দ্বিতীয় জীবন
প্রকাশিত: মে ১১, ২০১৮
লেখকঃ vickycherry05

 129 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ vickycherry05

লেখকঃ
Shopno Balika
(মে – ২০১৮)

বিয়ের দু’দিন পর সব ক’টা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখলাম। পুরো বাড়িটাই বেশ সাজানো গোছানো। আবিরও খুব টিপটপ মানুষ। আমি অবশ্য টিপটপ মানুষই পছন্দ করি। দেখলাম একটা ঘর একটু বেশী সুন্দর করেই সাজানো গোছানো। দেয়ালে একটা মেয়ের বেশ কয়েকটা ছবি টাঙানো আছে। এর মধ্যে দুটো ছবিতে মেয়েটার পাশে আবিরও আছে। তবে বেশীর ভাগ ছবিতে মেয়েটা একাই আছে। বুঝলাম এটা আবিরের প্রথম স্ত্রী তানিয়া। মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দরী, এক হারা ফিটনেস, বেশ ফর্সা গায়ের রঙ। আবিরের মেয়েটার ফেসটা ঠিক ওর মায়ের মত। শুধু ওর কোঁকড়ানো চুলগুলো তার বাবার মত হয়েছে। বাচ্চাটার নাম টুসি। নামটাও রেখেছে দারুণ। জানিনা বাচ্চাটির নাম কে রেখেছে।

হঠাৎ বাচ্চাটি আমার সামনে এসে বললো,
– আন্টি তুমি আমার কে হও?
– আমি ওর কথা শুনে হেসে ফেললাম।
– আমি তোমার মামনি হই। টুসী হেসে উঠে দেয়ালের ছবিটাকে হাত দিয়ে ঈশারা করে বললো,
– তুমি কিচ্ছু জানো না, মামনি তো ঐ টা।

আমি এরপর কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। আমি ওর ছোট মা অর্থাৎ স্টেপ মাদার, এটা ভাবতেই নিজেকে ছোট মনে হচ্ছিল। আমি ওর ছোটমা হয়ে থাকতে চাইনা। আমি ওর শুধু মা হতে চাই। তাই ওকে বললাম,
ওটা তোমার মামনি কিন্তু আমি তোমার মা। মেয়েটার চোখ মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, সে আমাকে জড়িয়ে ধরে ‘মা’ বলে ডেকে উঠলো। এই টুকু বাচ্চাকে কি করে বুঝাই যে ওর মা হতেই আমি এখানে এসেছি! আমার যে বহু বছর আগেই মা হবার বয়স হয়েছে! পেছন দিকে ঘুরে তাকাতেই দেখলাম পর্দার আড়ালে আবির দাড়িয়ে। সে হয়ত আমাদের কথা গুলোই শুনছিল। আমি তার মেয়েকে কতটা মেনে নিতে পেরেছি তা পর্যবেক্ষণ সে করতেই পারে।

আমি তার সামনে গিয়ে বললাম,
– আচ্ছা তানিয়ার এত্তোগুলো ছবির মধ্যে মাত্র দুইটা ছবিতে ওর পাশে আপনাকে দেখছি, কেনো?
– তানিয়ার পাশে আমাকে মানায় না তাই আমি নিজেই ওর সাথে ছবি উঠতাম না, আর সে একা ছবি উঠতেই পছন্দ করতো।”– ভালবাসার মানুষ বুঝি কখনো কুৎসিত হয়? -আমার কথা শুনে সে চুপ হয়ে গেলো। আমি প্রসঙ্গ চেইঞ্জ করে বল্নজ্ঞ,
– দু’দিন হয়ে গেলো অথচ আপনি একবারও আমাকে ‘তুমি’ করে বলতে বললেন না, আপনার কি ‘আপনি’ ডাক শুনতে খুব ভালো লাগে?
-তোমার ইচ্ছে হলে ‘তুমি’ বলতে পারো।
-সে তো আমি বলবোই। আপনি চান বা না চান…… সে আর কিছু না বলে চলে গেলো। আবির অফিস থেকে ফিরেই সরাসরি তানিয়ার ঘরে যায়। কর্তব্যের খাতিরে রাতে ঘুমানোর সময় ছাড়া আমার রুমে সে খুব একটা আসে না। আমাদের মধ্যে কর্তব্যের খাতিরে দাম্পত্য সম্পর্ক হয়েছে ঠিক কিন্তু মনের সম্পর্কটা যেনো কিছুতেই গড়ে উঠছে না। এক মাস কেটে গেলো তবুও যেনো আমি ঐ মানুষটার মনের নাগাল পাচ্ছিলাম না। কি এক রসকষ বিহীন মানুষ একটা! প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও আমার সাথে বলে না। কথা না বলে থাকে কি করে তা আল্লাহই জানেন। কাজের মেয়ে ছিল দুইটা। এক জন রান্নাসহ সব কাজ করে আর এক জন টুসির দেখা শুনা করে। এই চার বেডরুমের বাড়িতে আমি ছিলাম বেকার। আবিরের কাপড় ধোয়া, ঘন্টায় ঘন্টায় চা করে দেয়া সব কিছুই কাজের মেয়েকে বলে। আমি অবশ্য মাঝে মাঝে চা করে দিই। আমাকে সে ভালবাসুক বা না বাসুক আমি আবিরকে ভালবেসে ফেলে ছিলাম। তাই চাইনী যে তার কাজ গুলো কোনো কাজের লোক করে দিক। দুটো কাজের মেয়েকেই বাদ দিয়ে দিলাম। কারণ প্রয়োজনে যেনো আমার সাথে তার কথা বলতে হয়। আবির এখন বাধ্য তার দরকারী কাজের জন্য আমার সাথে কথা বলতে। ছয় মাসের মধ্যে বাড়ির পরিবেশটা একটু বদলে গেল; টুসি, যে মেয়েটা বাবার গলা জড়িয়ে ঘুমাত সে এখন আমার গলা জড়িয়ে ঘুমায়। অবসর সময়টাতে আমি টুসিকে বিনোদন দেয়ার চেষ্টা করি। ওকে কার্টুন এঁকে দিই, ওর সাথে ছাদে গিয়ে পুতুল খেলি। সব মিলে টুসির চোখে আমি একটা প্রিয় মানুষ হয়ে গেলাম। কিন্তু আবিরের কাছে কি হতে পেরে ছিলাম? ওর কাছে প্রিয় মানুষ হওয়া সহজ কোনো বিষয় ছিল না। ওর কাঠের তৈরী মনের ঘরে ঢোকার জন্য আমাকে কাঠমিস্ত্রী বা কাঠ ঠোকরা হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মানুষ কি কখনো কাঠ ঠোকরা হতে পারে? কি অদ্ভুত তাই না? ছয় মাস ধরে পাশাপাশি আছি কলিগ বা রুমমেটের মত। প্রয়োজনের বাহিরে একটাও মনের কথা নেই। আমার কাঠ ঠোকরা অভিযান চলছিল আর এখানেই আমার রান্নাগুলো কাজে লাগালাম। আমি আবিরের পছন্দের খাবার প্রতিদিন রান্না করতাম। আর নিজের পছন্দগুলো বদলে আবিরের পছন্দগুলোকে নিজের পছন্দ করে নিলাম। আবিরের বাহিরের খাবার খাওয়ার সব অভ্যেস বাদ হয়ে গেলো। আমি বুঝতাম যে সে আমার রান্না খেতে খুব ভালোবাসে। আমি সব সময় ওর খুব খেয়াল রাখি। টুসি ছিল আবিরের প্রাণ ভোমরা। সে টুসির জন্য সব কিছু করতে পারে। সবার মনে রাখা প্রয়োজন এটা- ভালোবাসার মানুষের ভাললাগা এবং ভালোবাসা গুলোকেও ভালোবাসতে হয়। যাকে ভালবাসবো তার দোষ গুন সব কিছুকেই ভালোবাসতে হবে। না হলে সেটাকে ভালোবাসা বলা যাবে না। আমি টুসিকে আমার সন্তানের মতই ভালোবাসি। ছয় মাসে মেয়েটাকে সত্যিই খুব ভালোবেসে ফেললাম। টুসিটা যেনো আমার এক পৃথিবী হয়ে গেলো। আর আবির? আবির সেই পৃথিবীর কি যে হবে বলতে পারছি না! এক দিন ওকে জিজ্ঞেস করলাম,
– আচ্ছা আমাকে কি তোমার কিচ্ছু বলতে ইচ্ছে করে না? এত চুপ থাকো কি করে?
– আসলে কি বলবো সেটা বুঝি না।
রাগে আমিও চুপ হয়ে গেলাম। মনে মনে আমার লেখা কবিতার কয়েকটা লাইন মনে পড়লো-
প্রেমের রাজ্যে এক’লা রানী
দিবা নিশি পায় সাজাসেই
রাজ্যে প্রেমে উদাস তুমি এক দুখী প্রজা।

আবিরের জামা কাপড় তানিয়ার আলমারীতেই রাখতো। আমিই তার জামা কাপড় ধুয়ে ইস্ত্রী করে গুছিয়ে তানিয়ার আলমারীতে রাখতাম। কিন্তু আমার কাঠ ঠোকরা অভিযানের কারণে ওর জামা কাপড় আমার আলমারীতেই রাখা শুরু করলাম। এতে আবিরের একটু অসুবিধা হলো, সারাক্ষণ আমার ঘরে যাওয়া-আসা সহ আমার কাপড়ের ভীড়ে সে নিজের কাপড় খুঁজেই পেতো না। তাই বাধ্য হয়ে তাকে বলতে হতো—“সানু আমার গ্রীন শার্ট টা খুঁজে পাচ্ছি না, সানু আমার রুমাল কোথায় রেখেছো? সানু ওয়ালেট পাচ্ছি না। সানু পেন আর ঘড়িটাও কি আলমারীতেই লুকিয়ে রেখেছো নাকি? সানু……সানু….এই সানু…”
আহা! শুনতে কি ভালো লাগে…..

আমার কাঠ ঠোকরা অভিযানের একটু একটু ফলাফল পাওয়া শুরু হয়েই গেলো।
আমার কাঠ ঠোকরা অভিযানে আমি বেশ সচল ছিলাম। আবির কিন্তু বোকা সোকা মানুষ ছিল না, খুব Intelligent man সে। আমার কাঠ ঠোকরা অভিযান সে যে বুঝতে পারতো না, তা কিন্তু নয়। সে বুঝুক, আমার জীবনকে সুখী করার দায়িত্ব শুধুই আমার। তাই নিজেকে সুখী জীবন দানে যা কিছু করা প্রয়োজন তার সবটাই করা আমার কর্ত্বব্য বলে আমি মনে করি। আমাদের দাম্পত্য জীবনটা এক বছরের কাছাকাছি চলে এসেছে কিন্তু আমি ঐ মানুষটার প্রেমের গন্ধেই মগ্ন সারাক্ষণ। আর সে দায়িত্ব আর কর্ত্বব্যের বাহিরে কোথাও নেই। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহতেই মোটা অঙ্কের টাকা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে বলে–“হাত খরচা দিলাম” যদিও আমার সেই টাকা গুলো কখনো নিজের কাজে লাগে না। আজব মানুষ একটা! কি করবো আমি, ওর মত সৎ, দয়ালু, ভালো মনের মানুষের প্রেমে না পড়ে কোথায় যাবো আমি? কিন্তু আমাকে কি একটুও ভালোবাসা যায় না? সত্যিই কি ওর মনের সব জায়গা টুকু তানিয়ার দখলে? একটা মৃত মানুষের কাছে আমি বার বার হেরে যাবো? প্রায় এক বছরেও ওর তানিয়ার ভাবনা শেষ হলো না। আমি অবশ্য চাই নি যে তানিয়া নিঃচিহ্ন হয়ে যাক। আবিরের ভালোবাসা বেঁচে থাক ওর মনে। আমি রোজ তানিয়ার ঘরে গিয়ে ওর ঘরটা পরিষ্কার করি। কিন্তু নিজেকে অসহায় মনে হয়। আবিরের মনে আমার কোনো অস্তিত্বের চিহ্ন টুকুও খুঁজে পাইনি। টুসির খালামণি কয়েক দিনের জন্য টুসিকে ওদের বাসায় নিয়ে গেলো। সারাটা বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। আমার ইচ্ছে ছিল না যে, টুসি যাক কিন্তু আবিরের কথা ওর নানুর বাসার সবার অধিকার আছে কয়েক দিন টুসিকে ওদের কাছে রাখার।
আমার শরীরটাও ঠিক যাচ্ছিল না। আবির বললো ওর এক বন্ধু ডাক্তার। তাই তাকে ফোন করে দিলো। আমি একাই সেখানে গেলাম। আবির আমার সাথে গেলো না। সে কি পারতো না আমার সাথে যেতে? অফিস শেষ করে বা ছুটির দিনে তো নিয়ে যেতে পারতো! মানুষের যতো ছোট খাটোই অসুখ হোক না কেনো, মানুষ যখন নিজেকে অসুস্থ বোধ করে তখন মনে মনে একটা ভাবনা আসে যে, মনে হয় আমি আর বাঁচবো না। সেই মুহূর্তটাতে মানুষ কাছের মানুষের সহানুভূতি আশা করে। আমি তো মানুষের বাইরের কেউ নই! যাই হোক, ডাক্তার আমাকে কোনোই ঔষধ লিখে না দিয়ে শুধু কয়েকটা টেস্ট করতে দিলেন এবং বললেন- “ভাবী আপনি বাসায় যান আমি রিপোর্ট আসলে বাসায় পাঠিয়ে দেবো”। আমি বাসায় চলে এলাম, শরীর আর মন দুটোই অসুস্থ আর টুসিও নেই তাই ভাবলাম কয়েক দিন মায়ের কাছে থেকে আসি। আবিরের খেয়াল রাখার জন্য তো বাবার বাসায় খুব একটা যেতাম না। আবিরকে রাতে বললাম যে, আগামী কাল সকালে আমি বাবার বাসায় যেতে চাই। আবির ল্যাপটপে কাজ করছিল, আমার কথা শুনে ল্যাপটপে মুখ গুজে থেকেই বললো-“যেতে ইচ্ছে করতেছে তো যাবা! আমি কি বলবো?” পর দিন শুক্রবার ছিল, আবির পারতো আমাকে রেখে আসতে তবুও সে গেলো না। আমার এতটা শরীর খারাপ তবুও সে আমাকে একা ছাড়তে পারলো! সত্যিই নিজেকে খুব তুচ্ছ আর নগন্য মনে হলো। পৃথিবীতে কারো কাছেই বোধ হয় আমার কিঞ্চিত মূল্যও নেই। যাকে বিয়ে করে ভালবেসে চলেছি তার কাছে আমি তুচ্ছ। আমার ভালবাসা হয়ত মূল্য নেই তার কাছে। আজ সত্যিই নিজের কাছে নিজের এই হেরে যাওয়া মুখটা আর দেখতেই ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে আয়নার সামনে গিয়ে যদি দাড়াই তবে আয়না আমাকে দেখে হাসবে আর বলবে-“সানু তোর লজ্জা করে না?” বাবার বাসায় আসার চার দিন হয়ে গেছে তবুও আবির একবারও আমাকে ফোন করেনি। বার বার ফোন দেখি, মেসেজ চেক করে দেখি কিন্তু কিছুই পাই না। এবার ওকে দয়ালু নয় নিষ্ঠুর নির্মম আর হৃদয়হীন মনে হচ্ছে। আরো একটা রাত এলো কিন্তু আবিরের ফোন এলো না। সন্ধ্যে থেকেই আকাশটা গুম ধরে আছে। বৈশাখ মাস ঝড় হবে মনে হয়। রাত দশটা থেকে প্রচন্ড ঝড় বজ্রপাত তারপর প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হলো। মনে হচ্ছে বৃষ্টি আজ শহরকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বেশ শীত শীত লাগছিল তাই একটা চাদর গায়ে দিয়ে পেছনের বেলকোনিতে গিয়ে দাড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। বৃষ্টির ঐ ভেসে যাওয়া জলগুলোর মত নিজেকে খুব নগন্য মনে হচ্ছিল। আরো অনেক কিছুই ভাবছিলাম। হঠাৎ মা দরজা নক করে সানু সানু বলে চিৎকার করছে। আমি দরজা খুলতেই দেখি আবির দাড়িয়ে। কাকের মত ভিজে গেছে বেচারা।

আমি বিস্মিত হয়ে হতভম্বের মত ওর দিকে তাকিয়ে আছি। তারপর চেতনা ফিরতেই ওকে বললাম,
– ভেতরে এসো, আর এই ঝড় বৃষ্টির রাতে এভাবে ভিজতে ভিজতে কেনো এসেছো? তারপর টাওয়েলটা এগিয়ে দিলাম।
সে মাথা মুছতে মুছতে বললো, না এসে কি উপায় বলো? চার দিন ধরে এই একটা শার্ট আর প্যান্ট পরে আছি, তুমি কি ভুল করে তোমার ব্যাগে আমার সব শার্ট প্যান্ট গুলো নিয়ে এসেছো নাকি?
– তোমার জামা কাপড় আমি এখানে কেনো আনবো?
– পুরো আলমারী তল্লাসী করে এটাও শার্ট প্যান্ট পাইনি। রোজ একটা শার্ট পরে অফিস করতে কত লজ্জা লেগেছে জানো?
– আমি তো তোমার সব কাপড় তানিয়ার আলমারীতেই রেখে এসেছি।
– কেনো?
– তুমি চাও তাই।
– এই চার দিনে আমি একবারও তানিয়ার ঘরে যাই নি।
আবিরের কথা শুনে আমি সত্যিই খুব অবাক হলাম। আমি এটা নিয়ে তাকে আর কোনো প্রশ্ন করি নি। ওর মনের গুপ্ত কথার সিন্ধুক আমি খুলতে চাই না।
আমি বললাম,
– ও… জামা কাপড় খুঁজে পাচ্ছো না তাই এই আগমন? তো একটা ফোন করলেই তো পারতে!
– আরে সে কারণে আসি নি।
– তাহলে?
– রেস্টুরেন্টের রাঁধুনীরা যে আজ কাল কি বাজে রান্না করে তা তুমি ভাবতেও পারবে না।
আমি দেখলাম আবিরের হাত ব্যান্ডেজ করা। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে?
– আরে ডিম পোচ করতে গিয়ে তেল ছিটে পড়ে ফোঁসকা পড়ে গেছে তাই ব্যান্ডেজ করেছি।
– তাহলে খাবার অসুবিধার জন্য এসেছো?
– আরে সে জন্যও না।
– তাহলে কেনো?
– জান সারা বাড়ি চিরুণী তল্লাসী করেও তোমার একটাও ছবি পেলাম না। কি বেরসিক মেয়ে তুমি হ্যাঁ? ছবি উঠাও না!
– তো ছবি নিতে এসেছো?
– আরে সে জন্য নয়।
– তো কি জন্য?
– ছাদের সব ফুল গাছ গুলো মরতে বসেছে, বৈশাখ মাস বৃষ্টি নেই আর পানি দেয়ার সানুও নেই।
– আজ তো বৃষ্টি হচ্ছে দেখলেই তো তারপরেও পানি দেয়ার আর কি দরকার আছে?
– আমি তো সে জন্য আসি নি। আমি–
– তাহলে কেনো এসেছো প্লীজ বলো!
– তোমাকে নিতে এসেছি সানু!
– এই ঝড় বৃষ্টির রাতে ভিজতে ভিজতে তুমি আমাকে নিতে এসেছো?
– একটা খবর দিতেও এসেছি।
– কি খবর?
– সানু আমি আবার বাবা হতে চলেছি।
ওর কথা শুনে আমার এক মিনিটের জন্য কোথায় জানি ভাবনায় হারালাম। আবির পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেখালো, দেখলাম আমার সেই টেস্টের রিপোর্ট এটা। রিপোর্টে লেখা আছে- “Pregnancy positive” সেদিন ঐ ঝড় বৃষ্টির রাতেই সে আমাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। রাতে আমার রুমে ঢুকে আলো জ্বেলে দেখি দেয়ালে বেশ বড় করে বাঁধানো আমার আর আবিরের ছবি। সবগুলো ছবিই আমাদের বিয়ের দিন উঠানো। এর পরে ঐ বেরসিক মানুষটার সাথে ছবি উঠানোর সুযোগ কোথায় ছিল? আবিরের দিকে তাকাতেই সে বললো—“ভাগ্যিস আকাশের ক্যামেরাতে ছবি গুলো ছিল! তাই তো পাটরানীকে দেয়ালে টাঙাতে পারলাম”
পরদিন সকালে আবির সেই পুরোনো দুই কাজের মেয়েকে জয়েন করালো তারপর টুসীকে বাসায় ফিরিয়ে আনলো। আর আমার উপর এক’শ চুয়াল্লিশ ধারা জারি হলো, বিছানা থেকে নামা যাবে না। আবির ওর ডাক্তার বন্ধুর কাছে থেকে কি সব শুনে এসে এই সব শুরু করেছে। ডাক্তার নাকি বলেছে যে ত্রিশ এর পর প্রেগনন্সীতে নাকি ঝুঁকি আছে। আমি সারা দিন টুসির সাথে বিছানাতেই বসে খেলি। আজ কাল আবির খুব ফাঁকিবাজ হয়ে গেছে, সে দেরীতে অফিসে যায় আর তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে। আর ফিরে এসেই সে এটা খাও ওটা খাও বলে আমাকে অত্যচার করে। আর অফিসের স্টাফদের বলে—“আমার মিসেস খুব অসুস্থ তাই তাড়া তাড়ি বাসায় ফিরতে হবে।”মানবাধিকার অধিদপ্তরের বড় কর্মকর্তা যদি এসব কথা বলে তাহলে দেশের মানুষের অধিকারের হাল তো বেহাল হয়ে যাবে। সেদিন মানুষটা আমার জন্য আপেল কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেললো। টপ টপ করে রক্ত পড়ছিল, আমি যখন ওর হাতটা ব্যান্ডেজ করতে গেলাম তখন সে আমাকে বললো-
– সানু এই রক্তের মাঝে কি তুমি কিছু দেখতে পাচ্ছো?
– দেখতে পাচ্ছি তো। সে খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
– কি দেখতে পাচ্ছো?
– লাল রঙ দেখতে পাচ্ছি।
– আর কিছু দেখতে পাচ্ছো না?
– আর তো কিছু নেই, তবে হিমোগ্লোবিন আছে, আর ঐ হিমোগ্লোবিনটা লাল রঙের হয়।
– এই রক্তের মাঝে সানুর জন্য যে ভালোবাসা ঝরে ঝরে পড়ছে সেটা কি তুমি দেখতে পাচ্ছো না?
ওর কথা শুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম তাই আর কোনো উত্তর দিই নি। ভালোবেসে অর্জিত ভালোবাসার ঘোরে ছিলাম আমি তাই ওর প্রশ্নের কোনো জবাব নেই আমার কাছে।
আমি কিন্তু বুঝলাম না যে আবিরের কাঠের তৈরি মনের ঘরের দেয়ালটা ভাঙলো কি করে?
আমার কাঠ ঠোকরা অভিযানের চুড়ান্ত ফলাফল নাকি সে নিজেই কি কাঠ মিস্ত্রী হয়ে ভেঙেছে।

সম্পর্কিত পোস্ট

পূনর্জন্ম

জুয়াইরিয়া জেসমিন অর্পি . কলেজ থেকে ফিরেই পিঠের ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো অন্বেষা। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো।প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ ওর। আজ ওদের সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট দিয়েছে। একদমই ভালো করেনি সে। যদিও শুরু...

অনুভূতি

অনুভূতি

লেখা: মুন্নি রহমান চারদিকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে এখনো আবছা অন্ধকার। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লো মালা। ঘরের কাজ সেরে বের হতে হবে ফুল কিনতে। তাড়াতাড়ি না গেলে ভালো ফুল পাওয়া যায় না আর ফুল তরতাজা না হলে কেউ কিনতে চায় না। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ যেন...

অসাধারণ বাবা

অসাধারণ বাবা

লেখক:সাজেদ আল শাফি বাসায় আসলাম প্রায় চার মাস পর। বাবা অসুস্থ খুব।তা নাহলে হয়তো আরও পরে আসতে হতো।গাড়ি ভাড়া লাগে ছয়শো পঁচিশ টাকা।এই টাকাটা রুমমেটের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।তার কাছে এই পর্যন্ত দশ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে।বলি চাকরি হলেই দিয়ে দিব। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর...

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *