড চেহারা।
ফেসবুকে এবার সার্চ দিলাম। কয়েকশো রাহা নামের ভিতর ছবি দেখে চিনে নিলাম তাকে।
বুকের ভিতর চিনচিন করে উঠলো যখন মিউচুয়াল ফ্রেন্ড হিসেবে ঈশানকে দেখতে পেলাম।

গত দুইদিন ধরে চিন্তাভাবনা করে তারপর রাহাকে ফ্রেন্ডরিকুয়েস্ট পাঠালাম। সত্যটা জানা দরকার।

ঈশানের আচরণ দিন দিন আরো কদর্য হচ্ছে। আমিও একটুকুও ছাড় দিচ্ছি না । আমার জীবনটা যতটুকু দূর্বিষহ করছে ঠিক সেভাবে না পারলেও ওর প্রতিটা কথার উত্তর দিচ্ছি। চুপচাপ শান্তমুখে কান্নাকাটি করার সেই মিম্মা আমি আর নেই। আস্তে আস্তে প্রতিবাদী হচ্ছি।

রাহা ফ্রেন্ড রিকু এক্সেপ্ট করেছে আজ। পরপর কয়ঘন্টা ওর ছবিতে লাভ, ওয়াও কমেন্ট করে ইনবক্সে নক দিলাম এখন।
মেয়েচটা বেশ খুশি খুশি মনে রিপ্লাই দিতে শুরু করলো। বাইরে চঞ্চল হলেও কথাবার্তায় বেশ মার্জিত দেখলাম। হুট করে জিজ্ঞেস করলাম, “ঈশানকে চেন?”
মেয়েটা ছোট্ট করে উত্তর দিলো, “হুম।”
একটু প্রশংসা করে কথার ফাঁকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, “ফোনে কথা বলেছো কখনো ঈশানের সাথে।”
হ্যা বলেছিতো, ‘ভাইয়া খুব ভালো। আপনার সাথে মিউচুয়াল দেখলাম। বলে একগাদা কথা বলতে থাকলো ঈশানকে নিয়ে।’
আমি চুপটি করে একটা হাসির ইমো দিয়ে ফেসবুক থেকে বের হয়ে এলাম।

পরের দুইটা মাস ছিলো আমার জন্য অসহনীয় দুটো মাস। একের পর এক ঈশানের প্রতারণার খবর সামনে আসছিলো। প্রমাণ পেয়েও চুপ করে বসে ছিলাম। নিজেকে বোকার হদ্দ বলে মনে হচ্ছিলো। কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ঈশানের এত এত মিথ্যাচারীতায় ওর প্রতি বিতৃষ্ণা এমন লেভেলে পৌছে গেছিলো যে ওর কন্ঠ শুনলেই রাগে গা জ্বলে উঠতো। তারপরেও নিজের সম্মান বাঁচাতে চুপ করে ছিলাম। ওর এসব অপকর্মের জবাবদিহি চাইতে ইচ্ছে যে করছিলোনা তা না, কিন্তু মনে হলো কি হবে জবাব চেয়ে! নতুন কোন মিথ্যা ব্যাখ্যা শুনবো আবার। ওর থেকে আর কয়টা দিন দাঁতমুখ চেপে সহ্য করি। ডিভোর্স লেটারের কাজ শেষ হতে আর মাত্র তো দুইদিন বাকি।

আহ! অবশেষে মুক্তি।
বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বেড়িয়ে গেছিলাম আবার এক কাপড়েই ফিরে এলাম। শুধু যাওয়ার সময় মাথাটা ছিলো উঁচু আর এখন নীচু।

লোকমুখে শুনেছি ঈশান নতুন অপবাদ দিয়েছে, ‘তাকে দিয়ে হচ্ছিলো না তাই নতুন আরেকজনের হাত ধরে পালিয়েছি।’ প্রতিবাদ করার রুচি হয় নি।
তবে, আজব ব্যাপার হচ্ছে, নরকযন্ত্রণা পেরিয়ে আসার পরেও ঈশানের কথা আমার এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে। বাঙ্গালী নারী বলেই হয়তোবা স্বামী জিনিসটা হৃদয় থেকে দূর করলেও মস্তিষ্কের এককোণে এখনো আস্তানা গেড়ে আছে। তবে, সকাল বিকাল দেখতে দেখতে মহল্লার এক ঠ্যাং ভাঙ্গা পোষা কুত্তাটার উপরেও তো মানুষের মায়া জন্মে, তাই ঈশানের জন্য থাকা ওই ‘কুত্তা মায়া’ নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *