দুই টাকার রাজা
প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 14 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

গল্প লেখকঃ
জান্নাতুল জান্নাত
(মার্চ – ২০১৮)
…………

ঐ তো রাজা ওখানে বসে আছে তবে সিংহাসনে নয় বসে আছে পিচ ঢালা জৈষ্ঠ্যের অগ্নিঝড়া দুপুরের উত্তপ্ত পথে। আগেরকার দিনে নাকি চৈত্র মাসে বেশি গরম পড়তো তবে ঋতুটা মনে হয় এখন বদলে গিয়েছে তাই চৈত্র মাসের চেয়ে জৈষ্ঠ মাসেই বেশি গরম পড়ে৷ এখন গাড়ি চলছে তাই জিরিয়ে নিচ্ছে রাজা। সিগনাল পড়লেই ছুটে যাবে বড়লোকদের গাড়ির কাছে দু’টো টাকার জন্য।

রাজার বয়স সাত বছর৷ খুব ছোট বলে কেউ কাজে নেয় না। ঘরে অসুস্থ মা আর তিনটি ছোট বোন৷ রাজাই বড় তাই সংসারের দ্বায়িত্ব রাজার মাথায়৷ চারজনের মুখে খাবার তুলে দিতে হবে তো। ওর বাবা রিকশা চালাতো তখন বেশ ভালোই সংসার চলতো ওদের। বাবা বেশ আদর করতো রাজাকে। সাহেবদের বাচ্চাদের মতো গোলাপি গাল ছিলো রাজার। বাবা খুশি হয়ে রাজা নাম দিলো। লেখাপড়া শিখিয়ে ছেলেকে মস্ত অফিসার বানাবে। তখন ছেলেকে ঠিক রাজার মতোই দেখতে হবে। রাজার সবচেয়ে ছোট বোনটির জম্মের পর রাজা বাবাকে বলেছিলো রসগোল্লা খাবে। রাজার আব্দার ওর বাবা কখনো ফেলতো না। রাত তখন অনেক গভীর রিকশা নিয়ে বেড়িয়ে গেলো রাজার বাবা।

একটু দূরেই যেতে হয়েছিলো। বস্তি এলাকাতে তো আর ভালো মিষ্টির দোকান নেই তাই৷ যে রাস্তা দিয়ে ফিরে আসবে সে রাস্তা দিয়ে মাওয়া ফেরীর উদ্দেশ্যে বড় বড় মালবাহী ট্রাক যায়। ক্রসিংএর সময় একটা ট্রাককে আসতে দেখে বেলও বাজাচ্ছিলো হাত ইশারাও দিচ্ছিলো রাজার বাবা। কিন্তু ড্রাইভার মনে হয় নেশা করে গাড়ি চালাচ্ছিলো তাই দেখতে পায়নি। রিকশা সহ পিষে দিয়ে গেলো রাজার বাবাকে৷ মিষ্টির প্যাকেটটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়লো।

অনেকক্ষণ পেরিয়ে যেতেও যখন ওর বাবা আসছিলো না তখন রাজার মা রাজাকে বললো একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে৷ এগুতে এগুতে বড় রাস্তায় গেলো রাজা। দূরে একটা জটলা কিন্তু ওর পা আটকালো একটা মিষ্টির বাক্সে৷ বাক্সটা হাতে নিয়ে জটলা দেখতে গেলো। লাশটার দিকে আর তাকাতে পারলো না রাজা৷ ছোট মানুষ তো আৎকে উঠেছিলো দেখে কিন্তু বাবার জামাটা চিনতে পারলো। মাকে বলে বাবার জামাতে ছোট ছোট ঝুনঝুনি লাগিয়েছিলো যেমনটি মেয়েদের ওড়নায় থাকে৷ রাজার বেশ ভালো লাগতো।

জটলার কাছে গিয়ে দেখলো একটা লোক রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে
এইডা তো আমার বাজানের জামা। রিশকাডাও তো বাজানের। তয় বাজান কই?

জটলার লোকজন বুঝতে পারলো এটাই ওর বাবা। তারা রাজাকে নিয়ে আর ওর বাবাকে নিয়ে ওদের বাড়িতে আসলো। আসলে ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিলো রাজার বাবা।

স্বামীর লাশ দেখে রাজার মা অজ্ঞান হয়ে গেলো। জ্ঞান ফিরতেই রাজাকে মারতে শুরু করলো। তুই একডা রাক্ষস। তুই আমার স্বোয়ামীরে খাইছোস। তোর লাইগা মিষ্টি আনতে যাইয়্যা আমার স্বোয়ামী মরছে। খা খা। অহন তোর বাজানের হাড়গোড় চাবাইয়া খা। তোর মিষ্টি খাওনের সাধ জাগছে না? এই দেখ তোর বাজানের গায়ে ম্যালা রক্ত এইয়া খাইয়া সাধ মিটা।”

রাজা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ওর হাতে তখনও মিষ্টির প্যাকেট। প্যাকেটটা ওর হাত থেকে নিয়ে রাজাকে জোর করে সব মুখে ভিতর দিতে লাগলো।
“খা খা জনমের খাওয়া খা। আমারে খা। তোর বোইনেগো খা। সব্বাইরে খা। ও আল্লা এই রাক্ষসডারে কির লাইগ্যা আমার প্যাডে দিছিলা? শ্যাষ পর্যন্ত আমি রাক্ষস জম্ম দেলাম?”

রাজা ওর বাবাকে আর দেখতে পারেনি। সকাল বেলা পুলিশ এসে লাশ নিয়ে গেলো ময়নাতদন্তের জন্য। তারপর লাশটা আরও বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলো। ওর মা ওর সাথে কথা বলছিলো না। রাজা পরে বুঝেছে ওর বাবা আর কোনদিন আসবে না। বস্তির ভাড়া দিতে না পারায় কয়েকদিন পর ওদের বের করে দেয় বাড়িওয়ালা। তারপর থেকে রেল ষ্টেশনেই থাকে ওরা। মা অসুস্থ তাই কিছু করতে পারে না। কাগজ টোকাতে গিয়েছিলো সেখান থেকেও সবাই মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। ছোট বোনটা অনেক ছোট। এখনও দাঁত উঠেনি। তাই দুধ ছাড়া কিছুই নাকি খেতে পারে না। রাজা কিছুতেই বুঝতে পারে না যেখানে ওরা সবাই রুটি পানিতে ভিজিয়ে খায় পরী কেন পারে না? মুখের ভিতর দিলেই তো গিলে ফেলতে পারে।

পরী ওর ছোট বোনের নাম। একেবারে পরীর মতো দেখতে তাই রাজাই নাম রেখেছে পরী। পরীর জন্য আলাদা করে দুধ আনে রাজা। গরম পানি এনে দুধ গুলিয়ে পরীকে খাওয়ায়। ওর বাবা মারা গেছে প্রায় আড়াইমাস। এখনও রাজার মা রাজার সাথে কথা বলে না। রাজার খুব খারাপ লাগে। ও কি জানতো ওর বাবা সেদিন ওভাবে চলে যাবে?

রাস্তায় বসে বসে দেখছে কত লোক কত ফল নিয়ে যাচ্ছে। আম, কাঠাল, তরমুজ কত ফল। রাজারও ফল খেতে ইচ্ছে করে কিন্তু কে খাওয়াবে ওকে? আবার তরমুজের লাল লাল রস, আমের হলুদ হলুদ রস, পরীকে খাওয়াতে ইচ্ছে করে কিন্তু এসব কেনার টাকা নেই ওর।

ঐ তো সবুজ বাতি জ্বলে উঠলো। রাজা দৌঁড়ে গেলো কিন্তু গাড়িগুলোর কাচ তোলা। রাজা এতো ডাকছে কিন্তু কেউ খুলেনা। একজন মহিলা কাচ খুলে রাজাকে ডাকলো। রাজা ছুটে গেলো
আম্মাজান দুইডা টাকা দ্যান। মা বইন লইয়্যা খামু।
ভিক্ষে করছিস কেন? তোর বাবা কোথায়?
বাজানরে গাড়ি চাপা দিছে। বইনের লাইগা দুধ কিনুম দুইডা টাকা দ্যান
দুই টাকায় দুধ হবে?
না
তাহলে?
আরও মাইনষের থাইকা নিমু।
তোর বোনের বয়স কত?
বয়স কইতারি না। এই টুকু। ওয়া ওয়া কইরা কান্দে। ওর দাঁত উডে নাই। আমাগো মতো রুডি খাইতারে না।

মহিলাটি রাজার কথা হেসে দিলো। ব্যাগে হাত দিলো। একশো টাকার একটা নোট বের করে রাজার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
এটা রাখ।
ওম্মা৷ এইডা কত টাহা?
১০০। কাল এখানে থাকবি তুই? সিগনাল এখনই ছেড়ে দিবে। তাড়াতাড়ি বল।
হ থাকুম তো। এতো টাহা দেছেন ক্যা? ভাংতি নাই।
ভাংতি লাগবে না। এটা তোর বোনের জন্য। আমি কাল আসবো তোর বোনকে দেখতে।
আইচ্ছা।
নাম কি তোর বোনের?
পরী।
বাহ্ সুন্দর নাম।
এর মধ্যে সবুজ বাতি জ্বলে উঠলো। গাড়ি সামনে চলে গেলো।

রাজার মুখে হাসি ফুটে উঠলো অনেক টাকা পেয়েছে। তবুও আরো ভিক্ষে করলো। সারাদিন ভিক্ষে করে সব মিলিয়ে ১৯২ টাকা হলো। রাজা আজ অনেক খুশি। দুইটা আম কিনলো। অর্ধেক তরমুজ কিনলো। আজ আম আর তরমুজ চটকে পরীকে রস খাওয়াবে। সবার জন্য ভাত আর তরকারি নিয়ে গেলো।

স্টেশনে গিয়েই মাকে ডাকলো।
মা মা আইজ পরীরে আম আর তরমুজ খাওয়ামু।
বলেই প্রথমে একটা বাটিতে একটু তরমুজ নিয়ে ভালোভাবে চটকে রস বের করলো। তারপর নিজে কোলে নিয়ে বেশ খাইয়ে দিলো।

ও মা পরী এতো হাত পা ছোড়ে ক্যা? খাওয়াইতে কষ্ট হইতাছে।

ওর মা নির্লিপ্ত বসে আছে। স্বামীর মৃত্যুর জন্য সে রাজাকেই দায়ী করে। রাজা বুঝে কিন্তু কিছু বলে না। রাজা এ কয় দিনে অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেককিছু বোঝে ও। সবাইকে নিইয়ে আজ তৃপ্তিসহকারে খেলো ওরা। রাজার মাথায় একবারও আসলো না মহিলাটি কেন আসতে চাইলো।

পরেরদিন রাজা সেই সিগন্যালে আবার দাঁড়ালো। দুপুরবেলা সেই মহিলাটি আসলো। রাজাকে গাড়িতে নিয়ে মহিলাটি স্টেশনে গেলো। পরীকে দেখে মহিলাটির মুখে হাসি ফুটে উঠলো। রাজার মায়ের কাছে গিয়ে মহিলাটি জানালো তার কোন সন্তান নেই বলে পরীকে দত্তক নিতে চাইছে। ১০,০০০ টাকাও দিতে চাইছে। রাজার মা নির্লিপ্ত বসে আছে। কিছুক্ষণ পর রাজাকে কাজে যেতে বললো ওর মা।

রাজা চলে যেতে ওর মা মহিলাটিকে বললো
আপনে টাহা দেবেন? মাইয়্যাডারে লইয়্যা যাইবেন?
হ্যাঁ৷ আপনার মেয়ে ভালো ভালো জামা পড়বে, ভালো ভালো খেলনা পাবে, লেখাপড়া শিখতে পারবে। দিয়ে দিন প্লিজ
টাহা লগে আনছেন?
হ্যাঁ।
ব্যাগ থেকে টাকা বের করে বললো
এই নিন।

রাজার মা টাকাটা হাতে নিয়ে বললো
পরীরে লইয়্যা যান। অর নাম কি রাখবেন?
ওর জন্য পরী নামটাই ঠিক আছে। ঠিক পরীর মতো দেখতে। রাজাকে সরিয়ে দিলেন কেন?
রাজা থাকলে পরীরে নেতে দেবে না। পরীরে ও ম্যালা ভালা পায়। আম্নে যান।
রাজার অন্য দু’টি বোন খেলছিলো। পরীকে নিয়ে যাবার সময় ওরাও দেখতে পায়নি।

কিছুক্ষণ পর রাজা পরীর জন্য দুধ নিয়ে আসলো কিন্তু পরীকে পেলো না। খুব কান্নাকাটি করলো পরীর জন্য। ওর মা বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া করে ওদের নিয়ে গেলো। সারাদিন মাকে গালিগালাজ করে পরীর জন্য। পরে একদিন ওর মা বললো ঐ মহিলাটি পরীকে নিয়ে গেছে। তারপর থেকে রাজা প্রতিদিন ঐ জায়গায় বসে থাকে পরীর জন্য। একদিন ঐ মহিলার গাড়ি দেখতে পেলো। কাছে গিয়ে ঐ মহিলার কোলে পরীকে দেখতে পেলো। ওখানে একটা মার্কেট ছিলো। গাড়ি পার্ক করে পরীকে নিয়ে মার্কেটে প্রবেশ করলো মহিলাটি। ট্রলিতে পরীকে রেখে মহিলাটি কিছু কিনছিলো।

রাজা সুযোগ পেয়ে পরীকে ওখান থেকে তুলে নিয়ে দৌড়ে পালালো। লোকজন চিৎকার করে উঠলো। রাজাকে তাড়া করছে। রাজাও রাস্তা পার হওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছে এমন সময় সবুজ বাতি জ্বলে উঠলো চোখের নিমিষে একটা গাড়ি ধাক্কা মারলো রাজাকে পরী ছুটে গেলো হাত থেকে। ছোট্ট পরীর মতো মেয়েটি পিচ ঢালা রাস্তায় উপুড় হয়ে পড়ে রইলো। হয়তো রক্তও বেড়িয়েছে। ছোট্ট পরী হয়তো সত্যিই পরী হয়ে আকাশে উড়ছে। পরী পরী করতে করতে জ্ঞান হারালো রাজা। সে জ্ঞান আর ফিরে আসলো না।

সম্পর্কিত পোস্ট

অঘোষিত মায়া

অঘোষিত মায়া

বইয়ের প্রিভিউ ,, বই : অঘোষিত মায়া লেখক :মাহবুবা শাওলীন স্বপ্নিল . ১.প্রিয়জনের মায়ায় আটকানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। ২.মানুষ কখনো প্রয়োজনীয় কথা অন্যদের জানাতে ভুল করে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষ না জানাতে চাইলেও কীভাবে যেন কেউ না কেউ জেনে যায়। ৩. জগতে দুই ধরণের মানুষ...

আমার জামি

আমার জামি

জান্নাতুল না'ঈমা জীবনের খাতায় রোজ রোজ হাজারো গল্প জমা হয়। কিছু গল্প ব্যর্থতার,কিছু গল্প সফলতার। কিছু আনন্দের,কিছু বা হতাশার। গল্প যেমনই হোক,আমরা ইরেজার দিয়ে সেটা মুছে ফেলতে পারি না। চলার পথে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। অতীতটা মুহূর্তেই জোনাই পরীর ডানার মতো জ্বলজ্বলিয়ে নাচতে...

ভাইয়া

ভাইয়া

ভাইয়া! আবেগের এক সিক্ত ছোঁয়া, ভালবাসার এক উদ্দীপনা, ভাইয়া! ভুলের মাঝে ভুল কে খোঁজা, আর ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোঁজা, দুটোই এক কথা! ভুল তো ভুল ই তার মাঝে ভুল কে খোঁজা যেমন মূর্খতা বা বোকামি। ঠিক তেমনি ভালবাসার মাঝে ভাইকে খোজাও মূর্খতা! আমার কাছে ভাইয়া শব্দটাই ভালবাসার...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *