ঈদের জন্য আক্ষেপ
প্রকাশিত: অগাস্ট ২২, ২০১৮
লেখকঃ

 40 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখক : মোঃ সাইফুল ইসলাম
.
#এই_মাসের_প্রতিযোগীতার_জন্য
.
সুমন অবাক দৃষ্টিতে তরকারির ডেকচির দিকে তাকাচ্ছে আর হেসে হেসে আপনমনে মার্বেল নিয়ে দুষ্টামি করছে।
৯ বছরের সুমন, দুইবোন একভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট।
সুমনের বাবা নেই। মা কাজ করে মানুষের বাড়িতে। বড়বোন ১৬ বছরের কুলসুম কাজ করে পোষাক কারখানায়।
মেঝবোন রোমানার কাছে সারাদিন থাকে সুমন। সুমনরা থাকে মস্তবড় শহরের মস্তবড় এক বস্তিতে।
সুমন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে বস্তির পাশের সরকারি বিদ্যালয়ে।
সুমনের বাবা মারা যাওয়ার সময় সুমনের বয়স ছিল সাত।
বাবার মৃত্যুর পর থেকেই কুলসুম পোষাক কারখানায় কাজ করা শুরু করে। যা টাকা বেতন পায় তা দিয়ে বস্তির ঘর ভাড়া দিয়ে সামান্য কিছু বাঁচে। সুমনের মা দুইবাড়িতে কাজ করে যা পায় তা দিয়ে কোনমতে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছে চারজনের সংসার।
.
মাসতিনেক আগে সুমনদের বস্তির একটা মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়েতে সুমন, কুলসুম, রোমানা যায়। বস্তির বিয়েতে সামান্য আয়োজন হলেও বস্তির প্রায় সবঘরেই দাওয়াত করা হয়। কথায় আছে গরিবের আত্না বড়। গরিবের বিয়েতে সাদাভাত মুরগী, গরুর মাংস আলু দিয়ে মূলত রান্না করা হয়। সুমন বিয়েতে গরুর মাংস তৃপ্তি সহকারে খায়। সুমন এর আগে মাংস খেলেও কখনো স্বাদ কি জিনিস তা বুঝে নাই, হয়তো বয়স কম ছিল তাই, নয়তো বছরে একবার খেতে পারে তাই।
.
বিয়ে থেকে আসার কয়েকদিন পর,
সুমন : আম্মা প্রত্যেক দিন ডাইল রাঁনধো, ভর্তা বানাও,, গরুর গোস্ত আনতে পারো না।
আলেয়া বেগম : কছ কি বাজান। গরুর গোস্ত কিনার টাকা কি আমাগোর আছে?
সুমন : না, আমি গরুর গোস্ত দিয়া ভাত খামো।
আলেয়া বেগম : বাজান তুই এহন এইডি দিয়া খা, দুইদিন পরে তোর বইনে বেতন পাইলে আনুম নে।
সুমন : আম্মা আনবা তো?
মা : হ বাজান আনমো, তুই এহন খা।
.
সেদিনের পর থেকে সুমন প্রায়ই মার কাছে মাংস খাওয়ার জন্য আবদার করতো। আলেয়া বেগমের ইচ্ছা থাকলেও ৫০০ টাকা কেজি মাংস কিনার সামর্থ্য তার নাই।
আলেয়া বেগম হোটেল থেকে ১০০ টাকা দিয়ে রান্না করা মাংস আনার কথা অনেকবার ভেবেছিল। কিন্তু পরক্ষনে মনে হয়েছে ১০০ টাকার ডাল-চাল কিনলে ঘরের সবাই পেটভরে খাইতে পারবো।
সুমনের মাংস খেতে চাওয়ার আবদার, পুরোপুরি আলেয়া বেগমের সুমনকে দেওয়া বইনে বেতন পাইলে আনবো এই আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে রইলো।
.
আজ কোরবানি ঈদ, ভদ্র ভাষায় ঈদুল আযহা।
আলেয়া বেগম যে দুই বাসায় কাজ করে, দুই বাসাতেই বড় গরু জবাই করবে। এক বাসাতে আলেয়া বেগম সুমনকে নিয়ে যায়। অন্য বাসায় কুলসুম ও রোমানাকে পাঠায়।
গরু জবাই করার পরে, মাংস কাটার কাজ কসাইরা করে। মাংস সিড়ি দিয়ে তিনতলার উপরে তোলতে হয়, জবাই করার জায়গাটি পরিষ্কার করতে হয় আলেয়া বেগমকে। রান্নাবান্না করে, সবার খাওয়া শেষ হলে, ময়লা প্লেট- বাটি পরিষ্কার করা হলে, বাসার ম্যাডাম আলেয়া বেগমকে দুইকেজির মতো মাংস আর কিছু ছেড়া পরোটা রুটি দেয়। তাই নিয়ে ছেলেকে সাথে করে বস্তিতে ফিরে আলেয়া বেগম। বস্তিতে আজ সবাই খুশি, প্রত্যেক ঘরেই যে মাংস রান্না হচ্ছে। বস্তির চারপাশ থেকে শুধু মাংস রান্নার ঘ্রাণ আসছে।
.
.
রোমানা ও কুলসুম ফিরে এসেছে, ওদেরকেও বাসার আপা বেশখানিকটা মাংস দিয়েছে।
আলেয়া বেগম তড়িগড়ি করে রান্না বসায়। ছেলেকে যে অনেকদিন পর পচ্ছন্দের খাবার খেতে দিতে পারবেন।
সুমন অনেক খুশি হয়ে খেলছে আর অবাক দৃষ্টিতে তরকারির ডেকচির দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবছে এতোসময় লাগছে কেনো রান্না হতে?
আলেয়া বেগম চুলায় জ্বাল দিচ্ছে আর কিছু সময় আগের ঘটনাটি মনে করছে..
.
২ ঘন্টা আগে,
মাংস কুটার কাজ চলছে, আলেয়া বেগম জবাই করার জায়গাটা পরিষ্কার করছে। বাসার ম্যাডাম আলেয়া বেগমকে তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য ধমক দিয়ে, কেজি দুয়েক মাংস আলেয়া বেগমকে দিয়ে বললো ” যা ধুয়ে রান্না বসিয়ে দে?
.
আলেয়া বেগম তাড়াতাড়ি মাংস রান্না শেষ করে। ম্যাডাম বাসার সবাইকে মাংস রুটি খেতে দেয়। সবার খাওয়া শেষ হলে বাটিতে ঝুলের সাথে দুই টুকরা মাংস পরে থাকে। আলেয়া বেগম বাটিতে থাকা ঝুল আর মাংসের টুুকরা দুটা, সাথে একটা ছেড়া রুটি দিয়ে সুমনকে খেতে দেয়।
ম্যাডাম নিচে থেকে এসে আলেয়া বেগমকে জিজ্ঞাসা করে “টমকে খেতে দিছোছ?
আলেয়া বেগম : আপা দেই নাই। এখন দিতাছি.. বলার সাথে
ম্যাডাম আলেয়া বেগমের গালে তার পাঁচ আঙ্গুল বসিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে ” দেড়টা বেজে গেছে তুই এখনো টমকে মাংস খেতে দেস নাই হারামজাদী, নয়টার পর থেকে টম এখনো কিছু খায় নাই, তোর ছেলেরে চুরি কইরা খাওয়াইতেছোছ চুরনী “”” পাশে বসা সুমনের খাবারের প্লেটটা লাথি দিয়ে ফেলে দেয় ম্যাডাম।
.
আম্মা আর কতক্ষন লাগবো ” সুমনের ডাকে বাস্তবে ফিরে আলেয়া বেগম।
এইতো আব্বা হইয়া গেছে তুই হাত মুখ ধুইয়া খাইতে আয়, তোর আপাগোরে ডাক দে।
.
আলেয়া বেগম গরম ভাত আর মাংস সুমনের পাতে বেড়ে দেয়। সুমন মনে খুশিতে খেতে থাকে।
আলেয়া বেগম আবার ভাবনায় ডুব দেয়, চিন্তা করে সকাল থেকে আমি তো না খেয়ে ছিলাম, আমার পোলাটা তো না কিছু খায় নাই। সারাদিন কাজ করলাম, আসার সময়তো একটু খেতে দিলো না, কুকুরকে খাবার দিতে দেরি করায় গায়ে হাত তুললো, পোলাটার মুখের খাওনে লাথি দিলো।
.
ছোটবেলায় হুজুরে কাছে শুনছিলাম” আল্লাহর রাসূল স: বলেন, তোমরা যা খাও,তোমরা যা পড় তোমার অধীনস্থ গোলামকে (চাকরকে) ঠিক একই খাবার দাও, পোষাক পড়তে দাও “”” হুজুর আরো বলতেন, আল্লাহর রাসূল বলেন ” তোমার গোলামকে ( চাকরকে) কখনো মারিও না। যদি ভুল করে তাহলে তাকে ক্ষমা করে দাও। তোমার দাসকে ( চাকরকে) দৈনিক ৭০ বার ক্ষমা করো “”” আলেয়া বেগম ভাবে এরা এতো টাকা দিয়া কোরবানি করে, আল্লাহ রাসূল স: এর কথা মানে না। এরা আমাদের গরিবদের ডাস্টবিনের ময়লা মনে করে।
এতোবড় গরু কোরবানি দেয়। অথচ গরিবগুলারে এক টুকরা কইরা মাংস দিয়া সব ফ্রিজে রাখছে। এরার কোরবানি কবুল হইবো তো?
.
আবারো সুমনের ডাকে বাস্তবে ফিরে আলেয়া বেগম।
এবার সুমন মাংসের টুকরা মুখে দিয়ে বলে “” আম্মা প্রতি মাসে ঈদ হয় না কিয়ারে। মাসে মাসে ঈদ হইলে আমরা মাসে গোস্ত খাইতে পারতাম “””””
খুশিতে আরো অনেক কিছু বলে সুমন। আলেয়া বেগম কিছুই শুনতে পায় না। আলেয়া বেগমের কানে বাজতে থাকে “” আম্মা প্রতিমাসে ঈদ হয় না কিয়ারে “

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৩ Comments

  1. আফরোজা আক্তার ইতি

    আসলেই। সুমনের মত অনেকেই আছে যারা একমুঠো ভালো খাবারের আশায় বছর পার করে দেয়। এই কুরবানির মধ্যে তিন ভাগ থাকে যার একটি ভাগ দরিদ্র মানুষের জন্য। অথচ অনেক ধনী লোকই আছে যারা এই ভাগ থেকেও নিজেদের জন্য রেখে দেয়। তাদেরকে শুধু দু’টুকরো দিয়ে বিদায় করে দেয়। এতে তাদের কুরবানি কবুল হয় কিনা এটাই প্রশ্ন। আর সুমনদের মনেও এই আশা থেকেই যায় ইদ যদি প্রতিমাসে আসতো।
    বানানে খুব বেশি ভুল নেই।
    পরক্ষনে- পরক্ষণে।
    পচ্ছন্দে- পছন্দে।
    তড়িগড়ি- তড়িঘড়ি।
    ঝুল- ঝোল।

    Reply
  2. Mahbub Alom

    ওনারা (বড়লোকরা) অনেক বড় মনের মানুষ।যাদের জন্য তারা বড়লোক তাদের খাবারে লাথি দিয়ে বড় মনের অমানুষিকতা দেখায়।
    এতোটুকু ভালোবাসা নেই গরিবদের প্রতি।তাহলে কোরবানির পশুর প্রতি কেমন করে হবে।
    আল্লাহর সন্তুষ্টি কিভাবে পাবে?

    শিক্ষণীয় একটা গল্প।অনেক ভালো লেগেছে।

    ধন্যবাদ

    Reply
  3. Halima tus sadia

    ধনীরাতো কুরবানি দেয় নিজেরা গোস্ত খাওয়ার জন্য।
    তারা খেতে পারলেই হয়।
    কুরবানির গোস্ত তিন ভাগ করতে হয়।
    এক ভাগ নিজের জন্য,এক ভাগ আত্মীয়ের জন্য।এক ভাগ গরীবের জন্য।
    গরীব ঘরের সন্তানরা কিছু খেতে চাইলেও খেতে পারে না।কারণ তাদের যে সামর্থ্য নেই।
    বড়লোকের বাড়িতে কাজ করেও আলেয়া পারলো না নিজের পছন্দের একটু খাবার আনতে।
    সত্যিই বড়ই আফসোস লাগে ধনীরা বুঝল না দান সম্পর্কে।নিজেরা খেতে পারলেই হয় মনে করে।
    আল্লাহ সবাইকে বুঝার তৌফিক দান করুক।

    শিক্ষণীয় গল্প।ভালো লাগলো।
    বানানে ভুল নেই।

    খামো–খামু
    কোরবানি–কুরবানি
    শুভ কামনা রইলো।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *