ধর্ষিতা নারীর আর্তনাদ
প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৫, ২০১৯
লেখকঃ আওয়ার ক্যানভাস

আওয়ার ক্যানভাস বই প্রেমীদের মিলন মেলা। লেখকদের লেখা পাঠকের কাছে বই আকারে পৌঁছে দেওয়া, আওয়ার ক্যানভাসের সাথে জড়িতদের সম্মানজনক জীবিকার ব্যবস্থা করার স্বপ্ন নিয়েই আমাদের পথ চলা।

 55 বার দেখা হয়েছে

এই লেখক এর আরও লেখা পড়ুনঃ আওয়ার ক্যানভাস

গল্পঃ ধর্ষিতা নারীর আর্তনাদ
লেখাঃ এ এইচ সাজু
.
ধর্ষণের পর স্নেহা যখন ফাঁসি দিতে ফ্যানের সাথে নিজের ওড়না লাগাচ্ছে তখন তার চোখে এক ফোঁটা জল আসলো! ধর্ষিত হওয়ার সময় থেকে শুরু করে এখনো অবধি মেয়েটির চোখে পানি আসলো না,নরম হৃদয়টা যেন কঠিন হয়ে ছিলো, ঠিক আত্মহত্যার একটু আগে এক ফোঁটা চোখের জল পড়লো!
আর তাতেই যেন থমকে দাড়ালো স্নেহা! ধর্ষিত হলাম আমিই, আবার নিজের প্রাণটাও আমিই দিতে যাচ্ছি?
ওই পশুটা তো ঠিকই বেঁচে যাবে!
না আর নয়, আর কোনো বোনের ইজ্জত হারাতে দেবো না!
এর বিচার দেখেই যাবো!
হ্যাঁ ফাঁসি ওই পশুটার দেখবো!
.
ছেঁড়া জামাটা নিয়ে সে তার বাবার সামনে দাঁড়ালো , যে বাবার সামনে সে ঘোমটা দিয়ে থাকতো, আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে ছেঁড়া জামা গায়ে।
অসুস্থ বাবা তার গায়ের চাদরটা দিয়ে মেয়ের শরীরটা ঢাকলো।
স্নেহার বাবার বুঝতে বাকি রইলো না তার মেয়ের সাথে কী ঘটেছে।
নিজের আদরের রাজকন্যাকে এমন দৃশ্যে কোনো বাবা দেখতে চাইবে না।
তবুও বাবা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।
বললো ” মা তোর কিছুই হয়নি।
তুই আমার রাজকন্যা সেই ছোট্ট রাজকন্যাই।
হয়তো স্নেহার বাবা চাচ্ছে না কাউকে বা পুলিশকে কিছু বলুক। কারণ সমাজের নোংরা মানুষ রা তার মেয়েকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। তার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সে কাউকে জানাতে চায় না।
কিন্তু স্নেহা যে সেটা মানবে না, তার শরীরের আঁচড়গুলো যে এখনো জ্বলছে।
বাবার প্রতিবাদী মেয়েটা যে চুপ করে থাকবে না।
.
কী করবে ভেবে পাচ্ছিলো না স্নেহা! ছুটলো পুলিশের কাছে। কিন্তু পুলিশ তো প্রমাণ ছাড়া কিছুই করবে না কারণ এটা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পরে না।
তাকে প্রমাণ দিতে হবে সে আসলে ধর্ষিতা নারী কিনা।
স্নেহার জন্য এই যেন খুবই বেদনাদায়ক! ধর্ষিতা হলাম আর সেটার প্রমাণও লাগবে!
নিয়ে যাওয়া হলো মেডিকেলে ডাক্তারি পরীক্ষা হবে আসলেই সে ধর্ষিতা কিনা।
শুরু হলো পরীক্ষা!
পরীক্ষা টা এত নোংরা ভাবে করা হয় সেটা সে আগে জানতো না, এ যেন আরেকবার ধর্ষিত হলো!
এটা তার চেয়েও বেশি লজ্জাজনক স্নেহার জন্য!
এখানে আসার ছেয়ে বুঝি মরে যাওয়াটাই ভালো ছিলো!
মনে মনে ভাবতে লাগলো।
চোখের অশ্রু এবার আর এক ফোঁটা না বেশ কয়েক ফোঁটা ঝরতে লাগলো!
.
অনেক ডাক্তারি পরীক্ষার পর
প্রমাণ পেলো আসলেই একজন ধর্ষিতা নারী স্নেহা। মুহূর্তেই খবরটা ছড়িয়ে পড়লো!
ছুটে আসলো সাংবাদিক!
সমস্ত নিউজ চ্যানেলে তার ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে ধর্ষিতা নারী হিসেবে।
সবাই ওই ধর্ষকের বিচার চাচ্ছে।
দেশের প্রায় সবাই ধর্ষকের বিচার চাচ্ছে। স্নেহা লক্ষ করলো সবাই বিচার চাচ্ছে, তাহলে সে ধর্ষকগুলো কে?
আসলেই খুব রহস্য।
কয়েক মুহূর্তেই সারাদেশ মেয়েটিকে চিনে ফেললো!
খবরের কাগজে ছাপা হলো মেয়েটির ছবি সাথে তার বাবার ছবিও!
এটা দেখে মেয়েটি ভাবলো ধর্ষিতা এবং ধর্ষিতার পরিবারকে সবাই চিনলো তবে ওই পশুগুলোর ছবি কেউ প্রকাশ করলো না!
না মেয়েটির চোখে আর কয়েক ফোঁটা অশ্রু বইছে না ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগলো।
সেদিনই যদি মরে যেত এই সুন্দর ধরণী টা দেখতে পেতো না! যেখানে ধর্ষিতা নারীর ছবি পরিবারসহ প্রকাশ পায়! ধর্ষকের ছবি আড়ালেই থেকে যায়।
এবার সত্যিই অনেকদিন বাঁচতে ইচ্ছা করছে স্নেহার! কার জন্য সে মরবে?
যেখানে মরেও শান্তি পাওয়া যাবে না মৃত ছবিটাও তুলে খবরে প্রকাশ করা হবে, এই সেই ধর্ষিতা নারী স্নেহা! হয়তো কবরে শুয়ে থাকতেও পারবে না, কবর থেকে উঠানো হবে ময়না তদন্ত করা হবে!
এসব কিছুর পরেও স্নেহার মনে একটাই বিশ্বাস হয়তো কখনো বিচার হবে সেই মানুষ রূপী পশুটার।
কিন্তু স্নেহা এটাও ভাবে যেখানে ধর্ষক জেনেও কিছু শিক্ষিত আইনজীবী ধর্ষকের পক্ষে আইনি লড়াই করে সেখানে বিচার কার চাইবে? যেখানে আইনজীবীরাই এক একটা বড় ধর্ষক হয়ে দাঁড়ায়।
তবুও মন যে চায় ধর্ষকের বিচার হোক।
.
সমাজে স্নেহা এখন সবার মুখে মুখে! কিন্তু সব মানুষ তার দিকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে তাকায়।
সে কি অন্য মেয়ে থেকে আলাদা?
নাতো সবকিছুই ঠিক আছে! তবুও কেনো এই দৃষ্টিভঙ্গি?
মনে মনে এসব ভাবতে লাগে স্নেহা।
তার সহপাঠীদের সবার বিয়ে হচ্ছে! চোখের সামনে হই হুল্লোড় করে তাদের বাবা বিয়ে দিচ্ছে!
এসব দেখেই যাচ্ছে! তাকে যে কেউ বিয়ে করতে রাজি হবেনা।
সারাদেশ জানে সে ধর্ষিতা নারী! চোখের জল যে আর নেই! যাক ভালোই কান্নাটা কে কেমন জানি শত্রু মনে হয় এখন।
স্নেহা ভাবতে থাকে সেই ছোটবেলার কথা। কত সুখী ছিলো তাদের পরিবার। তার মামা ছিলো খুব ধনী লোক। গ্রামের সর্দার ছিলো। তাকে তার মামা আদর করে টুনি ডাকতো। তখন তার মামা বলেছিলো তার ছেলের বউ করে নিবে টুনিকে।
তাহলে দুজনকে এক করে টুনটুনি ডাকবে। তার মামী তাকে শাড়ী পরিয়ে সাজিয়ে দেয় যতবার সে মামার বাড়িতে যায়।
কপালে একটা চুমো দিয়ে চোখে কাজল লাগিয়ে দিতো।
তবে খুব আশ্চর্যের বিষয় এখন স্নেহার পরিচয় দিতে অস্বীকার করে তারা। তার আদরের মামী বলে সে যেন মামার বাড়িতে না যায়। মামা তাকে চিনতেও রাজি না।
তার শরীরের কি এমন দাগ লাগলো যে সবাই এমন করবে তার সাথে?
এসব ভাবছে আর হাসছে ” সেদিন যদি মরে যেত প্রিয় মানুষগুলোর ব্যবহারটা দেখতো না।
একজন ধর্ষিতা নারীর সাথে কি ঘটতে পারে, সেটাও দেখা হলো।
স্নেহা অভাক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকায়!
আর বলে ”
আমার কি কখনো বিয়ে হবেনা?
আমি কি এতটাই অপবিত্র?
কি দোষ ছিলো আমার?
ধর্ষিত হয়ে বিচার না চাওয়াই কি আমার জন্য শ্রেয় ছিলো?
সেদিন কি মরে যাওয়াই ভালো ছিলো?
ধর্ষিত হয়ে চুপচাপ থাকো এটাই কি ধর্ষণ গল্পের সারমর্ম?
.
প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দিবে?
স্নেহা সেটা জানেনা! সে আকাশের দিকে এখনো তাকিয়ে আছে।
তার শরীরে এখন আর সেই জোশ নেই যেটা ফাঁসির দড়ি ছেড়ে বলেছিলো যে আর কোনো বোনের ইজ্জত হারাতে দিবো না। ওই পশুগুলোর বিচার দেখেই যাবো।
এ জোশ আর কেনো শরীরে আসছেনা সেটাও স্নেহার জানা নেই।
এখনো আকাশের দিকেই তাকিয়েই রইলো।
ঘরে ফিরলো না!
অনেকদিন হলো স্নেহাকে দেখা যাচ্ছে না।
বেশ কয়েকদিন হলো স্নেহার নিঃশ্বাস টা প্রকৃতি অনুভব করছে না।
কোথায় গেলো মেয়েটি কেউ জানেনা।
মেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এজন্য তার বাবারও কোনরকম মাথা ব্যথা নেই।
মেয়েটি কি এতটাই বোঝা হয়ে ছিলো সমাজে?
তার বেশ কয়েকদিন পর স্নেহার নিথর দেহটা পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রাণহীন সেই দেহ। অনেক শকুন ভীড় করেছে লাশের গন্ধে। শকুনরা ছিড়ে খাচ্ছে স্নেহার দেহটা।
শীতের ওই উত্তরের বাতাসে ভেসে আসছে না সেই ধর্ষিতা নারীর আর্তনাদ।
আকাশ বাতাস যেন ভারী হয়ে আছে, পাখির কিচিরমিচির যেন আজ অন্যরকম শুনা যাচ্ছে!
প্রকৃতি কি শূন্যতা অনুভব করছে ওই অপবিত্র মেয়েটার জন্য?
কে জানে হয়তো প্রকৃতির খুব আপন ছিলো স্নেহা ।
তবে আজ স্নেহা হয়তো খুব খুশি।
তার সুন্দর দেহটা সত্যিই শকুনে ছিড়ে খাচ্ছে!
কোন মানুষ রূপী শকুনরা ছিড়ে খাচ্ছে না।
হ্যাঁ স্নেহা আজ পৃথিবীর মাঝে নেই।
তবে পৃথিবী সত্যি কি আজ বোঝা ছেড়ে বাঁচলো?
হয়তো না!
পৃথিবীর মাঝে এরকম শত স্নেহার বাস।

সম্পর্কিত পোস্ট

যদি পাশে থাকো

যদি পাশে থাকো

তাসফিয়া শারমিন ** আজকের সকালটা অন্য রকম। সাত সকালে আম্মু বকা দিলো। মানুষের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙতেই পারে। তাই বলে এত রাগার কী আছে ?একেবারে যে দোষ আমারও তাও নয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে ফোনে বা দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে। কিন্তু আমি উঠি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আলো দেখে।কে জানে...

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন

অনন্যা অনু 'আমিনা বেগম' মেমোরিয়াল এতিমখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওমরের বুকটা ধুক ধুক করতে শুরু করে। ওমর ধীর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওমর গত রাতের ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে এসেছে। সে এসেই সোজা আমিনা বেগম মেমোরিয়াল এতিমখানায়...

দাদাভাইকে চিঠি

দাদাভাইকে চিঠি

প্রিয় দাদাভাই, শুরুতে তোকে শরতের শিউলি ফুলের নরম নরম ভালোবাসা। কেমন আছিস দাদাভাই? জানি তুই ভালো নেই, তবুও দাঁতগুলো বের করে বলবি ভালো আছি রে পাগলী! দাদাভাই তুই কেন মিথ্যা ভালো থাকার কথা লেখিস প্রতিবার চিঠিতে? তুই কি মনে করিস আমি তোর মিথ্যা হাসি বুঝি না? তুই ভুলে গেছিস,...

৩ Comments

  1. আফরোজা আক্তার ইতি

    প্রথমত লেখককে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে নেই। ধর্ষণের বিষয় নিয়ে অনেক গল্পই পড়েছি, কিন্তু এই গল্পটি আমাকে স্নেহার চরিত্রে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল। লেখক ও চমৎকারভাবে একটি ধর্ষিতা মেয়ের মনোভাব ও কষ্ট তুকে ধরেছেন যে গল্পটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল আমিই সেই স্নেহা! স্নেহার সকল কষ্ট আর আর্তনাদ যেন আমারই।
    আর কতকাল এভাবে নির্যাতিত হবে মেয়েরা? কতকাল পত্রিকার শিরোনাম হিসেবে থাকবে “তরুণী ধর্ষিত”? এবার বিচার চাই সকল ধর্ষক নামক জন্তুদের।
    গল্পে “_” চিহ্ন সঠিকভাবে ব্যবহাত নেই, এলোমেলো হয়ে গেছে।
    ছেয়ে- চেয়ে।
    নাতো- না তো।
    ছিড়ে- ছিঁড়ে।
    শুভ কামনা অনেক।

    Reply
  2. Halima tus sadia

    অসাধারণ একটি গল্প।
    অন্যরকম একটা গল্প পড়লাম।

    ধর্ষিতাকেই সবাই থুতু দেয়।ধর্ষকের আর বিচার হয় না।
    স্নেহার মতো বাস্তবেও কম হয় না ঘটনা।

    সেই ধর্ষনের খবর হয়তো কেউ জানেও না।
    এভাবেই অচিরেই মেয়েদের জীবন চলে যাচ্ছে।

    শাড়ী–শাড়ি
    অভাক–অবাক
    হবেনা– হবে না

    ধরণী টা–ধরণীটা

    শুভ কামনা রইলো।

    Reply
  3. Md Rahim Miah

    দাড়ালো-দাঁড়ালো
    চাইবে -চায়বে(যেহেতু অন্যজনের কথা বলা হয়েছে)
    ছোট্ট-ছোট
    মানুষ রা-মানুষরা
    ছেয়ে-চেয়ে
    বইছে-বয়ছে(যেহেতু অন্যজনের কথা বলা হয়েছে)
    হবেনা-হবে না(না আলাদা বসে যেহেতু শব্দ)
    ধরণী টা-ধরণীটা
    কান্নাটা কে-কান্নাটাকে(কে শব্দের সাথে বসে, তবে প্রশ্ন বুঝাতে আলাদা হয়)
    শাড়ী-শাড়ি
    কি-কী
    অভাক-অবাক
    হবেনা-হবে না
    কি-কী
    জানেনা-জানে না
    আসছেনা-আসছে না
    জানেনা-জানে না
    কোনরকম-কোনোরকম
    শুনা-শোনা
    ছিড়ে-ছিঁড়ে
    বাহ্ চমৎকার লিখেছেন। পড়ে অনেক অনেক ভালো লাগলো। সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে গল্পের মাঝে। আসলে স্নেহা এর মতো এইরকম শত শত ধষিতা নারীকেই এইরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ভুলে মান বেশি হলেও গল্পটা হৃদয় ছুঁয়ে গেল। অনেক অনেক শুভ কামনা রইল আর বানানের দিকে আগামীতে খেয়াল রাখবেন আশা করি।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *