দহন
প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০১৮
লেখকঃ

 382 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ

Taslima Amrin

স্কুল থেকে ফেরার পর আমার ভাইয়ের মেয়ে
ঝিলি ফুপি বলে দৌঁড়ে আমার কুলে এসে
উঠে পড়ে।তারপর আলতো করে একটা চুমু একে
দেয় আমার কপালে। প্রতিদিনের মতো আজও
সেই একই কাজ করল।মেয়েটা যেন কোনভাবে
আমায় মায়ায় জড়িয়ে ফেলছে আমি তা
কখনো বুঝিনি।
আজ ওর একটা বায়না আছে আমি যেন ওকে
শপিং করতে নিয়ে যাই।আর একটা টেডি
কিনে দেই। তার সাথে একটা মেকাপ বক্স।
চার বছরের মেয়ে এত সাজুগুজু করতে পছন্দ
করে।তা ওরে না দেখলে বুঝা যায় যাবে না।
আমার ভাবি বললেন যা না হিমি আমার
মেয়েটা কে নিয়ে।সারাদিন তো স্কুলে
থাকিস একটু ঘুরে আয় দেখবি ভাল লাগছে।
দুপুরে খেয়ে ওকে নিয়ে বের হলাম। আমার
নিজের বলতে বাবা,মা আর এই ভাইয়ের
সংসার ছাড়া আর কিছু নেই। ঝিলির দিকে
তাকালে মনে হয় আজ আমার সংসারটা টিকে
থাকলে ঝিলির মত একটা মেয়ে থাকতো
কিন্তু সবই বিধাতার লিখন আমার মতো কপাল
পুড়া মেয়ের কি এত সুখ কপালে আছে?
বিয়ের তিন বছরের মধ্যে আমার বিয়েটা
ভেঙে যায়। কারণ আমি আনসম্মার্ট, গেঁয়ো
আর কালো একটা মেয়ে এত বড় লোক শ্বশুর
বাড়িতে আমাকে মানায় না। তারপরও আমি
মানিয়ে নিয়েছিলাম তিনটে বছর। আমার
বিয়েটা পরিবারের পছন্দ মতো হয়েছিল।
আমার শ্বশুর আমাকে তার ছেলের জন্য পছন্দ
করে নিয়ে এসেছিলেন।কিন্তুু আমার
শ্বাশুড়ি আর বাকি লোকের আমার পছন্দ
হয়নি।কারণ আমি দেখতে কালো বলে,আমার
বর ছিল সুন্দর হেন্ডসাম একটা ছেলে। আর
আমার বর তাকে আমি ঠিক বুঝে উঠতে
পারতাম না।আসলে সে কি চায়? সে কোন
প্রতিবাদ করত না আমার এত অপমান দেখে।
রোজ আমার চলাফেরা আচার আচরণ নিয়ে
প্রশ্ন উঠত তারপর আমার গায়ের রঙ নিয়ে তো
কথা আছে।আমি নাকি তাদের ভাইয়ের বউ
হবার যোগ্য নই শুধু তাদের বাবার কথা
রাখতে গিয়ে এ বিয়ে দেয়া হয়েছে। আমার
মতো মধ্যবিত্ত মেয়ের এরকম সংসার, বর
মানায় না।রোজ কটু কথা শুনতে হতো।
ধীরে ধীরে সবার অপছন্দের পাত্রী হয়ে
উঠলাম আমি। এমনকি আমার স্বামীর কাছে।
আমার শ্বশুরও মারা গেলেন এদিকে আমারও
কোন বাচ্চা কাচ্চা হয়নি তাই নতুন একটা
সমস্যায় পড়লাম। সবাই বলতে লাগল আমার
কোন বাচ্চা হবে না।আমার স্বামী মুনীর, ওর
মা আর বোনদের কথা মতো চলতো ওরা যা
বলতো তাই করতো একপর্যায়ে আমার বর
আবার বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে আসে
চোখের সামনে নিজের স্বামী অন্যের হতে
দেখেছি।এত ক্ষত নিয়ে কি বাঁচা যায়?
তারপরও বেঁচে ছিলাম আমার বাবা মার
জন্য,কারণ আমি তাদের একমাত্র মেয়ে।
আমার কিছু হলে তারা বাঁচবে না।
আমি নিজে থেকে বাপের বাড়ি চলে আসি।
কাউকে কিছু না জানিয়ে আমার স্বামীও
আমার কোন খোঁজ নেয় নি।
যে ছেলে আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত চলত না।
আজ সে অন্য কারোর সাথে সংসার করছে
ভালই।
নিজের জীবনের ছেয়ে অনেক বেশি
ভালোবাসতাম ওকে কিন্তু ও আমাকে
কোনদিন বুঝে নি।
বিনিময়ে ওর কাছ থেকে কষ্ট আর অবহেলা
ছাড়া কিছু পাইনি।এ কটা বছর ওকে যত্ন করে
আগলে নিয়েছিলাম।
আমার বুকের ভেতরটা দহনে পুড়ে ছারখার
হয়ে গেছে।কিভাবে পারল এত সহজে অন্য
একটা মেয়ে কে বিয়ে করতে।
এসব পুরনো কথা মনে করে আর কি হবে।ও
সুখে থাকুক। আমি ওকে কতটা ভালোবাসি
ওকে মিস করি সেটা আমার মনেই থাকুক।এসব
ভেবে তো কিছু পর্রিবর্তন হবে না।
ঝিলিকে নিয়ে শপিং করা শেষ হঠাৎ
মেয়েটা অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলতে শুরু
করল।
টাকাটা দিয়ে ওকে আনতে গেলাম।
হঠাৎ দেখলাম মুনীর তার সাথে একটা সুন্দরী
মহিলা সাথে একটা বাচ্চা ছেলে ঝিলির
টেডিটা নিয়ে খেলছে।
আমি ঝিলিকে আনতে গেলাম।
মুনীর :কিছু মনে করবেন না আমার ছেলেটা
আপনার মেয়ের টেডিটা নিয়ে খেলছিল।
আমি:না আমি কি মনে করব বাচ্চা তো
খেলুক।
কত সুখে আছো তুমি মুনীর নতুন সংসার বউ
ছেলে নিয়ে।
আজ বোরকা পড়া অবস্থায় নেকাবের
আঁড়ালে থাকা তোমার হিমি কে চিনতে
পারছ না।কত বদলে গেছ তুমি।আর আমি
এখনো তোমায় ভুলতে পারিনি।তোমার প্রতি
আমার ভালোবাসাটা সেই আগের মত আছে।
আচ্ছা এখনো কি মনে পড়ে আমায় আনমনে?
তোমার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো?
যে তুমি বাজারের ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসতে
না সেই তুমি আজ এত এত শপিং এর ব্যাগ
নিয়ে হাতে ঘুরছো।আর করবেই না কেন
তোমার তো মনের মতো সুন্দরী বউ আছে।
আমার মত আনস্মার্ট নয় সে।
আমাকে এত সহজে ভুলে গেলে তোমার প্রথম
স্ত্রী তোমার হিমি কে?
অনেক সুখে থাকো তুমি তোমার মা নিশ্চই
এখন খুশি এমন বউ পেয়ে।
আমি আর তোমাকে নিয়ে ভাববো না।এবার
সময় এসেছে নিজেকে সময় দেয়ার নিজেরটা
ভাবার।অনেক ভেবেছি তোমাকে নিয়ে
প্রতিদানে কষ্ট ছাড়া কিছুই পাইনি
অনেক দহনে পুড়েছি আর না এবার নিজেকে
সামলে নিব।এবার আমি নিজে সংসারী
হবো।বাবাকে বলে দিব তোমার পছন্দ করা
ছেলে কে বিয়ে করব।চেষ্টা করব পরিবারের
কথা ভাবতে।
ঝিলিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম আসার
সময় মুনীরের ছেলে টাকে একটু আদর করে
আসলাম। একদম ওর বাবার মতো
হয়েছে,ছেলেটাকে দেখে কেন জানি মনে
হলো ও আমার ছেলে হতে পারত।
আজ আমি আমার জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছি
বলে তুমি এত সুখে আছো। আমি যদি কোন
আইনি লড়াই লড়তাম তাহলে এত সুখে থাকতে
পারতে না।তুমি অনেক স্বার্থপর একটা ছেলে
বরাবর নিজের ভালোটা বুঝে গেছো।কিন্তু
আমি এতটা স্বার্থপর নই, আমি চাই তুমি সুখে
থাকো।
তুমি চিরকাল সুখে থাকো সৃষ্টিকর্তার নিকট
সেই দোয়া করি।
আমি মিচেমিছি তোমার জন্য ভেবে চলেছি
অথচ সেই তুমি দিব্বি আছো।একবার খোঁজ
নেওনি আমি কেমন আছি? নাকি মরে গেছি।
তোমাকে ভালোবাসার প্রতিদান এভাবে
পাবো ভাবিনি। এখনো আমাদের ডিভোর্স
হয়নি।এবার সময় হয়েছে ডিভোর্স দেয়ার।
আমিও নিজেকে গুছিয়ে নিবো।কেউ যদি
আমাকে ছাড়া সুখী থাকে তাহলে আমি কেন
পারব না।
কারো জন্য আমি কেন অযথা অপেক্ষা করব।
পুরনো ক্ষতের দহনে অনেক পুড়েছি কিন্তু আর
না।
এবার আমিও দেখিয়ে দিব আমিও আমার
বাবা মায়ের কথা মত চলতে। এবার নিজেকে
সময় দিবো।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

১ Comment

  1. Rajwanul Haque

    একজন নারী অনেকভাবেই অবহেলিত হয়। গায়ের রং ফর্সা না হলে তার অবহেলার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। সমাজে এখন অনেক নারীই এভাবেই অবহেলিত ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। লেখার ধরন ভালো ছিল। তবে আরও একটু ভালো করতে হবে।
    হেন্ডসাম — হ্যান্ডসাম
    — নি সবসময় শব্দের সাথে যুক্ত হয়।
    — বিরাম চিহ্নের পর স্পেস দিতে হবে।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *