দুর্বল মানুষ
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮
লেখকঃ

 103 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

লেখকঃ রাদিয়া মাহবুব

আমি বড় হয়েছি কাকা কাকির সংসারে। কাকা বিদেশে থাকতেন। আমি, কাকি আর আমার কাকাতো বোন মণি থাকতাম গ্রামের বাড়িতে। মণি আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট ছিল। কিন্তু আমায় স্কুলে ভর্তি করা হয় মণির তিন বছর পর। তাই আমি আর মণি এক ক্লাসেই পড়তাম।
আমি অ ,আ,ক, খ কিছুই পারতাম না। কারণ,আমায় কেউ কিছুই শেখায়নি। মণিকে স্কুলে ভর্তির আগেই সব বিষয় ভালোভাবে শিখিয়ে নিয়েছিলেন কাকি। তাই দেখা যেত মণি সব পারে, আমি কিছুই পারি না। থ্রিতে যখন পড়ি, মণিকে কাকি ঘরে বসিয়ে সারাদিন পড়াতেন। মণি যখন পড়তো, আমি তখন ঘরের কাজকর্ম করতাম। রান্না করতাম। তাই আমি আর মণি কেউই বিকেলে খেলতে যেতে পারতাম না। অথচ কাকি সবার সামনে এমন ভাব করতেন যেন আমায় তিনি কত আদরই না করেন! আমায় স্কুলে পড়ান, বাড়িতেও পড়তে বসান, পড়ার চাপে আমি খেলার সময়ই পাই না। আমি পড়তাম মণির পুরনো কাপড়। মণির পুরনো ব্যাগটা নিয়ে আমি স্কুলে যেতাম।
প্রতিদিন স্কুলে যাবার আগে নাস্তা বানানো, বিছানা গোছানো, ঘর ঝাড়ু দেয়া, কাপড় ধোয়া আমাকেই করতে হতো। কাজ করতে গিয়ে যাতে স্কুলে দেরি না হয় তাই আমি অনেক সকালে উঠে কাজ শুরু করতাম। তবু আগে আগে কাজ শেষ করতে পারতাম না। তিন জনের সংসারে এত কাপড় যে কোথা থেকে আসে আমি বুঝতেই পারতাম না! প্রায় দিনই স্কুলে দেরি হয়ে যেত। পাড়াপড়শিরা ভাবতো, আমার বুঝি স্কুলে যেতে ভালোই লাগে না। তাই আমার দেরি হয়।
কাকির দেয়া কোনো কষ্টই তেমন কষ্ট মনে হতো না, যত কষ্ট মনে হতো খাবারের কষ্টটাকে। সকালে স্কুলে যাবার আগে কাকি মণিকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন, নিজেও খেয়ে নিতেন তখন। আমি ওদের খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত ঘরের কাজই করতাম। খাওয়া শেষে ময়লা প্লেট, বাটি ধুতাম। ধোয়া শেষ হতে হতে স্কুলের সময় হয়ে যেত। তখন কাকি বলতেন,”তাড়াতাড়ি যা রাহি, স্কুলে নাম ডেকে ফেলবে তো।” কাকির কথা মানে হুকুম। স্কুল ছিল দশ মিনিটের পথ। আমি ব্যাগ নিয়ে দিতাম এক দৌড়। দৌড়ে পাঁচ মিনিটে পৌঁছে যেতাম। ক্লাস শুরু সাতটা ত্রিশে। কাঁটায় কাঁটায় সাতটা ত্রিশে পৌঁছতাম। প্রথম দুই একটা ক্লাস ভালই করতে পারতাম। কিন্তু তারপর থেকে ক্ষুধায় চোখে অন্ধকার দেখতাম। টিফিন টাইমে আর থাকতে না পেরে বাড়ি চলে আসতাম। এ নিয়ে কাকির আক্ষেপের শেষ ছিল না, উনি সবাইকে বলে বেড়াতেন,”রাহিটা বড্ড অমনযোগী। স্কুলে পাঠালেও ফেরত চলে আসে।” আমি বাড়ি ফিরে করুণ গলায় বলতাম,”ও কাকি,কাকি, খিদে পেয়েছে কাকি।” কাকি বলতেন,”ভাত তো নেই রে, দাঁড়া , ভাত বসাই।” তারপর অনেকক্ষণ কেটে যেত। ক্ষুধায় আমি ঠোঁট কামড়ে ধরতাম। আর স্কুলে তো ফেরত যেতামই না। কারণ, স্কুলে গেলেও ক্ষুধায় আমি কোনোদিকেই মনোযোগ দিতে পারব না। ভাত রান্না হতো। ভাত চাওয়ার কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পর ভাত আসত আর আমি খেতে পারতাম। এ ঘটনার ব্যতিক্রম কোনোদিন হয়নি। আমাদের গ্রামের বাড়িতে ঘরটার সামনে ছিল টানা বারান্দা। একদিন আমি দশটায় স্কুল থেকে ফিরেছি। এসে বারান্দায় বসে আছি খাবারের অপেক্ষায়। আমার আজও মনে আছে, বড় দেয়াল ঘড়িতে তখন বাজে ঠিক বারোটা দশ। হঠাৎ একজন বুড়ো ভিক্ষুক এলেন। আমায় দেখে করুণ গলায় বললেন,”মাগো, সকাল থাইকা খাই নাই। চাইরটা ভাত দেন না, মা! ”
আমি ক্ষুধার চোটে প্রথমে কিছু শুনতেই পাইনি। কিন্তু কাকি ঠিকই ভিক্ষুকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে বাইরে এলেন। ব্যস্ত গলায় বললেন,”আপনি বসুন,চাচামিয়া। বসুন। খাবার আনছি, বসুন।” একটু পর কাকি ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত এনে ভিক্ষুকটির সামনে রাখলেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। একজন অচেনা মানুষ, যে আজ সকাল থেকে খায়নি, তার জন্য কাকি কতো ব্যস্ত! আর আমি? আমি তো রোজই এত করুণ গলায় ভাত চাই। কিন্তু কাকি তো সেটা গ্রাহ্যই করেন না! একটু পর কাকি এক প্লেট শুকনো ভাত আর ডাল ভর্তা এনে আমার সামনে রাখলেন। আমি ভাতে হাত দিলাম। একি? ভাত তো ঠাণ্ডা। তার মানে, ভাত ঘরে আগেই ছিল! কিন্তু আমায় সকাল থেকে উপোষ করিয়ে রেখে, এখন দু’ঘণ্টা ধরে বসিয়ে রেখে কাকি তো ভাত রান্না করছিলেন!
এক মুহূর্তের মধ্যে আমি যেন সব বুঝে ফেললাম। আসলে কাকি একেবারে দুপুরের ভাত রান্না করছিলেন মোট তিনজনের। ভিক্ষুককে দেয়ায় এক জনের খাবার কমে গেল। তাই কাকি আগের বাসি ভাত আমায় দিতে বাধ্য হয়েছেন। আর আমি যাতে স্কুলে ফিরে যেতে না পারি তাই আমায় খেতে না দিয়ে বসিয়ে রেখেছিলেন। প্রতিদিন কেন ভাত দিতে এত দেরি হয় তা সেদিন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমার চোখের ভেতর থেকে পানি ঠেলে বের হয়ে আসতে লাগলো। পড়ালেখায় এত খারাপ আমি,অংকে এত কাঁচা। তবুও সেদিন এই জটিল অংক আমি সমাধান করে ফেললাম। একই বারান্দায় বসা সকাল থেকে না খাওয়া দুজন মানুষ। ভিক্ষুক লোকটি এত তৃপ্তি করে খাচ্ছিল অথচ আমি চোখের পানি মুছে কূল পাচ্ছিলাম না!
তারপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। একদিন টিফিন টাইমে বাড়িতে এসে বসে আছি। অপেক্ষা করছি খাবারের জন্য। পাশের বাড়ির ময়না আপুর মা এসেছেন। কাকি গল্প করছেন তার সাথে। আজ তাই অন্য দিনের চেয়েও বেশি দেরি হচ্ছে । ঘড়িতে বাজছে একটা আঠারো। আমি আর থাকতে না পেরে আস্তে করে ডাকলাম,”কাকি?”
কাকি শুনতে পেয়েছেন কি না জানি না। তবে একটু পরে তিনি বের হয়ে এলেন। এক প্লেট ভাত রাখলেন আমার সামনে। আমি খেতে খেতেই দেখলাম, প্লেটে এক টুকরো মাছও আছে। আমি বুঝতে পারলাম, ময়না আপুর মাকে দেখানোর জন্য এই মাছটা দেয়া হয়েছে। মাছটা খেলে পরে কাকি মহা রাগারাগি করবে। রাগের কারণ বলবে না, কিন্তু আমার কপালে থাকবে মহা শনি। আমি তাই মাছটা স্পর্শও করলাম না। গপগপ করে ভাত খেতে লাগলাম। কাকি গর্ব করে বললেন,”রাহি তো মাছ খেতেই চায় না, বুঝলে ময়নার মা?”
কাকি ভেবেছিলেন, আশ্রিত একটা মেয়ে, মাছ-মাংস খায় না,তবু তিনি মাছ-মাংস দিতে কার্পণ্য করেন না, এজন্য একটা বাহবা পাবেন। কিন্তু ওই মহিলা কি মনে করে যেন আমার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “মেয়েটা এমন তাড়াহুড়া করে খাচ্ছে ক্যান, মণির মা? সকালে খেয়ে যায়নি? ”
এই প্রশ্ন শুনে কাকি যেন ভিরমি খেলেন। তার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। কাকির মুখ দেখেই ময়না আপুর মা বুঝে গেলেন, আমি সকালে খেয়ে যাইনি। তবু তিনি তাগাদা দিলেন,”কী হলো? বলছো না ক্যান? মেয়েটারে কি প্রতিদিনই না খাইয়ে স্কুলে পাঠাও? ”
কাকি আমতা আমতা করে বললেন,”না, মানে, স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যায় তো তাই-”
ময়না আপুর মা যেন রাগে ফেটে পরলেন, বললেন, ”তোমার নিজের মেয়েরে কি না খাইয়ে পাঠাও, মণির মা? বলো, পাঠাও?”
কাকির মুখ থেকে তখন আর কথাই সরছিল না।
ময়না আপুর মা বললেন,”ও আচ্ছা! নিজের মেয়ে স্কুলে যায় খেয়ে-দেয়ে। আর এই এতিম মেয়েটারে সকালের খাওন তুমি দাও দুপুর বেলা, তাই তো?
তুমি তো দেখতেছি মহা ধুরন্ধর, মণির মা। এতিম মেয়েটারে কষ্ট দিয়ে তোমার কি লাভটা হবে? নামাজ-রোজা তো ঠিকই করো। ক্যান করো? সওয়াব পাওয়ার আশাতেই তো করো। এই মেয়েটারে একুটু দয়া করলে সওয়াব তো কিছু কম হবে না। তা হলে মেয়েটারে অত্যাচারটা একটু কম করলেও তো পার।”
ময়না আপুর মায়ের গলাটা যেন ভারী হয়ে এলো, উনি বললেন, ”একবার কি নিজের মেয়ের চেহারাটা চোখে ভাসে না, মণির মা? তুমি যা করবা,তাই তো ফেরত পাবা। আজ তো রাহির জায়গায় তোমার মণিও থাকতে পারতো। ”
কাকির সাজানো অভিনয় যে এই ভাবে ধরা পরে যাবে, কেউ যে এভাবে তার প্রতিবাদ করবে , উনি কল্পনাও করেননি।পুরোটা সময় উনি চুপ করে রইলেন।
আমি ততক্ষণে খাওয়া শেষ করে ফেলেছি । কাকির মলিন মুখ দেখে মনে হল,এত দিন উনি আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন,আর আজ যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কাকি পরাজিত হয়েছেন।
পরদিন সকালে উঠে আমি বিছানা গুছিয়ে নাস্তা বানিয়ে ফেলেছি। কাকি মণিকে খেতে দিলেন। তারপর নিঃশব্দে আমার সামনে এক প্লেট ভাত রেখে দিয়ে চলে গেলেন। আমি বুঝলাম,যারা অসহায়কে কষ্ট দেয়, তাদের মেরুদণ্ড আসলে খুব দুর্বল,সাহস খুব কম। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের সাহস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। শুধু একবার সাত-পাঁচ না ভেবে প্রতিবাদটা করে ফেলতে হয়। আমিও প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম, আমি যদি কাউকে অন্যায় করতে দেখি, তাহলে আমিও চুপ থাকব না। কারণ, আর যাই হোক, আমিতো জানি, ক্ষুধা সহ্য করতে আমার কতো কষ্ট হতো।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

৪ Comments

  1. আরাফাত তন্ময়

    আবেগ জড়িত একটি গল্প…..
    শিক্ষাটা যেন সকলেই পায়।
    শুভ কামনা রইলো।

    Reply
    • রাদিয়া মাহবুব

      ধন্যবাদ আপনাকে।

      Reply
  2. আফরোজা আক্তার ইতি

    অসাধারণ গল্প। পড়ছিলাম,আর নিজেকে রাহির মতো কল্পনা করছিলাম। কি কষ্টেই না ছিল মেয়েটা! শেষের লাইনটুকু পড়ে আমার গায়ে কাঁটা দিল। অনেক সুন্দর হয়েছে।
    অবশেষে তার কাকি তার ভুল বুঝতে পেরেছে। এভাবে আসলে সব অন্যায়েরই প্রতিবাদ করা উচিৎ,তাহলে পৃথিবী থেকে সব অন্যায় ঘুচে যাবে।
    বানানে তেমন কোন ভুল পাই নি।

    Reply
    • রাদিয়া মাহবুব

      ধন্যবাদ আপু, আপনার মন্তব্যের জন্য।

      Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *